গিনিপিগের ভূমিকায় মানুষ “রোমথা” ও সমাজকল‍্যাণে অপরাধীরা

0
Romtha

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

অপরাধী ব‍্যক্তিদের বিভিন্ন সময়ে সমাজকল‍্যাণের কাজে ব‍্যবহার করেছেন শাসকদল। অপরাধীদের দিয়ে একসমময় পুকুর কাটাতেন জমিদাররা। বীরভূম জেলার দুবরাজপুর থানার মেটেলা গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে বেশ খানিকটা এলাকায় প্রাচীন গড়-রাজনগরের মাটির প্রাচীর ও তার পাশে পরিখার চিহ্ন দেখিয়ে এলাকার মানুষ বলেন, চোর খাটিয়ে এসব তৈরি করা হয়েছিল। অন্যদিকে, এ জেলার রাজনগর থানার দক্ষিণ অঞ্চলের বাঁন্দি গ্রামে অনেকগুলো পুকুর সম্পর্কেও জনশ্রুতি রয়েছে, এগুলো সব চোর খাটিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এভাবেই আমাদের দেশের শাসকদল সমাজকল্যাণের কাজে ব‍্যবহার করেছেন অপরাধীদের। একসময় চিকিৎসা বিজ্ঞানেও উন্নত ছিল আমাদের এই বাংলা। পালযুগে শ্রেষ্ঠ সর্বভারতীয় রোগনিদানবিদ্ ছিলেন বাঙালি চক্রপাণি দত্ত। চক্রপাণির বংশ হলো লোধ্রবলী কুলীন। বাঙালি টীকাকার শিবদাস সেন জানাচ্ছেন, এরা দত্ত বংশের-ই শাখা এবং মধ্যযুগীয় ঐতিহ্য অনুসারে, এদের বাড়ি বীরভূমে। ( তথ‍্য সূত্র : বাঙালীর ইতিহাস, আদি পর্ব, নীহাররঞ্জন রায়, দে’জ, কলকাতা, ৭ম সং, পৃ ৫৭৯ ) এখন চিকিৎসা বিজ্ঞানে কোনো ওষুধের গুণাগুণ পরীক্ষার জন্য ব‍্যবহার করা হয় গিনিপিগদের, কখনো ঘোড়া, কখনো ইঁদুর আরশোলাদের। কিন্তু একসময় এ কাজে ব‍্যবহার করা হতো অপরাধী মানুষদের। তবে কখনো কখনো চিকিৎসকরা নিজেরাও ওষুধের গুণাগুণ পরীক্ষা করতেন। যেমন, “ভারত-ভৈষজ‍্যতত্ত্ব” ( প্রকাশকাল বাংলা ১৩৬৬ সাল, কলকাতা ) গ্রন্থের লেখক ডা: প্রমদাপ্রসন্ন বিশ্বাস নিজে নিম-তুলসি-পটল মূল-বেলপাতা প্রভৃতি বেশ কয়েকটি ভারতীয় ভেষজের গুণাগুণ পরীক্ষা করে লিপিবদ্ধ করেছেন। পটাসিয়াম সাইনাইডের স্বাদ আবিষ্কারের কথা আমরা অনেকেই শুনেছি। এই তীব্র বিষ জিভের ডগায় আস্বাদন করে একজন ব‍্যক্তি লিখতে পারলেন একটিমাত্র ইংরেজি অক্ষর “এস্” (S) এবং তারপরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। পরে অন্য একজন ব‍্যক্তি একইভাবে এই বিষ খেয়ে লিখলেন “ডব্লিউ” (W) অক্ষরটি। তারপর তিনিও মারা গেলেন। এই SW–অক্ষর দুটি থেকে জানা যায়, পটাসিয়াম সাইনাইডের স্বাদ হলো SW ( EET) অর্থাৎ মিষ্টি। এবার মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলতেই হয়। খৃষ্টিয় একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীতে বাংলার শাসকগণ চারটি উপায়ে অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতেন। প্রথমত, (১) শ্মশানে বা বধ‍্যভূমিতে নিয়ে গিয়ে শ্মশানকালীর সামনে বলি দেওয়া। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, বতর্মান ঝাড়খণ্ডের তরণী পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে “কানাডা ড‍্যাম”,চলতি কথায় যার নাম–মশানজোড় ড‍্যাম। “মশান” মানে “বধ‍্যভূমি।” নিকটে সিদ্ধেশ্বরী নদীর ধারে প্রাচীন তন্ত্রক্ষেত্র তন্ত্রেশ্বর এলাকাটি ছিল এই “মশান” বা বধ‍্যভূমি, যেখানে রাজ নির্দেশে জল্লাদ আসামির মুণ্ডুচ্ছেদ করতো। (২) দ্বিতীয়টি ছিল শূলে চড়ানো। (৩) তৃতীয়টি ছিল হাত-পা বেঁধে আগুনে ফেলে দেওয়া এবং (৪) চতুর্থটি ছিল জীবন্ত সমাধি দেওয়া। সাধারণত অতি সম্ভ্রান্ত অপরাধীদের মধ্যে প্রথমটি এবং কুষ্ঠ ও যক্ষ্মারোগগ্রস্ত অপরাধীদের ক্ষেত্রে চতুর্থ নিয়মটি চালু ছিল। বাকি দ্বিতীয় ও তৃতীয় অপরাধীদের স্থানীয় নামী চিকিৎসকদের অনুরোধে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো “রোমথা” হিসেবে। “রোমথা” মানে মানুষ গিনিপিগ। তাদের কপালে উল্কি দিয়ে “রোমথা” কথাটি লিখে দেওয়া হতো। এরপর চিকিৎসকরা তাদের ওপর নতুন নতুন ওষুধের গুণাগুণ পরীক্ষা করতেন। ওষুধ প্রয়োগ করে তার গুণাবলী, পার্শ প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি পরীক্ষা করা হতো‌। তবে ওষুধের কারণে কোনো রোমথা ব‍্যক্তি ব‍্যাধিগ্রস্থ হলে, কিংবা মারা গেলে তার জন্য চিকিৎসক দায়ী থাকতেন না। বাংলার শাসক সেনরাজ লক্ষ্মণসেন এ রকম “রোমথা” দিয়ে চিকিৎসকদের সাহায্য করতেন বলে জানা যায়। তবে কখনো কখনো কোনো রোমথা ব‍্যক্তি তার অজানা সাপের বিষ পান করতে বা শরীরে লেপন করতে না চাইলে তখন তাদের চরমভাবে তা করতে বাধ্য করা হতো এবং এজন্য তাদের ওপর নির্দয় নির্যাতন চালানো হতো। আবার কোনো কোনো সহৃদয় চিকিৎসকের কাছে রোমথারা ছিল সন্তানতুল‍্য। পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গেই স্নেহে যত্নে প্রতিপালিত হতো তারা। বৃটিশ আমলে আইন করে এই “রোমথা” প্রথা শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়।…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here