ঘটি বাজা বামুন!

1
Bhatt Brahmin

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

“ব্রাহ্মণ” চলতি কথায় “বামুন”, আরও বিকৃতভাবে বলা হয় “বাউন।”
“অগ্রদানী” বামুনের পর আরও এক শ্রেণীর পতিত বামুনের খোঁজ মেলে আমাদের সমাজে, এদের নাম–“ঘটি বাজা বামুন।”
এদের আরেক নাম “ভট্ট ব্রাহ্মণ” , চলতি কথায় “ভাট বামুন।” অকারণে অবান্তর কথা বলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে বলে এদের বলে “ভাট বামুন।”
এক বিচিত্র জীবিকার সঙ্গে যুক্ত এই ভাট বামুনরা। সে কথায় পরে আসছি। তার আগে পরিচয় পর্ব।…
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে এই “ভট্ট ব্রাহ্মণ” বা ভাট বামুনের উল্লেখ আছে এক শ্রেণীর পতিত ব্রাহ্মণ হিসেবে। তবে এরা আদৌ বামুন কিনা, তা নিয়ে সংশয় আছে।

আরও পড়ুন: ৩৭০ বিলোপে সুদিন ফিরল অন্যত্র বিবাহিত জম্মু-কাশ্মীরের ভূমিকন্যাদের

ড: নীহাররঞ্জন রায় তাঁর “বাঙ্গালীর ইতিহাস ( আদি পর্ব)”- এ জানাচ্ছেন, “ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ভট্ট ব্রাহ্মণ নামে আর এক নিম্ন বা পতিত শ্রেণীর ব্রাহ্মণের খবর পাওয়া যাইতেছে। সূত পিতা এবং বৈশ‍্য মাতার সন্তানরাই ভট্ট ব্রাহ্মণ। অন্য লোকের যশোগান করাই ইহাদের উপজীবিকা।” অন্যদিকে, নৃতাত্ত্বিক রিজলে সাহেব বলছেন, এরা অব্রাহ্মণ। কারণ, মনুসংহিতায় বর্ণিত মাগধরাই ভাট সম্প্রদায়ভুক্ত। আবার অন্য প্রসঙ্গে বলছেন, বিধবা ব্রাহ্মণী ও ক্ষত্রিয় পিতার সন্তান এরা। তাঁর মতে, ভাট পাঁচ প্রকার–বিরম ভাট, ভাগ ভাট, ব্রহ্ম ভাট, রাজ ভাট ও তুর্ক ভাট। এর মধ্যে বিরম ভাটরা বিয়ে ও শ্রাদ্ধে হাজির হয়ে সংশ্লিষ্ট পরিবারের গুণকীর্তন করতেন। আগে তারা বিভিন্ন রাজবংশ ও অভিজাত পরিবারের কুলজি নথি সংগ্রহ করতেন। তারপর সুযোগ বুঝে সেই সব পরিবারে গিয়ে হাজির হতেন। তুর্ক ভাটরা ছিলেন ধর্মে মুসলমান। গান গেয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। অনেক সময় ভাটেরা ছেলেমেয়ের বিয়ের ঘটকালিও করতেন।

আরও পড়ুন: ওন্না বু গেইশাদের আজও মনে রেখেছেন জাপানী মহিলারা

যেমন, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ’র “মনসা মঙ্গল” ( যতীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য সম্পাদিত )-এ আমরা দেখতে পাচ্ছি, বেহুলার পাত্র সন্ধান প্রসঙ্গে চাঁদ সদাগরকে এক ভাট বলছেন,—
“ভাট বলে শুন সদাগর,
যতখানি ভ্রমি আমি সাবধানে শুন তুমি
কন্যা আছে যার যার ঘর।”…
এছাড়াও খ্রিস্টিয় অষ্টাদশ শতকে ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের “বিদ‍্যাসুন্দর” কাব্যে ভাটদের দেখা যায় ঘটকালি করতে। যেমন,—
“বীর সিংহ তার পাঠ পাঠাইয়া দিল ভাট
লিখিয়া এসব সমাচার।
সেই দেশে ভাট গিয়া নিবেদিল পত্র দিয়া
আসিতে বাসনা হৈল তার‌।”…
অন্যদিকে, “গৌরাঙ্গ বিজয়” কাব্যে ভাটদের “ভিক্ষুক” বা ভিখারি বলা হয়েছে। যেমন,—
“যতেক ব্রাহ্মণ ভিক্ষুক ভাটগণ
সভাকে সুখী করাইয়া।
মহা মহাজন ফলাহার ভোজন
বিদায় বস্ত্র রত্ন দিয়া।।”..
বীরভূমের মাড়গ্রামে এক কবিগানের আসরে মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত কবিয়াল গুমানী দেওয়ানকে বলতে শোনা গিয়েছিল,—
“মাড়গ্রামে ফলার পেকেছে ,
একে কে করেছে আমন্ত্রণ–
কোথা থেকে চলে এলো এক ঘটি বাজা ব্রাহ্মণ!”
এ থেকে স্পষ্ট, ঘটি বাজা বামুনরা ছিলেন বিনা আমন্ত্রণের অতিথি।

আরও পড়ুন: সোশ্যাল সফটওয়্যারের অপব্যবহারে উদ্বিগ্ন অ্যাপেল সিইও টিম কুক

আগেই বলেছি, বিচিত্র এদের পেশা।
এরা একসময় বীরভূম, বর্ধমান জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত ব‍্যক্তির শ্রাদ্ধ বাসরে বিনা আমন্ত্রণেই আসতেন একটি পিতলের ঘটি হাতে। তারপর বাড়িতে ঢুকে একটি লোহার শিক দিয়ে সেই ঘটিটি বাজাতেন এবং সেই সঙ্গে নাকি সুরে গাইতেন,—
ওগো, তোমার বাবা স্বর্গে যাবার পথ খুঁজে মরছে গো!
যমরাজের চেলাগুলো সব পথ আটকে দাঁড়িয়ে রয়েছে গো!
ওগো, ব্রাহ্মণকে দক্ষিণা দিয়ে তোমার বাপকে স্বর্গে পাঠাও গো!
বাড়ির জামাইকে সামনে পেলে বলতেন,—
ও জামাই বাবাজী গো, তোমার শ্বশুরবাবা স্বর্গে যাবে গো!
তোমার শ্বশুরবাবা তোমাকে কত ভালোবাসতো গো!
এখন কি এই ছেঁটা ( ছেঁড়া ) কাপড় পরে তোমার শ্বশুরবাবা স্বর্গে যাবে গো! ( নিজের পরণের কাপড়টা দেখিয়ে )
একখান কাপড় দাও না গো!
এঁড়ে গরু না দিলে কেমন করে তার লেজ ধরে তোমার শ্বশুরবাবা বৈতরণী পেরোবে গো!
গরু দাও গো!
মৃত ব‍্যক্তি বাবার জায়গায় মা, কিংবা শাশুড়ি হলে সম্ভাষণের রীতিও বদলে যেতো। মোট কথা, এসব তারা করতেন দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য‌।
বর্ধমান, বীরভূম ও উত্তর বাঁকুড়ার কিছু গ্রামে এভাবেই ঘটি বাজিয়ে তারা শ্রাদ্ধবাড়ি থেকে টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় আদায় করতেন। এজন্য এদের নাম হয়ে যায়, “ঘটি বাজা বামুন।” জানা গেছে, বর্ধমান জেলার অণ্ডাল থানার কাজোরা ও তার পাশে কুমারডিহি গ্রামে এই ধরণের কিছু ঘটি বাজা ভাট বামুন বসবাস করছেন দীর্ঘদিন ধরে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here