What Bengal thinks today, India thinks tomorrow! হিন্দু আইডেন্টিটির উত্থান কি গোখলের পর্যবেক্ষণটিকে ভুল প্রমাণ করিতেছে ?

0

Last Updated on

পশ্চিমবঙ্গ নামক ভূভাগ তথা রাজ্যটির মাটিতে হিন্দুত্বের উত্থান লইয়া অনেকেই বিস্ময় এবং লজ্জা প্রকাশ করিতেছেন। বিস্মিত হইতেই পারেন কিন্তু লজ্জা? ইহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলেই বামাবতারকুল ( বলাই বাহুল্য লজ্জা পাইবার মাপকাঠিতে ইহারাই সর্বোচ্চ স্থানে বিরাজমান) সোচ্চারে বলিতেছেন, বাঙালিকে দেখিয়াই এক কালে [শতাধিক বৎসর পূর্বে] মহামতি গোখলে কহিয়াছিলেন, What Bengal thinks today, India thinks tomorrow! হায় হায়, সে বাঙালির কী করুণ দশা! সমগ্র ভারত যাহা প্রত্যাখ্যান করিয়া উগরাইয়া দিয়াছে( যদিও এই তথ্য তাঁহারা কোথায় পাইলেন, কোন পরিসংখ্যানে পাইলেন, তাহা উহারাই জানেন) তখন একদা অগ্রগতির ধারক এবং বাহক বাঙালি সেই হিন্দুত্বের পাঁক সর্বাঙ্গে মাখিয়া উদ্দাম নৃত্য করিতেছে। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া, পত্র পত্রিকা সর্বত্রই গেল গেল রব। বামাবতারকুলের প্রিয় একটি নিউজ পোর্টালেও এইরূপ একটি নমুনা অবলোকন করিলাম। হায় বামাবতারকুল, আপনাদিগের মগজ অনুধাবন মাত্রই করুণা সিঞ্চনের অভিপ্রায় হয়। একটু ভাবিলেই ইহার কারণ হৃদয়ঙ্গম করিবেন। মহামতি গোখলের পর্যবেক্ষণটি কাহাদের উদ্দেশ্যে?

“আজ বাংলা যাহা ভাবে, ভারত তাহা আগামীকাল ভাবিবে!”

ভাবনার কাজটি কে করিয়া থাকে? কৃষক, শ্রমিক, জেলে, তাঁতি নাকি বুদ্ধিজীবী? তিনি নিশ্চয় খাটিয়া খাওয়া মানুষের ডাল ভাত তরকারি, অর্ধাঙ্গিনীর গোঁসা, পোলাপানের লবনচুষ চোষা ইত্যাদি ভাবনার নিরিখে বাঙালির অগ্রবর্তী চিন্তনের প্রশংসা করেন নাই। তবে কাহাদের চিন্তনকে মাপকাঠি ধরিয়াছিলেন? অবশ্যই সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীকুলের চিন্তাভাবনা, মনন, লেখনী ইত্যাদিই তাঁহাকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে অনুপ্রাণিত করিয়াছিল। অপোগণ্ডেও এই সরল সত্যটি উপলব্ধি করিবে। খাটিয়া খাওয়া মনুষ্যের সামাজিক অবদান অনস্বীকার্য, কিন্তু চিন্তন, মননের ক্ষেত্রে সমসাময়িক কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সমাজতাত্ত্বিক ইত্যাদি মনুষ্যের ভাবনা, মনন এবং পর্যবেক্ষণকেই সেই যুগের বৌদ্ধিক স্তরের সূচক বা মাপকাঠি বলিয়া ধরিয়া লওয়া হয়। ইহাতে দ্বিমত প্রকাশের কোনোরূপ অবকাশই নাই। তাহা হইলে কী দাঁড়াইল? মহামতি গোখলে তাঁহার এই অমূল্য পর্যবেক্ষণটি সমসাময়িক অথবা তাঁহার অগ্রজ বুদ্ধিজীবীকুলের কর্মকাণ্ড দেখিয়াই উচ্চারণ করিয়াছিলেন। তিনি কাহাদের কথা ভাবিয়া, কাহাদের লেখনী পড়িয়া, কাহাদের কর্মকুশলতা দেখিয়া ইহা বলিয়াছিলেন? আসুন দেখিয়া লই। গোপাল কৃষ্ণ গোখলে ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন, পরলোক গমন করেন ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে। এই সময়কালে অথবা তাহার কিঞ্চিৎ পূর্বে কোন কোন বাঙালি বুদ্ধিজীবী এই দেশের মাটিকে আলোকিত করিয়াছিলেন, যাহা মহামতি গোখলেকে এই উচ্চারণে অনুপ্রাণিত করিয়া থাকিতে পারে? সংক্ষেপে নিবেদন করা যাক। তাঁহার জন্মের কিছুকাল পূর্বেই এক বাঙালি অনন্যসাধারণ একটি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন — ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায়ের রচিত ভারতবর্ষের ইতিহাস। হাঁ, এই গ্রন্থটিকে নিশ্চিত একটি মাইলস্টোন বলা যায়। কারণ [ইহাতেই প্রথম] ইসলাম তথা মুসলমান শাসককুলের ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ কীরূপে এই দেশকে কয়েক হাজার বছর পিছাইয়া দিয়াছে তাহার প্রথম এবং পূর্ণাঙ্গ আলোচনা বিদ্যমান। কী বলিলেন? গোখলে এই জঘন্য, সাম্প্রদায়িক গ্রন্থটি পাঠ করেন নাই, তারিণীচরণকেও চিনিতেন না? বেশ তাহাই হউক! তবে এই সময় কালে তিনি আর কোন কোন বাঙালি বুদ্ধিজীবী দেখিয়া থাকিবেন? কেন? বঙ্কিমচন্দ্র! গোখলের জন্মের প্রায় দুই দশক পূর্বে এই প্রতিভাবান মনুষ্যটির আবির্ভাব ঘটে। সাহিত্যসম্রাট হিসেবে ভারতবিখ্যাত এই মনীষীর নাম তিনি নিশ্চয় শুনিয়া থাকিবেন। ইংরেজি ভাষাতেও এঁর যথেষ্ট বুৎপত্তি ছিল। প্রথম জীবনে রচিত Rajmohan’s Wife ইহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর আনন্দমঠের কথা তো ছাড়িয়াই দিলাম। তাঁহার রচিত বন্দেমাতরম তো বিপ্লবীদিগের পবিত্র মন্ত্র ধ্বনি হইয়া উঠিয়াছিল। গোখলে যখন অগ্রগামী বাঙালির কথা ভাবিয়াছিলেন, নিশ্চয় বঙ্কিমচন্দ্রকে বাদ দেন নাই! কী বলিলেন? গোখলে বঙ্কিমকেও ধরেন নাই কারণ উনি চরম সাম্প্রদায়িক ছিলেন? আনন্দমঠের পাতায় পাতায় মুসলমান বিদ্বেষ? বেশ ইহাও মানিয়া লইলাম। অগ্রবর্তী বাঙালি হিসাবে উনি বঙ্কিমকেও ভাবেন নাই। তবে কাহাদের দেখিয়া তিনি এই উচ্চারণে উপনীত হইলেন? নিশ্চয় যদুনাথ সরকার। গোখলের জন্মের মাত্র চার বৎসর পর অর্থাৎ ১৮৭০ খৃষ্টাব্দে এঁর জন্ম। প্রখ্যাত এই বাঙালি ঐতিহাসিক কেবল ভারত নয়, বিশ্বেও সুপরিচিত এবং সমাদৃত। ঔরঙ্গজিব, শিবাজী, ভারতে ইসলামি শাসন ইত্যাদি ব্যক্তি এবং বিষয়ের উপর তাঁহার গবেষণা এবং রচনা শ্রদ্ধা জাগায়। কী বলিলেন? ইনিও গোখেলকে প্রভাবিত করেন নাই যেহেতু ইনি চরম ইসলাম তথা মুসলমান বিদ্বেষী ছিলেন। ঔরঙ্গজিবের মূল্যায়ন অত্যন্ত নেতিবাচক ভঙ্গিতে করিয়াছিলেন, ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা তো করেনই নাই বরং প্রশংসাই করিয়াছিলেন। ও হরি! ইনিও বাদ! তবে আর কে বাকি থাকিল? তবে নিশ্চয় রমেশচন্দ্র মজুমদার? ১৮৮৪ অর্থাৎ গোখলের জন্মের ১৮ বছর পর এঁর জন্ম হয়। প্রখ্যাত এই ঐতিহাসিকের নাম কেবল এদেশ নয়, সমগ্র বিশ্বেই সুবিদিত। যদিও স্বাধীনতার পর জহরলাল নেহেরু এঁকে ভারতের ইতিহাস লেখার আমন্ত্রণ জানাইয়াও পিছাইয়া যান। কী বললেন? ইনিও বাদ? গোখলে এঁকেও গুরুত্ব দেন নাই? অগ্রগামী বাঙালি চিন্তকের মধ্যে এঁরও কোনো স্থান নাই ? কেন বলুন তো? ও হ্যাঁ মনে পড়িয়াছে। ইনিও তো আপনাদিগের চক্ষে হিন্দুত্ববাদী! কারণ ইনি পরিষ্কার বলিয়াছিলেন, ১১৯২ সালে পৃথ্বীরাজ চৌহানের পরাজয়ের পর হইতেই এদেশের পরাধীনতার সূত্রপাত, পলাশীর যুদ্ধের পর নহে। অর্থাৎ ইসলাম শাসককুলই এদেশকে প্রথম পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে। বলেন কী! তবে তো ইনিও ইসলাম বিদ্বেষী অর্থাৎ আপনাদিগের মতে হিন্দুত্ববাদী চাড্ডি! বেশ ইনিও বাদ! সর্বনাশ! তবে বাকি থাকিল কে! নেতাজী তো গোখলের জীবনকালে পাদপ্রদীপের আলোতেই পৌঁছাইতে পারেন নাই। ১৯২০ সালের পর জাতীয় কংগ্রেসে তাঁহার উপস্থিতির সুবাস! তবে বাকি থাকিল কে? মনে পড়িয়াছে! স্বামী বিবেকানন্দ! গোখলের জন্মের মাত্র ৩ বৎসর পূর্বে এই অনন্যসাধারণ ভারত মনীষার আবির্ভাব ঘটে। তাঁর কীর্তিকথা নূতন করিয়া আর কী বলিব! আহা কী ব্যক্তিত্ব! কী দীপ্তি! কী বোধ! কী মনন! কী বলিলেন? ইনিও বাদ? গোখলে মোটেই এঁর কথা ভাবিয়া বাঙালিকে অগ্রবর্তী বলেন নাই! কিন্তু কেন? হা হা হা! বুঝিয়াছি! উনিও তো আপনাদিগের চক্ষে হিন্দুত্ববাদী চাড্ডি! এই মহান মনুষ্যটিকে আপনারা কীরূপে মূল্যায়ন করিয়া থাকেন, কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করিলেই বোধগম্য হয়। তবে গোখলে কাহার কথা ভাবিয়া বাঙালিকে অগ্রগামী কহিয়াছিলেন? নিশ্চয় শরৎচন্দ্র? কিন্তু ইনিও তো ঘোর ইসলাম বিদ্বেষী। “মহেশ” নামক গল্পটিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধু থাকিলেও [গল্পকে গ্রহণীয় এবং নান্দনিক করিতে হইলে কল্পনার আশ্রয় লইতেই হয়] “বর্তমান হিন্দু মুসলমান সমস্যা” শীর্ষক প্রবন্ধটিতে গান্ধী, খিলাফত, জিন্নাহ, ইসলাম তথা স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমান সম্প্রদায়ের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে যাহা লিখিয়াছেন, বামাবতারকুলের গুপ্ত এবং প্রকাশ্য সকল কেশই জ্বলিয়া উঠিবে! হা হতোস্মি! তবে কে বাকি রহিল! নিশ্চয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর! কিন্তু উনিও তো হিন্দু ধর্মকে তুলোধনা না করিয়া, হিন্দু আইডেন্টিটির পিণ্ডি না চটকাইয়া বরং উহাকে কিরূপে সংস্কার করা যায়, আধুনিক সময়ের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ করিয়া গড়িয়া তোলা যায়, সেই মহান কর্মেই ব্রতী হইয়াছিলেন। অর্থাৎ হিন্দু আইডেন্টিটিকে নস্যাৎ না করিয়া উহাকে যুগোপযোগী এবং বিজ্ঞানসম্মত করিবার কাজে আত্মনিয়োগ করিয়াছিলেন। খিস্তি প্রদান করিয়া তুমুল খ্রিস্টান অথবা মুসলমান হইয়া যান নাই।না, এই মহামানবটিকেও আপনাদিগের তেমন পছন্দ নয়। নহিলে সত্তরের দশকে বিপুল ধক্কা নিনাদ করিয়া এঁর মূর্তি ভাঙিলেন কেন? রামমোহনও বাদ যায় নাই। আপনাদিগের চক্ষে বরণীয়, স্মরণীয় হইয়া উঠিবার নিমিত্ত যাহা যাহা লাগে, এঁদের ভাঁড়ারে ছিলনা। তবে কে বাকি রহিলেন? অবশ্যই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ! গোখলের মৃত্যুর দুই বৎসর পূর্বে ইনি নোবেলজয়ী হইয়াছিলেন। ভারত তথা এশিয়ার প্রথম নোবেল! কী বলিলেন? এঁকেও তেমন পছন্দ করেন না! স্বাভাবিক! ভুলিবেন কি করিয়া ইনিই “বন্দী বীর” নামক “কুখ্যাত” কবিতাটি লিখিয়া ইসলামি শাসকের প্রকৃত স্বরূপ দেখাইয়াছিলেন! তেনাদের বিরুদ্ধে কিছু বলিলেই তো আপনারা ক্ষিপ্ত হইয়া ওঠেন। দেশ ভাঙার দোসর যে! একই পথের পথিক হইলে প্রেম তো থাকিবেই। সর্বাপেক্ষা বড় অন্যায় এই যে মার্ক্সবাদী বামপন্থার এমন স্বর্ণযুগে অবস্থান করিয়াও উনি কম্যুনিস্ট হইলেননা। রাশিয়া ভ্রমণ করিয়া গদগদ হওয়া দূরের কথা, নেতিবাচক পর্যবেক্ষণের ঝড় তুলিলেন ![ যদিও কিঞ্চিৎ প্রশংসাও করিয়াছিলেন] তাই রবি ঠাকুরও আপনাদিগের চক্ষে “বুর্জোয়া কবি” হইয়া উঠিলেন৷ পরে অবশ্য হাওয়া বুঝিয়া বড়সড় ডিগবাজি খাইয়াছিলেন। বুর্জোয়া রবিকে ব্যাপক মান সম্মান দান করিয়া প্রচারের কম্মে লাগাইয়াছেন৷ পাবলিকের মুড বিগড়াইয়া যাইতে পারে এই ভাবিয়া। ভোট বড় বালাই যে। ইদানীং বিবেকানন্দ লইয়াও তদ্রূপ চিন্তাভাবনা চলিতেছে! কারণ বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ, রবি ঠাকুরকে বর্জন, বিসর্জন করিয়া যে বাঙালির মন পাওয়া যাইবেনা, হাড়ে হাড়ে বুঝিয়াছেন।
হে বামাবতার, অনুগ্রহ করিয়া অবধান করুন। মহামতি গোখলে যাঁহাদের দেখিয়া, বুঝিয়া, উপরিউক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছিলেন, তাঁহারা কেহই মার্ক্সবাদী বামপন্থী ছিলেননা। ভূভারত কেন, সমগ্র ভূভাগেও তখন মার্ক্সবাদী বুদ্ধিজীবীর অস্তিত্ব ছিলনা। কার্ল মার্ক্সের নাম কেহ কেহ শুনিলেও লেনিনের “মহান” কর্মসূচী নভেম্বর বিপ্লব তখনও ময়দা মাখিতেছিল, লেচি পাকানোর কর্মটিও সম্পন্ন হয় নাই। গোখলে যাহাদের দেখিয়াছিলেন, পড়িয়াছিলেন, মুগ্ধ হইয়াছিলেন তাঁহারা সকলেই দক্ষিণপন্থী, জাতীয়তাবাদী মনীষা! প্রায় সকলেই ইসলাম বিদ্বেষী এবং বলাই বাহুল্য হিন্দু আইডেন্টিটির ধারক এবং বাহক।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে যাহা ঘটিতেছে, হিন্দু আইডেন্টিটির নামে যাহা বলা, শোনা, লেখা হইতেছে তাহা নূতন কিছু নহে, স্বাধীনতার পূর্ববর্তী বাঙালি মনীষার স্মরণ এবং অনুসরণ মাত্র৷ বিবেকানন্দ, বঙ্কিমচন্দ্র, রমেশচন্দ্র, যদুনাথরা নূতন করিয়া জাগিয়া উঠিয়াছেন। বর্তমান প্রজন্ম উহাদের উত্তরসূরী মাত্র। তবে কোনো রাজনৈতিক দল নহে, চিন্তাশীল, মননশীল মনুষ্যের কথাই বলিতেছি। ইহার প্রতিফলন তো রাজনীতিতে ঘটিবেই। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কালে বিশেষ করিয়া সুদীর্ঘ বাম শাসনে এই রাজ্যের যে সমূহ সর্বনাশ ঘটিয়াছে, যাহার ক্লাইম্যাক্স হিসাবে রাজ্যবাসী অদ্যাপি যে নরক যন্ত্রণা ভোগ করিতেছেন, তাহার প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ হিসাবেই এই হিন্দু আইডেন্টিটির উত্থান।
“আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ” এর মহাকবিটি এই আইডেন্টিটি, বসুধৈব কুটুম্বকম- এরই প্রতিফলন। তাঁহার নোবেল, তাঁহার গীতাঞ্জলি – greatest prayer songs of the world — এই আইডেন্টিটিরই উত্তরাধিকার। ইহা নূতন নহে। পূর্বেই বিদ্যমান ছিল। সুপরিকল্পিত চক্রান্তের ফলে মাটি চাপা পড়িলেও অন্তঃসলিলা ফল্গুর ন্যায় ধিকিধিকি জ্বলিতেছিল। উপযুক্ত আলো বাতাস পাইয়া স্ফুরণ ঘটিয়াছে মাত্র। এই উত্থান আসলে continuation, কোনো মতেই introduction বা inititiation নহে। স্বাধীনতা পরবর্তী পশ্চিমবঙ্গে সুদীর্ঘ বাম শাসনের প্রকোপে সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি ইত্যাদি সর্ব স্তরে যে অবক্ষয়, সংকীর্ণতা, একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির প্রচার, এবং প্রসারে বাংলা তথা বাঙালির যে সমূহ সর্বনাশ ঘটিয়াছে, এই হিন্দু আইডেন্টিটির উত্থান তাহার প্রতিক্রিয়া মাত্র। মধ্যবর্তী সময়কালে কিঞ্চিৎ ছেদ পড়িয়াছিল মাত্র। ইহাতে বিস্ময় অথবা লজ্জার কিছু নাই। বরং গৌরবের অবকাশ আছে। ইসলামি মৌলবাদের পৃষ্ঠে চড়িয়া মাক্সবাদী বামপন্থা যেদিন “জয়যাত্রায়” বাহির হইয়াছিল [অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে] তাহার অনেক পূর্বেই ভারত তথা বাঙালির সাহিত্য সংস্কৃতির ভিত্তি স্বরূপ এই বহুত্ববাদী হিন্দু আইডেন্টিটির প্রকাশ এবং প্রতিফলন। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি দর্শন এবং মহাকাব্যের ভাণ্ডার যখন রচিত হইয়াছিল তখন আপনাদিগের মার্ক্স এবং মহম্মদ ভবিষ্যতের অতলে নিদ্রামগ্ন ছিলেন। বিশ্ববাসী এই দেশটিকে অদ্যাপি যে যে কারণে চিনিয়া থাকে, শ্রদ্ধায় মাথা নত করে তাহাতে বামাবতারদিগের কোনো অবদান নাই। বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায় – এই সকল রত্ন ভান্ডার, মণি মাণিক্যের ভেতর আপনি কি কোনো মার্ক্সবাদী বামপন্থী দেখিতেছেন ? ভাত রুটির একদেশদর্শী চোরাগলিতে পথ হারানো মগজ এবং মনন আইডেন্টিটির হদিশ পাইয়াছে। ক্ষুধা কাব্যের চর্বিত চর্বন নহে, শেকড়ের সুবাস মাখিয়া চিন্তনের সমুদ্র সন্তরণ করিবার প্রস্তুতি লহিতেছে।সে বুঝিয়াছে প্রলেতারিয়েত সাহিত্য মাত্রেই বদ্ধ ঘর, আইডেন্টিটির সাধনাই জানালার জন্ম দেয়। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন একদেশদর্শী ডোবাটিকে বসত বানাইয়া তোলেন, রবি ঠাকুর সমুদ্র অভিযানে বাহির হন।

মহামতি গোখলে যাঁহাদের দেখিয়া What Bengal thinks today, India thinks tomorrow উচ্চারণ করিয়াছিলেন, তাঁহারা প্রকৃত অর্থেই বুদ্ধিজীবী ছিলেন৷ তাঁহাদের সময় পেট্রো ডলারের রমরমা ছিলনা, গালাগালে পরিণতি হওয়া “বুদ্ধিজীবী” শব্দটি কত ঢ্যামনা হইতে পারে তাহাও কল্পনারও অতীত ছিল ।

হে বামাবতার, বেশ বুঝিতে পারিতেছি, আপনার চিত্তবৈকল্য উপস্থিত!কারণ বাঙলা তথা বাঙালির চিন্তন ভান্ডারে যে মণি মুক্তার বিচরণ, [অবশ্যই আন্তর্জাতিক খ্যাতির কথা বলিতেছি] তাহাতে আপনাদিগের অবদান নাই বলিলেই চলে ! যৎকিঞ্চিত যাহা আছে তাহা বদ্ধ ডোবা মাত্র, যাহাকে আপনারা সমুদ্র জ্ঞান করিয়া মনন এবং মগজ উভয়কেই ভাগাড়ে পরিণত করিয়াছেন। তবে মন খারাপ করিবেন না। একটি সহজ উপায় নিবেদন করি যাহাতে যন্ত্রণা লাঘব হইবে। আচ্ছা এরূপও হইতে পারে। মহামতি গোখলে টাইম মেসিনে চাপিয়া ভবিষ্যতের পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত হইলেন । তেমন বাড়াবাড়ি রকমের ভবিষ্যৎ না হইলেও চলিবে। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ। হাঁ ইহাই যথেষ্ট। কী দেখিলেন? বিশ্ববন্দিত বামপন্থী কবি সমর সেন তাঁহার প্রথম কাব্য গ্রন্থটি আরেক বিশ্ববন্দিত বামপন্থী দার্শনিক, তাত্ত্বিক এবং ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজফর আহমেদকে উৎসর্গ করিতেছিলেন! আহা কী নয়নাভিরাম দৃশ্য! তিনি দুচোখ ভরিয়া দেখিলেন। এত পুলকিত হইলেন, এত পুলকিত হইলেন যে স্থির করিলেন অগ্রগতির কাণ্ডারি এই পশ্চিমবঙ্গে আরও কিছুকাল অবস্থান করিবেন। অতঃপর, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,দীনেশ দাস, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অমিতাভ দাশগুপ্ত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, নবারুণ ভট্টাচার্য, ঋত্বিক ঘটক, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, অসীম চ্যাটার্জি, আজিজুল হক, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য, হরেকৃষ্ণ কোনার, বিনয় কোনার, লক্ষ্মণ শেঠ, সুশান্ত ঘোষ, সূর্যকান্ত মিশ্র ইত্যাদি সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, তাত্ত্বিক নেতা, কাণ্ডারি এবং লিটিল ম্যাগের বামাবতার কবি সাহিত্যিকুলের মহান কীর্তি কলাপ দেখিয়া চরম অভিভূত এবং ব্যাপক বিগলিত হইয়া উঠিলেন। মুষ্ঠিবদ্ধ দক্ষিণ হস্তটিকে উত্তোলিত করিয়া, আকাশ বাতাস কাঁপাইয়া দিয়া সোচ্চারে ঘোষণা করিলেন —
What Bengal thinks today, India thinks tomorrow

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here