শবদেহের শালগ্রাম শিলা

0

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

হিন্দুরা যে শালগ্রাম শিলা পুজো করে, তা পাওয়া যায় একমাত্র নেপালের কালীগণ্ডকী নদীতে। হিমালয়ের শিলাস্তর বিধৌত নদী এই কালীগণ্ডকী। চিরতুষারাবৃত অঞ্চলেই উৎপত্তি এই নদীর। জলের তীব্র স্রোতে শিলাস্তর ভেঙে নিয়ে আসছে বলে কালীগণ্ডকীর জলের রং কালো। আর এই শিলাস্তর বা পাথরের খাঁজে লুকিয়ে থাকা জুরাসিক যুগের সামুদ্রিক জীবাশ্ম ভেসে আসছে ওই জলের স্রোতে‌ । এর মধ্যে অ্যামোনয়ডিয়া গোষ্ঠীর জীবাশ্মও আসছে, যা হলো এই শালগ্রাম শিলা। সেনোজয়িক যুগে টেথিস সাগর থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায় হিমালয় পর্বতমালা। সে সময় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর সঙ্গে মলাস্কা পর্বের অন্তর্গত শামুক, গুগলি, শাঁখ প্রভৃতি অমেরুদণ্ডী প্রাণীরাও চাপা পড়ে যায়। তৈরি হয় জীবাশ্ম। এরাই শালগ্রাম শিলার ভেতরে থাকা জীবাশ্মদের আদি পুরুষ। এই শালগ্রাম শিলার ভেতর যে বিষ্ণুচক্র দেখা যায়, আসলে তা হলো অ্যামোনয়ডিয়া গোষ্ঠীভুক্ত চাপা পড়া প্রাণীর জীবাশ্ম। এই অ্যামোনাইট প্রাণীদেহের আকার কুণ্ডলাকৃতি। কোনো কোনো শালগ্রাম শিলায় বনমালা চিহ্ন দেখা যায়। এগুলো হলো বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর জোড় অংশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার পৈতে চিহ্ন থাকে। এটি হলো প্রাণীদেহে সাইফাঙ্কেল পাইপ দিয়ে হাড় তৈরির পূর্ব অবস্থা। এই পাইপের দাগ হলো পৈতে চিহ্ন। তাছাড়া, কোনো প্রজাতির শিলার মধ্যে যদি লোহার সালফাইড যৌগ “পাইরাইট” বেশি থাকে, তবে সেই শালগ্রাম শিলা হবে হিরণ‍্যগর্ভ লক্ষণযুক্ত। একসময় এই ধরণের শালগ্রাম শিলার ভেতরে সোনা আছে বলে এক শ্রেণির মানুষের মনে ধারণা জন্মে গিয়েছিল এবং এজন্য হিমালয়ের মুক্তিনাথ অঞ্চলে এই ধরণের শিলা পাচার রুখতে নেপাল সরকারকে সেনা নামাতে হয়েছিল। আবার ক্ষুদ্র গহ্বরবিশিষ্ট, চক্রহীন, গলায় মালার মতো লক্ষণবিশিষ্ট শিলাকে পদ্মপুরাণে বৌদ্ধ মূর্তি বলা হয়েছে।আপাতদৃষ্টিতে কালো রঙের নুড়ি পাথরের মতো দেখতে এই শালগ্রাম শিলা সম্পর্কে সর্বপ্রথম& সালে বিখ্যাত ভূ-বিজ্ঞানী কাউপার রিড্ ও টনি হেগেন নেপালের কালীগণ্ডকী এলাকায় ভূ-বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা চালান এবং তাদের সেই সমীক্ষা থেকেই উঠে আসে শালগ্রাম শিলা হলো আসলে যুগের বিবর্তনের জীবাশ্ম সম্বলিত শিলা। তাই বলা যায়, শালগ্রাম শিলার গায়ে বিষ্ণুচক্র, পৈতে চিহ্ন, বনমালা চিহ্ন বলে যেসব চিহ্ন দেখা যায়, তা হলো আসলে সেই সব চাপা পড়া জীবদেহ, যা পরিণত হয়েছে জীবাশ্মে। মলাস্কা পর্বের পরে মেসোজয়িক কল্পের অ্যামোনাইট জীবাশ্ম বহুগুণে বিবর্তিত হয়েছে, যার একটি হলো পেরিসস্ফিংটিস, যে পর্বের প্রাণীর জীবাশ্ম সম্বলিত শিলাই হলো শালগ্রাম শিলা। আর এই শিলাকেই নারায়ণ জ্ঞানে পুজো করে আসছেন হিন্দুরা। সোজা কথায়, যেসব শিলায় পেরিসস্ফিংটিস প্রজাতির জীবের জীবাশ্ম আছে, সেগুলোই হলো শালগ্রাম শিলা। এর ভেতরে আছে বিষ্ণুচক্র, যা হচ্ছে বিবর্তনের চিহ্ন। বৈজ্ঞানিক ব‍্যাখ‍্যায় বলা যায়, জীব সৃষ্টির প্রথম লগ্নে মলাস্কা পর্বের আদি প্রাণী সেফালোপোডের আবির্ভাব ঘটে। এরপর বিবর্তনের ধারা বেয়ে মেসোজয়িক কল্পে আসে অ্যামোনাইট গোষ্ঠীর জীবেরা। বংশগতির ধারা বেয়ে এরপর আসে পেরিসস্ফিংটিসগণ। এরপর এই প্রজাতির জীবদেহ কোটি কোটি বছর ধরে চাপা পড়ে থাকে সমুদ্রের তলায়। তারপর টেথিস সাগর মাথা তুললো হিমালয়রূপে। এককালের পলিস্তর জমে জমে তা পরিণত হলো শিলাস্তরে, আর তার ভেতরে বিভিন্ন জীবের দেহ সংরক্ষিত থেকে গেল জীবাশ্ম হিসেবে, যার মধ্যে এই শালগ্রাম শিলা বা নারায়ণ শিলা। তাই বলা যায়, শালগ্রাম শিলার ভেতরে যা আছে, তা পেরিসস্ফিংটিস প্রজাতির জীবদের হাড়ের অবশেষ বা জীবাশ্ম। এককথায়, মৃত জীবের অবশেষ বা শবদেহের হাড়, যার নাম “শালগ্রাম শিলা।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here