নারী হাঁড়ি!

0
Women in ancient India

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

প্রাচীনকালে অন্নলাভই ছিল বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। আর তাই এই অন্নকে “বহু” করার উদ্দেশ্যেই নর-নারীর মিলনের জন্য বহুরকম উৎসবের আয়োজন করা হতো। সিন্ধু সভ‍্যতার মানুষেরা ছিল কৃষিজীবি। তাই তাদের নগর তৈরি করে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলার দরকার হয়েছিল। এই কৃষিকাজ আবিষ্কার করেছিল মেয়েরা। পরবর্তীকালে কৃষিতে যখন খনন যষ্টি বাদ দিয়ে অন্নকে বহু করার জন্য বলদের ব‍্যবহার শুরু হলো, তখন কৃষি আর নারীদের অধিকারে থাকলো না, চলে এলো পুরুষদের দখলে। আজও বর্ষাকালে গ্রামাঞ্চলের নারীরা নিজেদের বাড়ির উঠোনে বা খামারে লাউ, কুমড়ো, ঝিঙের বীজ পোঁতেন। যাকে এখনকার ভাষায় “কিচেন গার্ডেন” বলা হয়, তা নারীদের দখলেই আছে। এটা সেই পুরোনো ঐতিহ্যের জের।

Harappan Mother Godess Seal


প্রত্নতত্ত্ববিদ স‍্যার জন মার্শাল হরপ্পায় একটি আশ্চর্য সীল আবিষ্কার করেছেন, তার এক পীঠে দেখা যাচ্ছে একটি নারীমূর্তি। এই নারীর দুটি পা দু’পাশে সরানো এবং তার গর্ভের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে একটি লতা। নারীদেহ থেকেই যে আদি শস্যের উদ্ভব, এই সীলটি সে কথাই ব‍্যক্ত করছে।
ভারতের প্রাচীন সাধনা ছিল তন্ত্রসাধনা। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় কর্মকেই এই সাধনার মধ্যে আনা হয়েছে। তন্ত্রধর্মের মতে, যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে, তাই আছে দেহভাণ্ডে। “তন্” ধাতুর উপর “স্ট্রন্” প্রত‍্যয় করে হয় “তন্ত্র।”

আরও পড়ুন: চাষে গুরুত্ব কমছে বলদ গরুর, বাড়ছে ট্রাক্টরের চাহিদা।


“তন্” ধাতুর অর্থ “বিস্তৃত করা।” বংশবৃদ্ধির একটি মুখ‍্য অর্থ হলো, তন্ + অয়ট = তনয়। আবার সম্+তন্+ঘঙ্=সন্তান।
তেমনি কৃষি বিস্তারের ক্ষেত্রেও এই ব‍্যাখ‍্যা প্রযোজ্য। “তন্” ধাতুর অর্থ যে “বিস্তৃত করা”, তা ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিকেও বোঝায়। অন্যদিকে, তন্ত্রের গৌণ অর্থ হলো, “বয়ন কর্ম।” কৃষিবিদ‍্যার পাশাপাশি এই বয়ন কর্মও এসেছে নারীর হাত ধরে।

Image of Buddhist Tantra


আমাদের দেশে পুরুষ প্রাধান্যকে বলা হয়েছে বীজ প্রাধ্যান‍্য এবং নারী প্রাধান্যকে বলা হয়েছে ক্ষেত্র প্রাধান্য। অথর্ববেদে বলা হয়েছে, বিয়ের সময় পুরোহিত বরকে বলবে, এই নারীই হলো তোমার ক্ষেত্র। তুমি সেই ক্ষেত্রে বীজ বপন করো। মাতৃপ্রধান তান্ত্রিক ধারা অনুসারে, সন্তান উৎপাদন থেকে কৃষি-ধন উৎপাদন, সব ব‍্যাপারেই পুরুষ অপ্রধান। এখানে নারীই জগদম্বা, নারী থেকেই সবকিছুর জন্ম।

আরও পড়ুন: সুখে থাকতে আংশিক কাজের নামে যৌবন বিক্রি করছে শহরের স্কুল ছাত্রীরা

আমাদের দেশে মাতৃপ্রধান সমাজের প্রভাবে প্রজনন কাজে নারীর প্রাধান্য স্বীকৃত হবার পরেই অর্থাৎ কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠার পরেই দেবী মাহাত্ম্যের মধ্যে দেখা যায় মানবী-নারীর উর্বরাশক্তির স্পষ্ট প্রতিবিম্ব। সন্তান প্রসবিনী নারীর প্রতিনিধি হিসেবেই তখন দেবলোকে আবির্ভূতা হোন দেবীরা। পৃথিবীই বসুমাতা। এই “বসুমাতা” পরিকল্পনার জন্ম-মতবাদই হলো ভারতের শাক্ত মতবাদের মূলমন্ত্র। দেবীও তাই “ভগবতী।” এখানে সমস্ত অঙ্গের থেকে “ভগ” অর্থাৎ জনন অঙ্গকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি।

Devi Bhagwati


অনার্যরা ছিল কৃষিজীবী। অন্যদিকে, আর্যরা ছিল পশুপালক এবং তাই তারা ছিল যাযাবর। তারা যোদ্ধাও ছিল। সেজন্য তাদের নগর তৈরি করে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলার দরকার হয়নি। আর তাই অনার্যদের কৃষি বৃত্তিকে তারা গ্রহণ করেনি। সেজন্য শাস্ত্রে ব্রাহ্মণের লাঙল চালানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তাই কৃষিকাজ থেকে গেছে অনার্যদের হাতে। পরবর্তীকালে আর্যরা কৃষিজমির মালিক হয়েছে ঠিকই, তবে সেই মালিকের জমিতে কৃষিকাজ করে এসেছে অনার্যরাই। মনুর আইনে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়ের কৃষিকাজ করা নিষিদ্ধ। মনু বলছেন, “কৃষি সাধ্বিতি মন‍্যন্তে সা বৃত্তি: সদ্বিগর্হিতা”, অর্থাৎ “কোনো পণ্ডিত ব‍্যক্তি কৃষিকাজকে ভালো বললেও তা সাধুজনের দ্বারা নিন্দিত।”

আরও পড়ুন: ‘ধর্মনিরপেক্ষ ‘ ভারতে এবার লুটেরাদের নিশানায় হিন্দু মন্দির , চুপ সকলে


মূলত পশুপালন প্রাধান্যের জন্যেই আর্য সমাজে এবং সেইসঙ্গে বৈদিক ধ‍্যান-ধারণায় মাতৃ প্রাধান্যের বিকাশ হয়নি। অন্যদিকে, স্থানীয় অনার্যরা কৃষি বৃত্তিতেই থেকে গিয়েছিল বলে তাদের মধ্যে মাতৃ প্রাধান্যের বিকাশ ঘটেছিল। ঋকবেদের “দেবীসূক্ত” অনেক পরের রচনা। তার আগে পর্যন্ত বৈদিক সাহিত্যে পুরুষ প্রাধান্যই বর্তমান ছিল।

Bhagwati Idol founded in Vietnam


আমরা জানি, শ্মশানের সঙ্গে ডোম জাতির অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক। কারণ, ডোমরাই শ্মশানে শবদাহের কাজ করেন। বৌদ্ধ চর্যাপদ থেকে দেখা যাচ্ছে, তান্ত্রিকদের কাছে ডোম নারী অর্থাৎ ডোমনীর কদর বেশি। শ্মশান ও শবদেহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধের কারণেই তা হয়েছে। আর এ দুটোর সঙ্গে তন্ত্রসাধনার অতি নিকট যোগসূত্র রয়েছে।

আরও পড়ুন: ফুড অ্যাপের মাধ্যমে ২০ মিনিটে ৫৫ প্যাকেট কম্বো বিরিয়ানির অর্ডার দিলেন জেলবন্দীরা


সুতরাং দেখা যাচ্ছে, বৌদ্ধ চর্যাপদের যুগে অর্থাৎ ১০০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দের সময়কালে ডোম নারীরা ঘরবন্দি না থেকে বাইরে তারা স্বাধীনভাবে ঘোরাফেরা করতেন। এ থেকে ডোমনীদের সাহসিকতার পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই ডোম নারীরা সে সময় বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের কাছে প্রেরণাদাত্রীর ভূমিকা নিয়েছিলেন। ডোম সম্প্রদায় ও ডোম নারীদের সঙ্গে বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের এই সামাজিক মেলামেশা এবং ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধজাত ধর্মপুজোয় ডোম পুরোহিতদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

Godess Kali and Lord Shiva


আমাদের দেশে সহজিয়া বাউল বৈষ্ণবদের মধ্যে নারী নিয়ে নারীশক্তির যুগল ব‍্যবহার বেশ চিত্তাকর্ষক। এই নিয়ে কিছুটা “প্র‌্যাকটিক‍্যাল” আলোচনা করবো। বিষয়গুলি অত্যন্ত গোপন এবং এই গোপনীয়তার কারণেই আস্তে আস্তে তা হারিয়ে যাচ্ছে। তাই সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতেই কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনায় আসছি। …
প্রথমেই বলি, এই সাধনার কেন্দ্রবিন্দু হলো “নারী।” রূপ-রস-রতি-মাটি—এই নিয়ে হলো “চারিচন্দ্র ভেদ।” একে একে বিষয়গুলির ব‍্যাখ‍্যায় আসছি।…

আরও পড়ুন: রথের রশিতে প্রথম টান বাড়ির মহিলাদের, হুগলির গোঁসাই বাড়ির এটিই প্রথা


১) রূপ : রূপ হলো নারীর জননাঙ্গ। এর আরেক নাম “ফুল।” এই “ফুল” দর্শনের বিধি রয়েছে।
২) রস : শুক্রপাতহীন যৌন সংসর্গের আগে নারী ও পুরুষের জননাঙ্গ থেকে বেরিয়ে আসা স্বচ্ছ জলীয় পদার্থ, যার নাম “মদন জল”, যুগল সাধনায় নারী-পুরুষের এই মদন জল লাগে। আবার পুরুষের শুক্র ও নারীর রজ: মিলেও তৈরি হয় “রস।” এটি পান করতে হয়।
৩) রতি : শৃঙ্গারের পর নারী-পুরুষ উভয়ের পেচ্ছাপ একটি নারকেলের মালায় রাখতে হয়। এর নাম “সোমরস।” বাউলরা বলেন, “শিবাম্বু।” সাধনার জন্য নারী-পুরুষকে এটি পান করতে হয়।
৪) মাটি : মাটি হলো আসলে পায়খানা। আগের দিন রাতে পোস্ত ভাত বা এই জাতীয় হালকা খাবার খেতে হয়, যাতে পায়খানা দুর্গন্ধযুক্ত অম্বল পায়খানা না হয়। এই “মাটি” ভক্ষণ করতে হয়।
এছাড়া উপরোক্ত সব বস্তুগুলি একত্রিত করে “লোশন” তৈরি করে তা গায়ে মাখতে হয়। এতে গায়ে কোনো ময়লা থাকে না। ভালো সাবানের কাজ করে এই “লোশন।”

Balgopala


বলা বাহুল্য, সহজিয়া ভাষায় “নৃত্য করা” মানে নারী-পুরুষের যৌন সংসর্গ করা।
ছবিতে আমরা নাড়ু হাতে নাড়ুগোপালকে দেখি। এর গূঢ় ব‍্যাখ‍্যা আছে। ছবিতে দেখা যায়, গোপাল হাঁটু মুড়ে বসে নাড়ু খাচ্ছে। সামনে থাকে ননীর হাঁড়ি।

আরও পড়ুন: ল্যাবরেটরি বনাম প্রকৃতি


এখন প্রশ্ন, “গোপাল” কী ?
“গোপাল” হলো পুরুষের না-জাগা লিঙ্গ। লিঙ্গ যখন ছোট থাকে, তখন তার নাম “গোপাল।” আর “গোপাল” মানে “গো-পাল”, অর্থাৎ গোরুর মতো “পাল” খায়। সোজা কথায়, যৌন সংসর্গ করে।
গোপাল ননী খায়, অর্থাৎ যৌন সংসর্গে যায়। সামনে যে ননীর হাঁড়ি, আসলে তা হলো “নারী।” এখানে “হাঁড়ি” মানে নারী। নারীই এখানে “হাঁড়ি।” আরও বিশদে বলতে গেলে , নারীর যোনি। বলরাম হলেন যোগমায়া এবং তিনিই হলেন নারীর রজ:।

Bhagirath and Ganga


এরপর আরও একটি ছবির কথা ভাবুন। ছবির নাম—“ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন।” এই ছবিতে দেখা যায়, ভগীরথ শঙ্খধ্বনি করতে করতে এগিয়ে আসছেন, পিছনে পিছনে আসছেন মা গঙ্গা। এখানে ব‍্যাখ‍্যা হলো, নারী-পুরুষের যুগল সাধনায় নারীই হলো শক্তি। ভগীরথ আগে আসেন মানে যৌন সংসর্গের সময় পুরুষের শুক্র আগে চলে আসে। যুগল সাধনায় এটি রুখে দিতে হবে। তবেই তার পিছনে আসবেন মা গঙ্গা অর্থাৎ নারী শক্তি। আর তারপরেই উদ্ধার পাবে জহ্নুমুনির অভিশাপে মৃত সগর রাজার ষাট হাজার সন্তান। তার মানে পুরুষের বীর্যস্তম্ভন ঘটলে ষাট হাজার শুক্রকীট বাইরে বেরিয়ে এসে মরবে না, তারা শরীরের ভেতরেই বেঁচে থাকবে।


এভাবেই যুগে যুগে নারী শক্তি যুগিয়েছে পুরুষকে। নারী তাই অর্ধেক আকাশ হয়ে পুরুষগামিনী। তন্ত্র থেকে দৈনন্দিন জীবন—-সর্বত্রই নারী তাই “শক্তিরূপেণ সংস্থিতা।”..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here