সীমার মাঝে অসীম যিনি

0

Last Updated on

সীমার মাঝে অসীম যিনি  / সম্বরণ চট্টোপাধ্যায়।

“তুমি বলছ দুপুর এখন সবে, না হয় যেন সত্যি হল তাই, একদিনও কি দুপুর বেলা হলে, বিকেল হল মনে করতে নাই? “-ছোট্ট খোকার এই কল্পনা প্রবণতা দেখে মায়ের হয়ত হাসি পায়। কিন্তু শিশুটির কল্পনা কি একেবারেই অবাস্তব? আচ্ছা ধরুন, ওই মুহূর্তে যদি শিশুটিকে এখান থেকে উড়িয়ে সোজা জাপানে নিয়ে গিয়ে ফেলা যেত! তাহলে শিশুটি সেখানে সন্ধে বেলাই তো দেখতে পেত ! হ্যাঁ, ঠিক বুঝেছেন। ভারতীয় সময় (Indian standard time) অনুযায়ী যখন এখানে দুপুর তিনটে, জাপানে তখন সন্ধে ছটা।তার মানে, এই সময় (time) ব্যাপারটা, এই দুপুরবেলা, বিকালবেলা, ব্যাপারগুলো নেহাতই আপেক্ষিক। সূর্য উঠবে, তারপর সকাল হবে, দুপুর হবে, বিকাল, সন্ধে, তারপর রাত আসবে। রাত পোহালে আবার সূর্য উঠবে, আবার সকাল হবে, আবার দুপুর হবে। এইভাবে চলতে থাকবে। এ এক চক্র, দিনরাতের চক্র। ভুগোলটা সবাই জানে। পৃথিবী নিজের অক্ষের(axis) ওপর চব্বিশ ঘন্টায় একবার আবর্তন(rotate) করছে তাই দিনরাতের এই চক্রটিও চব্বিশ ঘন্টার এক চক্র। এখন জাপান হোক বা ভারত, রাশিয়া হোক বা আমেরিকা, সর্বত্রই কিন্তু এই চক্রটা চলমান। পৃথিবী পৃষ্ঠে অবস্থিত যে কোন স্থানই কিন্তু এই চক্রের কোন না কোন দশায়(phase) রয়েছে। কোথাও সকাল, কোথাও দুপুর, কোথাও বিকেল আবার কোথাও রাত। তাহলে দেখুন, এই চক্রের শুরু বা শেষ বলে কিছু নেই। সকালটাকে শুরু বলছেন? কিন্তু কেন? সকালটাতো আপনার জন্য সকাল! আপনার ছেলেটা, যে আমেরিকায় চাকরী করে, তার জন্যে তো সেটা সকাল নয়! আপনি যখন ঘুম থেকে উঠে বেড-টী এর সন্ধান করছেন, সে তো তখন শুতে যাবার জন্য রেডি হচ্ছে। অঙ্কের ভাষায় একে continuity বলে। একটা নিরবিচ্ছিন্ন ব্যাপার, যার শুরু বা শেষ বলে কিছু হয় না। রবিবারের পরে আসে সোমবার, আবার শনিবারের পরে আসে রবিবার। সপ্তাহের এই চক্রেও শুরু শেষ বলে কিছু নেই। আপনি বলতে পারেন সোমবার সপ্তাহের শুরু। যেহেতু রবিবার ছুটির পর সোমবার অফিসে প্রথম যান। কেউ বলবে ক্যালেন্ডারে সবার ওপরে বা প্রথমে থাকে রবিবার, সুতরাং রবিবারই হল সপ্তাহের প্রথম দিন। সৌদিআরব চলে যান, ওখানে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সেই অনুযায়ী শনিবার হল সপ্তাহের প্রথম কাজের দিন। তাহলে দেখুন, সপ্তাহের শুরু বা শেষ বলে কিছু হয় না। একই ভাবে পুর্নিমার পনের দিন পর আসে অমাবস্যা আবার তার পনের দিন পর আসে পুর্নিমা। চাঁদও পৃথিবীর চারদিকে মাসে একবার ( আরো সঠিক ভাবে বললে সাড়ে উনত্রিশ দিনে) ঘুরে আসে বলেই এই তিথি চক্র। পৃথিবী আবার সুর্যকে প্রদক্ষিণ করছে বলে ঋতু পরিবর্তন হয়। গ্রীষ্মের পর বর্ষা, তারপর শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত হয়ে আবার গ্রীষ্ম। এখানেও শুরু শেষ বলে কিছু নেই। আমাদের যখন গ্রীষ্মকাল, অস্ট্রেলিয়ায় তখন শীতকাল। তাহলে দেখুন, আমাদের জীবনে সময়(time), নানা চক্রের রূপে আবর্তিত হচ্ছে। চক্র মানেই একটা সীমাহীন ব্যাপার। চক্র মানেই endless. জন্মমৃত্যু অবশ্যই এক চক্র। জীবনচক্র। শিশুর জন্ম হচ্ছে, বৃদ্ধি হচ্ছে, পুর্নবয়স্ক মানুষ বা প্রানীর থেকে নতুন প্রানের জন্ম হচ্ছে। বৃদ্ধ প্রানীর মৃত্যু হচ্ছে। এখানেই প্রশ্নটা আসে। যদি জীবনের প্রতিটা সময়চক্র অসীম হয়, চক্রাকার হয়, তাহলে এই সময়( time) এর উপলব্ধিকারী যে চেতনা(consciousness), তা কি করে সসীম হতে পারে? অর্থাৎ চেতনার কি করে জন্ম মৃত্যু থাকতে পারে? চেতনা না থাকলে সময় বলে কিছু থাকে কি? ঘড়ি দেখার কেউ না থাকলে ঘড়ি দিয়ে কি হবে? জড়বস্তু, যেমন চেয়ার, টেবিল, ইট, পাথর, এদের কাছে সময়ের কোন তাৎপর্য আছে কি? বিজ্ঞান বলছে বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ এর সঙ্গে সঙ্গেই স্থান এবং কাল(time) বা সময়ের জন্ম হয়। অর্থাৎ Big Bang এর ‘আগে’ কী ছিল? বা কী হয়েছিল? এই প্রশ্নই অর্থহীন, কারন বিগ ব্যাং এর ‘আগে’ বলে কিছু হয় না। বিগ ব্যাং দিয়েই ‘সময়’ এর জন্ম হয়। ভাবুন একবার ব্যাপারটা! ‘সময়’ এর আবার জন্ম!? বিজ্ঞান তো যুক্তি নির্ভর, অন্তত তাই তো হওয়া উচিৎ, তাহলে আসুন, যুক্তি দিয়ে বিষয়টাকে বোঝার চেষ্টা করি। দেখা যাক যুক্তি কি বলছে।মহাবিস্ফোরণ এর ফলে সময়ের জন্ম হয়।বেশ, তাহলে বলা যায় -মহাবিস্ফোরণ এর আগে সময়ের অস্তিত্ব ছিল না। ঠিক তো! উঁহু! এখানেই তো গন্ডগোল, ‘আগে’ শব্দটাই তো ব্যবহার করা যাবে না। মহাবিস্ফোরণ এর ‘আগে’ বলেই তো কিছু হয় না! তাহলে? সব গুলিয়ে গেল।বিগ ব্যাং এর ফলে টাইম এর জন্ম হয় ধরে নিলে যুক্তি অনুযায়ী বলা যায় -এমন একটা সময় ছিল যখন সময় বলে কিছু ছিল না। যাঃ। সেই তো ‘এমন একটা সময় ছিল’ বলতে হল, অর্থাৎ সময় তখনও ছিল, এটাই স্বীকার করতে হল। এ এক বিচিত্র স্ববিরোধ (paradox). একে যুক্তির দুষ্টচক্র বা logical loop ও বলা হয়। এরচেয়ে অনেকবেশী গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিসঙ্গত থিওরী হল, বিগ ব্যাং দিয়ে মহাবিশ্ব শুরু হলেও সময়ের শুরু হয়নি। সময় তার আগেও ছিল। এই বিগ ব্যাং অনন্ত বিগ ব্যাং এর একটি মাত্র। সে প্রসঙ্গে আবার পরে আসছি।আপাতত এটুকু আশাকরি বোঝাতে পেরেছি যে সময় নামক প্রতীতি টা নানা রকম সসীম ও পরিমাপযোগ্য চক্রের আকারে আমাদের জীবনে উপস্থিত থাকলেও আসলে সময় অসীম।পরিমাপ করা যায় এমন ভৌত রাশি (physical quantity) কে মাপা হয় কি দিয়ে?অবশ্যই সংখ্যা ও একক দিয়ে। আসুন একটু দেখে নেওয়া যাক সংখ্যা ব্যাপারটা কতটা সসীম। আচ্ছা বলুন তো, সবচেয়ে বড় সংখ্যা কী? ঠিক বলেছেন, ইনফিনিটি। অর্থাৎ সবচেয়ে বড় সংখ্যা বলে কিছু হয় না। যতবড় সংখ্যাই লিখুন না কেন, তারচেয়েও বড় সংখ্যা লেখা যায়। তাই ‘সংখ্যার সংখ্যা’ এবং ‘বৃহত্তম সংখ্যা’ দুটোই হল অসীম। সে না হয় হল। কিন্তু ছোট সংখ্যা? সেগুলোতো সসীম! যেমন 1 বা 2 ? হ্যাঁ, অবশ্যই সসীম এবং এদের মধ্যেকার দূরত্ব, অর্থাৎ বিয়োগফল 2-1=1 এটাও সসীম। ঠিক তো? আচ্ছা, এবার বলুন তো, 1এবং 2 এর মধ্যে কতগুলো সংখ্যা আছে? কি বললেন? একটাও নেই? কেন? 1.5 বা দেড় যাকে বলে আরকি ! সেটা তো 1 আর 2 এর মধ্যেই আছে! কি বলছেন? ওটা তো ভগ্নাংশ? তা হোক না। ভগ্নাংশ কি সংখ্যা নয়? অবশ্যই সংখ্যা এবং পরিমাপযোগ্য। দেড় খানা রুটি খাননি কখনও? সামান্য দশমিক ভগ্নাংশের ধারনা থাকলে সহজেই বুঝবেন, 1 থেকে 2 এর মধ্যে সহজেই নিম্নলিখিত সংখ্যাগুলি আছে বলা যায় -1.1, 1.2, 1.3, 1.4, 1.5, 1.6, 1.7, 1.8, 1.9. এখানেই শেষ নয়! এই সংখ্যাগুলোর যে কোন দুটো পরপর সংখ্যা নিন। যেমন ধরুন -1.3 আর 1.4। এইদুটো সংখ্যার মধ্যেও অনেকগুলো সংখ্যা আছে। যেমন – 1.31, 1.32,…..1.38,1.39 এইভাবে। একইভাবে 1.31 এবং 1.32 এর মধ্যেও আছে অসংখ্য সংখ্যা। এই প্রক্রিয়া কখনওই শেষ হবে না। এই প্রক্রিয়া অনন্ত। হ্যাঁ বন্ধু, শুনতে অসম্ভব মনে হলেও এটাই বাস্তব যে 1এবং 2 এর মধ্যে অসীম সংখ্যক সংখ্যা আছে। কি অদ্ভুত! তাই না! দুটো সসীম সংখ্যা 1 এবং 2. অথচ তাদের মধ্যেই আছে অসীম সংখ্যক সংখ্যা। সীমার মধ্যে অসীমের এই প্রকাশ, আর একটা আশ্চর্য উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। এটা জ্যামিতির ব্যাপার। ‘পাই’ (π, pi) কাকে বলে বলুনতো? হ্যাঁ, ‘পাই’ হল গ্রীক বর্ণমালার একটা অক্ষর। কিন্তু এই অক্ষরটা দিয়ে জ্যামিতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুপাত কে বোঝানো হয়। বৃত্তের পরিধি ( circumference of a circle) ও ব্যাস ( diameter) এর অনুপাত। π=C/D. অর্থাৎ এই pi হল দুটো বাস্তব পরিমাপযোগ্য রাশি ‘বৃত্তের পরিধি’ ও ‘বৃত্তের ব্যাস’ এর অনুপাত। সুতরাং এই অনুপাত (C/D) একটি বাস্তব ধ্রুব অনুপাত। অর্থাৎ এর মান অবশ্যই বাস্তব (real), সসীম (finite) ও মূলদ(rational) হওয়া উচিৎ। আশ্চর্যের ব্যাপার হল ‘পাই’ এর মান সঠিকভাবে নির্ণয় করাই যায় না। ‘পাই’ একটি অসীম ভগ্নাংশ ( infinite fraction) এবং অমূলদ সংখ্যা ( irrational number). ছোটবেলায় স্কুলে যে পড়েছিলেন π=22/7, ওটা একেবারেই নির্ভুল নয়। ‘পাই’ এর আসন্ন মান মাত্র। হিসাবের সুবিধার্থে ‘পাই’ এর মান বাইশের সাত বা 3.14 ধরা হয়। অমূলদ সংখ্যা মানে হল যে সংখ্যাকে বিশুদ্ধ ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করাই যায় না। একবার ভেবে দেখুন, বাস্তব ও সহজেই পরিমাপ করা যায় এমন দুটো রাশির অনুপাত, যাকে অবশ্যই একটা সসীম ভগ্নাংশের আকারে প্রকাশ করতে পারা উচিৎ, তাকেই কিনা ভগ্নাংশ আকারে প্রকাশ করাই যায় নি! সেটাই কিনা একটা অসীম ভগ্নাংশ? এরচেয়ে বড় হেঁয়ালী, এরচেয়ে বড় রহস্য আর কি হতে পারে?আগের একটা লেখায় ( বিজ্ঞান, আস্তিকতা ও ঈশ্বর) বলেছিলাম না, প্রকৃতির পরতে পরতে রহস্য! গণিত বলুন বা প্রাণীবিদ্যা, উদ্ভিদ বিদ্যা বলুন বা রসায়ন, বিজ্ঞানের যে কোন শাখায় আপনি বিচরণ করুন না কেন, আপনার জন্য অপার বিস্ময় অপেক্ষা করছে। যত জানবেন তত বিস্মিত হবেন। যত গভীরে যাবেন ততই মনে হবে কিছুই বুঝিনা, কিছুই জানিনা। এই পরমাপ্রকৃতির অপার বিস্ময়ের রাজ্যে আমরা শুধু মুগ্ধ দর্শক হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারি। একটা দুটো কেন, কয়েকশো প্রবন্ধ লিখলেও সব কথা লেখা হবে না। আপনাদের ভালবাসা আর আশীর্বাদ পেলে অবশ্য আরও লেখার চেষ্টা করতে পারি।
যাক গে, ফিরে আসি জ্যামিতির কথায়। বিন্দু (point) কাকে বলে জানেন তো! কিম্বা সরলরেখা? (straight line). 
কে না জানে? এতো সবাই জানে। 
আচ্ছা, তা এগুলো আঁকতে পারবেন? 
হ্যাঁ, না পারার কি আছে? 
একটা কাগজ, স্কেল আর পেনসিল পেলে এখুনি এঁকে ফেলতে পারবেন। তাই তো! 
হ্যাঁ, দিন, এঁকে দেখিয়ে দিচ্ছি।
ঘন্টা পারবেন। 
সে কী? কেন?? 
কারণ, ওগুলো আঁকাই যায় না।
গাঁজা খেয়েছেন নাকি? বিন্দু, সরলরেখা, এগুলো আঁকা যায় না? 
না, যায় না। আজ পর্যন্ত কেউ আঁকতে পারেনি।
আঁকা যায় না বললেই হল? ছোটবেলা থেকে কত আঁকলাম! এখন আমাদের ছেলেমেয়েরা স্কুলে আঁকছে, পরীক্ষায় অঙ্কে একশোয় একশো পাচ্ছে, আর আপনি বলছেন আঁকা যায় না? বললেই হল?
বুঝলেন না তো! বেশ, এবার বলুন তো বিন্দু আর সরলরেখার সংজ্ঞা কী?
তা মনে নেই। সেই কবে স্কুলে পড়েছিলাম। মনে থাকে নাকি?
বেশ, আমিই বলে দিচ্ছি। বিন্দু হল এমন এক জ্যামিতিক চিত্র, যার কোন মাত্রা (dimension) নেই। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, বেধ বা উচ্চতা ইত্যাদি কিছুই নেই। শুধুমাত্র অবস্থান (location) আছে। বিন্দুর কোন ক্ষেত্রফল (area) বা আয়তন(volume) নেই। বিন্দু মাত্রাহীন (dimensionless). নিন, এবার আঁকুন! আঁকবেন কি করে? পেনসিলটা যতই ছুলে ছুলে ছুঁচালো করুন না কেন, যতই সুক্ষ্ম ছোট্ট করে বিন্দু আঁকার চেষ্টা করুন না কেন, মাত্রাবিহীন হবে কি করে? আতসকাচ দিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে দিব্যি একটা ক্ষেত্রফল রয়েছে। কাগজের ওপর দিব্যি একটা দ্বিমাত্রিক স্থান দখল করে রয়েছে। বিন্দু আর হল কই? সংজ্ঞার সঙ্গে মিলল কই?এতক্ষণে নিশ্চই সরলরেখার সংজ্ঞাটা মনে পড়ে গেছে? হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। সরলরেখা হল এমন এক জ্যামিতিক চিত্র, যার শুধুমাত্র দৈর্ঘ্য আছে। প্রস্থ বা বেধ নেই। সরলরেখা একমাত্রিক (one dimensional).তাহলে বুঝেই গেছেন আশা করি, সরলরেখা কেন আঁকা সম্ভব নয়! হ্যাঁ, যত সরু করেই আঁকুন না কেন, প্রস্থ একটা থাকবেই। আতসকাচ দিয়ে বোঝা না গেলেও অণুবীক্ষণযন্ত্র ( microscope) দিয়ে দেখলে মোটা ধ্যাবড়া একটা চিত্র দেখা যাবে, যার প্রস্থ তথা ক্ষেত্রফল আছে।তাহলে বোঝা গেল জ্যামিতির এইসব প্রাথমিক ধারনাগুলোর বাস্তব অস্তিত্বই নেই। অথচ এইসব প্রাথমিক ধারনাগুলোর ওপরই সমগ্র গণিত তথা পরিমাপ পদ্ধতি গুলো দাঁড়িয়ে আছে।খালিচোখে দেখলে যেটা সরলরেখা, অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে দেখলে সেটাই একটা দ্বিমাত্রিক মোটা রাস্তার মত চিত্র।বিরাট চওড়া নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। এপার থেকে ওপার দেখাই যায় না। উঁচু বাড়ির ছাদে উঠে যান। এবার ওপার দেখা যাচ্ছে। নদীটা কিভাবে বাঁক নিয়েছে, সেটাও বোঝা যাচ্ছে। এরোপ্লেনে চড়ে বসুন। ওই নদীটার ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় নদীটাকে আঁকাবাঁকা সুতোর মত দেখাবে। সবগুলোই একটাই ব্যাপার। সবগুলোই ওই নদীটাই। সবগুলোই আপনার ওইদুটো চোখ দিয়েই দেখছেন। সবগুলোই বাস্তব। এটাকেই বিজ্ঞানের ভাষায় scale বলে। এই স্কেল নিয়েই একটা সতন্ত্র প্রবন্ধ লেখা যায়। সে অন্য কথা, আসুন বাস্তব জগতের আর একটা স্তম্ভ, স্থান (space) সম্পর্কে ধারনাটা পরিস্কার করার চেষ্টা করি।আমরা যে বাস্তব জগতে ( reality) বাস করি, সেটি ত্রিমাত্রিক ( three dimensional). দৈর্ঘ, প্রস্থ ও বেধ ( বা উচ্চতা), এই তিনটি মাত্রার দ্বারাই আমরা সবকিছু বুঝতে পারি। এটাকেই আমরা বাস্তব বলি। আমাদের এই বাস্তব জগতের অস্তিত্ব এই ত্রিমাত্রিক স্থান বা three dimensional space এর অস্তিত্বের ওপর নির্ভর করছে। তাহলে আসুন, বস্তু (matter) ও স্থান (space) সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনাটা একবার ঝালিয়ে নি। যার ভর (mass) আছে এবং কিছুটা স্থান দখল করে থাকে, তাকেই বস্তু বলে।আর স্থান? ত্রিমাত্রিক যে বাস্তবতা আমরা চারিদিকে দেখছি, যার মধ্যে বস্তুজগৎ অস্তিত্ববান, তাকেই স্থান বলে।স্থান সসীম না অসীম? এই মহাবিশ্বের আয়তন কত এখনও কেউ জানে না। আমরা যতদূর দেখতে পাই হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এর সাহায্য নিয়ে, তার আয়তন হল প্রায় 13.5 billion light year অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তেরশো কোটি আলোকবর্ষ। কিন্তু এটা সমগ্র মহাবিশ্বের আয়তন নয়, দৃষ্টিগোচর মহাবিশ্বের ( observable universe) আয়তন মাত্র। সে যাই হোক, মহাবিশ্ব সসীম হতেই পারে। অকল্পনীয় বৃহৎ হলেও যুক্তিগত ভাবে মহাবিশ্বের সসীম হতে কোন বাধা নেই।ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে আমরা মহাবিশ্বের শেষ সীমানা পেয়ে গেলাম। সেই শেষ সীমারেখা টি হতে পারে একটা প্রাচীরের মত কিছু। হতে পারে বস্তু ও শক্তির শেষ সীমা, যার পর আর বস্তু বা শক্তির কোন অস্তিত্ব নেই। মহাবিশ্বের আকার হতে পারে গোলকাকার বা ডিম্বাকার বা অন্য কোন আকারের। প্রশ্ন আসবেই, তারপর কি আছে? মহাবিশ্বের বাইরে কি আছে? কিছুই নেই। হতেই পারে কিছুই নেই। কিন্তু ওই যে ‘বাইরে’ বললাম, মহাবিশ্ব যত অকল্পনীয় বড়ই হোক না কেন, যদি সসীম হয়, তাহলে তার একটা সীমানা বা সীমারেখা থাকবে। আর সীমানা থাকলে সীমানার বাইরে বলেও একটা ব্যাপার থাকবে। অর্থাৎ মহাবিশ্বের বাইরেও স্থান (space) থাকবে। যুক্তিবাদ এর সাহায্য নেওয়া যাক। ধরা যাক স্থান সসীম। অর্থাৎ স্থানের একটা সীমানা আছে, যার বাইরে আর স্থান নেই। তাহলে যুক্তি অনুযায়ী বলা যায় – স্থানের সীমানার বাইরে এমন একটা স্থান আছে যেখানে স্থান বলেই কিছু নেই। ওই যাঃ। ‘এমন একটা স্থান আছে’ বলতে হল, অর্থাৎ স্বীকার করে নিতে হল স্থানের সীমারেখার বাইরেও স্থান আছে। সেই একই স্ববিরোধ, যা আমরা সময়ের ক্ষেত্রে দেখেছিলাম।ফিরে আসি সেই বিগ ব্যাং প্রসঙ্গে, যেখানে বলা হচ্ছে মহাবিস্ফোরণ এর সঙ্গে সঙ্গে স্থান ও কালের জন্ম হয়। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি, বাস্তববোধ আর যুক্তি দিয়ে স্থান আর কালের জন্ম ব্যাপারটা স্ববিরোধ এর সৃষ্টি করে। স্থান আর কাল বা সময়, অনাদি এবং অনন্ত। স্থান ও কালের জন্ম বা মৃত্যু হতে পারে না। সীমাও থাকতে পারে না। স্থান ও কাল অসীম। সুতরাং মহাবিস্ফোরণ বলে কিছু ঘটে থাকলেও তার ফলে স্থান ও কালের জন্ম হয়নি। স্থান ও কাল শাশ্বত, অনাদী, অনন্ত, অসীম। তাহলে বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল বা কি হচ্ছিল এর উত্তর কিভাবে পাওয়া যাবে? আসুন একটু ভবিষ্যতে ঘুরে আসি। বিজ্ঞানীরা প্রমান পেয়েছেন যে আমাদের মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল। অর্থাৎ ক্রমাগত সাইজে বেড়েই চলেছে। তাহলে এই স্ফীতির পরিণতি কি?এই মহাবিশ্বের পরিণতি সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা দুটি সম্ভাবনার কথা বলেন। ১. মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হতে হতে অনন্তে বিলীন হয়ে যাবে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে The big rip বলে।২. সম্প্রসারন একসময় বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর মহাকর্ষের টানে শুরু হবে মহা সঙ্কোচন বা The big crunch. মহাবিশ্ব গুটিয়ে ছোট্ট হয়ে গিয়ে আবার এক সিংগুলারিটির অবস্থায় আসবে। তারপর হবে আবার এক মহাবিস্ফোরণ। আর একটা বিগ ব্যাং। কোনটা বেশী গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে বন্ধু? অবশ্যই দ্বিতীয় টা, তাই না!কারন দ্বিতীয় টা ঘটলে অনন্ত সম্ভাবনার দরজা খুলে যাচ্ছে। স্থান(space) ও কাল(time) এর জন্ম মৃত্যু জনিত স্ববিরোধ ও থাকছে না। তবে তারচেয়েও অনেক বড় কথা হল, এই দ্বিতীয় অপশন টা বাস্তব জগতে সীমার মাঝে অসীমের যে রূপ আমরা দেখলাম, তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।দিনরাতের চক্র, ঋতুপরিবর্তন এর চক্রের সঙ্গে এই সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশের চক্রটা যেন একই ছন্দে গাঁথা। সৃষ্টি দিয়ে শুরু আর বিনাশ দিয়ে শেষ নয়। সৃষ্টি, স্থিতি, বিনাশ- এ সবই এক অনন্ত চক্রের তিনটে দশা মাত্র।এ এক অপূর্ব অনুভুতি, অনন্তের ছোঁয়া। অসীম এই মহাবিশ্বে অনন্ত আমাদের যাত্রা। এই যাত্রা পথে আমরা সবাই সবার সহযাত্রী। তাই আসুন, পরস্পরকে সাহায্য করি, সহযোগিতা করি। আমাদের যাত্রা শুভ হোক।এ উপলব্ধি আনন্দের, এ অনুভব আনন্দের- “তোমার অসীমে প্রাণ মন নিয়ে, যত দূরে আমি ধাই। কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই….”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here