ত্রুটিহীন ছুটি

0

Last Updated on

সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলিতে [প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক নির্বিশেষে] আকস্মিকভাবে দুমাস ছুটি ঘোষণা হওয়াতে সব মহলেই বিস্ময়ের সঞ্চার ঘটিয়াছে। কেবল অভিভাবক সমাজই নহে, শিক্ষক সমাজের একটি বিপুল অংশ এই সরকারি খামখেয়ালিপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হইয়া উঠিয়াছেন। এই প্রতিক্রিয়া যে অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং স্বতস্ফূর্ত সে বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। নিছক প্রতিক্রিয়া প্রকাশের মাধ্যমেই বিষয়টির ইতি প্রাপ্তি ঘটিলে এই অক্ষরবিলাসের কোনো প্রয়োজন পড়িতনা। এহেন ধামাকাদার মেগা থুড়ি গিগা ছুটির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে নানাবিধ জল্পনার উদ্রেক হইবেনা, ইহা কল্পনারও অতীত ! গোনোতান্ত্রিক থুড়ি গণতান্ত্রিক দেশ বলিয়া কথা ! কর্তৃপক্ষের এই প্রলম্বিত ছুটি ঘোষণার পশ্চাতে কেবলই কি ক্ষুদে পড়ুয়াদিগের দাবদাহজনিত যন্ত্রণাই উদ্দীপকের কর্ম করিয়াছে নাকি ধর্মনৈতিক, অর্থনৈতিক, সর্বোপরি কোনো রাজনৈতিক মহত্ব কাজ করিয়াছে, ভাবিবার বিষয়। রাজকীয় সিদ্ধান্ত তথা রাজকার্য পরিচালনায় দয়া, মানবিকতা, উদারতা কীরূপ ভূমিকা পালন করে তাহা মেকিয়াভিলি হইতে চাণক্য সকল কূটনীতিবিদই পর্যালোচনা করিয়াছেন। তথাপি এই রাজ্যের সুমহান কর্তৃপক্ষ যে এইরূপ সংকীর্ণ রাজনীতির বহু উর্ধ্বে তাহা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত এবং প্রতিষ্ঠিত। কোন কোন মহান, দেবসুলভ ভাবনা এই প্রলম্বিত “গ্রীষ্মাবকাশের” পশ্চাৎপট হিসাবে কাজ করিয়াছে দেখিয়া লওয়া যাক।
১] ৫ই মে হইতে রমজান শুরু হইয়াছে। চলিবে ৪ই জুন পর্যন্ত। কে না জানে ইহা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিকট কীরূপ গুরুত্বপূর্ণ। গোবর, গোমূত্রপায়ী হনু হিন্দুত্ববাদীদিগের সরকারটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রমজান চলাকালীন নির্বাচনের নির্ঘণ্ট স্থির করিয়াছেন। ইসলামের ন্যায় একটি নিখুঁত বিজ্ঞান এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে আর নাই।কিন্তু এই বিজ্ঞানের অনুসারীবৃন্দ অর্থাৎ মুসলমানদিগের প্রতি এই গেরুয়া দলটির বিদ্বেষ এবং বৈরিতা সর্বজনবিদিত। সমগ্র দেশ তথা বিশ্ব জুড়িয়া ইহার বিরুদ্ধে ধিক্কার উঠিয়াছে। মউত কি সদাগর উপাধিতে ভূষিত গুজরাট দাঙ্গার পরিচালক সেই নরপিশাচটি এখন প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসনে। অতএব যাহা হইবার তাহাই হইতেছে। বিজ্ঞানের উপাসক এই মহান সম্প্রদায়টির উপর অকথ্য অত্যাচার নামাইয়া আনা হইয়াছে। ধর্মাচরণ তথা বিজ্ঞান সাধনায় বাধা সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই এই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র সে বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহ নাই। এই বৈরিতার বিরুদ্ধেই এই রাজ্যের বিবেচক কর্তৃপক্ষ রুখিয়া দাঁড়াইয়াছেন। রমজানের আরম্ভ হইবার ত্রি দিবস পূর্বেই এই গিগা ছুটি ঘোষণা করিয়া দিয়াছেন। বলাই বাহুল্য এই ঘোষণাটিও আপাদমস্তক বিজ্ঞানসম্মত এবং সময়োপযোগী। ইহাতে সংখ্যালঘু মনুষ্যকুল যারপরনাই আনন্দিত হইবেন এবং ফলশ্রুতি হিসাবে মাননীয়ার দলটিকেই নির্বাচনে জয়যুক্ত করিবেন। ইহা সর্বজনবিদিত যে এই সম্প্রদায়টি বিচ্ছিন্নভাবে ভোট দান করেননা। অর্থাৎ সংখ্যাগরু থুড়ি সংখ্যাগুরু হিন্দুদিগের ন্যায় কেহ গেরুয়া, কেহ সবুজ, কেহ লোহিত, কেহ কর্তিত হস্তে ভোট প্রদান করিয়া নিজেদের কবর খনন করেননা। দলপতির নির্দেশ অনুযায়ী বিশেষ একটি দলকেই বাছিয়া লন এবং সেই দলটিকেই সদলবলে ভোট দেন। ইহাদিগের সমবেত ভোট যাহা প্রায় ২৭% [অফিসিয়ালি, মতান্তরে আরও অধিক] ঝুলিতে পুরিলেই রাজ্যের শাসন করায়ত্ত করা জলবৎ তরলং হইয়া যায়। কারণ সংখ্যাগরু সেগমেন্ট হইতে ১০/ ১৫% ভোট আসিলেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ! এই বৈজ্ঞানিক ফর্মুলাতেই পূর্ববর্তী বাম সরকার ৩৪ বৎসর রাজত্ব করিয়াছিলেন। বিজ্ঞানের উপাসক হিসেবে বিশ্ববন্দিত সম্প্রদায়টি মুখ ফিরাইয়া লওয়ার পরই উহাদিগের পতন ঘটে। একাধিক সংখ্যালঘু ধর্মগুরু এই মর্মে একাধিকবার ঘোষণাও করিয়াছেন এই রাজ্যটি কোন দল শাসন করিবে উহারাই ঠিক করিয়া দেন। ১৬/১৭ই মে-র পরিবর্তে ২রা মে হইতে শুরু হওয়া এই গ্রীষ্মাবকাশের সিদ্ধান্ত উহাদের ক্লান্তি, উপবাস জনিত দুর্বলতা ইত্যাদিতে মলমের কাজ করিবে সন্দেহ নাই। উহারা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করিবে কোন রাজনৈতিক দলটি তাহাদের ভাল রাখিবার নিমিত্ত, ধর্ম রক্ষার নিমিত্ত আদাজল খাইয়া নামিয়া পড়িয়াছে।

২] দ্বিতীয় কারণ অর্থহানি রোধ। কর্তৃপক্ষ প্রায়ই বলিয়া থাকেন সরকারের ভাঁড়ে মা ভবানী। নিদারুণ অর্থ সংকটের কারণে অনেক জনহিতকর কর্ম সম্পাদন করা যাইতেছেনা। এই ঘাটতি মিটাইবার উদ্দেশ্যেই রাজ্য সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ইত্যাদির বেতন, ভাতা ইত্যাদি স্থগিত করিয়া মাদ্রাসা খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ করা হইয়াছে, যাহা উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ হইতে অনেকটাই অধিক। বলাই বাহুল্য ইহাও একটি বিজ্ঞানসম্মত সিদ্ধান্ত। কারণ একমাত্র মাদ্রাসার মাধ্যমেই প্রকৃত বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদান করা সম্ভব। এই দীর্ঘ ছুটির ফলে রাজ্য সরকারের হাতে আরও অধিক অর্থ আসিবে। রাজ্যের প্রায় ৬৭০০০ বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় চার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছাত্রছাত্রী প্রায় আট লক্ষ। অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। শিশু পড়ুয়ার সংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ। প্রলম্বিত ছুটির ফলে ইহাদের জন্য বরাদ্দ মিড ডে মিলের খরচ[ মাথা পিছু কুড়ি টাকা] বাঁচিবে। বর্ধিত ছুটির নিমিত্ত কত হাজার কোটির খরচ বাঁচিয়া গেল, সহজ অংকই বলিয়া দিবে। এই অর্থ দ্বারা অনেক জনহিতকর কাজ যেমন সরকারি ভবন, বিদ্যালয় ইত্যাদিতে নীল শাদা রঙ করা, ক্লাবে ক্লাবে অর্থ প্রদান, আহারে উঁহুরে জাতীয় উৎসব আয়োজন করা সম্ভব। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য গত বৎসরই ৫০০.৪০ কোটি টাকা বিদ্যালয় রঙ করার উদ্দেশ্যে অনুমোদিত হয়েছে। মূলগত সুযোগ সুবিধা যেমন বেঞ্চ, ব্ল্যাকবোর্ড, লাইব্রেরি ইত্যাদির যথেষ্ট অভাব থাকিলেও এই নীল শাদার সিদ্ধান্ত যে কত বিজ্ঞানসম্মত তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখেনা। কে না জানে মন ভাল থাকিলেই শরীর ভাল থাকে। সকল কাজ সঠিক রূপে সম্পন্ন করা যায়। বিদ্যালয়ের সন্নিকটবর্তী হইবামাত্র ছাত্রছাত্রীবৃন্দ নীল শাদার পবিত্র প্রতিফলন দেখিবে যাহা হৃদয়, মস্তিষ্ক, রক্ত, রস মজ্জায় অভূতপূর্ব অনুরণন তুলিবে। স্মৃতিশক্তি, মেধা দ্বিগুণ হইয়া উঠিবে।

৩] সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিদ্যালয়গুলির সিংহভাগ শিক্ষকই অত্যন্ত ত্যাঁদড়। কারণ উহারা পূর্ববর্তী শাসকদলের ৩৪ বছরের অনাচার চলিবার সময় চাকুরি পাইয়াছিল। নিদারুণ লজ্জা এবং পরিতাপের বিষয় এই যে এই আট বৎসরেও উহাদের স্বভাব বদলায় নাই। আনুগত্য তো দূরের কথা ইহারা সর্বদাই মাননীয়ার প্রতি বিরূপ এবং খড়গহস্ত। দিবারাত্র স্কেল, মহার্ঘ ভাতা ইত্যাদির নিমিত্ত ঘেউ ঘেউ করিতেছে। ঝুড়ি ঝুড়ি মাহিনা হস্তগত করিয়া ইহারা গাড়ি মোটরবাইকে আরোহণ করিয়া মাল্টিপ্লেক্সে চলচ্চিত্র দেখেন এবং ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে শপিং করেন যাহা কোনো মতেই বিজ্ঞানসম্মত নহে। কারণ এই শিক্ষককুলের কতিপয় বিজ্ঞানসম্মত ধর্মটির অনুসারী। দীর্ঘ ছুটির ফাঁস লাগাইয়া উহাদিগকে কিঞ্চিৎ নাকানিচোবানি খাওয়াইতে হইবে। সুদীর্ঘ অবকাশ একদিকে উহাদের মানসিক অবসাদ বাড়াইয়া দিবে, অপরদিকে অন্যান্য পেশার মানুষ উহাদের প্রতি আরও বিরূপ হইয়া উঠিবে। প্রচলিত ধারণা এই যে উহারা বসিয়া বসিয়া মাহিনা পায়। পূজার ছুটি, গরমের ছুটি, অতি বর্ষণের ছুটি —ছুটি লাগিয়াই আছে। বিপুলাকার গ্রীষ্মাবকাশ এই মানসিকতায় ইন্ধন জোগাইবে। শিক্ষিতের প্রতি অশিক্ষিতের ক্রোধ বৃদ্ধি পাইবে। বলাই বাহুল্য ইহার ফলও উত্তম হইবে। শিক্ষিত, বুদ্ধিমান মানুষকে যত বেশি জনবিচ্ছিন্ন করিয়া দেওয়া যাইবে, রাজ্যের ততই মঙ্গল। পরিসংখ্যান বলিতেছে এই ত্যাঁদড় শিক্ষিত মনুষ্যরা কেহই মাননীয়াকে সমর্থন করেনা। করিলেও কতিপয়। এই সীমাহীন ঔদ্ধত্যের শাস্তি না দিলে উহাদের বাড় আরও বাড়িয়া যাইবে।

৪] এখানেই শেষ নয়। এই ছুটির আরও উপযোগিতা আছে। সুদীর্ঘ ছুটির প্রকোপে পড়িয়া অভিভাবককুল রাজ্য সরকারি বিদ্যালয় হইতে মুখ ফিরাইয়া লইবে। শহর, নগরাঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ই হয় উঠিয়া গিয়াছে নয় শিক্ষার্থীর অভাবে ধুঁকিতেছে। এই জাতীয় লম্বা ছুটি এই অনীহা কয়েকগুণ বাড়াইয়া দিবে। সংখ্যাগরু থুড়ি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়টির এমনিতেই ইংরাজি মাধ্যমে ঝোঁক। সরকারি বিদ্যালয় যত কমিবে তত কম শিক্ষক নিয়োগ করিতে হইবে। ছাত্র ছাত্রী কমিয়া গিয়াছে এই অজুহাতে বিদ্যালয় বন্ধ করা অনেক সহজ। ইহার পরেও যাহারা সরকারি বিদ্যালয়, অথবা বিনা খরচে পড়িতে চাহিবে তাহাদের জন্য মাদ্রাসা আছে। হিন্দু মুসলমান ভাই ভাই হইয়া একত্রে বিজ্ঞানের পাঠ গ্রহণ করিবে। ধর্মীয় ভেদাভেদ দূরীভূত হইবে।

বি.দ্রঃ যাহারা ইসলামকে বিজ্ঞান মনে করেননা, একটিমাত্র উদাহরণই তাঁহাদের সংশয় নিরসন করিবে। ক্যালেণ্ডারের কথাই ধরুন। বিশ্বের যাবতীয় ক্যালেণ্ডার সোলার অর্থাৎ সূর্যকে কেন্দ্র করিয়াই রচিত হইয়াছে। আন্তর্জাতিকভাবে অনুসৃত গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারটিও এর ব্যতিক্রম নয়। বিস্ময়ের কথা এই যে কেবলমাত্র ইসলামিক ক্যালেন্ডারটিই চন্দ্রকে কেন্দ্র করিয়া রচিত। সমস্ত ধর্ম, বিজ্ঞান যেখানে ব্যর্থ হইয়াছে, ইসলাম সেখানে চরম সাফল্য অর্জন করিয়াছে। কেন ? কিঞ্চিৎ ভাবিলেই বুঝিতে পারিবেন। সবাই যেখানে সূর্যকে সকল শক্তির আধার মনে করিয়া তাহাকেই অনুসরণ করিয়াছে। ইসলামই বিপরীত পথে হাঁটিয়া প্রমাণ করিয়াছে সূর্য নয়, চন্দ্র অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সূর্য দিনের বেলায় আলো দেয়। যখন আলোর কোনো দরকারই নাই। চন্দ্র রাতের বেলায়, যখন আলোর দরকার আছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here