নুসরত জাহান, জায়রা ওয়াসিম বিতর্ক — নারী কোন পথে?

1

Last Updated on

সপ্তাহান্তের সম্পাদকীয় লিখিতে বসিয়া দুইটি নারীর মুখ স্মরণে আসিতেছে –নুসরত জাহান এবং জায়রা ওয়াসিম। ইহাদিগের মধ্যে সাদৃশ্য যেরূপ, বৈসাদৃশ্যও তদ্রূপ। সাদৃশ্য এই যে ইহারা উভয়েই ইসলাম ধর্মাবলম্বী নারী এবং উভয়েই জনপ্রিয় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। তবে প্রথম নারীটির অপর একটি পরিচয় আছে, যাহা বর্তমান প্রক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নুসরত জাহান এই রাজ্যের শাসকদলের সহিত যুক্ত এবং বসিরহাট লোকসভার সম্মানীয়া সদস্যা। সচেতন নাগরিক মাত্রই অবগত আছেন কেন এই নারীযুগল এই মুহূর্তে সংবাদের উঠিয়া আসিয়াছেন। ধর্ম এবং পেশায় সাদৃশ্য থাকিলেও ইহারা কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী কারণেই বিতর্কের সৃষ্টি করিয়াছেন। নুসরত জাহান তাঁহার ধর্মের নিদান অগ্রাহ্য করিয়া একজন বিধর্মীকে [ইসলামে যাহাদের কাফের বলা হইয়াছে] বিবাহ করিয়াছেন। কেবল তাহাই নহে লোকসভার সদস্য হিসাবে বিধিবদ্ধ শপথ গ্রহণকালে তাঁহার কপালে উজ্জ্বল লোহিত বর্ণের সিঁদুর [যাহা বিবাহিতা হিন্দু নারীরাই ব্যবহার করিয়া থাকেন] পরিলক্ষিত হইয়াছে। তাঁহার আচার আচরণ, উচ্চারণ, অনুরণন, পোশাক আশাক সর্বত্রই এই হিন্দুয়ানির প্রতিফলন দ্বিধাহীন এবং নির্ভিকরূপেই সোচ্চার। বলাই বাহুল্য ইহাতে মৌলবাদীর দল ব্যাপক চটিয়াছে, এবং ইসলামি সমাজে এক প্রকার গেল গেল রব উঠিয়া গিয়াছে। নুসরত জাহানের এরূপ আচরণ ইসলাম কখনই সমর্থন করেনা। তিনি বিধর্মীকে বিবাহ করিয়া নিজেকে ধর্মচ্যুত করিয়াছেন ইত্যাদি ইত্যাদি ! কিন্তু কোনো ফল হয় নাই। এই মৌলবাদীকুলের ধিক্কার অথবা সমালোচনায় তিনি কর্ণপাত করেন নাই, বরং নিজের আচরণ এবং সিদ্ধান্তে অটল থাকিয়াছেন। এমনও বলিয়াছেন পরিধানের সঙ্গে ধর্ম বিশ্বাসের কোনো সম্পর্ক নাই। ফল যাহা হওয়ার কথা তাহাই হইয়াছে। মৌলবাদীকুল তাঁহার বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করিয়াছেন এবং সদম্ভে ঘোষণা করিয়াছেন এইরূপ ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়া নুসরত জাহান চরম ইসলামবিরুদ্ধ কাজ করিয়াছেন, অতএব তাঁহাকে সমাজচ্যুত করা হইল। একবিংশ শতাব্দীতেও চলিতে থাকা এহেন দেওবন্দী ফতোয়ার বিরুদ্ধে বেশ কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সোচ্চার হইয়াছেন । স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন নুসরত জাহান একজন সাবালিকা, সুতরাং তিনি কোন ধর্ম পালন করিবেন, কোন পরিধান ধারণ করিবেন সকলই তাঁহার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত এবং অভিরুচি। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে নুসরতের সমর্থনে যারা সোচ্চার হইয়াছেন, তাঁহারা সকলেই হিন্দু, অর্থাৎ কোনো বিশিষ্ট মুসলমান তাঁহার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই নাই। কেবল তাহাই নহে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী যিনি কুলা , ধুলা, চুলা এবং মূলা সকল বিষয়েই কিছু না কিছু বলিয়া থাকেন, চরম বিতর্ক সত্ত্বেও মুখে কুলুপ আঁটিয়াছেন। দুধ দেওয়া গরুরা কিসে খুশি হয়, কি কারণে চটিতে পারে, দরকারে লাথিও মারিতে পারে, তিনি উত্তমরূপেই জানেন। সদ্যজাত শিশুর ওজন দেড় হাজার কিলোগ্রামে পৌঁছাইয়া গেলেও দুধেল গরুকুলের ধর্মীয় ব্যাপার স্যাপারে এক মিলিগ্রাম সমালোচনাও চলিবেনা।
অপরদিকে দঙ্গল খ্যাতা জায়রা ওয়াসিম চলচ্চিত্র থেকে বিদায় গ্রহণ করবেন এই মর্মে ঘোষণা প্রদান করিয়াছেন। এই পেশাটি নাকি তাঁহার ধর্ম পালনের অন্তরায় হইয়া উঠিয়াছে। অর্থাৎ ইসলামি নারীর যেরূপ পর্দানসীন জীবন যাপন করা উচিত, তিনি সেই পথটিই বাছিয়া লইবেন। যদিও এরূপ প্রচারও বিদ্যমান যে তিনি স্বয়ং এই বিবৃতি প্রদান করেন নাই। তাঁহার ফেসবুক প্রোফাইলটি নাকি মৌলবাদীদের শিকার হইয়াছে। যদিও এবিষয়ে তিনি নীরব। তবে সত্য যাহাই হউক না ইহার পূর্বেও অজস্র ইসলাম ধর্মাবলম্বী নারী পেশাদারি জীবন ত্যাগ করিয়া পর্দানসীন জীবন বাছিয়া লইয়াছেন। ইসলাম ধর্মে এমন ভুরি ভুরি দৃষ্টান্ত বর্তমান।

বলাই বাহুল্য জায়রা ওয়াসিমের ক্ষেত্রে ইসলামি মৌলিবাদিরা কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নাই।ইহাই স্বাভাবিক। কারণ জন্মলগ্ন হইতেই এই ধর্মটি নারীকে পর্দানসীন হইবার উপদেশ প্রদান করিয়াছে। এখানেই বিষয়টির ইতি ঘটিলে এই দীর্ঘ আলোচনাটি আবশ্যক হইতনা। জায়রা ওয়াসিমের সিদ্ধান্ত ইসমামি মৌলবাদীরা কীরূপে গ্রহণ করিল সেবিষয়ে আমার মাথাব্যথা নাই। কারণ ইহা আবহমান কাল ধরিয়া চলিতেছে। কিন্তু জায়রা ওয়াসিমের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার প্রেসিডেন্ট স্বামী চক্রপাণি যাহা বলিয়াছেন তাহা রীতিমত চিন্তার। এই কারণেই আলোচনাটির সূত্রপাত। তিনি টুইট করিয়া যে চিন্তাভাবনার পরিচয় রাখিয়াছেন তাহা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি ঠিক কী বলিয়াছেন ? আসুন পড়া যাক– “Actress Zaira’s (Wasim) decision to withdraw from films because of religious beliefs is praiseworthy. Hindu actresses should also take inspiration from Zaira.”

অর্থাৎ ধর্মীয় কারণে জায়রা ওয়াসিমের চলচ্চিত্র অভিনয় থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত প্রশংসনীয়। হিন্দু অভিনেত্রীদের উচিত জায়রার কাছ থেকে এবিষয়ে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করা।

স্বামী চক্রপাণির বক্তব্যটি আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছে। বর্তমান আবহে এর গুরুত্ব অত্যন্ত অপরিসীম কারণ পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর সংস্পর্শে থাকিলে অপর জনগোষ্ঠীর অর্জিত অগ্রগতিগুলিও রসাতলে যায়। চক্রপাণির মহাশয়ের পর্যবেক্ষণ সেই বার্তাই বহন করিতেছে। কিন্তু ইহাই কী হিন্দু সংস্কৃতি ? যে সংস্কৃতি অপালা, ঘোষা, বিশ্ববারা, গার্গী, মৈত্রেয়ীর ন্যায় বিদুষীর জন্ম দিয়াছে, বেদান্ত উপনিষদ রচনার ক্ষেত্রেও পুরুষের সমকক্ষ হিসাবে সম্মান দিয়াছে, যে সংস্কৃতির বলে হিন্দু নারী যুগে যুগে স্বয়ম্বরা হইয়াছে সেই সংস্কৃতির এক প্রতিনিধির এহেন দৃষ্টিভঙ্গি? তিনিও ইসলামি মৌলবাদীদের মত কেবল নারীদেরই পর্দানসীন হইবার আহ্বান জানাইতেছেন। পুরুষেরা অভিনয় করিলে দোষ নাই, কেবল হিন্দু নারীরাই চলচ্চিত্র হইতে অবসর গ্রহণ করিবে ? বাহ ,ইহা না হইলে সভ্যতা ! কী অপরূপ অগ্রগতির পথে আমরা গমন করিতেছি !

কিন্তু সনাতন হিন্দু ধর্মেই পরিণতি এরূপ হইল কেন ? উপলব্ধি করিতে হইলে কিঞ্চিৎ গভীরে যাইতে হইবে। ইসলামি আগ্রাসনের পূর্বে যে ভারতবর্ষ বিদ্যমান ছিল সেই ভূখণ্ডের সহিত বর্তমান দেশটির প্রভূত পার্থক্য। কেবল কলেবরে নয়, আচার, আচরণ, মূল্যবোধ সকলই ইসলামি শাসনের প্রকোপে পড়িয়া হয় ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে, নয় বিকৃত রূপ গ্রহণ করিয়াছে। এই আব্রাহামিক ধর্মটির প্রতিক্রিয়া হিসাবেই এই কদাকার হিন্দু সমাজের জন্ম। ইতিহাস নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করিলেই বুঝিবেন এই পৃথিবীতে যত যুদ্ধ হইয়াছে, যত দেশ দখল হইয়াছে, হানাদার আক্রমণকারীরা নতুন নতুন এলাকা দখল করিয়াছে, তাদের মূল লক্ষই হল সেই জাতি, সম্প্রদায়ের আইডেন্টিটিকে হত্যা করা। তার অতীত, সংস্কৃতি, ধর্ম সব কিছুকে মাটির সহিত মিশাইয়া দেওয়া। কিন্তু কেন ? একটি দেশ দখল করাই যথেষ্ট। সেখানে তো বিজয়ীর শাসন প্রতিষ্ঠা হইয়াই গেল। তবে কেন সংস্কৃতি, ধর্ম নিয়ে টানাটানি ? ইহার উত্তরও খুব সরল । একটি জাতির ধর্ম সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার অর্থ সেই জাতিটিকেই নিশ্চিহ্ন করা। তাকে অনন্তকালের জন্য পরাজিত করা। সে যাহাতে আর কখনও মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে না পারে। এর ফলে আর বিদ্রোহের ভয় থাকেনা। অনন্তকাল ধরে সেই জাতিটিকে শাসন করা যায়। ইসলামি শাসকেরা সেটি অনেকাংশেই পারিয়াছিল তাই দীর্ঘ আটশ বৎসর রাজত্ব করা সম্ভব হইয়াছিল।
নিশ্চয় বোধগম্য হইতেছে বিচক্ষণ ইসলামি শাসকেরা কেন এই নাম এবং ধর্ম পরিবর্তনের উপর জোর দিয়াছিলেন। কেবল এদেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই তাঁরা এই দূরদর্শিতার পরিচয় রাখিয়াছেন। এদেশের অজস্র নগর, জনপদের নাম তাঁহারা বদলে দিয়েছেন। কেবল নগর নয়, রাস্তা, প্রতিষ্ঠান, যেখানে যতটা সম্ভব হইয়াছে। কেবল ইসলামি আক্রমণকারী নয়। যে কোনো আধিপত্যকারী হানাদারদের লক্ষ্যই হইল ভূমি এবং নারী। ভূমির নূতন নামকরণ করিয়া তার আইডেনটিটিকে হত্যা করা, নারীকে ধর্ষণ করিয়া তাহার গর্ভে নিজেদের আইডেন্টিটির বীজ রোপন করা। হ্যাঁ এই উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশের অসংখ্য হিন্দু নারীকে খান সেনারা ধর্ষণ করিয়াছিল। এই সকল ধর্ষণ নিছক যৌন আনন্দ লাভ করা হয়, একটি জাতির মনোবলকে চূর্ণ বিচূর্ণ করিয়া বিজাতীয় আধিপত্য স্থাপন করা। নুসরত জাহান মুসলিম থেকে হিন্দু হইলে ইসলামি মৌলবাদীরা প্রমাদ গোনে, কিন্তু সুমন চট্টোপাধ্যায় কবীর সুমনে রূপান্তরিত হইলে উহারা যারপরনাই আনন্দিত হয়। নুসরত জাহান সিঁদুর না পরিয়া যদি তাঁহার স্বামীকে ইসলাম গ্রহণে সম্মত করাইতে পারিত তাহাই হইলে তিনি এই মৌলবাদীদের প্রশংসার পাত্র হইয়া উঠিতেন। ইহার কারণ যে সংখ্যাবৃদ্ধি সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নাই। হিন্দুরা মুসলিমে পরিণত হইলে ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বাড়িতে থাকে, আর এই আধিপত্যের ফলে দেশ, ভূখণ্ড, গণতন্ত্র সকলই কব্জা করা যায়। ইহার বিপরীত কিছু ঘটিলেই উহারা রে রে করিয়া ছুটিয়া আসেন। অথচ এই পুরুষ শাসিত সমাজে বিবাহের পর সকল নারীই পুরুষের ধর্মটি গ্রহণ করেন। সন্তানের পরিচয়টিও পিতার ধর্ম অনুসারে হয়। কোনো মুসলমান যুবক হিন্দু নারীকে বিবাহ করিলেও একই নিয়ম অনুসৃত হয়। সেই হিন্দু নারীটির নাম পর্যন্ত বদলাইয়া ফেলা হয়। সারা জীবন বোরখা, হিজাবের অন্তরালেই কাটিয়া যায়। সেক্ষেত্রে ইসলামি মৌলবাদীরা অমৃত পানের তৃপ্তি লাভ করে। কিন্তু বিধর্মী পুরুষ মুসলমান নারীকে বিবাহ করিলেই উহারা গেল গেল রব তোলে। উহাদের চাপে পড়িয়া কত হিন্দু যুবককে যে মুসলমান হইতে হইয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। ইসলামি সমাজ নারীকে বিধর্মী বিবাহের অনুমতি দেয় নাই। সেক্ষেত্রে পাত্রটিকেও ইসলাম গ্রহণ করিতে হইবে এমনই নিদান। অপরপক্ষে মুসলমান যুবকেরা অনায়াসেই হিন্দু নারীকে বিবাহ করিতে পারে। এব্যাপারে কোনো বাধা নাই। বরং প্রশংসা এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা আছে। কারণ ইহাতে সেই বিধর্মী নারীটিও মুসলমানি হইয়া যাইবে। সন্তান সন্ততিও মুসলমান হইবে। ফলে হিন্দুদের সংখ্যা কমিবে, মুসলমানের সংখ্যা বাড়িবে। নুসরত জাহানের সিদ্ধান্ত ইহার বিপরীত। ইহাতে হিন্দুর সংখ্যাই বাড়িবে। সেই কারণেই দেওবন্দি মৌলবাদীরা খেপিয়া গিয়াছে। যেন তেন প্রকারে সংখ্যাবৃদ্ধিই উহাদের উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যটি এতই প্রকট এবং গুরুত্বপূর্ণ যে একুশ শতকেও উহারা জন্ম নিয়ন্ত্রণকে হারাম বলিয়া বর্জন করিতেছে। ফলশ্রুতি হিসাবে সমগ্র বিশ্বেই ব্যাপক ভাবে মুসলমানের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিতেছে।
কিন্তু জায়রা ওয়াসিমকে সমর্থন করিয়া স্বামী চক্রপাণি এরূপ বক্তব্য রাখিলেন কেন ? সনাতন হিন্দু সংস্কৃতি তো এরূপ পর্দানসীন নারীর ওকালতি করে নাই ! ইহার উত্তরেও ইসলামি আগ্রাসনকেই দায়ি করিতে হইবে। আকস্মিক, অভাবনীয়, বর্বর এবং চরম পৈশাচিক এই বহিঃশত্রুর আক্রমণে দিশেহারা হিন্দু সমাজের প্রথম প্রতিক্রিয়াটিই ছিল বিস্ময় এবং আতংকের। কারণ এজাতীয় নৃশংসতা তারা আগে কখনও দেখে নাই। সনাতন ধর্মের উদারতায় সিক্ত আর্যসমাজ ভাবিল এও কি সত্য ? বসুধৈব কুটুম্বকম-এর মন্ত্রে বিশ্বাস রাখা এই জনগোষ্ঠী প্রথমে বিশ্বাসই করিতে পারে নাই, যা ঘটিতেছে তা সত্যিই ঘটিতেছে কিনা। তাহারা এই প্রথম কোনো আব্রাহামিক ধর্মের সংস্পর্শে আসিল। এই ইসলামিক হানাদারেরা পূর্ববর্তী আক্রমণকারী যেমন গ্রিক, শক, কুষান ইত্যাদি হইতে সম্পূর্ণ পৃথক। তাহারা এমন নৃশংস ছিলনা। কখনই ধর্মান্তরের উদ্দেশ্যে বলপ্রয়োগ করে নাই। প্রত্যেকেই কালক্রমে এদেশের জনতার সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে । কিন্তু ইসলাম কেবল ভূমি দখল করিয়াই ক্ষান্ত হইলনা। তার লক্ষ্য ধর্ম, আইডেন্টিটি। হিন্দু নামক পৌত্তলিক তাহাদের চোখে কাফের, ঘৃণার যোগ্য। দিশেহারা হিন্দু সমাজ উপলব্ধি করিলল নিছক প্রাণ বাঁচাইলেই চলবেনা, বুক চিতাইয়া শত্রুর মোকাবিলাও যথেষ্ট নহে। ধর্ম রক্ষায় নামিতে হইবে। নহিলে হিন্দু ধর্ম বলিয়া এদেশে কিছুই থাকিবেনা। কিন্তু কিভাবে ? বেদ উপনিষদের এই মহান সংস্কৃতিতে তো এই জাতীয় শত্রুর মোকাবিলা করার পন্থা নির্দেশ নাই। আঘাত, আতঙ্ক এবং বিস্ময়ের প্রাথমিক ঘোরটি কাটতেই সর্বাগ্রে মনে হইল নিছক ভূমি নয়, এই যবনদের কবল হইতে নারীদেরও রক্ষা করিতে হইবে। কারণ ভূমির মত তাহারাও একটি জনগোষ্ঠীর আইডেন্টিটি ধরিয়া রাখে। সেও উৎপাদন করে। বংশবিস্তারের একমাত্র অবলম্বন। তাহারাও যদি যবনদের অধিকারে চলিয়া যায়, তবে তাহাদের সন্তানসন্ততিও যবনের পরিচয়ে পরিচিত হইবে। বিদ্যার অধিকার, বিদুষী হওয়ার অধিকার, স্বয়ংবরা হওয়ার অধিকার ভোগ করা আর্য নারী প্রায় রাতারাতি পর্দানসিন, অন্তঃপুরবাসিনী হইয়া গেল। এছাড়া আত্মরক্ষার কোনো উপায়ও ছিলনা। আক্রান্ত শামুক যেরূপে নিজের ভেতর গুটাইয়া যায়, আঘাতপ্রাপ্ত কচ্ছপটি যেরূপে নিরাপত্তা খোঁজে আমাদের পূর্বজরা আত্মরক্ষার মরিয়া চেষ্টা হিসাবে এই পন্থাই বাছিয়া লহিলেন। কিন্তু এ তো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া—অনেকটা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মত। দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা নহে। Regimentation ছাড়া আর্যসমাজের টিকিয়া থাকা অসম্ভব। হ্যাঁ এই রেজিমেন্টেশনের সন্ধানেই হিন্দু সমাজ হাতড়াইতে শুরু করিল—আছে কি এমন কোনো অবলম্বন ? যাহার উপর ভর করিয়া দিশেহারা আর্যসন্ততিদের অস্তিত্ত্বরক্ষা সম্ভব ? এ যুদ্ধ কেবল বাহির হইতে লড়া অসম্ভব। ভেতরেও কঠোর অনুশাসন চাই। সনাতনী, পেগান বহুত্ত্ববাদে এর সমাধান নাই। শ্রুতিতে [যাকে দেব নিঃসৃত বাণী বলা হয়, যেমন বেদ, উপনিষদ] আর কাজ চলিবেনা, এবার স্মৃতি [মনুষ্যরচিত বিধান, আইন] চাই।
পাওয়াও গেল। মনু নামক এক মহা ঋষি ! তাঁহারই রচনা মনুস্মৃতি নামক এক আলোকসামান্য বিধি !কে এই মনু ? কবেই বা তিনি এই স্মৃতিটি রচনা করিলেন ? মনুস্মৃতির রচনাকাল লইয়া আজও নিশ্চিত করিয়া কিছু বলা যায়না। বলা হয় আনুমানিক ১৩০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি রচিত হয়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রকাশ এটি এক সঙ্গে, একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে লেখা হয়নি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা স্মৃতিগুলিকে ২০০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ একটি পূর্ণ সংকলনের অবয়ব দেওয়া হয়। বলাই বাহুল্য এই পর্যবেক্ষণটিও বিতর্কের উর্ধ্বে নয়। মনু কে ছিলেন, তাঁর পরিচয়ই বা কি এই আলোচনাটি তার উপরও কেন্দ্রীভূত নয়। মোদ্দা কথা হইল, মনুস্মৃতি লইয়া সমসাময়িক আর্যসমাজ মাথা ঘামায় নাই। কারণ এটি বিধি হিসেবেই রচিত হইয়াছিল—commandment অর্থাৎ অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় নির্দেশিকা হিসেবে নয়। তাই বৃহত্তর হিন্দু সমাজ ইহার কোনো খোঁজই রাখে নাই। কিন্তু ইসলামিক আগ্রাসনের আবহে হিন্দু সমাজকে regimented অর্থাৎ কঠোর এবং শক্তিশালী করিয়া গড়ে তুলিতে এই মনস্মৃতিই পরিত্রাতা হিসেবে অবতীর্ণ হইল। তবে রাতারাতি নিশ্চয় নয়। একটি ধীর,ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এমন ভাবাও ভুল হইবে যে এই স্মৃতিটিকে হুবহু বা আক্ষরিকভাবে আপামর আর্যসমাজ মানিয়া চলা শুরু করিল। তবে এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই এটিকে ভিত্তি করিয়া হিন্দু সমাজকে নিয়ন্ত্রণের কাজটি ব্রাহ্মণরাই নিজেদের কাঁধে তু্লিয়া লহিলেন। সকলই ঠিকঠাক অনুসরণ করা হইল, কোনো বিচ্যুতি ঘটলনা, এমন দাবী পাগলেও করিবেনা। কিন্তু দিশেহারা হিন্দু সমাজকে একটি অনুশাসনে বাঁধিয়া ফেলিতে, সাংসারিক জীবন তথা অপত্য উৎপাদনের আবশ্যকতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে মনুস্মৃতি একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করিল সন্দেহ নেই।

বলাই বাহুল্য মনুস্মৃতি নির্ভর ( যদিও এই গ্রন্থের সকল নীতি নিয়ম কার্যকরী হয়েছিল বলা যায়না) হিন্দু সমাজ এরূপেই ইসলামি আগ্রাসনের মোকাবিলা করিবার কথা ভাবিল এবং সনাতন বৈদিক সংস্কৃতি হইতে বহুদূর গমন করিল। নারীকে শস্য ক্ষেত্র হিসাবে দেখা আরম্ভ হইল। “পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা” ইত্যাদি প্রবচনের মাধ্যমে নারীকে অন্তঃপুরবাসিনী জীবে পরিণত করা হইল। তাহার কর্মের অধিকার, শিক্ষার অধিকার, জীবিকার অধিকার, আত্মপরিচয়ের অধিকার খর্বিত অথবা নির্মূল করা হইল। নেতিবাচক ফল হিসাবে নারীরা চরম অন্যায়, অত্যাচারের শিকার হইলেন, পুরুষদের তুলনায় সর্বক্ষেত্রে পিছাইয়া পড়িলেন। এক কথায় হিন্দু নারীর অবস্থা ইসলামী নারীর মত হইল। আত্মপরিচয়হীন ভোগ্যবস্তু মাত্র। কিন্তু ইতিবাচক কী কিছুই ঘটিলনা? আলবাত ঘটিল। ইসলামি আগ্রাসনে, অত্যাচারে নিহত হওয়া কোটি কোটি হিন্দুর শূন্যস্থান পূরণ মনুস্মৃতির অবলম্বন ব্যতীত অসম্ভব ছিল। ইসলামি হানাদারকুল একদিকে যেমন অসংখ্যা হিন্দু নিধন করিয়াছে, মনুস্মৃতি নির্ভর হিন্দু সমাজ তখন সম সংখ্যায় সন্তানসন্ততি উৎপন্ন করিয়া সেই ক্ষতি সামাল দিয়াছে। তাহা না হইলে এদেশে অনেক আগেই মুসলমানেরা সংখ্যাগুরু হইয়া উঢ়িত। একদিকে ধর্মান্তরকরণ, অপরদিকে হত্যা এই দুইয়ের মাধ্যমে হিন্দু সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাইতেছিল। এক্ষেত্রে মনুস্মৃতির অবদান অস্বীকার করা যাইবেনা।

রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র যে হিন্দু সমাজকে পাইলেন, তাহা সনাতন হিন্দু সমাজ নহে, মনুস্মৃতি আশ্রিত হিন্দু সমাজ, যাহা ইসলামের মোকাবিলায় এই ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করিয়াছিল। জহরব্রত, সতীদাহের ন্যায় কুপ্রথার অনুশীলন সনাতন হিন্দু সমাজে ছিলনা। ইসলামি আগ্রাসনের বিপরীতে আত্মরক্ষার ঢাল হিসাবেই ইহা ব্যবহৃত হইত। সেই কারণেই রামমোহন, বিদ্যাসাগরকে পাশ্চাত্যের আইন কানুনের উদাহরণ টানিয়া এই কুপ্রথাগুলি বন্ধ করিতে হয় নাই। শাস্ত্র দেখাইয়াই প্রমাণ করা সম্ভব হইয়াছিল যে সনাতন হিন্দু ধর্মে এই সকল কুপ্রথার অস্তিত্বই ছিলনা। অর্থাৎ হিন্দু সমাজকে পাশ্চাত্যের আধুনিকতায় নিজের মুখ খুঁজিতে হয় নাই। এই মানবিকতা, আধুনিকতা পূর্ব হইতেই বিদ্যমান ছিল। সহস্র বৎসরের ইসলামি শাসনের মোকাবিলা করিতে গিয়া হিন্দু সমাজ এই সকল হারাইয়া ফেলিয়াছিল মাত্র। ইহা বলাই সঠিক হইবে যে ইহাদের নেতৃত্বে হিন্দুসমাজ হারানো মণিমাণিক্য খুঁজিয়া পাইল, পাশ্চাত্যের অনুকরণের দরকারই পড়িলনা৷

কিন্তু একুশ শতকে আসিয়া, যখন হিন্দু নারীরা অনেকাংশে আগাইয়া গিয়াছেন, পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেছেন, প্লেন, ট্রেন চালাইতেছেন,সেই মুহূর্তে হিন্দু সমাজে এক নেতা স্বামী চক্রপাণি মহাশয় কেন এরূপ মন্তব্য করিলেন? কেন বলিলেন জায়রা ওয়াসিমকে অনুসরণ করিয়া হিন্দু চলচ্চিত্র অভিনেত্রীরাও যেন এই পেশা ছাড়িয়া দেয়? ইহা কোন মানসিকতার প্রকাশ? চক্রপাণি মহাশয়কে যথেচ্ছ গালিগালাজ করিতেই পারেন। কিন্তু গালাগালি দেওয়া সম্পন্ন হইলে কিঞ্চিৎ গভীরে প্রবেশ করিবার অনুরোধ করিব। ভাবিতে বলিব কেন এই হিন্দু নেতারা মাঝেমধ্যেই এরূপ বিজাতীয় মন্তব্য করিয়া থাকেন। হিন্দু নেতা নেত্রী দ্বারা উচ্চারিত এরূপ আর একটি পর্যবেক্ষণ আছে — প্রতিটি হিন্দু নারীকে প্রচুর সন্তানসন্ততির জন্ম দিতে হইবে৷ অর্থাৎ হিন্দুর সংখ্যা বাড়াইতে হইবে। একুশ শতকে দাঁড়াইয়াও কেন এরূপ আহ্বান?

ইহার উত্তরটিও সরল। রামমোহন, বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে হিন্দু সমাজ পুনরায় মানবিক হইল, নারী শিক্ষার পুনঃ সূত্রপাত ঘটিল, নারীরা অগ্রগামী হইলেন, জীবন এবং জীবিকা বাছিয়া লইলেন। ফল কী দাঁড়াইল? নারীশিক্ষার বিস্তার, নারী স্বাধীনতার বিস্তারের পর যাহা ঘটে তাহাই ঘটিল। কী ঘটিল? নারীরা আর আগের মত পর্যাপ্ত সন্তান উৎপাদন করিতে চাহিলনা। তাদাদের কাছে আত্মপরিচয়, আত্মপ্রতিষ্ঠা, জীবিকা ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিল। সমাজ অনেক সমৃদ্ধ হইল, আমরা অনেক প্রতিভাবান নারীর অবদান গ্রহণ করিলাম, কিন্তু বিপরীতে আর একটি নেতিবাচক প্রক্রিয়া আরম্ভ হইল। হিন্দুর সংখ্যা হ্রাস পাইতে লাগিল। বিশেষত শিক্ষিত হিন্দু পরিবারগুলিতে এই চিত্র ভয়াবহ আকার ধারণ করিল। কোনো দম্পতি একটির বেশি সন্তান গ্রহণ করিলনা। নিঃসন্তান দম্পতির সংখ্যাও হু হু করিয়া বাড়িতে থাকিল। পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু বাঙালির বৃদ্ধি এখন নেতিবাচক মাত্রায় পৌঁছাইয়া গিয়াছে। হিন্দু নারী যত শিক্ষিত হইতেছে, পেশাদার হইতেছে জনসংখ্যা তত কমিয়া যাইতেছে। এই চিত্র কেবল হিন্দু নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, বিশ্বের সর্বত্রই এই একই চিত্র। ইউরোপের অবস্থা তো ভয়াবহ৷ বিবাহের পরিবর্তে সেখানে লিভ ইন – এর রমরমা। চরম স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া নারীকুল সন্তান গ্রহণে কোনো আগ্রহ দেখায় না। তাহাদের নিকট ভোগ এবং কেরিয়ার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পুরুষের অবস্থাও অনুরূপ। নারীদের অগ্রগতিকে সমর্থন করিয়া তাহারাও এই বন্দোবস্ত মানিয়া লইয়াছে। ফলতঃ ইউরোপে শাদা চামড়ার স্থানীয় অধিবাসী বিরল হইতে হইতে বিরলতর হইতেছে৷

খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ সকল সম্প্রদায়ই সময়ের সহিত তাল মিলাইয়া চলিলেও ইসলামি সমাজ প্রায় একই অবস্থানে দাঁড়াইয়া আছে। মুসলমান নারী এখনও পর্দানসিন, অন্তঃপুরবাসিনী! শিক্ষা, জীবিকায় উহাদের অধিকার এখনও অধরা।উহারা সন্তান উৎপাদনের শস্যক্ষেত হিসাবেই ব্যবহৃত হইতেছে। ইহার ফলে সমগ্র বিশ্বেই মুসলমান জনসংখ্যা হু হু করিয়া বাড়িতেছে। একটি মুসলমান নারীর সন্তান ধারণের হার অন্যান্য যে কোনো ধর্মের তুলনায় অনেক বেশি তো বটেই, কখনও দ্বিগুণ! ইহার ফলে অন্যান্য সম্প্রদায়গুলি প্রমাদ গুনিতেছে। ইউরোপীয়রা নিজেদের দেশেই বিপন্ন বোধ করিতেছে। কারণ মুসলমান শরণার্থীর সংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাইতেছে, সমগ্র ইউরোপ একদিন ইসলামের দখলে যাইবে৷

স্বামী চক্রপাণি হইতে আরম্ভ করিয়া স্বাধ্বী প্রজ্ঞা এমন কি স্বামী বিবেকানন্দ, বীর সাভারকরও নারী সম্পর্কে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ রাখিয়াছেন, যাহা আধুনিক সভ্যতার পরিপন্থী মনে হইতে পারে। কিন্তু একটু ভাবিলেই বুঝিবেন ইহাদের এই পর্যবেক্ষণগুলি আসলে অসহায়তার ফসল। স্বদেশেই হিন্দুরা সংখ্যালঘু হইয়া যাইবে, এই ভাবনা যদি দিবারাত্র আপনাকে তাড়িত করে, নারীদের প্রতি এই জাতীয় উপদেশ মাথায় আসিতে বাধ্য৷ তাই বিবেকানন্দকেও সীতা, সাবিত্রী,দময়ন্তীর মত পৌরাণিক উদাহরণ টানিতে হয়। মৈত্রেয়ী, গার্গি, ঘোষা, বিশ্ববারাদের মত ঐতিহাসিক নারীরা অনুকরণীয় থাকেননা। কারণ পতিব্রতা না হইলে কোনো নারীই একাধিক সন্তানগ্রহণে আগ্রহী হইবেন না।

তবে কী দাঁড়াইল? নারী শিক্ষা, নারী অধিকারের মন্ত্রে সমাজ অগ্রবর্তী হইলে সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়৷ কিন্তু ইহাও সত্য যে নারী শিক্ষা, নারী অধিকার মানিয়া লইলে সেই জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘুতে ( ইসলামের সাপেক্ষে) পরিণত হইতে বাধ্য৷ অর্থাৎ নিজের দেশে পরাধীন। কিন্তু একুশ শতকে দাঁড়াইয়া হিন্দু নারীকে পুনরায় অন্তঃপুরবাসিনী করা সম্ভব? সম্ভব হইলেও কি তাহা উচিত হইবে? অবশ্যই নহে৷ সেক্ষেত্রে একটিই পরিণতি — হিন্দু সম্প্রদায় অবধারিতভাবে সংখ্যালঘু হইয়া উঠিবে এবং সমগ্র দেশটিই ইসলামের অধীনে আসিবে৷ জনসংখ্যা যে কত গুরুত্বপূর্ণ তাহা নুসরত, জায়রার উদাহরণ হইতেই স্পষ্ট। নুসরত নিন্দিত হন কারণ তিনি মুসলমান জনসংখ্যা হ্রাস করেন, জায়রা প্রশংসিত হন কারণ তিনি ইসলামি জনসংখ্যা বৃদ্ধি করার পথে অগ্রসর হন। হিন্দু সমাজও কি সেই পথে হাঁটিবে? অবশ্যই নয়। কিন্তু মুসলমান সম্প্রদায়ের সহিত বসবাস করিলে প্রতিক্রিয়া হিসাবে অন্যান্য জনগোষ্ঠীগুলিও পিছাইয়া যায়। এদেশে আবার সেই প্রক্রিয়াই আরম্ভ হইয়াছে। আল্লা হো আকবরের বিপরীতে জয় শ্রীরাম ক্রমশঃ শক্তিশালী হইয়া উঠিতেছে। ইসলামের অনুকরণে হিন্দু নারীর প্রতিও অধিক সন্তান গ্রহণের আর্জি কানে আসিতেছে। স্বামী চক্রপাণি এমনই এক কন্ঠস্বর।

আগামীতে কি ঘটিবে? কী ঘটিতে পারে? ভবিষ্যৎ যে অগ্নিগর্ভ সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। মুসলমান জনসংখ্যায় লাগাম না টানিলে, এবিষয়ে রাষ্ট্র উদ্যোগী না হইলে হিন্দু সমাজও যে পিছাইয়া যাবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই৷ কঠোর জন্মনিয়ন্ত্রণ বিধি ( বিশেষত ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের জন্য) এদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কতটা কার্যকর হইবে তাহা বিশেষজ্ঞরাই ভাবুন। তবে মুসলমান জনসংখ্যায় লাগাম টানিতে না পারিলে ( ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ এটি স্বেচ্ছায় মানিবেন বলিয়া মনে হয়না) আগামীতে দুটি সম্ভাবনা। ১) হিন্দুরা স্বদেশেই সংখ্যালঘু হইয়া উঠিবেন এবং গাজোয়াতুল হিন্দ- এর পথ প্রশস্ত হইবে। ২) অথবা আত্মরক্ষার জন্য আবার হিন্দু সমাজ পিছাইতে থাকিবে৷ নারীদের স্বাধীনতা হরণ করিবে, ইসলামের অনুকরণ করিয়াই ইসলামকে আটকাইবার প্রয়াস করিবে। আগামীই জানে হিন্দু সমাজ কোন পথটি বাছিয়া লইবে।

1 COMMENT

  1. প্রাসঙ্গিক। কিন্তু এত গুরুচন্ডালী দোষ করার চেয়ে চলিত ভাষায় লিখলেই ভালো করতেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here