মুচলেকা ও ” কাপুরুষ ” সাভারকর

0

Last Updated on

প্রবীর মজুমদার

কমিউনিস্ট ও অন্যান্য তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বন্ধুরা বীর সাভারকরকে প্রবলভাবে গঞ্জনা দেন। কারণ তিনি ব্রিটিশ-সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামে সাভারকরের সশস্ত্র সংগ্রাম, ২৭ বছরের বন্দীজীবন– এ’সবকে গুরুত্ব দিলে “গো-মাতার সন্তান” হিসেবে পরিচিতি প্রাপ্তি অবধারিত! বাংলার বিপ্লবীদের প্রেরিত প্রতিনিধিকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিতে সাহায্য করার কথা তুলুন, বা মহারাষ্ট্রের “অভিনব ভারত” নামক বিপ্লবী সমিতির সদস্যদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র পাঠানোর প্রসঙ্গই তুলুন– হিন্দুত্ববাদীদের “টাইট” দেবার জন্যে তাদের গুরুঠাকুর বিনায়ক দামোদর সাভারকরকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতেই হবে!

মোদ্দা কথা হল, মুচলেকা দিয়ে বীর সাভারকর কাপুরুষ সাভারকর হয়ে গিয়েছিলেন! কিন্তু সাভারকর না থাকলে আমরা আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে সুভাষচন্দ্রকে পেতাম কি না সেটা-ই সন্দেহ। মহাবিপ্লবী রাসবিহারী বসু যে “ঘৃন্য সাম্প্রদায়িক” দল হিন্দু মহাসভার জাপানি শাখার সভাপতি ছিলেন ও তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের জন্যে যোগ্য নেতা পাঠাবার জন্যে সাভারকারের কাছেই চিঠি পাঠিয়েছিলেন এই খবর-ই-বা কয়জন রাখেন? খবরটা জানা থাকলেও প্রাণপণে চেপে যাবার চেষ্টা হত। কারণ “যে যত কম জানে সে তত কম মানে”– এটাই বর্তমানে রাজনীতির মূলমন্ত্র।

নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে বিশ্লেষণ করলে, সহজেই বোঝা যায়, শত্রুর সঙ্গে ছলনা করার পদ্ধতি হিসেবে মুচলেকা বা ক্ষমাভিক্ষা একটা রাজনৈতিক পদক্ষেপ, ইতিহাসে যার বহুল প্রয়োগ ঘটেছে। শত্রুর সঙ্গে ছলনা করাতে কোনও অন্যায় নেই, বরং সেটা-ই রাজনীতি। ধর্মনিরপেক্ষদের প্রিয়পাত্র মহম্মদ ঘোরিও পৃত্থিরাজের থেকে ক্ষমা চেয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। তাহলে কি তিনি কাপুরুষ ছিলেন? মোটেই না। ক্ষমা চেয়ে প্রাণ না বাঁচালে পুনরায় আক্রমণ করে পৃত্থিরাজকে পরাজিত ও হত্যা করার সুযোগ পেতেন কি তিনি? না, পেতেন না। বরং গাজওয়া-ই-হিন্দ রূপায়ণই আরেকটু কঠিন হয়ে যেত। শিবাজী চিরশত্রু মোগলের সঙ্গে পুরন্দরের সন্ধি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাতে মারাঠা শক্তি আরো সংহত হবার সুযোগ পায়। বুদ্ধিমান ব্যক্তি অধিক শক্তিশালী শত্রুর সামনে জেদ ধরে না, বরং আঘাত করার উপযুক্ত সময় খোঁজে। আবার গ্যালিলিও-ও কিন্তু কোর্ট অব ইনক্যুইজিশনে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তাতে কি তিনি ভিলেন হয়ে গেলেন, না কি যারা তাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করেছিল তারা ঘৃণার্হ হল? না কি গ্যালিলিওর আবিস্কারের গুরুত্ব কমল? সত্যকে চেপে দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে সত্য কখনোই মিথ্যে হয়ে যায় না। সুতরাং শত্রুর কাছে মুচলেকা দেওয়ায় সাভারকরেরও দোষ থাকতে পারে না। শত্রুর কারাগারে বীরের মত চুপচাপ তেলের ঘানি টেনে শত্রুকে শক্তিশালী করার বদলে কাপুরুষের অভিনয় করে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে এসে প্রত্যাঘাতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করা বুদ্ধমানের লক্ষণ।

মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে সাভারকর ব্যক্তিসুখসসৃদ্ধ জীবন কাটাননি। ২রা মে ১৯২১ সালে সেলুলার জেল থেকে মুক্তি পেলেও তাঁর বন্দীজীবন তখনও কাটেনি। এই সময়ে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা তাঁর জন্যে নিষিদ্ধ ছিল। রাজনীতি নিষিদ্ধ হলেও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যোগদান নিষিদ্ধ ছিল না। এই সুযোগটা তিনি ভালভাবেই নিয়েছিলেন। মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে না বেরলে এই সুযোগটাও তিনি পেতেন না। আসলে, যুদ্ধক্ষেত্রে চতুরতার প্রয়োজন হয়। সাভারকরের এই চাতুর্য তাঁর অনন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞার সাক্ষ বহন করে। ১৯২৪ থেকে ১৯৩৭ পর্যন্ত মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে নজরবন্দী থাকার সময়ে সাভারকর সামাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেছিলেন– শুরু করেছিলেন অস্পৃশ্যতা-বিরোধী আন্দোলন, যার গুরুত্ব ইংরেজ তাড়ানোর গুরুত্ব থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। ঔপনিবেশবাদের তুলনায় জাতিবাদ যে ভারতের বড় শত্রু– এই সত্যটা বাবাসাহেব আম্বেদকর যেমন বুঝেছিলেন, তেমনি বুঝেছিলেন বীর সাভারকরও। তবু সাভারকরের নামে কলঙ্কলেপন চলবে। কেন চলবে না? তিনি হিন্দু-জাগরণ চাইতেন যে! ধর্মনিরপেক্ষ-নজরে হিন্দুদের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের মত সাংঘাতিক অপরাধ আর হয় না কি?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here