শ্লোগান সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের পরম্পরা নয়

0

Last Updated on

নীলাঞ্জন কুমার

সাহিত্য যেহেতু মানুষের হিতের কাজে আসার জন্য প্রধানতঃ প্রথম থেকে সৃষ্টি হয়েছিল ও মানুষকে এক
আনন্দদায়ক চিন্তাভাবনার পথে ধাবিত করার জন্য
ছড়িয়ে পড়েছিল তাই আমরা তাকে এক বিশেষ সন্মানে স্থান দিয়েছি। যারা সাহিত্য নিয়ে চিন্তাভাবনা
করেন বা সাহিত্য সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন এই ভারতবর্ষ তথা বাংলায় তাদের জন্য সন্মানের স্হান রয়েছে। যদি অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য নিয়ে বিশেষভাবে ভাবনা করি তবে দেখা যাবে বহু বহু ভাবে তার প্রকরণ ও চিন্তনগত পরিবর্তন ঘটেছে বহু মানুষের সাহিত্যসেবীর কল্যাণে । সাহিত্যের নিজস্ব বৃত্ত ও নিয়ম অনুযায়ী সাহিত্য বিকশিত হয়। বিশিষ্ট রুশ দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ ট্রটস্কি একটি সুন্দর কথা বলেছিলেন শিল্প সৃষ্টি হল ‘a changing and a transformation of reality in accordance with peculiar laws of art.’ সমস্ত শিল্পের প্রতিই প্রযোজ্য সন্মান জানিয়ে বলা যেতে পারে এই নিজস্ব পদ্ধতি ও নিয়ম সৃষ্টি করেছেন অবশ্যই বিশিষ্ট সাহিত্যসেবীরা যাদের চিন্তাধারা ভিত্তি করে এখনও আমরা সাহিত্যের আরো বিকাশ করতে চেষ্টা করছি। ১৯২০ সালে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এম, এন, রায়, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের হাত ধরে মার্কসবাদ ভারতে আসে। ধীরে ধীরে এই দার্শনিক তত্ত্ব বাংলার শিক্ষিত সমাজকে বেশ কিছুটা প্রভাবিত করে। তাছাড়া ক্রমাগত সাহিত্যের ভেতরেও তার রূপ প্রকরণ দেখতে পাই। বাংলা সাহিত্যের তিরিশ দশক থেকে চল্লিশ দশকে আমরা পেয়ে যাই মার্কসবাদী কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্আয় , কবি বিষ্ণু দে , সুকান্ত ভট্টাচার্য , সমর সেন , সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গোলাম কুদ্দুস, রাম বসু, মঙ্গলাপ্রসাদ চট্টোপাধ্আয় প্রমুখ। তাঁরা কার্ল মার্কসের ‘কমিউনিস্ট ইস্তাহার’ এর প্রধান চিন্তার দিক ‘ গোটা সমাজ ক্রমেই দুটি বিরোধী শিবিরে ভাগ হয়ে পড়েছে, ভাগ হচ্ছে পরস্পরের সম্মুখীন দুই বিরাট শ্রেণীতে – বুর্জোয়া এবং প্রলেতারিয়েত । ‘ কিংবা ‘এ যাবৎ সম্মানিত এবং সশ্রদ্ধ বিস্ময়ে দেখা প্রতিটি বৃত্তির অলৌকিক মহিমা বুর্জোয়াশ্রেণী টেনে খুলে ফেলেছে। চিকিৎসাবিদ, পুরোহিত , কবি, বিজ্ঞানী – সকলকে পরিণত করেছে তার হিসেবপারিশ্রমিক – প্রাপ্ত মজুরি শ্রমিকে ‘ – র মতো কথাগুলি ভিত্তি করেসাহিত্য রচনায়

তাঁরা প্রবৃত্ত হয়েছিলেন ও সেগুলিতে প্রধানতঃ প্রচারমূলক দিকটির প্রতি মূল লক্ষ্য থাকার জন্য রবীন্দ্রনাথ যুগ জীবনানন্দ যুগের পর বামপন্থী শিবিরের
চিন্তন ব্যক্তিত্ব বিশেষিত কবিকুল বামপন্থামন্ডিত সাহিত্যের কোন আলাদা যুগ গঠন করেনি।এর প্রধান কারন ভারতীয় পরম্পরার সংগে তাঁদের লেখার তেমনভাবে যোগস্হাপন গড়ে ওঠেনি । আমাদের এই ধারা বাস্তবতা কী ও কেমন তাই নিয়ে সাধারণ বিতণ্ডা করে চলেছি বহুদিন ধরে । বাস্তবতা মানেই শুধু খিদে, আশ্রয়ের অভাব , শোষণ,পীড়ন ইত্যাদি নয় তার বাইরেও যে কিছু আছে তা তারা যেন ভুলে মেরে দিয়েছেন বলে মনে হয় তাদের লেখার ভেতর দিয়ে। সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদেরও বহু বিচিত্র দিক আমরা দেখতে পাই । সেখানেও বহু গবেষক মার্কস লেনিনীয় বিশ্ববিখ্খায় অনুপ্রাণিত বস্তুবাদী নন্দন তত্ত্বের প্রকরণবাদের দ্ব্যর্থহীন বিরোধীতা করে ।

মার্কস- লেনিনীয় নন্দনতত্ত্বে অনুপ্রাণিত প্রাগুক্ত সাহিত্যিক বর্গ ভারতীয় তথা বাংলার বাস্তবতা সামনে রেখে যখন লিখে চলেন তখন তার থেকে ফুটে ওঠে শ্লোগানধর্মিতা । এই শ্লোগান কতখানি সাহিত্য তা নিয়ে সাহিত্যমহলে বহু আলোচনা হয়েছে ও হচ্ছে । সমর সেন যখন লেখেন : ‘ জটিল অন্ধকার একদিন জীর্ণ হবে চূর্ণ হবে ভস্ম হবে/ আকাশগঙ্গা আবার পৃথিবীতে নামবে , / ততদিন /ততদিন নারীধর্ষণের ইতিহাস / পেস্তাচেরা চোখ মেলে শেষহীন পড়া / অন্ধকূপে স্তব্ধ ইঁদুরের মতো , / ততদিন গর্ভের ঘুমন্ত তপোবনে / বণিকের মানদণ্ডের পিঙ্গল প্রহার ।’ (‘ঘরে বাইরে ‘ ) , দিনেশ দাসের কবিতা ‘ কাস্তে ‘ তে দেয়ালিকা করার যোগ্য পংক্তি : ‘ দিগন্তে মৃত্তিকা ঘনায়ে / আসে ওই চেয়ে দেখো বন্ধু ! / কাস্তেটা রেখেছো কি শানায়ে/ এ – মাটির কাস্তেটা বন্ধু !’ , সুকান্ত ভট্টাচার্যের : ‘ আকাশে আকাশে ধ্রুবতারায় / কারা বিদ্রোহে পথ মাড়ায় / ভরে দিগন্ত দ্রুত সাড়ায় , জানে না কেউ ।’ ( ‘ কবিতার খসড়া ‘ ) – র মতো বিবৃতি করে মানুষের সামনে তুলে ধরার ও রাজনৈতিক সুফল ফলানোর তাগিদে কবিতাকে কাজে লাগানোর চিন্তাধারা নিয়ে কবিতা রচনার প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছিল তা কিন্তু কোনো যুগ হয়ে উঠতে পারেনি । সে কারণে তার পন্ঞ্চাশ ষাট বছর পরেও জীবনানন্দ নিয়ে কথাবার্তা চলে রবীন্দ্রনাথকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বলে মেনে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সুকান্ত দিনেশদের কবিতা বর্তমান প্রতিবেদকের মতো কিছু মানুষের ও কখনো কখনো কোনো ‘কমরেড ‘ আবৃত্তিকারদের আবৃত্তি করতে দেখা যায়।

এ কথা সত্য যে বাস্তবতার বিভিন্ন স্তরে ও তাদের গ্রন্থিল বুনোট সম্পর্কে জানানোর দায়িত্ব অবশ্য শিল্প সাহিত্যের ।তারা তা পালন করে। সমাজের সামনে দর্পণ হয়ে মেলে ধরে । কিন্তু যদি সেখানে সারা সাহিত্যতত্ত্ব ( যা কিনা আর্থসামাজিক দিক দিয়ে পৃ থিবীকে চালনা করতে চায় ) হিসেবে প্রায় চাপিয়ে কিছুর ওপর নির্ভর করে যদি শিল্পী সাহিত্যিকরা তাদের আরব্ধ কাজ করে চলেন তবে সে কাজ ওই দর্শনের বৃত্তে ঘুরপাক থাকবে । তারা এ ইজমের বাইরে আর কিছু আছে কিনা খুঁজে দেখার প্রয়োজন বোধ করেন না। আমরা ষাট দশকের থেকে অর্থাৎ যুক্ত ফ্রন্ট থেকে বামফ্রন্ট সরকার শেষ হওয়ার কিছু আগে পর্যন্ত যদি পর্যবেক্খণ করি তবে দেখা যাবে যে এই সময়ের নকশাল আন্দোলন ও তারপর বামফ্রন্টের আওতায় যারা সাহিত্য মহলে থাকতেন তারা তাদের মতো চেষ্টা করে গেছেন কিন্তু ওই পর্যন্তই, এর বেশি কোনো যুগ প্রচেষ্টা নেওয়ার তাগিদ তাদের ছিল না । আমরা জীবনানন্দ যুগ কেন পার হতে পারছি না সে নিয়ে ভাবনাচিন্তার দায় তাদের ছিল না । তারা কার্যত শ্লোগান সাহিত্য কিংবা বিবৃতি মূলক শিল্পসত্তা নিয়ে মশগুল ছিলেন , কলকাতার কফি হাউসের টেবিলে তুফান তুলতেন , সাহিত্য সম্মেলনের সভাস্থল আলোকিত করতেন , পুরস্কার ইত্যাদি জুটতো আর তলে তলে বাজারী বুর্জোয়া পত্রিকার সংগে মাখামাখি করে যেতেন । বামফ্রন্টের আমলে বহু দেওয়াল লিখন করা হতো সুকান্ত ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায় দের কবিতার পংক্তি তুলে । এতে হয়তো রাজনৈতিক ফায়দা কিছু হতো কিন্তু সাংস্কৃতিক দিকে দৈনতা প্রকাশ পেত। যদি শোষক ও শোষিতদের তীব্র দ্বন্দ্বের বহি:প্রকাশ এই হয় তবে বলা যেতে পারে এখানের শিল্পী সাহিত্য ক্ষেত্রে এই সাহিত্য তত্ত্বের বিচরণ হলো এক অগভীর বিচরণ ।

আমরা যদি মার্কসের চিন্তায় নন্দন তত্ত্ব নিয়ে দেখি তবে দেখতে পাবো তিনি বুর্জোয়া ভাবাদর্শের কিছু কিছু দিক বিশেষত: সাহিত্য শিল্পে সার্বভৌম কেন্দ্রিক দিকটি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন । কেউ কেউ এ কথাও বলেছেন যে শিল্প সাহিত্য নিয়ে হেগেলের মত তিনি অনিচ্ছা সত্বেও স্বীকৃতি দিয়েছেন । এর প্রধান কারণ ক্লাসিক সাহিত্যের দিকে নতুন সাহিত্যের থেকে বেশি ঝোঁক ও পুন:পাঠের আগ্রহ তাঁকে ভাবিয়েছিল । এই দিকটি প্রায় সব দেশে প্রযোজ্য। রাশিয়ার মার্কসীয় কবি মায়াকভস্কি থেকে সম্পূর্ণ নান্দনিক ধারার কবি পুশকিনের কবিতা অনেক বেশি সমাদৃত । তলস্তয় গদ্যের ক্ষেত্রে এ কথাও বলা যায় । মার্কসীয় শিল্পে শ্লোগানের জন্য শিল্পকে চমক হিসেবে অনেকাংশে কাজে লাগিয়েছে কমিউনিস্টরা আর্থসামাজিক দিক থেকে কিন্তু ওই পর্যন্তই । এখানেও দেখি জীবনানন্দকে নিয়ে যে আলোচনা ও মূল্যায়ন বামপন্থীদের ক্ষেত্রে তা নেই। সাহিত্যের ক্ষেত্রে বামপন্থী সাহিত্যের প্রকোপ আশির দশকের শেষডাগ পর্যন্ত পাই। বাংলায় বামপন্থী শাসন জমজমাট থাকাকালীন তারা শিল্প সাহিত্যে যতটা না তোল্লাই দিয়েছেন তার থেকে বেশি দিয়েছেন ভাববাদীদের । এ নিয়ে বামপন্থীদের অভিমান এই সময়ে দেখা গেছে। ভোটের সময় বামপন্থী শিবিরের দেওয়াল লিখনে রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দের নাম উচ্চারিত হতে দেখেছি।

শ্লোগান বহুভাবে আসতে পারে। বামপন্থীরা সাহিত্যে তাকে ঢুকিয়ে ভাবের ঘরে চুরি করেছে ও করছে। অন্ন , বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রতিবিধান করার শক্তি শিল্প সাহিত্যের নেই। শুধুমাত্র পরিকাঠামোর বিকাশ করতে পারে। সমাজের দর্পণ হয়ে উঠতে পারে। সুখের কথা এই যে ভাববাদ বস্তুবাদ কাজিয়া বাদ দিয়ে আজকের কিছু তরুণ প্রকৃতার্থে সেই দর্পণ তুলে ধরার নিরন্তর চেষ্টা করছে। শ্লোগান বহুভাবে আসতে পারে। বামপন্থীরা সাহিত্যে তাকে ঢুকিয়ে ভাবের ঘরে চুরি করেছে ও করছে। অন্ন , বস্ত্র ও বাসস্থানের প্রতিবিধান করার শক্তি শিল্প সাহিত্যের নেই। শুধুমাত্র পরিকাঠামোর বিকাশ করতে পারে। সমাজের দর্পণ হয়ে উঠতে পারে। সুখের কথা এই যে ভাববাদ বস্তুবাদ কাজিয়া বাদ দিয়ে আজকের কিছু তরুণ প্রকৃতার্থে সেই দর্পণ তুলে ধরার নিরন্তর চেষ্টা করছে