উত্তরণ

0

Last Updated on

কৃষ্ণলাল সরকার

শ্যামবাজার থেকে যশোর রোড ধরে উত্তরপুবমুখী বাসে আসতে, নাগেরবাজার ছাড়াবার কিছু পরে বাঁদিকে চোখ মেললে দেখা যায় এক বিশাল উঁচু পাঁচিল অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে রেখেছে বিঘা পঁচিশেক একটা জায়গাকে। এখানে এসে বাস কন্ডাকটার হাঁক পাড়ে ‘সেন্ট্রাল জেল, সেন্ট্রাল জেল।’ অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এখানে কারার এই লৌহপ্রাচীর। এটাই দমদম সেন্ট্রাল জেল! কলেজ ফেরতা নন্দুর বাসের জানালা দিয়ে অনেকবারই চোখে পড়েছে এটা; আজ এই কালো প্রিজন ভ্যানের ভিতরে বসে এক নতুন চোখে আবার এটিকে দেখতে লাগল। সে তাহলে আজ থেকে আসামী হয়ে জেলে ঢুকছে! আবার যেমন তেমন না, নকশাল আসামী!

চারু মজুমদার এখানে বন্দী ছিলেন? আর সঙ্গে জ্যোতি বসু? চিন্তা করতে গিয়ে মনে মনে ফিক করে একটু হেসে নিল নন্দু ওরফে নন্দলাল। আচ্ছা সুভাষচন্দ্র বসুও ছিলেন নাকি এখানে? আর ক্ষুদিরাম? জিজ্ঞাসা করা যায় কাকে? পুলিশের কালো রঙের লম্বা প্রিজন গাড়িটা যশোর রোড থেকে বাঁক খেয়ে জেলগেটের দিকে ঘুরতেই নন্দুর মাথায় এইসব হিজিবিজি চিন্তা ঢুকে গেল।

নন্দু বারাসাতে তাদের নপাড়ার বাড়ি থেকে কলেজ যেত প্রায়ই এই রাস্তায়, শ্যামবাজারের বাসে চেপে। যেতে যেতে কতবার বাসের জানালা দিয়ে এই জেলের পাঁচিল দেখেছে উদাস চোখে, কোনো বিশেষ ভাবান্তর হয়নি তখন। আজ আবার সে চলেছে সেই পথে, তবে বাসে নয়, কালো রঙের পুলিশ ভ্যানে চড়ে, একেবারে রাজ অতিথি হয়ে।

অবশ্য সত্যি করে বলতে গেলে তার রাজ অতিথি হবার যোগ্যতা নেই একেবারেই; কেননা নন্দু নকশাল কিনা সে নিজেই জানেনা। মনে মনে ওদের সমর্থন করতো হয়তো আর পাঁচটা কমবয়েসি ছেলে-ছোকরাদের মতো। কলেজ ক্যান্টিনে নকশালবাড়ির রাজনীতি করা ছেলেগুলোর সঙ্গে দহরম মহরমও ছিল কিছুটা। এর বেশি সে ছাত্র রাজনীতির গভীরে ঢোকেনি। দূর থেকে দেখেছে শুধু ওদের কান্ডকারখানা। কিন্তু ‘আমি কোনোকিছুর সাতে পাঁচে নেই, ছাত্র রাজনীতি করিনা’ বললেই রাজনীতি তাকে ছাড়বে কেন? যখন নকশালপন্থীরা কলেজ ক্যান্টিন, পাড়ার চায়ের দোকান কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে তাদের নতুন পাওয়া বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে; পুলিশের সঙ্গে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনীতি করা সিপিএমের কর্মীদের সঙ্গে নিত্য নতুন লড়াই চালাচ্ছে পথে ঘাটে, তখন আমি শুধু পড়াশোনা নিয়ে আছি বললেও মনে একটা রাজনীতির ছাপ এসে যাবেই। বাস! এই পর্যন্ত হল তার রাজনীতির দৌড়!

নন্দু আজও ভোরে মর্নি কলেজে গিয়েছিল রোজকার মতো। এদিকে যে পাড়ায় নকশাল আর পুলিশে খন্ডযুদ্ধ হয়ে গেছে সে কিছু জানত না। কলেজ থেকে ফেরার সময় বাড়ির গলির মুখে একেবারে টহলদারি পুলিশ স্কোয়াডের মুখোমুখি। আর পড়লো তো পড়লো, তার কপালও পুড়ল। পাড়ার অন্য এক ঢ্যাঙা নকশালের সঙ্গে চেহারার মিল দেখে তাকে ভুল করে ধরে নিয়ে এসেছিল থানার বাবুরা। তারপর থেকে চলছে ভোগান্তি। জীবনে এই প্রথম পুলিশ থানার চৌহদ্দিতে পা পড়ল, তারপর আবার ঢোকার পরেই পিছনে এক রদ্দা দিয়ে লকআপে চালান্ । বাপ মা নেই, মামাবাড়িতে থাকে। গরীব মামা ফিরেও তাকায়নি পুলিশের ভয়ে। জামিন চাইবে কে? তাই জামিনও পায়নি।

কাল থেকে পরপর নন্দুর যা সময় চলেছে! ধরা পড়ার পরে থানা লকআপে ঢুকে প্রচন্ড ঘাবড়ে গিয়েছিল সে। ওঃ, সে কী অবস্থা! মেরে কেটে আট বাই দশের একটা জানালাবিহীন স্যাঁতসেতে ঘর, সেখানে আগে থেকে পাঁচ ছজন সাধারণ বন্দি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে শুয়ে বসে আছে। তারও স্থান হল ওদের মধ্যে।

‘কিবে তোর কী কেস? পকেটমার?’ এক ষন্ডা মার্কা গেঁজেল চেহারার লোক নন্দুকে স্বাগত জানালো।

‘আবে নাবে, মাকু নকু হবেরে সালা! দ্যাখতাছোস না পকেটে পেন গোঁজা, চউখে বাহারি চশমা! এস্ শাল্লা নকু হবে ঠিক’। নন্দুকে উত্তর না দিতে দেখে পাশ থেকে আর এক গুলিখোরের মত চেহারার ঢ্যাঙা বলে ওঠে। এরপর কিছুক্ষণ তাকে নিয়ে শুরু হল যথেচ্ছ হাসিঠাট্টা, খামচাখামচি র‍্যাগিং; যতক্ষণ না এক কনস্টেবল বাবু ধমক দিয়ে তাদের থামায়।

র‍্যাগিং বস্তুটা তাহলে শুধু তাদের কলেজ ছাত্রদের একচেটিয়া নয়। তাদের কলেজে প্রায় সবাই বাড়ি থেকে এসে কলেজ করে ফিরে যায়, হস্টেলে থাকেনা। কিন্তু র‍্যাগিং ঠিক চালু আছে, ক্যান্টিনে বা কলেজ কমন রুমে। সেখানে নতুন ছেলেদের সঙ্গে আলাপ জমাতে আর তাদের উপর দাদাগিরি ফলাতে র‍্যাগিং এর জুড়ি নেই। ‘এখানেও দেখছি তাই! বেশতো, তাহলে এখন র‍্যাগিংটাই এনজয় করা যাক, সারাদিন যা গেছে!’

রাতটা এই লকআপেই কাটতো হয়তো, কিন্তু ছোট্ট এইটুকু ঘরে স্থানাভাবের কথা চিন্তা করে মনে হয় বড়বাবুর দয়া হল। দ্রুত কোর্টে চালান হয়ে গেল তারা। তারপর কোর্টের রায় জেল-কাস্টডি। লম্বা কালো পুলিশ ভ্যানটা সটান গেট পেরিয়ে ঢুকে গেল জেলখানার অফিস ঘরে। তারপর হল আর এক অভিজ্ঞতা, শুরু হল তাদের জেলবন্দী হিসাবে অভিষেক পর্ব। জামা-প্যান্টের পকেট তন্নতন্ন করে সার্চিং করে পেন-পেন্সিল টাকাপয়সা মায় বিড়ি সিগারেট দেশলাই সব জমা করে রেখে নামের পাশে লিখে রাখল।

‘এগুলো ছুটি পাবার দিনে পাবে বুঝলে?’ সাদা খাদির জামা আর হাফ প্যান্ট পরা লোকটি বলল। পরে জেনেছিল ইনি “রাইটারবাবু”। পড়া লেখা জানা দীর্ঘকালীন সাজা পাওয়া বন্দীদের এই ডিউটি দেওয়া হয়। লোকটি ভাল, থানার সেপাইদের মতো অযথা রুক্ষ নয়।

জেলার বাবু ছিলেন অফিসের ভিতরের ঘরে, তাঁর সঙ্গে তখন সাক্ষাৎ হলনা। রাইটারবাবুই সই সাবুদ করে ঢুকিয়ে দিলেন আর একটা গেটের ভিতরে। পিছনে তখন ঘটাং করে বন্ধ হয়ে গেছে লোহার দরজা। ব্যাস! নন্দু এখন বন্দী, শত কান্নাকাটি করলেও মুক্তি নেই।

*

*

কেষ্টবিল

জেলে ঢুকে সবার ঠাঁই হয় আমদানি ফাইলে, মানে বাইরে থেকে আমদানি যারা, সেই আয়ারামের দল থাকে এই বিশাল হলঘরে। নন্দুও আমদানি ফাইলে রাত কাটিয়েছে গতকাল, উকুনভরা নোংরা কম্বলের বিছানায় শুয়ে শুয়ে নন্দুর প্রথম রাতটা প্রায় না ঘুমিয়েই কাটল। আর সেখানেও সিনিয়ার মেয়াদি, মানে যারা সাধারণত খুনের কেসে যাবজ্জীবন সাজা খাটছে, সেই মেটদের হাতে কম নাকাল হয়নি। এখানেও সেই র‍্যাগিং! তবে এখানে কলেজের মতো সফট-টিজিং না, খুব কড়া আর জবরদস্ত হাতের কড়কানি । নিজেদের কাজগুলো এদের দিয়ে করিয়ে তো নেয়ই, না করলে মারধরও করে। সকালে নন্দুকে নতুন আর ভালোমানুষ পেয়ে অনেক খাটিয়ে নিয়েছে, এমনকি আমদানি কয়েদিদের রাতের ময়লাও তাকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়েছে। এরপর দাতমুখ পরিষ্কার করা, সেটাও ফাইল করে অর্থাৎ লাইন বেঁধে, নিয়ম মেনে। এখানে সবকিছুর নামই ফাইল। সকালের খাবার শুকনো চিড়া আর গুড়ের একটা দলা, নাস্তা ফাইল। জল দিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে খাও। বেশ “এলাম নতুন দেশে” ভাব হচ্ছিল তখন নন্দুর মনে।

সকাল থেকেই শুনছিল, ‘কেষ্টবিল, কেষ্টবিল, জোড়া জোড়া লাইন কর’। কথামতো মেসিনের মত না চললেই মেটের বেল্টের বাড়ি। কেষ্টবিল কীরে বাবা! অগত্যা দেখাই যাকনা মনোভাব নিয়ে সকালের চিড়েগুড় নাস্তা খেয়ে জোড়া জোড়া লাইন করে কেষ্টবিলের দিকে রওনা দিয়েছিল। পৌঁছে গিয়ে, ‘ওহরি, এ যে কেস-টেবল্! জেলার সাহেবের দরবার, এখানে নতুন বন্দীদের, আর পুরোনোদের মধ্যে যাদের আগেরদিন কোর্টে হাজিরা ছিল তাদের নাম রেজিষ্ট্রি হচ্ছে। জেলগেটের বাইরে থেকে এলে সে আমদানি বন্দী, এখানে নাম রেজিস্ট্রি করলে সে জেলের বাসিন্দার দলে ঢুকে গেল, যতদিন না ছাড়া পায়। আবার কোর্টে পাঠাবার সময়ও নাম কেটে দিয়ে জেলের আবাসিকদের গুনতি ঠিক রাখে। ফিরে এলে আবার ‘কেষ্টবিল!’ ব্যাপারটা বোঝার পর নন্দুর মত শান্তশিষ্ট ছেলেও হোহো করে হেসে ফেলেছিল।

এ এক আজব অভিজ্ঞতা বটে! জেলখানার পাঁচিলটা এতোবার দেখেছে বাইরে থেকে, কই কখনোতো মনে হয়নি এর ভিতরে কী আছে একবার জেনে নেয় কারো কাছে। অবশ্য বন্ধুমহলে, এখানে সেখানে জেলের ঘানি ঘোরানোর কথা শুনেছে বটে; চুরি করলে নাকি জেলের ঘানি ঘোরায়! আনমনে ভাবতে লাগল নন্দু, তাকে তাহলে কি এবার জেলের ঘানি ঘোরাতে হবে? বেশতো ঘানি না ঘোরাতে হোক জেলের ঘানি ঘরটা একবার দেখা যেতেই পারে, যাতে পরে বন্ধুমহলে গল্প করতে পারে।

‘এই তোর নকশাল কেস? একটুও ভয় পাবিনা। আমাকে দেখছিস না?’ কেষ্টবিলের জমায়েতের এক কোনায় তার জড়সড়ো হয়ে বসে থাকা দেখে একটা সদ্য গোঁফগজানো ছেলে এগিয়ে এল তার দিকে। ‘আমি গোরা, আমি পুরনো ঘাগু রে, তোর মত নতুন না, কাল কোর্টে নিয়ে গিছল তাই আমদানি ফাইলে ছিলাম তোর মত।’

ছেলেটার দিকে সবার আগেই চোখ পড়েছিল ওর ডোন্ট-কেয়ার হাবভাব দেখে। সবাই যেখানে উবু হয়ে “জোড়ায় জোড়ায় বইঠ্” হুকুম তামিল করছে, আর বয়েসে সবার থেকে ছোটো ছেলেটা এসবে পাত্তা তো দিচ্ছেই না বরং উল্টে মেটরাই যেন ভয় করছে তাকে। তার বেপরোয়া ভাব জেলার দেখেও না দেখার ভান করছে, একে ঘাঁটাবেনা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। ইউনিয়ন লিডার নাকিরে বাবা!

নন্দু ছেলেটার দিকে মুখ তুলে চাইল এবার, কিছুটা ভয়ে ভয়েই। কাল থেকে তার শুধু ভয়ের সময় চলেছে, জেলের ভয়, তারপরে আমদানি ফাইলে মেটদের বেল্ট আছড়ানী শব্দের ভয়, এখানে জেলারের গম্ভীর মুখের ভয়; কাল সন্ধ্যায় এখানে ঢোকার পর থেকেই ভয়ে সিটকে আছে সে। আবার গোরার কী মতলব আছে কে জানে!

গোরার সাথে পরিচয় হল এরপর, সার্থক নাম বটে। গোরাতো গোরাই, ফর্সা সুন্দর চেহারা যেমন, তেমন কাছে টেনে নেবার ক্ষমতা। ‘তোর নাম নন্দলাল? বেশ তো। তবে নন্দু নামটাই চলবে ভাল। আমার নাম তো শুনলি, আমি এড়েদার, তুই?’

অন্য ‘আমদানি’ বন্দীদের মুখে গোরা ডাকটা শুনে নামটা আগেই জেনে গিয়েছিল, এবার মুখোমুখি কথা চালু হল। আর তক্ষুনি সেই ভয়ের জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এল নন্দু। গোরার সঙ্গে খুব সহজেই ভাব জমে গেল, যেন এই নির্বান্ধব পুরীতে গোরা তার ঈশ্বরের আশীর্বাদ।

‘নন্দলাল ঘোষ…’, ডাকটা শুনে উঠে দাঁড়াতে একজন রাইটার বাবু, তার হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দিল। লোকটাকে দেখে খারাপ লাগল না, আমদানি ফাইলের মেটগুলোর মত অভদ্র আর রাগী নয়। তাকে সাহায্য করল, জেলের নিয়ম কানুন কিছুটা বুঝিয়েও দিল। এইবার তার একটা ঠিকানা হল, আমদানি ফাইল থেকে বেরিয়ে এবার পাঁচ নম্বর ফাইল। গোরার সঙ্গে একই ফাইল, দুজনকে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে দেখে তাদের এক দলের ঠাউরেছে। ভালোই হল গোরাকে সঙ্গী পেয়ে। এতক্ষণে যেন তার ভীতু আর জবুথবু ভাবটা কেটে গেল।

*

পাগলি

কেস টেবল যখন শেষ হল, সুর্য তখন মাথার উপরে। সেই কোন সকালে পেটে চিড়ে গুড় পড়েছে, পেট চোঁচোঁ করছে নন্দুর। হঠাৎ নন্দুর ধারে কাছে হঠাৎ ফুটবল রেফারির বাঁশি বেজে উঠল যেন, ঠিক অফ-সাইডের বাঁশির মত। এটা কী ভাবতে ভাবতেই এর সাথে তাল মিলিয়ে শয়ে শয়ে রেফারির বাঁশি বেজে উঠল। হলোটা কী! এ বাঁশি যে থামার লক্ষণ নেই একেবারে! বেজেই চলেছে ফ্রু… ফ্রু ফ্রু! ফ্রু…ফ্রু…ফ্রু! জেলখানার হুটারের আওয়াজ শুরু হল একটু পরে ওঁওঁও…, সঙ্গে এক জোরালো ঘন্টা বেজে উঠল ঢংঢংঢংঢং…, বাজলো ত বাজল তার আর থামার নাম নেই, বেজেই চলল একটানা।

‘পাগলি! পাগলি!’ চিৎকার উঠল চারদিকে এবার, আর তার সাথে শুরু হল ছুটোছুটি দৌড়োদৌড়ি। সবাই ছুটছে জেলখানায় তাদের নিজের নিজের ঘরের দিকে। চারদিকে চিৎকার ভেসে আসছে ‘ফাইল…ফাইল!’ কেষ্টবিল থেকে ফিরছিল নন্দু, ফেরার পথে এবার আর জোড়ায় জোড়ায় লাইন নেই। মূহুর্তের মধ্যে আশপাশের সব দৌড় দিল নিজের নিজের আস্তানায়, সে একা হয়ে গেল এই বিশাল জেল চত্বরে। ফেরার পথে একি বিপত্তি রে বাবা! কোথায় পাগলি? চারিদিকে তাকিয়ে নিল একবার নন্দু। না কোনো মহিলার ছায়াও দেখা যাচ্ছেনা। আর এই “ফাইল ফাইল” চিৎকারেরই বা কী মানে?

এদিকে জেল সেপাই আর সাজা পাওয়া জেলবন্দী মেয়াদিদের, দৌড় আর দাপাদাপি চলছেই চারিদিকে। এদের কারো হাতে লাঠি কারো হাতে বন্দুক। যাকে সামনে পাচ্ছে তাড়া করছে। সবাই ছুটে চলেছে ঘরের দরজার দিকে। নন্দু তখন হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মাঝে, বুঝে পাচ্ছেনা কোন দিকে যাবে, তার ঘর তো সেই দোতালায়। সেদিক থেকে ভেসে আসছে মেয়াদি মেটদের আস্ফালন, এরা কোমরের চওড়া চামড়ার বেল্ট খুলে যাকে সামনে পাচ্ছে পিটিয়ে দিচ্ছে।

নন্দুর সাধারণ বুদ্ধি এমনিতেই কম, তায় এইরকম পরিস্থিতি যেখানে বুদ্ধিমানেরও বুদ্ধিভ্রংশ হয়ে যায়! “ফাইল ফাইল” কথাটার মানে তার মাথায় ঢুকছেনা। কোথায় যাবে এই দৌড়োদৌড়ির মধ্যে তাও বুঝতে পারছেনা। চার দিকে তাকালে নজরে আসে শুধু উঁচু উঁচু জেল পাঁচিল। তার মধ্যে একদিকে লম্বা সারি সারি দোতলা বাড়ি, আর একদিকে ফাঁকা মাঠ। এই বড় বড় দোতলা বাড়িগুলোই ফাইল হবে, এরই কোনো একটায় সে কাল রাত্তিরে রাত কাটিয়েছে। কোনটায় মনে আছে নাকি? কোথায় যাবে বুঝতে না পেরে তাই হতবুদ্ধি হয়ে মাঠের ভিতরেই দাঁড়িয়ে থাকল।

দিশাহারা কেবলার মত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়ান নন্দুর দিকে এক বিশাল গোঁফের পাঠান সেপাই লাঠি উঁচিয়ে তখন তেড়ে এসেছে। তার লাঠির বাড়ি নন্দুর পিঠে পড়ার মুখে কোথা থেকে গোরা এসে হাজির, ‘হেই সিপাইজি, আমার আদমি!’

‘তো লে যাও উসকো, কানুন সিখাও!’ বলে শিকার হাতছাড়া হবার রাগে এক অশ্রাব্য গাল দিয়ে ওঠে ।

‘এই হাবা, যে কোনো একটা ঘরে ঢুকে পড়!’ বলে তার হাত ধরে টেনে দৌড়ে চলল ঘরের দিকে। ঘরে ঢুকে শান্তি! ও! এখানে কেউ আর লাঠি নিয়ে তেড়ে আসছেনা। এখানে আবার শুরু হল ‘জোড়ায় জোড়ায় বইঠ্’।

নন্দুর ভয়ে হাতপা সিধিয়ে গেছে তখন, ‘এবার কী হবে রে গোরা?’

‘দূর বোকা ভয় পেয়ে গেলি? এবার “গিনতি”হবে। মানে সব ঘরের আসামীদের গুনতির ফল জেলারের ঘরে যাবে। সেখানে খাতায় কলমে এরা মেলাবে পাগলির আগের আর পরের জেলবন্দীদের সংখ্যা এক আছে কিনা। গিনতি মিললে তারপরে অল-ক্লিয়ার সাইরেন বাজবে, ব্যাস! পাগলি শেষ। আর এটাতো ‘রুটিন পাগলি’, মানে পাগলাঘন্টির রিহার্সাল! আসল পাগলাঘন্টি বাজা অবশ্য আমিও শুনিনি কোনোদিন!’

উঃ, বাপরে! রিহার্সালই যদি এই, তাহলে আসলটা কেমন ভয়ংকর হবে কে জানে।

গোরার সঙ্গলাভ মহালাভ হল নন্দুর সেদিন হতে। পাঁচ নম্বর ফাইল এক বিশাল টানা হলঘর, সেখানে ছোটো ছোটো জায়গা বরাদ্দ আছে বন্দীদের জন্য সারি দিয়ে। দুটো কম্বল, একটা এলুমনিয়ামের থালা আর একটা টিনের মগ বরাদ্দ এক এক জনের জন্যে। দুটো কম্বলেই তার বিছানা, এতেই বালিশ আর এই তার যাবতীয় সম্পত্তি। জেলের ভাষায় বন্দীরা এখানে বন্ধ হয়। এখানে এই পাঁচ নম্বর ফাইলে সে বন্ধ হয়ে গেল।

‘তুই এদিকে আয়’, হাতে থালা মগ আর কম্বল নিয়ে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল নন্দু। একটা জায়গায় কম্বল বিছিয়ে তার অধিকার কায়েম করতে হবে এবার। আশপাশের বন্দীরা সব অচেনা, আবার সেই র‍্যাগিং শুরু হবে! এইসব সাত পাঁচ ভাবছিল, তখন গোরাকে দেখে ধড়ে প্রাণ এল যেন। গোরার সঙ্গে এসে নকশালপন্থী বন্দীদের মধ্যে এসে বিছানা পাতলো নন্দু, স্থান পেল সে নকশাল ফাইলে। অন্য বন্দীরা বেশ সম্ভ্রম নিয়ে তাকাচ্ছে তখন নন্দুর দিকে। গোরার সাথে ঢুকেছে যখন, এ বিরাট নেতা না হয়ে যায়না। নন্দুর প্রমোশন হয়ে গেল নকশাল-নেতায়!

*

জেলখানায় রাতের খাওয়া হয়ে যায় সন্ধ্যা সাতটায়, মোটা মোটা চাপাটি চারপিস, ঘন করে রান্না ডাল। নকশাল আর সিপিএম বন্দীদের জন্য মনে হয় স্পেশাল ব্যবস্থা। নন্দু এতটা আশা করেনি। তবে যে শুনেছিল জেলখানার খাবার মানেই লপসি আর পোকাভরা ডালের ঝোল! তার রোগা পেটে চারখানা মোটা চাপাটি বেশি হয়ে গেল। ‘রেখে দে পরে কাজে লাগবে’, গোরা গম্ভীর স্বরে জানাল। পরে জেনেছিল এগুলোর কাজ; অন্যদের প্রয়োজন মিটিয়েও বেশি হয়ে যাওয়া রুটিগুলো শুকিয়ে রাখা হত। সন্ধ্যায় গেঞ্জির কাপড়ে প্লাস্টিক জড়িয়ে পোড়ানো হত চা করার সময়। এগুলো কাজে লাগত তখন জ্বালানী হিসাবে।

জেলখানায় দেশলাই অমিল, কিন্তু আগুন অমিল নয় একেবারেই। ইঞ্জেকশনের এম্পুল কাটার ছোট্ট করাতে বালি পাথর ঘষে ফুলকি বানিয়ে সেটাকে গেঞ্জিপোড়া ছাইয়ের ওপরে ফেলে আদিম মানুষের মত আগুন জ্বালাতে শিখে নিল নন্দু কিছুক্ষণের মধ্যেই।

‘আবে প্রমেথিউসের সিষ্য, চা বানা তুই আজ’, দলপতি অজয় এবার নতুন আমদানি কমরেডকে চাটতে বসল। মন্দ লাগছিল না র‍্যাগিংটা। সন্ধ্যাটা বেশ কাটছে নন্দুর এই নতুন জগতে!

পুরোনো “পাপী”রা এর মধ্যে গান ধরেছে, “পূব দিক লাল…, সূর্য ওঠে…! নতুন তৈরি গণসংগীত। তন্ময় হয়ে শুনতে শুনতে নন্দুর গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

পরদিন সকালে আবার গুনতি। এখানে এই একটা কাজ বারবার করা হয়, শুতে যাবার আগে “গিনতি”, ঘুম থেকে ঊঠেও “গিনতি”। সারাদিনে পাঁচ ওয়াক্ত! হাহা করে মনে মনে হেসে নিল নন্দু। তবে এখানে আর জোড়া জোড়া উবু হয়ে বসতে হচ্ছেনা। মেটরা নিজেরাই ‘গিনতি’ করে নিচ্ছে। বাপস্, নক্সালবন্দীদের ঘাঁটায় কার সাধ্য!

*

নো বেল, ভাঙো জেল

পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর জেলে দু রাত্তির হল নন্দুর। কী করে জেল থেকে বেরোবে, তার হয়ে জামিন কে দেবে এই চিন্তায় মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, এখানে আসার পরে মন কিছুটা শান্ত হয়েছে। কাল রাতে একটু পলিটিক্যাল ক্লাস নিয়েছে অজয়দা, অর্থাৎ কমরেড অজয়, ‘দেখ নন্দু, আমরা এই সরকারকে মানিনা, মানিনা এদের আইনকানুন। কাজেই জামিন আমরা নিচ্ছিনা, নেবনা। অবশ্য এরমধ্যেও কোনো অভিভাবক আমাদের কারো জামিন করে আনতেই পারে, তখন ওরা আমাদের ছেড়েও দেবে। সেক্ষেত্রে আমরা বাইরে বেরিয়েই বেল-জাম্প করে আবার আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাব, এই আমাদের নীতি।’

‘কিন্তু…’, একটা বিশাল কিন্তু তখন তার মনের ভিতরে, ‘আমরা তবে জেলের বাইরে বেরোবো না?’

‘নিশ্চই বেরোবো, পৃথিবীর কোনো জেল কোনোদিন বিপ্লবী জনগনকে বেঁধে রাখতে পারেনি। ফরাসী বিপ্লবের পর বিপ্লবী বাহিনী জিতবার পরে প্রথমেই বাস্তিলের জেল ভেঙ্গে দিয়ে সব বন্দীদের মুক্তি দিয়েছিল জানিস না?’

হ্যা, ইতিহাস পড়া নন্দু জানে সে ইতিহাসের কাহিনী, কিন্তু সেই জেলভাঙার কাহিনী যে তার জীবনে জড়িয়ে যাবে সে কী ভেবেছিল কখনো? তারপরে ফরাসী বিপ্লবের গল্প, রুশবিপ্লব, চিনের বিপ্লবের গল্প শুনতে শুনতে নন্দু শিউরে শিউরে উঠছিল। ‘জেলের মধ্যে আমাদের লড়াই হবে ভিতর থেকে জেলের পাঁচিল ভাঙ্গা। আর বাইরের কমরেডরা সত্তরের দশককে মুক্তির দশক বানাতে দ্রুত কাজ চালাচ্ছেন, আমরা না পারলেও তারাই জেল ভেঙে আমাদের মুক্ত করবেন। বিপ্লবী জনগনের ওপরে আমরা ভরসা রাখি, বিপ্লবের জয় হবেই।’

কমরেড অজয় এক ঘন্টায় নন্দুকে নতুন এক জগতে নিয়ে ফেললেন। রাতে ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে জেল ভেঙ্গে বেরিয়ে এল নন্দু সেই আজব দেশে। “এখানে সবার সমান অধিকার, সবাই সমান”, কমরেড অজয়ের কথাগুলো কানের মধ্যে তখন গমগম করে বাজছে নন্দুর। দূর! তাই কখনো হয়? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে সে। তাহলে লেনিনের সঙ্গে স্ট্যালিনের সঙ্গে? আমার আর কমরেড অজয়ের? কোনো তফাৎ নেই? সবার সমান অধিকার? লেনিন, স্ট্যালিন, মাওসেতুঙ, লিন পিয়াও, চারু মজুমদার , কানু সান্যাল, জঙ্গল সাঁওতাল? নামগুলো আগে শুনেছে বটে, কিন্তু এঁদের সম্পর্কে কোনো বিশেষ ধারণা ছিলনা। অজয়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে কখন যেন সে এঁদের চেহারা নিজের মত করে গেঁথে নিয়েছে তার মনে। স্বপ্নের মধ্যে তাঁরা ঘুরে চলেছেন নন্তুর চারপাশে, হাসছেন, ঘুরছেন। এরা সবাই আমার সমান? এ দেশটার ছবি এখনো অস্পষ্ট তার চোখে, কিন্তু আবছা আবছা হলেও নতুন এই জগতটা তাকে মুগ্ধ করে দিল।

*

‘হ্যারে গোরা, তোকে ওরা ভয় পায় মনে হচ্ছে? কেনরে?’ আলাপ একটু জমতেই মনের মধ্যে চেপে রাখা প্রশ্নটা করে ফেলল নন্দু।

‘ধুর পাগল!’ হোহো করে হেসে ওঠে গোরা। ‘ওরা আমাকে ভয় পেতে যাবে কোন দুঃখে। আসলে আমাদের সঙ্গে অনেক দিনের সম্পর্ক তো!’ বলে চোখ মুচকে এক দুষ্টু হাসি দেয়। গোরার ফর্সা মুখটা এই হাসিতে আরো সুন্দর হয়ে ওঠে।

‘মানে?’

‘মানে আমার বাবা দমদম জেলে বন্দী ছিলেন, ছেচল্লিশের সেই তেভাগা আন্দোলনে কমিউনিস্ট পার্টির ক্যাডার হিসাবে প্রায় দুইবছর। আরও আছে, আমার মা ও, সেই সময় মানে তাদের বিয়ের আগে আলিপুর জেলে ছিলেন। আর আমি? এই নিয়ে তিনবার হল! ছেড়ে দেয়, আবার ধরে আনে। বলতে পারিস আমি হলাম এদের জামাই…’ বলে আবার নিষ্পাপ এক হাসি দিয়ে ভরিয়ে দেয় চারদিক।

গোরারা তিনভাই, বাবা স্কুলে পড়ান, বাবার আদর্শ মেনে সে আর তার মেজো ভাই সুদীপ চারু মজুমদারের দলে নাম লিখিয়েছে।;দাদা প্রেসিডেন্সীতে কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ছিল, সেকেন্ড ইয়ারে উঠে অসীম কাকার দলে ভিড়ে কমরেড কাকার সঙ্গে গোপীবল্লভপুরে গেছে। সেই থেকে দাদার সঙ্গে প্রায় দুবছর দেখা নেই, তবে বেঁচে আছে খবর পাই।’

‘আর তোর বাবা, মা? দাদা?’

‘আমার মা সিপিএম করছে এখনও। বাবা নকশাল সাপোর্টার, সিপিএম ছেড়ে দিয়ে বসে গেছেন। মা সিপিআইএমের ডাকসাইটে নেত্রী ছিলেন, এখনও মত পালটাননি। ‘তবে মা আমাদের দলে ভিড়ল বলে,’ বলে হোহো করে হেসে নিল একচোট। বড়দা মায়ের দলে, সরকারি অফিসে একটা কাজ জুটিয়েও নিয়েছে। ‘বড়দা শালা আমাদের দলে ভিড়ছেনা মাইরি! আমরাও কিছু বলিনা, শতহোক সবাই বিপ্লব করলে সংসার কে চালাবে বল?’ বলে চোখ টিপে এক ফিচেল হাসি দিল।

জেলখানায় টাকা ফেললে সব পাওয়া যায়, মায় রেডবুকও। চারু মজুমদারের ছাত্রযুবদের প্রতি আহবান, লিন-পিয়াও এর জনযুদ্ধের তত্ব, মাওসেতুং এর তিনটি লেখা, সব। এগুলো পড়ে ফেলল সে কদিনের মধ্যেই। রাজনীতি আর মার্কসবাদের প্রাথমিক শিক্ষা হল আস্তে আস্তে এখানে, কিছুটা পড়ে আর কিছুটা শুনে। জেলের এই পরিবেশ তাকে পালটে দিচ্ছে…, কাঁচা লোহা যে ইস্পাতে পরিণত হচ্ছে সে নিজেই সেটা বুঝতে পারছিল।

এর মধ্যে নিত্য নতুন খবর আসতে লাগল। দিকে দিকে নকশালি ছাত্র-যুবদের একশানের খবর, জেলের বাইরের লড়াই বলে যাকে বলছিল এরা, মানে জেলের কমরেডরা। ‘আমরা জেলের ভিতরেও বিপ্লবী কর্ম চালিয়ে যাব কমরেড নন্দু’, আর এক নেতৃস্থানীয় নেতা সামসুল সেদিন নতুন আসা কমরেডদের তাত্বিক ক্লাস নিচ্ছিলেন। ‘আমরা সত্তরের দশককে মুক্তির দশক বানাবোই। কমরেড চারু মজুমদার; সিএম, বলেছেন, “চেয়ারম্যানের চিন আক্রান্ত হতে পারে, বিপ্লবের কাজ ত্বরান্বিত করুন”। কাজেই আমাদেরও কাজ হল যত শীঘ্র সম্ভব জেলের বাইরে গিয়ে বাইরের কমরেডদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে লড়াইয়ে সামিল হওয়া, এ জন্য প্রয়োজনে জেল ভাঙ্গতে হবে আমাদের।’

নন্দুর মাথায় আর কিছু ঢুকছেনা। অজয়দা বলেছেন ‘আমাদের প্রিয় কমরেড সিএম আমাদের গাইড, সিএম বলেছেন, “পার্টির পরে ভরসা রাখুন, জনগনের পরে ভরসা রাখুন’’। তবে তাই হোক, সে আজ থেকে নির্বিচারে পার্টির কথা মেনে চলবে।

*

নক্সাল-ফাইল এর বন্দীরা জেলারের কাছে আবেদন জানিয়েছে তারা সেল এ গিয়ে থাকবে, সাধারণ কয়েদীদের সঙ্গে তাদের রাখা চলবেনা। জেলখানার সীমানা পাঁচিলের একপাশে খুপরি খুপরি জানালাবিহীন ঘরের সারি এই সেল বা ডিগ্রী ঘর। ব্রিটিশ আমলে বিপদজনক বন্দীদের বিশেষ সতর্কতার সাথে রাখার জন্য এটা তৈরি হয়। সলিটারি সেল এ থাকে ফাঁসির আসামীরা আর অবাধ্য সাজাপ্রাপ্ত বন্দীরা। ডিগ্রী-সেল এ অনেক ঘর, এটা তৈরি হয়েছিল বিশেষ মর্য্যাদাপ্রাপ্ত আসামীদের জন্য।

গোরা-অজয়দের দল সেলে যেতে চায় শুনে জেলার হোহো করে হাসতে থাকলেন। ‘স্বপ্নের সওদাগর সব বুঝলেন অবনীবাবু।’ হেডক্লার্ক অবনীবাবু সায় দিলেন, ‘হ্যা স্যার, যা বলেছেন। এদিকে এরা রাতদিন চিল্লাছে, “জেলের পাঁচিল ভাঙ্গছি ভাঙ্গব”, আর ওদিকে বায়না করছে ডিগ্রী সেলে থাকবে। ওয়ার্ডে দল বেঁধে গুলতানি করা সহ্য হচ্ছেনা তো, এখন থাকুক সব এক ঘরে একজন করে।’

‘হ্যা অবনীবাবু, আজই পাঠিয়ে দিন ওদের সেল এ। বাবুরা ওখানে গিয়ে চিন্তা করুন ডিগ্রীতে থেকে জেল পালানোর কসরৎ কীভাবে করবেন, হ্যাঃহ্যাঃহ্যা!’

সেদিন থেকেই নন্দুদের নতুন ঠিকানা হল ডিগ্রী-সেল।

সিংহের খাঁচা! প্রথমদিন যখন সেল-এর এক একটা ঘরে তাদের দুজন দুজন করে আটকে দিল সেপাইরা, আর উঁচু লোহার গরাদের দরজায় বিশাল সাইজের তালা পড়ল, সিংহের খাঁচা কথাটাই নন্দুর মনে এসেছিল প্রথমে।

জেলখানাটাতো একটা খাঁচাই বটে। যেদিকে তাকানো যায় চারিদিকে প্রায় বিশ ফুট উঁচু খাঁড়াই পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বিশাল অঞ্চল। এরপর ছোটো খাঁচা ছাড়িয়ে আবার এক পেল্লায় গেট। তারপর মূল জেলচত্বর, এক বিশাল অঞ্চল জুড়ে লম্বা লম্বা দোতলা বাড়ি, এগুলোর নাম আসামী ফাইল। ফাইলেরও অনেক শ্রেণীবিভাগ। আস্তে আস্তে জেনেছিল সব। বিচারাধীন কয়েদিদের আলাদা, সাজা পাওয়াদের আলাদা ফাইল। এখানে হাসপাতালও আছে, অফিসের গায়ে গায়ে। তার সামনে কয়েদিদের হাতে তৈরি মরশুমি ফুলের বাগান। আছে কয়েদিদের নিজস্ব রান্নাঘর, ‘চৌকা। বড়চৌকা আর ছোটোচৌকা’। নন্দু অবাকই হচ্ছিল, তাহলে “মামাবাড়ি” খুব ভয়ের জায়গা নয়!

সেলে আসার পরেই এই অঞ্চলটা চিনল ভালোকরে, নাহলে লম্বা একটেরে জায়গায় পরপর সাজানো সেলগুলোর দিকে অজানা বিস্ময়েই তাকিয়ে থেকেছে এতদিন। এখানে বড়বড় রাজনৈতিক নেতারা থাকেন, আর থাকে ফাঁসির আসামীরা। জেলের আইন ভাঙ্গা বিপদজনক কয়েদিদেরও জায়গা এখানে। আর আছে ভবঘুরে পাগলদের জন্য এন সি এল বা ননক্রিমিন্যাল লুনাটিকদের আশ্রয়খানা, সেও এই সেলে। ব্রিটিশ আমলে কত যে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা থেকেছেন এখানে, মনে মনে একবার তাঁদের শ্রদ্ধা জানিয়ে নিল নন্দু।

*

সমস্ত সেলগুলো একনম্বর, দুইনম্বর, তিননম্বর এভাবে সারি দেওয়া আছে। ছয় আর সাতে নকশালি বন্দিদের স্থান হল। এই সেলগুলো আবার লম্বা লম্বা উঁচু লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা, খাঁচার মধ্যে খাঁচা। এরপর এক ফাঁকা চত্বর, যেখানে জেলপুলিশেরা সার বেঁধে ডিউটি করছে বন্দীদের পাহারা দেওয়ার। তাদের পেরিয়ে তবে দেখা মেলে জেল পাঁচিলের। তাহলে এই দুর্ভেদ্য অঞ্চলে এসে কী লাভ হল? এখান থেকে তারা পালাবে কী করে? সবার মনেই বোধহয় এই চিন্তা এসেছিল।

‘এখানে কেন? এতো জেলের ভিতরে আর একটা জেল,’ নন্দু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল গোরাকে।

‘আরে হাঁদা, দেখিসনি সেলের পরেই জেলের পাঁচিল?’ বলে চোখ মটকে ইশারা করল। এখানে ইশারাই যথেষ্ঠ, বেশি কথা বলার দরকার হয়না।

গোরা অজয়দের ব্রেণ অন্যভাবে কাজ করছিল। একটাই স্ট্র্যাটেজি তখন তাদের মাথায়, সুড়ঙ্গ খুঁড়তে হবে। সেটা পাঁচিলের কাছাকাছি থাকলে সুবিধা; আর সেলের অবস্থান পাঁচিলের কাছে। সহজ হিসাব। শুরু হল জেল পালানোর গোপন ছকে ছক মিলিয়ে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ।

“জেলের পাঁচিল ভাঙ্গছি ভাঙ্গব” শ্লোগান দিয়ে শুরু হয় সেলবন্দী নন্দু-গোরাদের সান্ধ্য অধিবেশন। সময় কাটাতে হবে। সুর্য ডোবার আগে লক-আপ, দুজন দুজন করে এক এক ঘরে বন্দী। সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে খাবার দিয়ে দেয়। তারপরের দীর্ঘ-রাত কাটাতে তাই গানই সম্বল। থালা-বাটি বাজিয়ে গনসংগীতের সুরে মেতে ওঠে সেলের বন্দীরা যতক্ষণ না ঘুম আসে। আর এই গানের শব্দের আড়ালেই চাপা পড়ে যেত সুড়ঙ্গ খোঁড়ার টুক-টুক আওয়াজ!

কিন্তু হলনা! কিছুদিনের মধ্যেই পরিত্যক্ত হল এই অসম সাহসিকতার, জেল-সেপাইদের সতর্ক চোখের আড়ালে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার খেলা। ‘ধরা পড়ে যাব যে! এতো মাটি লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, অতএব সম্ভব নয় এই পথে জেল পালানো’। কোর-কমিটি আবার বসল অন্য পথের খোঁজ করতে, বৈকালিন পায়চারির ফাঁকে ফাঁকে। একমাত্র এই সময়টাই তারা একজোট হতে পারে, এই সময়টাতেই জেল কর্তৃপক্ষ সেলের বন্দীদের সেলের সামনে এক সেল থেকে অন্য সেলে যাতায়াতের লম্বা রাস্তায় পায়চারি করতে আসার অনুমতি দিয়েছেন।

‘আচ্ছা আমরা কি সামনাসামনি লড়াই করতে পারিনা? সবসময়ে চোরের মতই পালাতে হবে? বিপ্লবী জনতার অগ্রগামী বাহিনীরা প্রাণ দিয়ে কেন জেল ভাঙ্গার কাজ করবেনা? আমরা মুখে বলছি ‘‘জেল ভাঙ্গব’’ আর কাজে চেষ্টা করছি ইঁদুরের মতো জেল পালানোর। কেন?’ গোরা সেদিন কোর-কমিটিতে তার জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখল।

‘কিন্তু কমরেড, অস্ত্র? লড়াই করতে গেলে হাতিয়ার পাব কোথায়?’

‘আছে কমরেড!’ অজয়ের কথার উত্তর এবার নন্দু দিল, এতদিনে সে কোর কমিটিতে ঢুকে পড়েছে। বড়-চৌকা দখল করলেই অনেক অস্ত্র পাব আমরা। কমরেড সিএম তো বলেছেন, দা ছুরি কাঁচি বঁটি, এই সব আদিম অস্ত্র নিয়ে শত্রুর পরে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের অস্ত্র কেড়ে নিতে।

বড়চৌকা জেলের সাধারণ কয়েদিদের রান্নাঘর। এখানে শতেক বন্দীর রান্না একসাথে হয়। কাজেই বড় বড় হাতা-খুন্তি ছুরি বঁটির অভাব এখানে হবেনা। এটাই হবে তাদের আদিম অস্ত্রশালা।

‘ তাহলে এবার সামনা সামনি যুদ্ধ!’

‘হ্যা, শেষ যুদ্ধ শুরু হবে কমরেড!’ গোরা গেয়ে উঠল ‘ইন্টারন্যাশনাল” এর এক কলি।

পাঁচিল ভাঙার লড়াই

‘গোরা তোর লাল জামাটা আমাকে দিবি?’

‘কেনরে কেল্টি? ওটা দিয়ে তুই কী করবি? আর ওটা তো ছিঁড়ে উঠেছে রে!’

‘তা হোক,ওটা পরেই আজকে…’

গোরা আর নন্দু দুজনেরই চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। আজ ১৪ই মে, ১৯৭১; আজ সেই ডি-ডে। আজকেই সেই শেষ যুদ্ধ।

বিকালবেলায় বন্দীরা সবাই সেলের সামনের রাস্তায় পায়চারি করছিল সেদিন অন্যদিন গুলোর মতোই। সামনে শুধু একটা লোহার রেলিং-এর সীমানা, তারপরেই জেল-পাঁচিল।

অজয়ের ইশারা পেতেই শুরু হল অপারেশন জেল-ব্রেক! গোরাই সবার আগে নজর করেছিল, সেল আর পাঁচিলের মধ্যে লোহার রেলিং এর গেটের খুঁতটা। কব্জায় রিভেট খোলা। এটা লাগাবার পরে মিস্ত্রীরা মনে হয় ভুলে গিয়েছিল রিভেটিং এর কথা। প্রায় পনেরো ফুট লম্বা লোহার রেলিং গেটটা তাই খুব সহজেই কমরেডদের হাতে উঠে এল। “ ইনকিলাব জিন্দাবাদ” ধ্বনির সাথে সাথে সেটা জেল পাঁচিলের গায়ে বসিয়ে দিয়ে তৈরি হল সিঁড়ি। আর একদল তখন পাশেই চৌকাঘরের দখল নিয়ে নিয়েছে, আর আদিম অস্ত্র হাতে বেরিয়েও পড়েছে।

ফ্রুফ্রুফ্রু…, ওঁওঁওঁ…, ঢংঢংঢং…, পাগলি…পাগলি…।

তখন পিলপিল করে কমরেডরা পাঁচিলের উপরে উঠে পড়েছে। তাঁদের নামিয়ে দিতে সাহায্য করছে কেউ কেউ। এদিকে নীচে রয়েছে পাঁচিলের কাছে খুন্তি বঁটি হাতে সহযোগী কমরেডদের ব্যারিকেড। সেখানে জোর লড়াই লেগে গেছে ততক্ষণে বন্দুকধারী সেপাইদের সাথে।

গোরা তখন জেল পাঁচিলের গায়ে একেবারে, রেলিং গেট ধরে দাঁড়িয়ে। তার কাজ হল অগ্রগামী কমরেডদের পালাতে সাহায্য করা, সেপাই আর মেটদের সঙ্গে লড়াই চালানো। এদিকে জেল রক্ষীরা বাঁশি আর পাগলা ঘন্টি শুনে তেড়ে আসছে; সেপাইদের হাতে ওয়ানশট মাস্কেট আর খেঁটে বাঁশের লাঠি। মেয়াদিদের লাঠি লম্বা বাঁশের, তেল খাওয়ানো। কেউ কেউ নিয়েছে লোহার রডও। ছুটে আসছে চিৎকার দিয়ে। গোরা প্রতিরোধী দলের নেতা। হাতের লম্বা ঝাঁঝরির দিকে চেয়ে মেপে নিল একবার। পাঁচ জনের এক ছোট্ট স্কোয়াড তার সঙ্গে আছে, তাদেরও হাতে বড় চৌকার থেকে ঝটিতি তুলে নেওয়া আদিম অস্ত্রশস্ত্র। ‘চার্জ করতে হবে কমরেড ওরা এগিয়ে আসার আগেই’ বলে নির্দেশ দিয়ে এগিয়ে যাবার আগে শেষ বারের মত তাকিয়ে দেখল রেলিংগেট দিয়ে বানানো সিঁড়িতে জেল পালাতে ইচ্ছুক কমরেডদের ঢল। পিলপিল করে সব পালাচ্ছে, যেন মহোৎসবে মেতেছে সবাই।

‘ঠিক আছে, আমাদের মিশন সাকসেসফুল! কমরেডস, এট্যাক করো, আর দেরি নয়, যতক্ষণ পারবে কমরেডদের পালাতে সাহায্য কর, তারপর আমাদের পালা। আমরা পালাতে না পারি প্রাণ দিতে তো পারি।’ কিন্তু কতক্ষণ আর যুঝতে পারে এরা বন্দুক আর লম্বা লম্বা লাঠি হাতে অসংখ্য জেল পুলিস আর মেয়াদি বন্দীদের সঙ্গে? খুব দ্রুত ভেঙে গেল এদের প্রতিরোধ। এরা হেরে যেতেই শুরু হয়ে গেল নির্বিচারে হত্যালীলা।

“স্বপ্নের সওদাগর!” জেলর সাহেব ঠিকই মূল্যায়ন করেছিলেন এদের। এ অসম লড়াই ক’মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল, রেলিং-গেট চলে গেল সেপাইদের দখলে। তারপরে শুরু হল নির্বিচারে খতম অভিযান। না নকশালদের নয়, পুলিশেরা শুরু করল নকশাল খতম অভিযান। যাকে সামনে পাচ্ছে তার মাথা লক্ষ্য করে লাঠি বা রডের বাড়ি।

নন্দুকে তখন কী এক যেন ঘোরে পেয়েছে, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ!’ ধ্বনি দিতে দিতে সে উঠে পড়েছে পাঁচিলের উপরে, গোরাদের পাতানো রেলিং গেট বেয়ে। গোরার সেই লাল জামাটা গায়ের থেকে খুলে হাতে নিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে সে পাঁচিলের মাথায় দাঁড়িয়ে! লাল জামা নাতো, শ্রমিকের রক্তে ভেজা পোষাকে তৈরি সেই লাল পতাকা!

তখন শ্রমিকের মুক্তির প্রতীক লালপতাকা উড়ছে জেলের পাঁচিলে। আর নীচের সেপাইদের সবকটা বন্দুক তখন ওই লাল-জামা ওড়ানো লোকটার দিকে ঘুরে গেছে।

“ইনকিলাব জিন্দাবাদ!!” ধ্বনি ছাপিয়ে গর্জে উঠল সেপাইদের হাতের বন্দুক। হাবানন্দু জেল পাঁচিলের ওপাশে গিয়েই পড়ল একেবারে। জেল-মুক্ত নন্দু!!

সে রাতে পাগলাঘন্টি বেজেই চলল, ঢংঢংঢং…, সকাল হয়ে গেলেও থামেনি। তেইশজনের মৃতদেহ মিলিয়েও “গিনতি” মিলছিল না। বাহান্নজন তখনও অমিল।

ছবি : শুভাশিস মজুমদার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here