মানুষ থেকে দেবতা!

0
Man and God

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

মাটির মায়ের সন্তানরাই তপস্যা করে দেবত্ব অর্জন করে একসময় “দেবতা” হয়েছেন। কাজেই দেবতারা কোনো ভিন গ্রহ থেকে আসেননি। তার প্রমাণ রয়েছে ঋকবেদে, ” অয়ং দেবায় জন্মনে স্তোমো বিপ্রেভিরাসয়া। / অকারি রত্নধাতমং‌।।” ঋকবেদ ১/২০/১.
অর্থাৎ দেবতার জন্ম উপলক্ষ‍্যে ঋষিগণ রত্নাকরস্বরূপ এই স্তব মুখে মুখে রচনা করেছিলেন। রিভ‍্যুগণের দেবত্ব স্বীকৃতির জন‍্য-ই এই স্তব। তাই বলা যায়, মানুষের-ই তপস্যা দ্বারা দিব‍্যত্ব অর্জনের পর হতো তার দেবজন্ম। তখন তিনি হতেন “দেবতা।” এই রিভ‍্যুগণ ছিলেন সেই নরদেব। 
উপনিষদেও আমরা পাচ্ছি এরই প্রতিধ্বনি। সুপর্ণাপুত্র আরুণি ঋষি প্রজাপতিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন,”কিং ভগবন্ত: পরমং বদন্তি ?” 
অর্থাৎ, ভগবান, পরম সাধ‍্য কী ?
উত্তরে ঋষি প্রজাপতি বললেন, “তপসা দেবা দেবতামগ্র আয়ন সুরবন্ববিন্দন্ / তপসা সপত্নান্
প্রণুদামারাতী স্তপসিসর্ব্বং প্রতিষ্ঠিতং তস্মাত্তপ পরমং বদন্তি।”–নারায়ণোপনিষদ
অর্থাৎ, পূর্বে পূর্বে তপস্যার অনুষ্ঠান করেই ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র,বরুণ প্রভৃতিরা দেবত্ব অর্জন করেছেন। তপস্যার দ্বারা শত্রুরাও বশীভূত হয়। সমস্ত কিছু তপস‍্যাতেই প্রতিষ্ঠিত আছে। তাই দ্রষ্টা পুরুষগণ তপস‍্যাকেই বলেন পরমা।”
তাই তপস‍্যাতেই দেবত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ইন্দ্র, মিত্র, অর্যমা প্রভৃতিরা সকলেই ছিলেন নরদেব, যাঁরা একসময় এই পৃথিবীতেই বিচরণ করে গেছেন। শুধুমাত্র বিচরণ-ই নয়, কাজ করে গেছেন লোককল‍্যাণের লক্ষ্যে। আর সেজন্যই পরবর্তীকালে উপকৃত কৃতজ্ঞ মানুষেরা তাদের দেবত্বে বরণ করে লোককল‍্যাণমূলক কাজের স্বীকৃতি জানিয়েছেন। 
এখন প্রশ্ন, কী সেই লোককল‍্যাণ ?
উত্তরটা ঋকবেদেই রয়েছে, ” যস্মিন্নিন্দ্রো বরুণো মিত্রো অর্যমা দেবা ওকাংসি চক্রিরে।”–ঋকবেদ ১/৪০/৪.
অর্থাৎ, সভ‍্যতার ঊষালগ্নে এই পৃথিবীর অধিকাংশ স্থল-ই যখন ছিল বসবাসের অযোগ্য, তখন এই ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, অর্যমারা মানুষের জীবন ধারণ ও বসবাসের জন্য বিভিন্ন স্থান নির্বাচন করে তাদের বাসস্থান গড়ে দিয়েছিলেন। তাই মানতে হবে, দিব‍্যভাবাপন্ন মানুষ-ই দেবতা। আর দেবত্ব স্বীকৃতির এই রীতিতে যীশু আজ ঈশ্বর পুত্র, নদীয়ার নিমাই –বিষ্ণুর অবতার, বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ থেকে ঋষি অরবিন্দ, কামারপুকুরের গদাধর চট্টোপাধ্যায় থেকে অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ, নরেন থেকে স্বামী বিবেকানন্দ। 
এবার কিছু কিছু লৌকিক দেবতার খোঁজ করি।…
হাঁড়ি ঝি : বৌদ্ধ যুগে অন‍্যান‍্য অন্ত‍্যজ শ্রেণীর মতো হাঁড়িরা মহাযান বৌদ্ধধর্মের আশ্রয়ে এসেছিলেন এবং নিজেদের দক্ষতায় তারা সমাজে একটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেন। এই হাঁড়িরা শ্মশান থেকে হাঁড়ি-কলসি কুড়িয়ে আনতেন নিজেদের ব‍্যবহারের জন‍্য।  তারা ছিলেন ধাত্রী বিদ‍্যায় পারদর্শী। তখন প্রসব হতো ঘরে। এই সম্প্রদায়ের মানুষ হাঁড়ি-পা ও হাঁড়ি-ঝি ( কন‍্যা) চণ্ডী যথাক্রমে সিদ্ধপুরুষ ও সিদ্ধা রমণী ছিলেন। মৃত্যুর পর তাঁরা দেবতা হয়েছেন।
ডাকিনী-যোগিনী : ডাকিনী-যোগিনীরাও রক্ত-মাংসের মানুষ ছিলেন। এ প্রসঙ্গে চণ্ডীদাসের লেখায় আমরা পাচ্ছি, “শালতোড়া গ্রামে অতি পীঠস্থান / নিত‍্যের আলয় যথা। / ডাকিনী বাসুলী নিত্য সহচরী, বসতি করয়ে তথা।”
বাঁকুড়া জেলায় অবস্থিত এই শালতোড়া। বৌদ্ধ সাহিত্য “পদসমুদ্র” থেকে জন্য যাচ্ছে, এই শালতোড়া গ্রামে সহজিয়া ধর্মপ্রচারিকা ডাকিনীদের আখড়া ছিল। “বৌদ্ধ ও শৈব ডাকিনী ও যোগিনীদের কথা “( বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা ” ( ১৩৩৩/১ প্রকাশিত) প্রবন্ধে রমেশচন্দ্র বসু জানাচ্ছেন, “…যেসব ডাকিনী যোগিনীদের কথা বলিতে যাইতেছি, তাঁহারা রক্তমাংসের মানুষ এবং বৌদ্ধ সহজযান ও বজ্রযান সম্প্রদায়ভুক্ত ধর্মচারিণী নারী, অনেক সময় ইহাদের আদেশেই অনেক তন্ত্রের গ্রন্থ লিখিত হইয়াছে।” 
চণ্ডীদাস আরাধিতা দেবী বাশুলী বিশালাক্ষী রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন বলে এই দেবী মন্দিরের আশেপাশে প্রবাদ প্রচলিত আছে।
অষ্টাবক্র : প‍্যারালিসিস রোগগ্রস্ত সুব্রত মুনি বীরভূম জেলার দুবরাজপুর থানার শৈবক্ষেত্র বক্রেশ্বরে এসে শিবের তপস্যা করে সিদ্ধ হোন এবং তিনি এখন শিবের সঙ্গেই মন্দিরে পুজো পাচ্ছেন। আর তাঁর নামেই স্থানটির নাম হয়েছে “অষ্টবক্রেশ্বর ” বা সংক্ষেপে “বক্রেশ্বর।”
নন্দী : পাতঞ্জল দর্শন অনুসারে মাত্র আট বছরের মানবশিশু নন্দী ভগবান মহেশ্বরের আরাধনা করে ইহজন্মেই দেবত্ব লাভ করেন। 
সাহেব দেবতা : ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ লেফটেন্যান্ট কর্ণেল টুলেমন সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী সাঁওতালদের তীরের আঘাতে মারা যান। সময়টা ছিল বর্ষাকাল। তাই তড়িঘড়ি তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। জেলা বীরভূমের প্রান্তিক অঞ্চল রাজনগরের ছোটবাজার কুশকর্ণী নদীর ধারে আজও রয়েছে তাঁর অত্যন্ত সাদামাটা সমাধিটা। সমাধি বলতে চারপাশে ধানক্ষেতের মাঝে  একটি মাটির উঁচু মাটির ঢিপি। লোকে বলে, ইনি “সাহেব দেবতা।” তিনি চাষির ক্ষেতে ধান পাহারা দেন। আর চাষিরাও পাকা ধান তোলার সময় দু-চার আঁটি ধান তাদের সাহেব দেবতাকে দেন। 
গঙ্গা মা : বীরভূম জেলার রাজনগর থানার শঙ্করপুর গ্রামে বর্তমানে গ্রামবাসী দুলাল সাহার গোয়াল ঘরে রয়েছেন গঙ্গা মা। লোকমুখে “গঙ্গি মা।” ক্ষেত্রসমীক্ষায় জানা গেছে, একসময় এখানে পরিব্রাজিকা সন্ন্যাসীনী গঙ্গা মা থাকতেন। গ্রামের মানুষজন তার কাছে আসতো। তিনি মৃত্যুর আগে বলে যান, তার নামে মানত করলে সংসারের হারানো জিনিস খুঁজে পাওয়া যায়। সেই কথা মেনে আজও গ্রামের মেয়ে-বৌরা কোনো জিনিস হারিয়ে গেলে এখানে মানত করেন এবং পাওয়া গেলে বাতাসা ছড়ান। মানবী গঙ্গা মা এভাবেই আজ এলাকার লৌকিক দেবী। ব্রহ্মচারী কাশীশ্বর গোস্বামী : ব্রহ্মচারী কাশীশ্বর গোস্বামী পুজো পাচ্ছেন বীরভূমের রাজনগর থানার বাঁন্দি গ্রামে। অন‍্যতম চৈতন্য পার্ষদ এই কাশীশ্বর গোস্বামীর আশির্বাদে গ্রামের এক নি:সন্তান রাজপুত মহিলার সন্তান  হয়েছিল। বর্তমানে তাদের বংশধরেরা আজও ধুমধামের সঙ্গে এই ব্রহ্মচারীর থানে প্রতি বছর  বিশেষ পুজো ও খিচুড়ি মহোৎসবের আয়োজন করে থাকেন। এভাবেই ব্রহ্মচারী কাশীশ্বর গোস্বামী আজ এলাকার লোকদেবতা। এভাবেই বাংলার বিভিন্ন স্থানে একদা রক্তমাংসের মানুষেরা আজ পরিণত হয়েছেন লৌকিক দেবতায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here