নারী প্রগতি মানেই কি ক্রমহ্রাসমান জন্মহার এবং অস্তিত্বের বিপন্নতা ?

1

Last Updated on

২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ শে অগাস্ট টাইমস অফ ইণ্ডিয়া নামক প্রথম শ্রেণির দৈনিকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরাজ্যে হিন্দু এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের বৃদ্ধির হারের উপর কেন্দ্রীভূত প্রতিবেদনটিতে গবেষণাধর্মী কিছু পরিসংখ্যান স্থান পেয়েছে যা একাধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অপরদিকে যথেষ্ট আশংকাজনক। মূল আলোচনায় প্রবেশ করার আগে প্রকাশিত তথ্যে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। ২০০১—২০১১ এই দশ বছরে এদেশে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২৪% । ইকোনোমিক টাইমস-এর রিপোর্টও বলছে এই সময়ে সমগ্র দেশেই হিন্দুর তুলনায় মুসলমান জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি কেবল চমকপ্রদই নয়, তাৎপর্যপূর্ণও বটে। রাজ্যের তিনটি জেলা—মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরে মুসলিম জনসংখ্যা হিন্দু জনসংখ্যাকে ছাপিয়ে গিয়েছে। মুর্শিদাবাদে মুসলিম জনসংখ্যা যেখানে ৪৭ লক্ষ, হিন্দুর সংখ্যা মাত্র ২৩ লক্ষ। শতকরা হিসাবে মুসলিম ৬৬.২৭%, হিন্দু ৩৩.২১% ! শতকরা হিসেবে মালদাতে মুসলমানের সংখ্যা ৫১.২৭%, হিন্দু ৪৭ %, উত্তর দিনাজপুরে হিন্দু ৪৯.৩১%, মুসলিম ৪৯.৯২% [পরস্পরের সঙ্গে লাগোয়া এই তিনটি জেলাতে মুসলমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি একটি পরিকল্পিত প্যাটার্নের ইঙ্গিত দেয়। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র যেহেতু বাংলাদেশ ! জঙ্গি আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা [যা অতি সম্প্রতি ফিলিপাইনসের বাসাংমোরোতে দেখা গিয়েছে, এবং সফলও হয়েছে] কেবল সময়ের অপেক্ষা] এটি ভিন্ন একটি আলোচনার বিষয় হতে পারে। এই একই সময়ে সমগ্র দেশে হিন্দু জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিন্তু নেতিবাচক। সমীক্ষা বলছে ভারতে এই হ্রাসের হার ০.৭% ! কিন্তু এই রাজ্যে এটি ১.৯৪% অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটিতে প্রায় তিন গুণ হারে হিন্দু জনসংখ্যা কমেছে। এবার আসি মুসলমান জনসংখ্যার সামগ্রিক বৃদ্ধির হারে। সামগ্রিক জনসংখ্যার হিসেবে এদেশে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ০.৮% , কিন্তু এরাজ্যে বেড়েছে ১.৯৪% অর্থাৎ দ্বিগুণের বেশি !

ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু নয়। ৩.১ প্রতি নারী হারে মুসলমান জনসংখ্যা সমগ্র বিশ্ব জুড়েই বেড়ে চলেছে যেখানে ২.১ প্রতি নারী গড় থাকলেই একটি জনগোষ্ঠী স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ২রা এপ্রিল পিউ রিসার্চ সেন্টার একটি জনসংখ্যা গবেষণাপত্র তথা পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেখানে ২০১০ থেকে ২০৫০ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের বৃদ্ধির হার কেমন হতে পারে বা হতে চলেছে সে বিষয়েও একটি বিশদ রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে সেটিও এক ঝলক দেখে নেওয়া যেতে পারে। কী বলা হচ্ছে সেখানে ?

• বর্তমান বৃদ্ধির প্রবণতা বজায় থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ মুসলমানের সংখ্যা খ্রিষ্টানদের সমান হয়ে যাবে।

• ইউরোপের জন সংখ্যার ১০%-ই ইসলাম ধর্মাবলম্বী হবেন।

• ভারতের মুসলিম জনতার সংখ্যা ইন্দোনেশিয়াকেও ছাপিয়ে যাবে। এই দেশটিতেই বর্তমানে সর্বাধিক সংখ্যায় ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ বাস করেন।

• মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানের সংখ্যা ইহুদিদের ছাপিয়ে যাবে এবং ইসলাম দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। বর্তমানে সেদেশে খ্রিষ্টানদের পরেই ইহুদিদের স্থান।

• নাইজেরিয়া ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সেখানে মুসলমান জনসংখ্যা ৪৯% [২০১০ সালের হিসেব] থেকে বেড়ে ১৯৫০ সালে ৫৯% ছুঁয়ে ফেলবে।

• জনসংখ্যার গড় বয়সের হিসেবটিও ভাবনার উদ্রেক করে। ২০১০ সালের হিসেব অনুযায়ী বিশ্ব জনসংখ্যার ১১% মানুষ ষাট বছরের উর্ধ্বে, কিন্তু মুসলিমদের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৭% ! অর্থাৎ ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে কমবয়সীর [কিশোর, যুবক, শিশু] সংখ্যা অনেক বেশি। কর্মক্ষমতার নিরিখে যা যথেষ্ট ইতিবাচক।

• ২০১০ থেকে ২০৫০ এই চল্লিশ বছরে সমগ্র বিশ্বের জনসংখ্যা বাড়বে ৩৫% অর্থাৎ ৯৩০ কোটি ছুঁয়ে ফেলবে। কিন্তু এই একই সময়ে মুসলমান জন সংখ্যা বাড়বে ৭৩% ! অর্থাৎ অন্যান্য ধর্মের সামগ্রিক বৃদ্ধির দ্বিগুণেরও বেশি ! মুসলিম জনসংখ্যা কিভাবে এত বাড়ছে ! বিশ্ব গড় ৩.১ প্রতি নারী হলেও আফ্রিকায় এটি ৫.৬ প্রতি নারী, পাকিস্তানে ৩.৮ ! হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন এই বৃদ্ধির একমাত্র কারণ উচ্চ জন্মহার। একসময় ধর্মান্তর মুসলমান জন সংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে বড় ভূমিকা নিলেও বর্তমানে এটির অবদান প্রায় শূন্য। কারণ এখন ইসলাম গ্রহণ করার মানুষ যেমন আছে, ইসলাম ত্যাগ করছেন এমন মানুষও আছে। এক্স মুসলিমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। অতিরিক্ত জন্মহারের পেছনে যে ধর্মীয় মানসিকতাই বড় ভূমিকা নিয়েছে তা বলাই বাহুল্য। মুসলমান সম্প্রদায়ের সিংহ ভাগ নারী পুরুষ এখনও জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে। এবিষয়ে রোহিঙ্গা নারীদের উগ্র মনোভাব সম্প্রতি শিরোনামে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য এন জি ও-র বিতরিত বিভিন্ন জন্ম নিরোধক পন্থা [যেমন পিল, কন্ডোম ইত্যাদি] তারা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন এমনটাই খবর। বিশিষ্ট মানবতাবাদী অধ্যাপক, লেখক এবং গবেষক পল কুর্তজ মহাশয় ভারতীয় মুসলমানদের ক্ষেত্রে [এঁকে ফাদার অফ সেকুলার হিউম্যানিজম বলা হয়] একটি মূল্যবান পর্যবেক্ষণ রেখেছেন। তিনি বলছেন এদেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ আধুনিক জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহারে চরম অনীহা প্রকাশ করে থাকে, যা অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় তীব্রতর।

কিন্তু হিন্দু জন সংখ্যা কমছে কেন ? বিশেষত এই রাজ্য যেখানে সমগ্র দেশের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হারে হিন্দু জন সংখ্যা অর্থাৎ হিন্দু বাঙালির জন সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে ! কেন ? এই কারণ অনুসন্ধানই এই আলোচনার প্রতিপাদ্য বিষয় । যদিও নিছক হিন্দু নয়, ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাদ দিয়ে অন্যান্য সমস্ত সম্প্রদায়ের জন্মহারই ক্রমাগত নিম্নমুখী। কিন্তু কেন ? এই সার্বিক প্রবনতাটির উপর আলোকপাত করার পর হিন্দু বাঙালির ক্ষেত্রেও পৃথক আলোচনা রাখব। জন্মহার বৃদ্ধি বা হ্রাসের প্রসঙ্গ উঠলে প্রথমেই আর্থিক সমৃদ্ধি বা আয়ের বিষয়টি মাথায় আসে। এই ভাবনাকে নিছক বাম মানসিকতা বলে উড়িয়েও দেওয়া যায়না। কারণ সন্তান প্রতিপালনে পারিবারিক আয় তথা উপার্জনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দরিদ্র পিতামাতা নিশ্চয় একাধিক সন্তান জন্ম দিতে চাইবেননা। কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসছে।আর্থিক ক্ষমতা, পারিবারিক আয়, মাথা পিছু উপার্জন, ইংরেজি পরিভাষায় যাকে per capita income বলা হয়ে থাকে, সব কিছুর নিরিখেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের অবস্থা অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে খারাপ। পৃথিবীর সর্বত্রই এই এক চিত্র। অর্থাৎ ইহুদি, খ্রিস্টান, হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ ইত্যাদি যে কোনো সম্প্রদায়ের তুলনায় মুসলমান সমাজ আর্থিকভাবে পিছিয়ে আছে। বিরল ব্যতিক্রম হিসাবে কতিপয় তেল উৎপাদনকারী দেশ। কিন্তু সেসব দেশে বরং মুসলমানদের জন্মহার অপেক্ষাকৃতভাবে কম। যেমন সৌদি আরব, ইরান, সিরিয়া ইত্যাদি দেশের নারীদের fertility rate নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ ইত্যাদি দেশের তুলনায় অনেকটাই কম। অর্থাৎ পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের উপর বিষয়টি নির্ভর করছেনা। অন্তত মুসলমানদের ক্ষেত্রে নয়। তবে অন্যান্য সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এটির ভূমিকা থাকতেই পারে। সে বিষয়ে পরে আসব। পরবর্তী প্রশ্ন, অতীতকালে, খুব বেশি অতীত নয়, মাত্র দুশ বছর আগেও খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি সম্প্রদায়ের জন্মহার যথেষ্টই ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেটিই উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাচ্ছে। কারণ কি ?

এই প্রশ্নগুলির কারণ অনুসন্ধানের জন্য আমাদের অনেকটাই পিছিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ প্রায় দু হাজার বছর। যখন খ্রিস্টানিটি নামক দ্বিতীয় আব্রাহামিক ধর্মটির জন্ম হচ্ছে। কারণ এই আব্রাহামিক ধর্মগুলিতেই নারীকে নিকৃষ্ট জ্ঞান করা শুরু হয় এবং পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয় সন্তান উৎপাদন এবং গৃহ কর্ম ছাড়া নারীদের আর কোনো ভূমিকাই নেই। প্রথম আব্রাহামিক ধর্ম জুদাইজম কেবল কতিপয় ইহুদিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও খ্রিস্টানিটি এবং ইসলাম ক্রমে ক্রমে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং অধিকৃত, বিজিত ভূখণ্ডগুলিতে ছলে বলে কৌশলে নিজেদের ধর্মটি চাপিয়ে দেয়। অর্থাৎ খ্রিস্টান এবং মুসলমান অধিকৃত দেশগুলির নারীরা নিছক শস্যক্ষেত্র বা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত হয়। কিন্তু এই দুটি ধর্মের আবির্ভাবের আগে সমগ্র বিশ্বে নারীর অবস্থা কেমন ছিল ? তখনও কি তাঁরা সম্মান পেতেননা ? তখনও কি তাঁরা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবেই গণ্য হতেন ? এসব প্রশ্নের একটিই উত্তর—না, না, এবং না ! পৃথিবীর প্রথম মানব গোষ্ঠীগুলি যাদের আমরা ইংরেজিতে tribe বলে থাকি, দেশ, কাল নির্বিশেষে প্রায় সবই মাতৃতান্ত্রিক। সাঁওতালই বলুন অথবা খাসি কিম্বা আমাজনের প্রত্যন্ত জঙ্গলের বর্বর আদিবাসী। এমনকি আমরা যদি আদিমতম সভ্যতাগুলির দিকে তাকাই [যেমন সিন্ধু, মেসোপোটোমিয়া, মিশর ইত্যাদি] সেখানেও নারীরা সম্মানের আসনেই অধিষ্ঠিতা ছিলেন।] এই সভ্যতাগুলি যে আর্য সভ্যতার শাখা প্রশাখা সেটিও প্রমাণিত। [অমৃতস্য পুত্রাঃ নামক বইটিতে এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি] আর আর্য সভ্যতাতে যে নারীরা কতটা সম্মান, শ্রদ্ধা এবং গুরুত্ব পেতেন সেটি বৈদিক যুগের নারীদের সামাজিক অবস্থান দেখলেই বোঝা যায়। আর একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে। আর্য কোনো জাতি গোষ্ঠী নয়, নিছক ভাষা গোষ্ঠী। এদেশের বাম ইসলামিক ঐতিহাসিককুল বহিরাগত আর্য তত্ত্বের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মিথ্যা প্রচারকে সামনে রেখে রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় অভিসন্ধি পূরণ করতে চেয়েছেন। আর্যদের বহিরাগত প্রমাণ করে তথাকথিত শুদ্র, হরিজনদের এদেশের প্রকৃত অধিবাসী হিসেবে চিত্রিত করে বাম ইসলামিক গাঁটছড়া বাঁধার এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র যা ইতিমধ্যেই ফাঁস হয়ে গেছে। যাক সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। বৈদিক যুগের নারীদের বিদ্যা চর্চা, দর্শন আলোচনা, স্তোত্র/ মন্ত্র রচনা ইত্যাদি সকল বিষয়েই অধিকার ছিল। অপালা, ঘোষা, বিশ্ববারা, মৈত্রেয়ী, লোপামুদ্রা ইত্যাদি বিদুষী নারীই তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মেসোপোটোমিয়া, মিশরও এর ব্যতিক্রম নয়। বহু দেবতায় বিশ্বাসী ইংরেজিতে যাদের polytheist বলা হয়ে থাকে, আর্যরা তাই ছিলেন, কিন্তু পাশাপাশি নিরাকার ঈশ্বর বা দর্শন চিন্তাতেও তাঁদের সমান অংশগ্রহণ ছিল। ইংরেজিতে religion বলতে যা বোঝায়, বিশেষ করে খ্রিস্টানিটি এবং ইসলাম [যাদের একজন মাত্র প্রবক্তা বা প্রফেট] আর্যদের বহুত্ববাদী চিন্তাভাবনায় তার কোনো স্থান ছিলনা। এমনকি পরবর্তী ইউরোপে গ্রিক এবং রোম্যান সাম্রাজ্যেও নারীরা অনেকটাই সম্মানের আসনে উপবিষ্ট ছিলেন। অসংখ্য নারী দেবতার উপস্থিতিই সেটি প্রমাণ করে। এদেশের আর্যদের জ্ঞান, বিদ্যার দেবী যেমন সরস্বতী, গ্রিকদের তেমনই এথেনা ! অর্থাৎ মানব সমাজের শ্রেষ্ঠতম সম্পদটির অধিষ্ঠাত্রী একজন নারী দেবী, পুরুষ দেবতা নয়। প্রাচীনকালে বিশ্বে নারীদের অবস্থা বুঝতে চাইলে এই তথ্যটিই যথেষ্ট।

কিন্তু সময় থেমে থাকেনা। তার গতিপ্রবাহে অনেক কিছুই তছনছ হয়ে যায়। প্রকৃতির শুভাশুভ বোধের সংজ্ঞাটিই যে অন্যরকম। সে কোনো মতবাদ বা দর্শনের জন্ম দেয়নি। ধর্মই, মতবাদ বা দর্শন যাই বলুন, সব কিছুর জন্মদাতাই মানুষ। মনুষ্যসৃষ্ট আব্রাহামিক ধর্ম খ্রিস্টানিটি এবং ইসলাম [ যদিও আমি এদের doctrine বা মতবাদই বলে থাকি, অমৃতস্য পুত্রা বইটিতে তা সবিস্তারে আলোচনাও করেছি] আদিকাল থেকে চলে আসা polytheism বা বহুত্ববাদকে যাকে গণতন্ত্রের পুরোধা বলা যায়, একদেশদর্শী অনুশাসন দিয়ে ক্রমে ক্রমে ধ্বংস করে ফেলল। যীশু খ্রিস্টের মৃত্যুর সাড়ে তিনশ বছরের মধ্যেই সমগ্র ইউরোপে খ্রিস্ট ধর্ম ছড়িয়ে পড়ল। আপাতভাবে প্রেম ভালবাসা প্রচার করা ধর্মটির স্বরূপ প্রথম দিকে কেউই সেভাবে বুঝতে পারেননি। যীশু খ্রিস্টের আত্মত্যাগ [যদিও এটিকে আধুনিক গবেষকরা বানানো ঘটনা বলে চিহ্নিত করেছেন] এই ধর্মটিতে একটি বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছিল। মানুষকে ভালবাসার অপরাধে একজন মহান মানুষকে ক্রুশবিদ্ধ হতে হল ! আহা ! প্রচারের ঢক্কা নিনাদে ব্যাপার এমন দাঁড়াল যে খ্রিস্টান ধর্মের শরণ না নিলে মানুষের গতি নেই। যীশু খ্রিস্টই একমাত্র পরিত্রাতা। সেন্ট পলের অক্লান্ত প্রচারে হাতে নাতে ফল মিলল। ৩১৩ খ্রিস্টাব্দে মিলান এডিক্ট [Edict of Milan] এর মাধ্যমে সম্রাট কনস্টানটাইন তাঁর সাম্রাজ্যে [অর্থাৎ রোম্যান সাম্রাজ্যে] খ্রিস্ট ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসাবে গণ্য করার নিদান দিলেন। সম্রাট বলে কথা ! তাঁর আদেশ কি অমান্য করা যায় ? অতএব দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ল এই আব্রাহামিক ধর্ম। [ জুদাইজম, খ্রিস্টিয়ানিটি, ইসলাম—এই তিনটি ধর্মকে আব্রাহামিক ধর্ম বলা হয়, যেহেতু এরা মহা মানব আব্রাহামকে পিতা হিসাবে মান্যতা দেয়] তারপর যা হওয়ার তাই হল। জ্ঞান, বিজ্ঞান, সমৃদ্ধির শিখরে থাকা ইউরোপ আবার পিছনে হাঁটা শুরু করল। শুরু হল অন্ধকারের যুগ। হ্যাঁ এই মধ্যযুগকেই ইউরোপের ইতিহাসে Dark Age বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন চিন্তা একরকম নিষিদ্ধ হল। চার্চের একচ্ছত্র আধিপত্যে জনতার নাভিশ্বাস উঠল। সামান্য সমালোচনা করলেই আগুনে পুড়িয়ে মারা থেকে শুরু করে জন সমক্ষে হত্যা ! আর যাই করুন খ্রিস্ট ধর্ম এবং চার্চের সমালোচনা করা যাবেনা। রোম্যান ক্যাথলিকদের [ খ্রিস্ট ধর্মের আদি এবং গোঁড়া অংশ, অপেক্ষাকৃত উদার প্রটেস্ট্যান্টদের আবির্ভাব অনেক পরে। গোঁড়া রোম্যান ক্যাথলিকদের অত্যাচারেই খ্রিস্ট ধর্মের অনেক ভাগ উপভাগ] সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হল নারীদের। শিক্ষা, স্বাধীনতা, জীবিকা সব কিছু থেকে বলপূর্বক বিচ্ছিন্ন করে নারীকে গৃহবন্দী করে তোলা হল। পলিথিস্ট [বহুত্ববাদী] সংস্কৃতিতে বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিলনা। বৈদিক যুগেও সেটি অভাবনীয় ছিল। খ্রিস্ট ধর্মের হাত ধরেই বাল্য বিবাহের প্রচলন হয়। এই প্রথাটিকে ইসলাম আরও চরমভাবে প্রয়োগ করে। ন বছরের আয়েশার সঙ্গে স্বামী হিসাবে হজরত মহম্মদের যৌন মিলন, মুসলমানদের মধ্যে বাল্য বিবাহকে আরও জনপ্রিয় করে তুলল। কিন্তু কেন এই বাল্য বিবাহের প্রচলন ? কারণটি সহজবোধ্য। একটি নারীকে যত কম বয়সে বিবাহ দেওয়া যাবে, সন্তান উৎপাদনের হার তত বেশি হবে। প্রথম ঋতুস্রাবের সময় [যে সময়টিকে ইসলাম আজও বিবাহের জন্য আদর্শ মনে করে] বিবাহ সম্পন্ন হলে একটি নারী প্রজননক্ষম থাকা পর্যন্ত চোদ্দ পনেরোটি বা তার বেশি সন্তানের জন্ম দিতে পারে। কিন্তু পঁচিশ ত্রিশ বছরে বিবাহ দিলে সেই তুলনায় অনেক কম সন্তান উৎপাদিত হবে। অতএব নারী শিক্ষা বিসর্জন দেওয়া হল। কিন্তু এত উৎপাদন দিয়ে কি হবে ? এক্ষেত্রেও কারণটি সহজবোধ্য। খ্রিস্টিয়ানিটি এবং ইসলামের প্রাথমিক এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল সমগ্র বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করা। এই কারণেই তারা ধর্মান্তকরণ এবং সন্তান উৎপাদনের উপর এত জোর দিয়েছে। জনবল যত বাড়বে ধর্ম তত ছড়াবে। এভাবেই নারীদের নরকের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত করা হল। বীরাঙ্গনা জোয়ান অফ আর্ককে পুড়িয়ে মারা, সত্যান্বেষী গ্যালিলিওকে অত্যাচার এবং নিপীড়ন এই অন্ধকারের যুগেই ঘটেছিল। খাঁচায় বন্দী নারীরা মুক্তির জন্য ছটফট করলেও তাঁদের জন্য কোনো আকাশ ছিলনা। সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র এবং পুরুষের ভোগ্যপণ্য—এই ছিল তাঁদের একমাত্র পরিচয়।

খ্রিস্টান ধর্ম ইউরোপকে পিছিয়ে দিল। গ্রীস তথা সমগ্র রোম্যান সাম্রাজ্যকে লক্ষ্য বানানোর জন্যই নিউ টেস্টামেন্ট গ্রীক ভাষায় লেখা হয়, যাতে প্রাচীন সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে এই আব্রাহামিক ধর্মটি দিয়ে মগজ ধোলাই সুসম্পন্ন করা যায়। ইউরোপে অন্ধকার নামল । ইউরোপ থেকে একসময় এই ধর্ম আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ল। যেহেতু ইউরোপিয়ানরাই এই দেশ তথা মহাদেশগুলির অনেকাংশে উপনিবেশ বানিয়েছিল। কিন্তু এশিয়া কি মুক্তি পেল ? অবশ্যই না। যদিও এখানে খ্রিস্টান ধর্মের বিস্তার অনেক পরে ঘটেছিল, তার অনেক আগেই এটি ইসলামের দখলে চলে গেল। চতুর্থ শতাব্দীতে ইউরোপে অন্ধকার নামল খ্রিস্টান ধর্মের আধিপত্যে, অষ্টম শতাব্দীতে আঁধার নামল ভারত তথা এশিয়ায়। ইসলাম ধর্মের প্রবক্তা হজরত মোহম্মদের মৃত্যুর পরই [৬৩২ খ্রিস্টাব্দে] মুসলমান আক্রমণকারীরা বিশ্ব অভিযানে বেরিয়ে পড়ে। বিন কাশেমের সিন্ধু জয় [৭১২ খ্রিষ্টাব্দ] দিয়েই ভারতবর্ষে ইসলামের আধিপত্যের সূচনা হয়। সিন্ধুরাজ দাহিরকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়, তাঁর দুই কন্যা সূর্যদেবী এবং পীরমলদেবীকে বন্দী করে খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইসলামের শক্তি ক্রমশ বাড়তেই থাকে। কাশ্মীর অধিপতি ললিতাদিত্য মুক্তিপীদার [মুক্তিপীড়া] জীবদ্দশায় মুসলমান হানাদারেরা কোনঠাসা অবস্থাতেই ছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পরই কাশ্মীর ইসলাম আধিপত্যের শিকার হয়। সিকান্দার শাহ মিরির [তাঁকে কাশ্মীরের কশাই বলা হয়] চূড়ান্ত অত্যচারে কাশ্মীর প্রায় হিন্দু শূন্য হয়ে যায়। একের পর এক বিজয়ের পর মুসলমান আক্রমণকারীরা দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। মহম্মদ ঘোরি দিল্লি আক্রমণ করেন। তরাইনের প্রথম যুদ্ধে পরাজিত হলেও উদারচেতা পৃথ্বীরাজ চৌহান তাঁকে ক্ষমা করেন। এই ভুলের খেসারত তাঁকে দিতে হয়েছিল। ১১৯২ এর দ্বিতীয় তরাইনের যুদ্ধে তিনি পরাজিত এবং বন্দী করা হয়। তাঁর স্ত্রী সংযুক্তাকে সর্বসমক্ষে ধর্ষণ করেন মোহম্মদ ঘোরি। সেই করুণ কাহিনীর বিবরণ দেওয়ার পরিসর এখানে নেই।

মোহম্মদ ঘোরির দিল্লি বিজয়ের সময় এদেশের নারী সামাজিক অবস্থান কেমন ছিল বোঝার জন্য একটি তথ্যই যথেষ্ট। প্রিয় কন্যা সংযুক্তাকে বিবাহ দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাজা জয়চন্দ্র স্বয়ম্বর সভার আয়োজন করেন। [যদিও সেখানে পৃথ্বীরাজকে আমন্ত্রণ করা হয়নি। যেহেতু জয়চন্দ্র তাঁকে ঈর্ষা করতেন] কিন্তু এই স্বয়ম্বর সভা থেকেই পরিষ্কার হয় যে সেই সময় নারীরা তাঁদের পছন্দের পাত্র বেছে নিতে পারতেন। নারী স্বাধীনতার এত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সমসাময়িক বিশ্বে অত্যন্ত বিরল, নেই বললেই চলে। কিন্তু তারপর এদেশেও অন্ধকার যুগ শুরু হল। ইসলামি শাসক এবং হানাদারদের লালসা, অত্যাচার থেকে অব্যাহতি পাওয়ার লক্ষ্যেই হিন্দু নারীদের গৃহবন্দী করা হল। একদিকে লক্ষ লক্ষ হিন্দু হত্যা, অপরদিকে হিন্দু নারীদের বলপূর্বক অপহরণ, ধর্ষণ এবং বিবাহ –এই কল্পনাতীত হিংস্রতার কবলে পড়ে দিশেহারা হিন্দু সমাজ মনুস্মৃতিকে আশ্রয় করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মরীয়া প্রয়াস শুরু করল। বাল্য বিবাহ যা বৈদিক যুগে অকল্পনীয় ছিল ইসলামি ভারতে চালু হয়ে গেল। শরীরে এন্টিজেন প্রবেশ করলে মানবশরীরে যেভাবে এন্টি বডি জন্মায়—বহিরাগত ভাইরাস/ ব্যাকটেরিয়ার মোকাবিলায় সে তাকে কপি বা অনুকরণ করতে শুরু করে, হিন্দু সমাজও ইসলাম অনুকরণের পথে হেঁটে নারীদের পর্দানসীন, অন্তঃপুরবাসিনী দ্বিপদে পরিণত করল। সতীদাহ প্রথা সর্বগ্রাসী রূপ পরিগ্রহ করল। মুসলমান হানাদারদের কবল থেকে নারী সম্ভ্রম বাঁচানোর জন্য জন্ম নিল জহরব্রতের মত আত্মহননের প্রথা। আলাউদ্দিন খলজির লালসা থেকে বাঁচানোর জন্য নিছক পদ্মিনী নয়, এমন হাজার হাজার নারী আগুনে আত্মাহুতি দিলেন। নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতা, যা সনাতন হিন্দু সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ছিল, ইসলামি যুগের করাল অন্ধকারে সব নিমজ্জিত হল। লক্ষ লক্ষ নর হত্যার ফলে ফলে অস্তিত্ব সংকটে ভোগা হিন্দু সমাজও নারীকে সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বানিয়ে ফেলল। এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। প্লেগ, মহামারী, যুদ্ধ, দাঙ্গা অথবা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আবহে জীব মাত্রেই বেশি অপত্যের জন্ম দেয়। মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। আসুন এবিষয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক Will Durant এবং Ariel Durant এর পর্যবেক্ষণটি দেখে নেওয়া যাক। The Story of Civilization নামের অসাধারণ এক বিশ্ব ইতিহাসের [এগার খণ্ডের] প্রথম খণ্ডের ষষ্ঠ অধ্যায়টিতে তাঁরা এব্যাপারে বিশদ আলোচনা রেখেছেন। অধ্যায়টির নাম– The Muslim Conquest OF INDIA সেটি কিভাবে শুরু হচ্ছে ? আসুন প্রথম লাইনটি পড়ে নেওয়া যাক।
The Mohammedan Conquest of India is probably the bloodiest story in

কী দাঁড়াল ? হ্যাঁ, ইসলামের ভারত জয় সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়।
এখানেই তিনি উল্লেখ করেছেন – আশি মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় আট কোটি হিন্দুকে এই সময়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু মুসলিম ঐতিহাসিক ফেরেস্তার ( ইনি ১৫৭০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন) মতে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তারিখ ই ফেরেস্তা গ্রন্থে তিনি ৪০০ মিলিয়ন অর্থাৎ চল্লিশ কোটি হিন্দু হত্যার কথা বলেছেন। এর ফলে সমসাময়িক হিন্দু জনসংখ্যা ষাট কোটি থেকে কুড়ি কোটিতে নেমে আসে। বলাই বাহুল্য এটি একদিনে ঘটেনি। পর্যায়ক্রমে, একের পর এক ইসলামি শাসক, লুণ্ঠনকারী মামুদ থেকে তৈমুর লঙ –সুদীর্ঘ এই তালিকা। [অমৃতস্য পুত্রাঃ নামক সদ্য প্রকাশিত বইটিতে এবিষয়ে কিছু আলোকপাত করেছি]
হ্যাঁ, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা-মনুস্মৃতির এই প্রবচন প্রয়োগ করে হিন্দু নারী তখন শত সহস্র সন্তান সন্ততির জন্ম দিয়ে চলেছে। এর অন্যথা হলে হিন্দু সমাজের অস্তিত্বই থাকতনা।

কিন্তু তাতে তো নারীদের যন্ত্রণা দূর হলনা। তাঁরা যুগের যুগের পর যুগ কেবল ব্যবহৃত হতে থাকলেন। সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হয়ে পুরুষের ভোগ্যপণ্য হতে কারই বা ভাল লাগে ! ভারতীয় নারীর জীবনে সে এক দুঃসহ অন্ধকার। সহস্র বিধি নিষেধ, বৈষম্য, অত্যাচার সহ্য করতে করতে শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তাঁদের কোনো পথ ছিলনা। তবু অতলপ্রাসারী এক অন্ধকারে মুখ ঢেকে কেউ কেউ হয়ত আগামীর অপেক্ষা করছিলেন। রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মত মহা মানব তাঁদের একদিন মুক্তি দেবেন।

মধ্যযুগ মানেই অন্ধকার। মধ্যযুগ মানেই নারীমেধ যজ্ঞ ! সামাজিক অনুশাসনে অসহায় নারীদের বলি দেওয়ার কাহিনী। বিশ্বের সর্বত্র তখন আব্রাহামিক ধর্মের অত্যাচারী থাবা। কোথাও ইসলাম, কোথাও খ্রিস্টানিটি ! এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা সর্বত্র একই চিত্র। কিন্তু অন্ধকারই তো শেষ কথা নয়। তারপর আলো আসে। কিন্তু কোথায় ? কেন, যেখানে প্রথম অন্ধকার নেমেছিল, সেই ইউরোপে ! যেখানে প্রথম রাত নামে, সেখানেই তো আগে সূর্য উঠবে। খিস্ট ধর্মের গোঁড়ামি, স্তূপীকৃত কুসংকার, চার্চের সঙ্গে রাজার গাঁটছড়া, ধর্ম যাজকদের স্বৈরাচার, লাম্পট্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় জনতা ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিল। পুঞ্জীভূত ক্রোধ এবং অসন্তোষ নারীদেরও অসহিষ্ণু করে তুলেছিল। নারীদের এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেন মেরি উলস্টোনক্র্যাফট [১৭৫৯—১৭৯৭] নামের এক প্রতিবাদী রমণী। এই লেখিকা, চিন্তাবিদ এবং দার্শনিককেই নারীবাদ বা ফেমিনিজম-এর প্রবক্তা বলা হয়। যদিও জীবদ্দশায় তাঁকে নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি। মধ্যযুগের এই অন্ধকারকে গুঁড়িয়ে দিয়ে যেদিন ফরাসী বিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়ল, ভেঙে পড়ল বাস্তিল( ১৪ই জুলাই, ১৭৮৯) সেইদিন থেকেই ফ্রান্স তথা ইউরোপ আলোর দিশা পেল। বুর্জোয়া বিপ্লব হিসাবে বিখ্যাত এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ কেবল সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধেই গর্জে উঠেছিল এমন নয়, চার্চ এবং খ্রিস্ট ধর্মের সমস্ত রীতিনীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। চার্চ এবং খ্রিষ্ট ধর্মের প্রতি ঘৃণা এবং বিদ্বেষ এত তীব্র হয়ে উঠেছিল বলেই এই সময় সেকুলার [secular] শব্দটির জন্ম হয়। এর প্রকৃত অর্থ চার্চ বা খ্রিষ্ট ধর্মের সঙ্গে যার কোনো যোগাযোগ বা সম্বন্ধ নেই। হু হু করে বাড়তে থাকল নাস্তিক এবং নারীবাদীর সংখ্যা। যা একান্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। ফ্রান্সেই প্রথম সমকামিতা আইনসিদ্ধ হল। ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র ইউরোপে। প্রচলিত হল নেপোলিয়নিক কোড [ code Napoleon, ১৮০৪] । এই সিভিল আইনেই প্রথম অজাচারকে [ incest] আইনসিদ্ধ করা হল। অর্থাৎ পিতা কন্যা, মাতা পুত্র, ভ্রাতা ভগিনীর মধ্যে যৌন সম্পর্ক ! ভাবতে পারেন ! ওই যে কথা আছে—বাঁধা গরু ছাড়া পেলে যা হয়। খ্রিস্ট ধর্ম যা যা নিষেধ করে এসেছে, চাপিয়ে দিয়েছে, ফরাসীরা ঠিক এবার তার বিপরীত করা শুরু করলেন। ঘৃণা এতটাই তীব্র ! চরম পন্থার মোকাবিলায় চরম পথ অবলম্বন করা। উগ্র নারীবাদী এবং উগ্র নাস্তিক উভয়ের জন্মই আব্রাহামিক বাতাবরণে !কারণ extremity produces extremity ! চরমতা চরমতার জন্ম দেয়। [হিন্দু সংস্কৃতি আদিতেই চার্বাক, বুদ্ধের মত নাস্তিক, নিরীশ্বরবাদী, নারী স্বাধীনতার উপস্থিতি ইত্যাদি মেনে নিয়েছিল বলে এই বিপরীত উগ্রতা সেভাবে দেখেনি]। ইউরোপের নারীরা মুক্তি পেতে শুরু করলেন। তাঁরাও শিক্ষার আলো পেলেন, জীবিকার অধিকার পেলেন। বিয়ে করা বা না করার স্বাধীনতা পেলেন। কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই থেমে থাকলনা। বাঁধ ভেঙে যখন জলস্রোত প্রবেশ করে তখন ভাসানোর তালিকাটি হিসেবের মধ্যে থাকেনা। অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে নারীদের বেঁচে থাকার অধিকার হিসেবে শুরু হওয়া ফেমিনিজম ক্রমশ পুরুষ এবং পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিষোদগারে পরিণত হল। মার্ক্সীয় দর্শনের আবির্ভাবের পর এটি আরও তীব্র আকার ধারণ করল। সাইমন দ্য বোভোয়ার [১৯০৮—১৯৮৬] মত নারীবাদী দার্শনিকের আবির্ভাব ঘটল। তাঁর সেকেণ্ড সেক্স নামক বইটি নারী এবং নারীবাদকে কেবল নতুন মাত্রাই দিলনা, কায়েমি পুরুষতন্ত্রের বুকে সুতীব্র কুঠারাঘাত করল। নারীদের বোঝানো হল, বিবাহ, মাতৃত্ব ইত্যাদি কখনও নারীর পরিচয় বা আইডেন্টিটি হতে পারেনা। সে পুরুষের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং অনেক বেশি উৎকৃষ্ট। তাই তাঁদের যুগে যুগে শেকল পরানো হয়েছে। বলাই বাহুল্য নারীরা এতে অনুপ্রাণিত হলেন। বোভোয়ার পর এলেন হেলেন সিক্সাস-এর মত ফরাসী নারীবাদী। তাঁর রচিত লাফ অফ মেডুসা ফেমিনিজমের মুকুটে আর একটি পালক । এলেন লুস ইরিগারে। প্রখ্যাত এই ফরাসী নারীবাদী দুটি বই Speculum of the Other Woman এবং This Sex Which is Not One নারীবাদের জগতে আলোড়ন তুলল। মার্ক্সীয় ক্যাপিটাল এবং কোমোডিটির তত্ত্ব প্রয়োগ করে তিনি ফেমিনিজম-এ আর একটি নতুন মাত্রা যোগ করলেন। লুস ইরিগারে ফ্রয়েডকে নস্যাৎ করে mother daughter relationship অর্থাৎ মা মেয়ের সম্পর্কের উপর জোর দিলেন। সোচ্চারে জানালেন মেয়েরা বাবার প্রতি নয়, মায়ের প্রতিই বেশি আকর্ষিত হয়। ফ্রয়েড পুরুষতান্ত্রিক মূল্যবোধ চাপিয়ে ইদিপাস কমপ্লেক্স [ যেখানে পুত্র পাতার প্রতি, এবং কন্যা পিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়] এর তত্ত্ব সাজিয়েছেন।

এখানেই ইতি নয়। ১৯৭০ সালের পর আছড়ে পড়ল নারীবাদের তৃতীয় ঢেউ ইংরেজিতে যাকে third wave of feminism বলা যেতে পারে। আবির্ভূত হলেন রিটা ব্রাউন, শিলা জেফ্রেজ, চেরি মোরাগা, চেরিল ক্লার্ক, মেরি ডেলি ইত্যাদি মহান নারীবাদী। তাঁরা ঘোষণা করলেন একজন নারী কেন পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হবে ? এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক। নারীর উচিত একজন নারীর প্রতিই আকৃষ্ট হওয়া এবং তার মধ্যেই যৌন তৃপ্তি খুঁজে নেওয়া। এই মহামানবীদের এই মহান মতবাদটিই Lesbian feminism অথবা সমলিঙ্গ নারীবাদ হিসেবে পরিগণিত। আপনারাই বলুন এমন করলে বাচ্চাকাচ্চা হবে ? ফল যা হওয়ার তাই হল। অত্যধিক নারীস্বাধীনতা, পরিবর্তিত মূল্যবোধের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে ইউরোপ বিবাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল। শুরু হল লিভ ইন-এর মত সর্বাধুনিক জীবন শৈলী। নারী স্বাধীনতা মানে দাঁড়াল বিয়ে না করার স্বাধীনতা, মা না হওয়ার স্বাধীনতা, পুরুষ বিদ্বেষের স্বাধীনতা। প্রতিপালনের ক্ষমতা নয়, মূল্যবোধই অন্তরায় হয়ে দাঁড়াল। নারীবাদ বস্তুটি অবশেষে এমন জায়গায় পৌঁছল যে মহা মানবীরা প্রশ্ন করে বসলেন –পুরুষ তো সন্তান ধারণের যন্ত্রণা ভোগ করেনা, সে কেবল যৌন আনন্দ নেয়। আমরা কেন খামোকা এই কষ্ট সহ্য করব ? প্রকৃতিই এখানে নিরপেক্ষ নয়। অর্থাৎ নারীবাদ পুরুষতন্ত্রের বিরোধিতা করেই ক্ষান্ত হলনা, প্রকৃতির বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে বসল। তারপর আর কি ! নারীরাই যদি বেঁকে বসে, ছেলেপেলে হবে কিভাবে ! ১৮৫০ সালের পর থেকে কমতে থাকা TFR [total fertility rate] ক্রমে ক্রমে তলানিতে এসে ঠেকল। একশ বছর আগেও যেখানে আমেরিকা, ইউরোপের নারী প্রতি সন্তানের গড় চারের কাছাকাছি ছিল, ১৯৭৬ সালের একটি হিসেবে সেটি ১.৭ এসে দাঁড়াল। বর্তমানে সেটি ১.৫ ! হ্যাঁ আধুনিক ইউরোপে এটিই এখন লেটেস্ট টি এফ আর ! অনেকের মত আরও কম হবে। কারণ ইউরোপের অনেক ভূখণ্ডেই পরিবার বলতে আর কিছু নেই। অথচ মুসলমানদের বিশ্বগড় এখনও ৩.৩ ! ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন ওরাই তো দেখবে ! ভাবলে অবাক হবেন সন্তান ধারণের জন্য গাদা গাদা পুরস্কার ঘোষণা করেও লাভ হয়নি। তাই অনেক ইউরোপীয় দেশ কর্মক্ষম মানুষ পাওয়া যাবে ভেবে মুসলমান শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে। কী বললেন ? নারীবাদ ? হা হা হা ! নারীবাদই বলুন আর মার্ক্সবাদই বলুন এসব মুসলমানদের বাদ দিয়েই বিকশিত হয়েছে। মুসলিম নারীরা সাইমন দ্য বোভোয়া, লুস ইরিগারে অথবা লেসবো ফেমিনিস্ট কারও ধার ধারেনা। ইসলামি আদর্শ অনুসারে তাঁরা এখনও জন্ম দিয়েই চলেছেন, দিয়েই চলেছেন। নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতা ইত্যাদি শব্দ তাঁদের এখনও সেভাবে ছুঁতেই পারেনি।

ভারতবর্ষও কেন ব্যতিক্রম হবে ? দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে পরাজিত করে যে ব্রিটিশ শক্তি এদেশের দখল নিয়েছিল, তাঁরা এই উদার মূল্যবোধের ধারক ছিলেন। তাঁদের বাহিত খ্রিস্ট ধর্মটি আগের মত গোঁড়া ছিলনা। ১৭৫৭ সালের খ্রিস্টান ধর্ম ৫০০ খ্রিষ্টাব্দের মত নিশ্চয় হবেনা। তাই রামমোহন, বিদ্যাসাগরের মত মহা পুরুষ যখন হিন্দু নারীদের উদ্ধারে এগিয়ে এলেন, ব্রিটিশ শাসকরা বাধা দিলেননা, বরং সাহায্য করলেন। নারী শিক্ষার প্রচলন হল। নারীদের জীবিকার অধিকার, বিধবা বিবাহের অধিকার ইত্যাদির মাধ্যমে আবার আলো প্রবেশ করল। তবে একে সূত্রপাত না বলাই ভাল। কারণ বিদ্যাসাগর, রামমোহন যা করেছিলেন তা ইউরোপের অনুকরণ নয়। ভারতীয় নারীরা হাজার হাজার বছর আগেও এমন স্বাধীনতা ভোগ করত। তবে আধুনিক ইউরোপের প্রভাব অস্বীকার করা যাবেনা। ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা না হলে হিন্দু নারীদের দুর্ভোগ একইভাবে চলত। স্বধর্মের নারীদেরই যারা নরকে নিক্ষেপ করেছে, সেই ইসলামি শাসক নিশ্চয় হিন্দু নারীর যন্ত্রণা নিয়ে ভাবতে বসতেননা।

কিন্তু ফল একই হল। স্বাধীনতা, শিক্ষার প্রবর্তন, আধুনিক মূল্যবোধের প্রসার, ফেমিনিজমের বিস্তার হিন্দু নারীকেও নতুন করে ভাবাল। নব অর্জিত স্বাধীনতার স্বাদ নিতে চেয়ে অনেকেই বিয়ে করলেননা। করলেও সন্তান নিলেননা। নিলেও বড় জোর একটি। শিক্ষিত হিন্দু পরিবারগুলিতে TFR কমতে শুরু করল। এই রাজ্যেও আরো বেশি। অর্থাৎ হিন্দু বাঙালির সংখ্যা সর্ব ভারতীয় গড়ের চাইতে অনেক দ্রুত হারে হ্রাস পাচ্ছে। কিন্তু কেন ? উত্তর সহজবোধ্য ! সুদীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসন, এবং তারও বেশি সময় ধরে মার্ক্সবাদীদের উপস্থিতি এই রাজ্যের মাটিতেও নারীবাদের বীজ বপন করেছে। অনিবার্য ফল হিসেবে হিন্দু বাঙালি নারী অনেকেই দেরিতে বিবাহ করছেন, কেউ করছেননা। সন্তান বড় জোর একটি। ঘরে ঘরে নিঃসন্তান দম্পতীর অভিনব জীবনশৈলী ! তাতেও কোনো চিন্তা ছিলনা। কিন্তু ওই যে ওরা ! ওরা তো মার্ক্সবাদ, নারীবাদে নেই। কোনো দেশে, রাজ্যে, ভূখণ্ডে সংখ্যাগুরু হয়ে গেলেই ইসলামি শাসনের দাবীতে হুঙ্কার ! তাই কোনো কোনো হিন্দু বাঙালি, যারা আগামী দেখতে পান, ব্যাপক আশঙ্কিত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ নামক রাজ্যটির ভবিষ্যৎ সত্যিই ভয়াবহ !

এবার সেই অনিবার্য প্রশ্ন ! নারী শিক্ষা, নারী স্বাধীনতা, আধুনিক মূল্যবোধ এসবের সম্মিলিত প্রভাবে কি সত্যিই সন্তান জন্মের হার কমে যায় ? অবশ্যই কমে যায়। সমগ্র বিশ্বের চিত্র তাই বলছে। শিক্ষিত, স্বাধীনচেতা, স্বনির্ভর নারী মাত্রেই কম সন্তানের জন্ম দেন। অথবা দেন না ! অশিক্ষিতা নারী সেই তুলনায় অনেক বেশি সন্তান জন্ম দেন। তবে উপায় ? আমরা কি চাইব আমাদের নারীরাও অশিক্ষিত হয়ে থাক ? যাতে সন্তান উৎপাদন করে হিন্দু সমাজকে পরিত্রাণ করতে পারে ! নিশ্চয় নয়। এ কোনো গ্রহণীয় যুক্তি হতে পারেনা। তবে সত্যিই কি কোনো উপায় নেই ? নারী শিক্ষিতাও হবেন, স্বাধীনতাও ভোগ করবেন আবার মাতৃত্বেও অনীহা থাকবেনা, এমন কি হতে পারেনা ?

অবশ্যই পারেন। ইজারায়েলের নারীরা পেরেছেন, পারছেন। হ্যাঁ এঁরাই একমাত্র ব্যতিক্রম যা সমগ্র বিশ্বের বিস্ময় হয়ে উঠেছেন। প্রশাসন, বিদেশ দপ্তর, ব্যাঙ্ক, বীমা, বহুজাতিক, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদির উচ্চ পদে থেকেও ইহুদি নারীরা কিভাবে এত সন্তান ধারণ করে চলেছেন, বিশেষজ্ঞরা যাকে রীতিমত “বেবি বুম “ বলে চিহ্নিত করেছেন। The Organisation for Economic Co-operation and Development [ OECD] এর সদস্য ৩৬ টি উন্নত দেশের মধ্যে ইজরায়েলের গড়ই এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল। ৩.১ টোটাল ফার্টিলিটি রেট [TFR] নিয়ে তাঁরা রীতিমত গর্বিত। একই সঙ্গে এটিও সত্য যে ইহুদি নারীরা শিক্ষায়, দীক্ষায়, মেধায়, মননে ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে একটুও পিছিয়ে নেই, বরং সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ! হ্যাঁ এই চিত্রটিই বিশেষজ্ঞদের বিস্মিত করেছে, যা স্বাভাবিক প্রবণতার সম্পূর্ণ বিপরীত। এমন ভাবলে ভুল হবে যে ধর্মীয় কারণেই ইহুদি নারীরা বেশি সন্তানের জন্ম দিয়ে চলেছেন। পরিসংখ্যান তা বলছেনা। গোঁড়া ইহুদি নারীর সংখ্যা এখন অত্যন্ত কম এবং তাঁদের TFR এখনও অপেক্ষাকৃত বেশি, বর্তমানে সেটি -৪.১ । হারেদি বলে পরিচিত এই রক্ষণশীল ইহুদি নারীরা বর্তমানে মাত্র ১২-১৩% ! সেকুলার এবং কম ধার্মিক ইহুদি নারীর সংখ্যাই এখন ক্রমবর্ধমান। হ্যাঁ এঁদের সিংহভাগ প্রার্থনা করেননা, ধর্মীয় আচার মানেন না, উপাসানালয়েও যান না। আশি ভাগ সকার। অর্থাৎ কোনো না কোনো জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। হ্যাঁ এই আধুনিক শিক্ষিতা পেশাদার নারীরাই এখন ইজরায়েলি বেবি বুমের কারিগর ! কিন্তু রহস্যটা কি ? কেউ কেউ বলছেন আধুনিক আই ভি এফ ব্যবস্থা তথা সন্তান লাভের নব নব প্রযুক্তি ! যাতে বেশি বয়সেও মা হওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই এই যুক্তি মানতে নারাজ। পাশাপাশি আর একটি কারণ উঠে আসছে—নিরাপত্তা ! কী চমকে উঠলেন ! হ্যাঁ সমীক্ষা তাই বলছে। ইজরায়েল দেশটি শত্রু দিয়ে ঘেরা। মুসলমান প্রতিবেশীরা দিনরাত শুধু ধ্বংস কামনা করে চলেছে। প্যালেস্টাইন, হামাস, হিজবুল্লা, ইরাণ—প্রায় সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ! শুধু কি তাই ? দেশের ভেতরেও প্রায় ২৫% আরব মুসলিম ! তারাও তো জন্ম দিয়ে চলেছে ! তারা যদি সংখ্যাগুরু হয়ে যায় ! কী বুঝলেন ? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। দেশপ্রেম ! স্বজাতি প্রেম ! আবহমানকাল ধরে চলতে থাকা নিপীড়ন হিটলারের গ্যাস চেম্বার পর্যন্ত পৌঁছে গেলে সেদেশের নাগরিক বুঝি এমনই হয়।
কিন্তু আমরাও কি অত্যাচারিত হইনি ? আটশ বছর ধরে প্রবহমান রক্তস্রোত কি এখনও থেমেছে ?

তবে নিছক দেশপ্রেম, স্বজাতিপ্রীতির আবেগ দিয়ে এই বিষয়টিকে দেখা উচিত হবেনা। ধরে নেওয়া যাক বাঙালি হিন্দুও ইহুদিদের মত সচেতন আইডেন্টিটি উপাসক হয়ে উঠল। নারীরাও ভাবল স্বজাতির কথা ভেবে, ইসলামিকরণ রুখে দেওয়ার জন্য বিবাহ এবং সন্তান ধারণ অত্যন্ত জরুরি। তাতেও কি সমাধানের পথ মিলবে? মনে হয়না। কারণ ইহুদিদের মাথা পিছু আয়, ক্রয় ক্ষমতা পশ্চিমবঙ্গবাসী হিন্দুর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। তাঁরা চাইলেই একাধিক সন্তানের লালন পালন করতে পারেন৷ এতে তাঁদের জীবন যাত্রার মানে কোনো কুপ্রভাব পড়বেনা। কিন্তু বাঙালি হিন্দুর গড়পড়তা শিক্ষা দীক্ষা মুসলমানের চেয়ে অনেকটাই বেশি। অথচ তাদের জন্য উপযুক্ত জীবিকা এখন প্রায় শূন্য। উচ্চশিক্ষিত তরুণ তরুণীর জন্য না আছে সরকারি চাকরি না আছে কর্পোরেট সেক্টর। শিল্পহীন ভাগাড়ে পরিণত হওয়া রাজ্যে কেই বা বিনিয়োগ করবে। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু উন্নয়নের নামে রাশি রাশি বৃত্তি। ইমাম ভাতা, ক্লাবে ক্লাবে অর্থদান ইত্যাদি সুপরিকল্পিত অপচয়ের কথা ছেড়েই দিলাম। এই পরিস্থিতিতে কি স্বজাতিপ্রীতি দেখানো সম্ভব? কুকুর বিড়ালের জীবনে তো শিক্ষিত মানুষ অভ্যস্ত হতে পারেনা। যদিও এক্ষেত্রে সেই বিশেষ সম্প্রদায়টির উপর দারিদ্র্যের কোনো প্রভাব পড়েনা। তারা অভিন্ন হারে সন্তান উৎপাদন করে চলে। সেই চিত্রই এরাজ্যে দেখা যাচ্ছে। এই রাজ্য সরকারি নীতি টি কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়? হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাস করতে চাইলে এর চেয়ে ভাল কোনো পথ আছে কি? মেধাকে শেষ করে দেওয়া মানে আসলে বাঙালি হিন্দুকে শেষ করে দেওয়া এই সত্য কি জলের মত পরিষ্কার নয়?
কিন্তু যারা সম্পন্ন, সুপ্রতিষ্ঠিত, তারাও কি সচেতন? সবে মাত্র সাতাশ, এখনই বিয়ে করব? রোজগেরে নারীর মুখে এই প্রশ্নটি শোনেননি? পুরুষদের ক্ষেত্রেও উদাহরণের কমতি নেই। অথবা সবে তো বিয়ে হল৷ আগে দু তিন বছর ঘোরাঘুরি, এনজয় করে নিই, তারপর বাচ্চাকাচ্চার কথা ভাবব। এই জাতীয় প্ল্যানিং এর চক্করে পড়ে প্রেগন্যান্সি ডিলে করতে করতে শেষমেশ আর হলই না, এমন উদাহরন কি কম আছে?
প্রগতি কাম্য, স্বাধীনতাও কাম্য, কিন্তু চরম ব্যক্তিস্বাধীনতা কি সমষ্টির ক্ষতি করবে না?

ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন

1 COMMENT

  1. অপূর্ব ।। Education brings consciousness, consciousness brings revolution, revolution brings emancipation.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here