ছাগল হইতে সাবধান

0

Last Updated on

দেবাশিস লাহা

এক পাল হায়না নতুন একটি জঙ্গলে ঢুকে পড়ল। খুব সন্তর্পণে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে যা দেখল, তাতে আনন্দ আর ধরেনা। প্রথম সারিতে থাকা হায়নাটি তো প্রায় চেঁচিয়েই উঠল — ওস্তাদ এযে দেখি গরু আর গরু! ওই যে মোষও আচে দ্যাখতাছি। একসঙ্গে এতগুলান গরু মোষ যে শ্যাষ কবে দ্যাখছি! জিভখান জলে টসটস করতাছে!

পালের গোদাটি একটু বকেই দিল।

চোপ, আস্তে! এত হড়বড় করলি চলে! আগে খবর লাগাতি হবে এই জঙ্গলে বাঘ আচে কিনা। উত্তর পাড়ার জঙ্গলে কি ঘইটল ভুইলা গেলি? বাঘের থাবা থিকা জানডা কোনমতে বাঁচাইয়া — তাছাড়া ওহানের গোরুগুলান কেমন এককাট্টা! বাপ রে! এক খানের পেছন লইলে বাকি গরুগুলানও গুঁতাইতে আসে। এহানের গরু মোষ কেমন, হদিশ লাগাইতে হইব। মোষগুলানের চেহারা দেখতাছিস? ওদের বাপ দাদারা তো আরও বড়সড়!

কাদের কতা বলতিছ ওস্তাদ?

ক্যান? এইডাও ভুইলা গেলি? উত্তর পাড়ায় বাইসনের তাড়া খাস নাই? বাবারে কি ভয়ংকর। ওরা তো এই মোষেরই জ্ঞাতি গুষ্টি! পিণ্ডিখান একেবারে চটকাইয়া দিব । তাই ভাইবা চিন্তা কাম করতি হইবা। আমরা তো মাত্র কজন। আর কত্ত গরু মহিষ!

এক্কেরে ঠিক কইছেন কত্তা! কিন্তু ওইগুলান কি? ছোট ছোট আকার। উত্তর আর পশ্চিম পাড়ার জঙ্গলে এই রকম জীব দেখি নাই! তবে ভয়ের কেচু নাই মনে হচ্ছে। এরাও তো সেই ঘাস খাইতেছে দেখতাছি! পুচকি পুচকি তৃণভোজি!

সেডাই তো মনে হইতাছে। তবু সাবধানের মার নাই। বাজাইয়া দেখনের দরকার। খান পঞ্চাশের জঙ্গলকে আমরা মরুভূমি বানাইয়া ছাড়ছি। তবু বাধার পর বাধা। উত্তর পাড়ার জঙ্গলডা তো এহনও নাগালের বাইরে। যাক কাল থিকাই লাইগা পড়তি হবে। তরেই দায়িত্ব দিলাম। চুপচাপ কাম করতি হইব। সবার আগে খোঁজ লাগা এহানে বাঘ আচে কিনা। তারপর গরু মহিষ! ওই জীবগুলানকে তো চেনাই যাইতেছে না। ওদের যে কি পরিচয় কে জানে! মনডা বড় খচখচ করতাছে রে হামুদু! তুই হদিশ লাগা!

——–

হুজুর! হুজুর!

কি রে, হামুদু, এমন
হাঁপাইছস ক্যানে?

আনন্দে হুজুর আনন্দে!
বাঘ নাই! এ জঙ্গলে বাঘ নাই!

বলিস কি করে! বাঘই তো জঙ্গলের রক্ষাকর্তা। সে না থাকলে জঙ্গলও বাঁচেনা। এ তো সত্যই সুখবর।

একখান ছেল হুজুর। অনেকদিন আগের কতা। ১৯৫৩ সালে সেই শ্যাষ বাঘখানও মইরা গেছে!

মধু মধু! এবার গোরু মহিষের ব্যাপারডা হদিশ লাগা। আর ওই এক খান জীব — আরে ওই যে পুচকি পুচকি! গরুর মত ঘাস পাতা খায়।

সে খবরও এনেচি হুজুর। ওদের ছাগল বলে। পশ্চিম, উত্তর কুনো বন বাদাড়েই এই সব জীব নাই। এহানেই এদের দ্যাখা মেলে। তবে দক্ষিণ পাড়ার বাদাড়েও নাকি বেশ কিচু আচে।

কি নাম কইলি? ছাগল?

হ্যাঁ হুজুর। পূব পাড়ার জঙ্গলে এরা বেশ জমিয়ে বসেছে, শুনলাম।

বেশ, খোঁজ লাগা!

***
হুজুর! হুজুর! জবর খবর!

কইয়া ফ্যাল হামুদু!

এক পাল গরু ঘাস চিবাইতেছিল। যেই না আমায় দেখেচে, হাম্বা হাম্বা কইরা ছুইটা আইল।

কস কি! গুঁতায় নাই তো?

না হুজুর! কি কইল জানেন! গরু ছাগল হায়না, ভালবাসি আয়না!

বলিস কি! এ তো দারুণ সংবাদ রে! সম্প্রীতির গরু ঠাওর হইতাছে! যাক, নিশ্চিন্তি!

না, হুজুর। আমিই তাই ভাবছিলাম। কিন্তু আচমকা এক পাল মহিষ! বাপ রে! কি চেহারা! কোনমতে প্রাণ হাতে পলাইয়া আসতাছি!

কস কি? গরুর জন্য মহিষের এত দরদ!

হ্যাঁ হুজুর! গরুগুলাম শান্তশিষ্ট, কিন্তু মহিষগুলান খতরনাক।

তাই তো দেখতাছি। ভাবনার কতা। তুই এবার ওই ছাগলের ব্যাপারডা দ্যাখ দিকি!

**
হুজুর! হুজুর! জোর খবর!

তোর মুখে তো নাল ঝরতাছে রে হামুদু! ফটাফট কইয়া ফ্যাল! আর যে তর সয়না!

একটু আগেই এক ছাগলের সাতে দ্যাহা৷ আমি দূর থিকা নজর রাখছিলাম। বলা তো যায়না। এমন জীব তো এই পেথম দেখতাছি! কিন্তু কান দুখান সজাগ ছেল। সুর ভাইসা আইল।

কস কি! ছাগলে কি গান করতাছিল!

হ্যাঁ, হুজুর। সে গান শুনলি আপনার জিবেও নাল ঝরবে! — ধর্মতলার মোড়ে, গরু খাব তোড়ে!

কস কি? ছাগলেও গরু খাইতে চায়? বিশ্বাস হয়না!

হ্যাঁ হুজুর! আমারও সন্দেহ হইছিল। পুচকি এক খান প্রাণি! সে কিনা বলে গোরু খাবে! ভাব জমাতেই সব খোলসা হইয়া গেল। ওরা নাকি পেথমে শুধু ঘাস পাতাই খাইত। একবার হইল কি, জার্মান দ্যাশ হইতে ইমপোর্টেড ঘাস এই পূব পাড়ার বাদাড়েও আইয়া পড়ল!

বার বার কইছি। ইংরাজি কস না। হায়নাগো বিশুদ্ধ ভাষাখান কি কামে লাগতাছে না?

মাপ করেন হুজুর। আমদানি করা ঘাস, তবে সবুজ নয়, লাল রঙের। সেই ঘাস খাওনের পরেই নাকি এই ছাগলগুলান গরু খাইতে শুরু করে। তারপরই বাজারে চাউর হইয়া যায়, পাগলে কিনা বলে, ছাগলে কিনা খায়! ছাগলডার দাড়ি আচে দ্যাখলাম!

দাড়ি আচে! আগে কস নি ক্যান? এদের নেতা কে? এক খান গোপন বৈঠক হওয়া জরুরী। ছাগলের সাথে একখান জোট যদি কইরা ফ্যালা যায়! অহন মহিষদের ব্যাপারডা সামলাইতে হইব। সকলেই আমাগো খাদ্য। কিন্তু এক এক কইরা খাইতে হইব৷

সে আর বলতি হুজুর। আমি ন্যাতারে সঙ্গেই লইয়া আইছি! তবে ডেরায় ঢুকাই নাই। মরা ব্যাঙ আর পচা ইঁদুরের ব্যবস্থা কইরা তারে বসাইয়া আসতাছি!

কস কি, ব্যাঙও খায়!

হ্যাঁ, হুজুর! ওই যে বললাম — ছাগলে কিনা খায়!

বেশ, লইয়া আয়। আলোচনায় বসি।
***
তিন ঘন্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠকের শেষে ছাগল নেতা নিজের আস্তানায় ফিরে গেলেন। উপঢৌকন হিসেবে আরও কিছু ইঁদুর, ব্যাঙ,এবং একটি মরা গরুর ঠ্যাং।

***
কি রে মোষ বলে কি তোদের বুদ্ধি হবেনা? তোরা নাকি সেদিন হায়নাদের ধাওয়া করেছিস?

ওহ, ছাগল ভাই যে! বল কি খবর! হ্যাঁ সে তো করবই! গরু মারার মতলব করেছিল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব নাকি! বাগে পেলে যে কি করতাম!

এই জন্যই তোরা মোষ! আরে গরু মারবে মারুক! তোদের কি?

মানে? গরু তো আমাদের স্বজাতি। মহিষ হয়ে হয়ে ওদের বাঁচাব না? কি যে বল ছাগল দাদা!

গরু তোদের স্বজাতি? কে বলল? জানিস না তোরা নিচু জাতের? তোরা কালো, ওরা ফর্সা। গরুরা তোদের নিচু চোখে দেখে! সেটাও বুঝিস না! ছি! এই তোদের মগজ!

ভুল দাদা। সব গরু কি একরকম হয়? ওদের মধ্যেও শাদা কালো আছে। তুমি কি কালো গরু দেখ নি? তাছাড়া গরুদের নমস্য আদি গরুরাও সব কালো।

আবার ভুল বকছিস! গরুরা তোদের সমান চোখে দেখে? তবে শ্রীকৃষ্ণ, মহাদেব এদের প্রিয় জীব মহিষ না হয়ে গরু হল কেন? তোদের স্রেফ মহিষাসুর বানিয়ে দিয়েছে! অসুর মানেও বুঝিস না?, লজ্জা লজ্জা!

তাই তো ছাগল দাদা। এইটা তো ভেবে দেখিনি। তা তুমি কি চাইছ?

মন দিয়ে শোন। গরুদের মতলব ভাল নয়। ওরা গোপনে জঙ্গলের দখল নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে।ওরা যদি ক্ষমতায় আসে, তবে ছাগল মহিষ সবার সর্বনাশ হবে। একমাত্র উপায় হল হায়নাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা।

তবে আমরা মোষেরা এখন কি করব দাদা?

হায়নারা গরু মারলে চুপচাপ দেখবি৷ আর চেঁচিয়ে বলবি হায়নারা খুবই শান্তিপ্রিয়। গরুরাই প্রথম গুঁতোনো শুরু করেছে৷

বেশ। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিনা। গরুরা মারা পড়লে তো হায়নারা সর্বেসর্বা হয়ে উঠবে। সে তো মহাবিপদ। গরুরা আর যাই হোক, মাংস তো খায়না। আমাদের মারতেও পারবেনা। আমাদের শক্তি অনেক বেশি। কিন্তু হায়না তো দল বেঁধে থাকে। খুব হিংস্র। ওদের সংখ্যা বাড়লে–

আরে বুদ্ধু। এই জন্যই তোদের গরুরা ঠকিয়ে নেয়। গরুদের শেষ করে আমরা মানে ছাগলরা জঙ্গলের দখল নেব। সঙ্গে তোরা তো থাকবিই। তারপর কি আর হায়নাদের রাখব ভেবেছিস? মহিষ ছাগলের জোট। ছাগলের বুদ্ধি আর মহিষের শক্তি। হায়নারা পালানোর পথ পাবেনা। রাজা হব আমি, মন্ত্রী হবি তুই।
——–

ইহার পরের ঘটনা অতি সংক্ষিপ্ত। পূর্ব পাড়ার জঙ্গলে মৃত গরুর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here