নদীর _নাম_শীলাবতী_ও_তার_উপাখ্যান

1

Last Updated on

“বহু দিন ধরে, বহু ক্রোশ দূরে

বহু ব্যায় করি, বহু দেশ ঘুরে

দেখিতে গিয়াছি পর্বতমালা

দেখিতে গিয়াছি সিন্ধু

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া

একটি ধানের শিষের উপর

একটি শিশির বিন্দু”

বাংলায় লোককথার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ ব্রতকথা ও নানা লৌকিক কাহিনী। দেব দেবীর মাহাত্ম্য বিষয়ক বিভিন্ন প্রকার বিশেষত্ব যুক্ত কাহিনী গুলোর সঙ্গে বিশ্বাস ও সংস্কারের গভীর সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে। এসব ব্রত ও লৌকিক গল্প শোনা একটি ধর্মীয় আচার বলে মনে করা হয়। ব্রত কথা শুনলে পুন্য হয় ।সংসারের সুখ শান্তি ও মঙ্গল কামনায় বাংলার নারীরা ব্রত উদযাপন করে থাকেন । বাংলার অসংখ্য ব্রতকথার পরিচয় জানা যায়।

এসব ব্রত যেরকম ধর্মীয় ভাব আনতে সাহায্য করে, আবার অন্যদিকে চরিত্র গঠনে ও  সমাজ গঠনে বিশেষ সহায়ক হয়। প্রাচীনকাল থেকেই পদ্ধতি নিয়ম প্রচলন করেছে । এই অপূর্ব শিক্ষা নিয়ে আমাদের সংসার আমাদের সমাজ সুধাময় হয়েছে ।

আমরা যত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছি আমাদের সমাজ থেকে এগুলো হারিয়ে যাচ্ছে।  লুপ্তপ্রায় এই কথাগুলোকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার বর্তমান মানুষের একান্ত উদ্দেশ্য বলে আমরা মনে করে থাকি।

মানুষের ব্যক্তি জীবনে তার সুচরিত্র পরোপকারিতা ও অন্যের জন্য আত্ম বলিদান তাকে দেবত্বে উন্নীত করে ।

জয়পন্ডা , শীলাবতী নামে দুটি চরিত্রকে অবলম্বন করি আজও মানভূমের প্রচলিত আছে একটি কাহিনী। আসলে দুটি হলো দুটি নদীর নাম ।পুরুলিয়ার বিখ্যাত একটি প্রাচীন নদী শিলাবতী আর জয়পন্ডা বাঁকুড়ায় প্রবাহিত একটি নদী। শিলাবতী নদীর উৎস স্থল হুড়া থানার অন্তর্গত বড়গ্রাম মৌজার একটি পুকুর থেকে।

এই গ্রামেই শিলাবতী ও জয়পন্ডার নিত্য পূজা হয় । আজও গ্রামবাসীদের মুখে শোনা যায় শিলাবতী অমর কাহিনী। শিলাবতী হলেন একজন ভূমি কন্যা।

জয়পন্ডা ছিলেন এক সিদ্ধ মুনি। তিনি পুরুলিয়ার বড়গ্রামে এক জঙ্গলে এক নির্জন পলাশ আর শাল বৃক্ষের নিচে একটি ছোট্ট কুটির নির্মাণ করে বাস করতেন। তাঁর কাজ ছিল বিদ্যাচর্চা , ধ্যান , জপ ও কিছু ছাত্রকে বৈদিক শিক্ষা দান। এই জয়পন্ডার কুটিরেই আশ্রিতা ছিলেন শীলাবতী। কুটিরের কাজ , জল আনা , ফুল তোলা , পুজোর জোগাড় ,আল্পনা দেওয়া , ঘরকন্নার আরো নানা কাজ এইসবই ছিল শীলাবতীর দৈনন্দিন কর্ম।

বেশ কিছু ছাত্র তাঁর নিকট বেদ উপনিষদ পাঠ নিতে আশ্রমে আসতেন। পুরুলিয়া গরমে যেমন রুদ্র ঠিক তেমনি বর্ষায় সবুজ আর শীতে অতীব শীতল ,বসন্তে যৌবন। এক কনকনে শীতের সকালে আশ্রমের সেই ছাত্রদের নিয়ে মকর সংক্রান্তিতে জয়পন্ডা মনস্থ করলেন গঙ্গাস্নানে যাবেন। শীলাবতী সব শুনে বললেন , “গুরুদেব আমিও আপনার সঙ্গে যাবো গঙ্গাস্নানে।”

কিছুক্ষণ ভাবলেন ঋষি ঠাকুর। তারপর বললেন ,  “মাগো সে তো বহুদূর । তাছাড়া তুমি সমর্থ যুবতী । পথে চোর ডাকাতের বড় ভয় …. কি জানি কখন কি অঘটন ঘটে ? তার চাইতে তুমি এখানেই থাক।”

কিন্তু শীলাবতী তখন নাছোড়। তিনি ঋষির সঙ্গেই যাবেন। একদিন, এক রাত না খেয়ে উপোস করে কাটিয়ে দিলেন। সে সময় রাঢ় অঞ্চলের জঙ্গল ছিল শ্বাপদ সংকুল । শুধু তাই নয় দস্যুরা সেসময় এই জঙ্গল দাপিয়ে বেড়াত। তাই কোনো ভাবেই শীলাবতীকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলনা। জয়পান্ডা মন দুঃখে পেলেন। কিন্তু শিলাবতী কে নিয়ে যেতে সাহস পেলেন না ।

মকর সংক্রান্তির তিন দিন আগে জয়পন্ডা পাঁচ জন শিষ্য নিয়ে পথে বের হলেন।  শিলাবতী যাবার মুহূর্তে কাঁদতে কাঁদতে পায়ে পড়ে বললেন , “গুরুদেব আপনি তো আমায় নিয়ে যাবেন না ।এটি আপনি গঙ্গা মাকে উৎসর্গ করে দেবেন । ” বলে তিনি  কাপড়ের পুঁটলি মুনিকে দিলেন। সেই পুঁটুলি অতি যত্ন তাঁর অন্যান্য জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে রওনা হলেন।

চলতে চলতে পায়ে খিল ধরল। হেঁটে হেঁটে সকলে বেদম হল। পশ্চিম আকাশে সূর্য্য ঢলে পড়ল। শীতের বিকালে রাঢ়এর জঙ্গলে ঝুপ করে আঁধার ঘনাল। পথ চলার শরীর ক্লান্ত । ঋষি তাই ঘন জঙ্গলের মাঝে  শিষ্যদের নিয়ে রাত কাটাবার মনস্থ করলেন।  মাঝরাতে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন এমন সময় একদল ডাকাত তীর্থ যাত্রীর দলকে আক্রমন করল । সেই পুঁটুলি বুকে চেপে ধরে জয়পন্ডা বারবার মা গঙ্গার নাম উচ্চারণ করতে লাগলেন । ডাকাতদলের হঠাৎ কি মনে হল তীর্থযাত্রীদের রেখে পালিয়ে গেল ।

পরদিন সকালে স্নান সেরে আবার সবাই বেরিয়ে পরলো । দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হল। হুড়মুড় করে আঁধার এল। সে সন্ধ্যা কালসন্ধ্যা ছিল । তাদের সামনে হাজির হল এক ভয়ঙ্কর চিতা বাঘ । ঋষি ঠাকুর দেখলেন আর বুঝি রক্ষা নাই। তিনি ভয়ে পুনশ্চ সেই পুঁটুলি বুকে জড়িয়ে মা গঙ্গার নাম জপ করতে থাকলেন।  বাঘ গুটি গুটি চলে গেল ।

অবশেষে এক প্রত্যুষে তারা হাজির হলো গঙ্গার ঘাটে। জয়পন্ডা  ও তাঁর শিষ্যগন গঙ্গা স্তোত্র পাঠ করতে করতে পরম তৃপ্তিতে গঙ্গাবক্ষে অবগাহন করলেন । তারপর শিলাবতীর কথা ঋষির মনে আসতেই সেই পুঁটুলি গঙ্গার বুকে ছুড়ে দিলেন । অমনি তিনি দেখলেন শ্বেত শুভ্র দুই হস্ত পুঁটুলি নিয়ে  মিলিয়ে গেল।

জয়পন্ডা এ দৃশ্য দেখে আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়লেন। দু চক্ষে ঝরতে লাগল আনন্দাশ্রু । বারবার একই প্রশ্ন মনে জাগলো কে? কে এই শিলাবতী ?তিনি শিষ্যদের নিয়ে গৃহ অভিমুখে রওনা হলেন ..…বারবার মনের মধ্যে জাগতে লাগলো শিলাবতী কথা।  তিনি অনুভব করলেন সেই পুঁটুলিটি তাকে ঘোর বিপদ থেকে বারবার রক্ষা করেছে। মনের মধ্যে জোর বাড়িয়েছে । কিন্তু কি এমন বস্তু ছিল সেই পুঁটলিতে যা মা গঙ্গা স্বয়ং দুহাত দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন?

শিলাবতীকে একটিবার দেখার জন্য ঋষি ঠাকুরের মন ছটফট করতে লাগল । তিনি মনে মনে ঠিক করলেন ঘরে গিয়ে তিনি সেই কন্যার পায়ে পড়ে ক্ষমা ভিক্ষা চাইবেন । তিনি দ্রুত পথ চলতে লাগলেন। শিষ্যরা তার উদ্বেগের কথা জানতে চাইলেও তিনি মৌন থাকলেন ।

গৃহে পৌঁছনোর পর ঋষি জয়পন্ডা উচ্চস্বরে ডাকলেন …”শিলাবতী ; মা শিলাবতী …” শীলাবতী তখন পুকুর থেকে বড় মাটির কলসিতে জল ভর্তি করে নিয়ে আসছিলেন। ডাক শুনে শীলাবতী থাকতে পারলেন না । শীলাবতীকে দেখেই তাঁর পায়ে পড়ে প্রণাম করতে গেলেন জয়পন্ডা। অমনি শিলাবতীর জলপূর্ণ মাটির কলসি কাঁখ থেকে পড়ে গেল। সেই জল সরু স্রোতের আকারে বইতে লাগলো। সেই স্রোত ধরে শিলাবতীও ছুটতে লাগলেন। কিন্তু যতই শীলাবতী ছোটেন স্রোত তত গভীর হয়। শিলাবতী কে উদ্দেশ্য করে সেই ঋষিও ছুটেন… কিন্তু শীলাবতীকে কিছুতেই ঋষিকে পাদ স্পর্শ করতে দেবেন না।

শীলাবতী ছুটে ছুটে এক সময় হারিয়ে গেলেন সেই জলধারায়। জয়পন্ডা সেই জলধারাকে লক্ষ্য করে ছুটতে ছুটতে এক সময় স্থির করলেন এভাবে তাকে ধরা যাবে না।তাই কমুন্ডুল থেকে মন্ত্রপুত জল থেকে জলধারা সৃষ্টি করে শিলাবতীর উদ্দেশ্যে ধাবিত হলেন ।

অবশেষে মেদিনীপুরের কাছে উভয়ের মিলন হল।উভয়ের মিলনের তৈরি হলো মহাস্রোত। তা ধাবিত হল গঙ্গার উদ্দেশ্যে।

বড়গ্রামের নিকট শীলাবতীর উৎস স্থলে গ্রামবাসীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মা শিলাবতী মন্দির । সেখানেই কাহিনী শিল্পীর তুলিতে আঁকা হয়েছে ।এখানে নিত্য পূজা হয় ।আর পৌষ সংক্রান্তিতে বসে বিশাল মেলা…..

মেদিনীপুরে র এই মহাস্রোতের পাশে গনগনি। প্রথম দর্শনে সেই মহাস্রোত শিলাবতীকে দেখে মনে হয় কবিতা থেকে উঠে আসা সেই নদী –
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।

হুবহু তাই-ই।

মুগ্ধ বিস্ময়ে অনেক নীচে বয়ে চলা মহাস্রোত শিলাবতী, নদীর বুকের ওপর দিয়ে পার হওয়া গরুর পাল। ডান দিক, বাঁ দিকে হাজার হাজার বছরের স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাল, গেরুয়া মাটির পাহাড়। বিচিত্র, বিভিন্ন আকৃতি তৈরি হয়েছে প্রকৃতির আপন খেয়ালে। দূর থেকে মনে হয় ক্ষয়িষ্ণু কোনো বেলে পাথরের থাম, কোথাও গুহামুখ আবার কোথাও সুড়ঙ্গপথের শুরু যেন। বাঁধানো সিঁড়ি আছে নদীর পাড়ে নামার জন্য।

নদীর পাড়ে কোথাও কোথাও সবুজ ঘাসের গালিচা, নদীর বুকে চড়া, কোথাও হাঁটু জল, কোথাও বা কোমর সমান জল বয়ে চলেছে তির তির করে। শক্ত বালিমাটির পাড়। মাঝে মাঝে ঘাসের ছোপ, কিছুটা এগিয়ে গেলে চাষের জমি আর এপাড়ে ছবির মত গনগনি – দ্য গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন অফ বেঙ্গল”….

নদীর নাম শিলাবতী, পথের নাম ঢেউ
পোড়া মাটির রাস্তা ধরে তারা যাচ্ছে কেউ অন্ধকার মন চক্ষু, অন্ধকার ঘর
প্রিয় ছবির সঙ্গে যেন,সারা জীবন ভর…

#দুর্গেশনন্দিনী

তথ্যঃ পুরুলিয়ার লৌকিক দেবদেবী

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here