বদলীর চাকরি

1
Sunday-Story

Last Updated on

তন্বী হালদার

জবা মাথার কাছের জানলাটা খুলে দিতেই হু হু করে হিমেল বাতাসের সঙ্গে একরাশ বৃষ্টির ছাট ঝাপটা দিয়ে যায় বসন্তর চোখেমুখে। সাথে সাথে জবা সশব্দে জানলাটা বন্ধ করে দেয়। চোখ বুজিয়েই বসন্ত জিজ্ঞাসা করে, ‘এই বৃষ্টিতে তুই এলি কি করে রে জবা?’
একগাল হেসে জবা উত্তর করে, ‘কেনে শালপাতা মাথায় দিয়া। জানলি ছোটাবাবু তুর জন্য আজ ফুল কুড়াইতে পারি নাই। একটা ডাঁশা পিয়ারা আনিছি’।
‘স্লেট পেনসিল আনিস নি?’
‘আনিছি। বইগুলা আনি নাই’।
‘ঠিক আছে। মাদুর পেতে অ আ, ক খ-গুলো লিখে ফেল। আমি মুখ ধুয়ে এসে দেখবো’।
ভীষণ অনিচ্ছা সত্ত্বেও চাদরের মধ্যে থেকে বার হয় বসন্ত। পুরুলিয়া টাউনের সাথে মানবাজার টু-র যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন। কংসাবতীর ব্রিজ ভেসে গেছে। গাড়ী যাচ্ছে না। যেতে গেলে সেই কুইলাপাল হয়ে যেতে হবে। এদিকে বেশ কিছু দরকারি কাজ, পাওনাগণ্ডা সব পেন্ডিং হয়ে আছে। সেজন্য বিডিও সাহেব বসন্তকে আজকেই একবার ডি. এম. অফিস, ট্রেজারি অফিস যাওয়ার জন্য পুরুলিয়া শহরে যেতে বলেছেন। ঐ লজঝড়ে জীপটা নিয়ে যাওয়া। মুখ ধুতে এসে এসবই ভাবছিল বসন্ত।
চন্দ্র এসে চা দিয়ে গেছে। চন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করে বসন্ত, ‘আজ কি খেতে দিবি চন্দ্র? ডাল, আলুর চোকলা? উঃ তোর এই আলুর চোকলা খেতে খেতে পেটে চরা পড়ে গেল’।
‘রাইতে আচ্ছা ভোজ হবেক। খুকরির কষা হবেক আর রোটি’।
‘তার মানে আবার চাঁদা তুলবি?’
‘না গো – আজ মিলা আছে না – কাঁড়া খুড়ার মিলা। সিখানে খুকরির লড়াই হবেক। জখমী খুকরিটা তো বড়াবাবুর ভেট’।
ছোট্ট করে একটা উত্তর করে বসন্ত।
চন্দ্র চলে যেতে বসন্ত বিস্কুটের কৌটো বার করে। জবা আড়চোখে দেখে নিয়ে স্লেট পেনসিলে মন দেয়।

আরও পড়ুন – শতরূপার ড্রেসিং টেবিল

বসন্ত জবার দিকে দুটো বিস্কুট এগিয়ে দিতে জবা একরাশ পবিত্র হাসি হেসে বিস্কুট দুটো হাতে নেয়। বলে, ‘লিখা শেষ বটে’।
‘তুই আজ বাড়ি যা। আমি টাউনে যাব’।
জবার চোখ দুটোয় খুশীর ঝিলিক খেলে যায়, ‘তু টাউনে যাবি বটে?’
‘কেন রে?’
‘আমার ছড়ার বই?’
‘ও ভালো কথা মনে করেছিস জবা। আমারও কিছু জিনিস কিনতে হবে’।
জবা প্যান্টের পকেট থেকে পেয়ারাটা বার করে বসন্তর হাতে দেয়। স্লেট পেনসিল বসন্তর ঘরে ফেলে প্যান্টের দড়ি আটকাতে আটকাতে দৌড় লাগায় –
“হাট্টিমাটিম টিম – তারা মাইঠে পাড়েক ডিম
তাদের খাড়া দুটো শিং – তারা হাট্টিমাটিম টিম”।

বসন্ত আপনমনে হোহো করে হেসে ওঠে। এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় তার এই অসমবয়সী বন্ধুটা না থাকলে কিভাবে যে দিন কাটতো বসন্তর, ভাবলেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে। প্রথম যেদিন জয়েন করতে এলো সেদিনের সেই রোমাঞ্চ আজকে তলানিতে এসে ঠেকেছে। ভেবেছিল আগে একবার জায়গাটা দেখে যাবে। কিন্তু ডি.এম. সাহেব বললেন, ‘আপনি জয়েনিং রিপোর্ট আমার কাছে দিন’।
ব্যস। WBCS C গ্রুপে পাশ করা জয়েন্ট বিডিও হয়ে গেল কলুর বলদ। এখানকার বিডিও সাহেব শ্রীমান দেবাশিষ সেনগুপ্ত বড় বেশী পদমর্যাদা সম্পর্কে সচেতন। প্রায় সমবয়সী বসন্তকে বন্ধু না করে একটু এড়িয়েই চলে। বসন্তর অবশ্য এর জন্য আক্ষেপ নেই। বরং সে ফাঁক পেলেই মুকুটমণিপুর পাহাড়ের কোলে যে ড্যামটা আছে সেখানে গিয়ে বসে থাকে। বিশেষত গরমকালে অসহ্য দাবদাহে সারাদিন দগ্ধ হয়ে বিকেলবেলায় ঐ ড্যামের পাড়টা যেন স্বর্গোদ্যান। ওয়েসিস।
বসন্ত ইঁদারায় চলে যায় স্নান করার জন্য। নিম্নচাপের দরুন কদিন বৃষ্টি হওয়ায় ইঁদারার জল বেশ উপুরে, ঝপাঝপ কয়েক বালতি ঢেলে নেয়। বৃষ্টির জল পেয়ে চারপাশের জঙ্গলটায় ঢল নেমেছে। চন্দ্রকে বলতে হবে পরিষ্কার করতে। এ সপ্তাহে কার্বলিক অ্যাসিডও ঢালতে হবে।
খেতে বসে বসন্ত চন্দ্রকে জিজ্ঞাসা করে, ‘গাড়ী কোথায় রে?’
‘এইঠে – বড়াবাবুকে রাতির বেলা দিয়া চলি আসে গো, সেদিন পঞ্চায়েতের ডেপুটেশন বইসলো না …………’।
‘ও আচ্ছা’ বলে মাঝপথে থামিয়ে দেয় চন্দ্রকে।
এই এক চন্দ্রের স্বভাব। কারও কাছে কারও নামে কিছু বলতে পারলেই ব্যস আর রক্ষা নেই। কল খুলে গেল। অবশ্য ব্যবস্থাটা একপক্ষে ভালোই হয়েছে। পুরো বরগড়িয়া ব্লকটায় দ্রুতগামী যানবাহন বলতে এই ব্লক অফিসের জীপটাই সম্বল। এখানকার সবাই জীপ্টাকে আদর করে নাম দিয়েছে পৃথ্বীরাজ।
জামাপ্যান্ট পরে, জুতোর ফিতে আটকাতে আটকাতে বসন্ত গলা তুলে ডাক দেয়, ‘চ… ন…দ্র …’।
চন্দ্র কি একটা কাজ করছিল। প্রায় ছুটে আসে।
‘মুয়ে ডাকিলি ছোটাবাবু?’
‘হ্যাঁগো …… বড়বাবু এসেছেন?’
‘আসিছি’।
‘আচ্ছা যাও’।
চন্দ্র বিনা বাক্যব্যয়ে স্থান ত্যাগ করে। এখন শ্রী সেনগুপ্তর চেম্বারে ঢুকতে হবে। সারাদিনের যাবতীয় ফাইফরমাশ শুনে নিতে হবে। দেওয়ালে টানানো ছোটো আয়নাটায় নিজের চেহারাটা একবার দেখে নিয়ে, দরজায় তালা দিল বসন্ত। মুখে একটু হাসির প্রলেপ মেখে শ্রী সেনগুপ্তর ঘরে ঢুকলো। বিডিও সাহেব চোখ তুলে ব্যস্তভাবে বসন্তকে বললো, ‘বসুন বসন্তবাবু। শুনুন প্রথমে আপনি মানবাজার ওয়ানে চলে যান। ওখানে টেলিফোনের বিল অনেকদিন পড়ে আছে। ওখানকার চৌকিদারকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। ঐ টাউনে গিয়ে যা যা জমা দেওয়ার দিয়ে আসবে। তারপর কুইলাপাল চলে যান। কংসাবতীর ব্রিজের জল নামে নি। গতকাল বান্দোয়ানের পঞ্চায়েত প্রধান এসেছিল, সেই বললো’।
মানবাজার ওয়ানের বিডিও ছুটি নিয়েছেন। ওখানকার বর্তমান চার্জে শ্রী সেনই আছেন।
বসন্ত হাসিমুখে ‘আচ্ছা’ বলে বেড়িয়ে গেল। সাধন জীপের পাশেই দাঁড়িয়েছিল। বসন্ত যেতেই দরজা খুলে দিল।

আরও পড়ুন – নীল তিমির ডাক অথবা বিজ্ঞাপনের ভাষা


সাধনের সাথে পথ চলায় একটা মজা আছে। এখানকার গাছপালা, পশুপাখির সাথে ওর একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে। স্টিয়ারিং হাতে নিয়ে গলা খুলে সাঁওতালি গান পথ চলার ক্লান্তিটুকু মুছে দেয়। ওর সাথে বসন্ত একবার অযোধ্যা পাহাড় গেছিল। মাঠাতে ওর শালির ঘর। সেখানে বসন্তকে জোর করে নিয়ে গিয়ে খাতিরযত্ন করে নিষ্পাপ চিত্তে হাসিমুখে বলেছিল, ‘জানিস ছোটাবাবু হই ছুঁড়ির লগে মুর আসনাই আছেক’। বসন্ত ভাবে বসন্তরা কি পারবে কখনও এমন অকপট ভাবে পরকীয়ার কথা স্বীকার করতে। সাধন মুর্মু ওকে চিনিয়েছিল অযোধ্যার সীতাকুণ্ড, শুনিয়েছিল রামচন্দ্র নাকি সীতাদেবীকে নিয়ে এই পথে গেছিল। সীতা মা তখন চুল ছিঁড়ে এই প্রজাতির গাছে বেঁধে দেয়। তাই গাছগুলোর এত ঝুড়ি। দেখিয়েছিল টুগ্রা ফল্‌স। হঠাৎ চেঁচামেচি। ক্যানেস্তারা পিটাতে শুরু হয়। গ্রামবাসীরা চেঁচাতে শুরু করে – হাতি হাতি। অযোধ্যার পাকদণ্ডীর পথে হুড়মুড়িয়ে নামতে হয় ওদের। শাল, মহুয়ার ঋজু জঙ্গলের ঘন আবেশ শীতের সন্ধ্যার মতো বিড়ালের গুটি গুটি পায় মিলিয়ে যায়। বিডিও সাহেব না থাকলে সাধন একদিন বসন্তকে দুয়ারসিনিও নিয়ে যায়। সেখানকার অদ্ভুত জঙ্গলি গন্ধের মাধ্যমে সাধন ছোটো ছেলের মতো গুড়ুম নদীর জল নিয়ে জলকেলিতে মেতে ওঠে। বসন্ত দূর থেকে খালি প্রকৃতিকে ভালোবেসে গেছে। সাধনের মতো ছুঁয়ে দেখতে পারে নি তার অবয়ব।
সাধন গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলে, ‘আজ বড়ো মজা হবেক ছোটা বাবু’।
‘কেন?’
‘কত্তদূর হই টাউনে যাওয়া হইবেক বটে। হই কুইলাপালের সিনসিনারি তো আগে দিখিস নাই …………। এক্কেবারে ছবির মত’।
বসন্ত তখন মনে মনে সময়ের হিসাব করছে। মানবাজার ওয়ানের কাজ মিটিয়ে, কুইল্যাপাল হয়ে পুরুলিয়া টাউন। পেমেন্ট নিয়ে, এতগুলো টাকা নিয়ে টুকিটাকি কাজ মিটিয়ে আবার ফেরা।
বসন্তর এতক্ষণ কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে সাধন গান ধরে –
“সেবে সেবে দাহাসে, মালা বদল কে
হপ্পে হপ্পে পে পে হপ্পে হপ্পে পে
উরুকাতে সিলাং কিনা – ওয়াং সিলা হিজু মে
ডাং ডোল বায়ে, ডাং ডোল বায়ে
ঢুলুক ঢুলুক বায়ে, ঢুলুক ঢুলুক বায়ে
সেবে সেবে দাহাসে মালা বদল কে ………” ।
বসন্ত, সাধনের গানের প্রতি আবছা মনোযোগে ভাবছে কবে তার ট্রান্সফার হবে। সেই কবে দরখাস্ত করেছে, আজও সাড়াশব্দ নেই। আজই একটু ডি.এম.কে খোঁচা দিতে হবে।
সাধনই কথা বললো, ‘হই ছোটা বাবু, যে গানটা বললাম, সিটার মানে কি বলতো’।
বসন্ত হেসে বলে, ‘আমি কি করে বলবো?’
‘ইটার মানে হইল, বিয়ার সময় মালাবদল হচ্ছে, মাদল বাজিয়ে ঢুলুক ঢুলুক, স্ফূর্তির গান বটে’।
বসন্ত মনে মনে বলে, হ্যাঁ তোমার সবকিছুতেই স্ফূর্তি।
সাধন আবার বলে, ‘জানিস ছোটাবাবু তুকে গাড়ী চাপিয়ে সুখ আছে’।
বসন্ত অবাক হয়ে বলে, ‘কেন?’
‘কুথা বলা যায়। হই তোর বড়া বাবু বটে না কেমন জানি গোমড়া মুয়ে বইসা থাকে’।
বসন্ত দমফাটা হাসিতে ফেটে পড়ে। সত্যি এ দুনিয়ায় শ্রোতাকে সকলে পছন্দ করে।
কথায় কথায় ওরা প্রায় পুরুলিয়া টাউনের কাছাকাছি চলে এসেছে। কুইল্যাপালের অরণ্যর সোঁদা গন্ধ মেখে বসন্ত এখন বিভোর। মাঝে মানবাজার ওয়ানের চৌকিদার বিধূ মাহাতোকে গাড়ীতে তুলে নিয়েছে।

আরও পড়ুন – একটা নাম দিতে হবে

ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে বিধূকে নামিয়ে দেয় বসন্ত। বলে, ‘দুটোর মধ্যে এইখানে ফিরে আসবে’।
সাধন এখন গাড়ী রেখে পুরুলিয়া টাউন টৈ টৈ করবে। কোথাও ছৌনাচের আসর বসলে বসে যাবে। বসন্ত এখন পুরদস্তুর অফিসার। আগে থেকেই খবর ছিল। অফিসের কয়েকজন স্টাফ যারা টাউনে থাকে, গাড়ী এলে ব্লকে যাবে, তাদের মধ্যে দুজনকে ট্রেজারি অফিসের বারান্দায় দেখা গেল। বসন্ত দ্রুত গিয়ে ওদের হাতে পেমেন্টের ভার বুঝিয়ে ডি.এম.-এর চেম্বারে গেল। ডি.এম. রঘুবীর সিং ফোনে কার সাথে কথা বলছিলেন। বসন্তকে দেখে ইশারা করলেন বসতে। ফোন নামিয়ে হেসে বললেন, ‘গুড নিউজ বসন্টবাবু। আপকা বদলী ওর্ডার হোগিয়া, লেকিন ইতনা বারীশ মে হাম ক্যায়সে লেটার ভেজা। উসকা টেলিফোন নেহি থা’।
বসন্তর হৃৎপিণ্ড আনন্দে লাফিয়ে উঠলো। কোনরকমে আবেগকে চাপা দিয়ে বললো, ‘ঠিক আছে স্যার। আপনি শুধু একটু শ্রী সেনকে বলে দেবেন আমায় যেন তাড়াতাড়ি রিলিজ করে’।
‘জরুর করিবে। আপ হামার কথা ভি বলিয়ে, ব্যাস শ্রী সেন আপকো ছোড় দেগা, আপকা চার্জ উহাপর যো কো-অপারেটিভ সি.আই. থা, উসকো হ্যান্ডওভার করেগা’।
বসন্ত প্রায় বিগলিত হয়ে বলে, ‘হ্যাঁ স্যার, ঠিক আছে’।
ডি. এম. বললেন, ‘তো বসন্টবাবু বেস্ট অফ লাক…………।
বসন্তও উঠে দাঁড়াল। আরও একবার হাসি দিয়ে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করলো।
বসন্ত আবার বারাসাত ফিরে যাবে। নিজের মা, বাবা ভাইবোনের কাছে, ভাবতেই ফুরফুরে লাগছে। ডি. এম. চত্তরে একটা বড়ো ঝাঁকড়া মাথাওয়ালা আমগাছ আছে, তাতে অজস্র টিয়া পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত হয়ে থাকে চারপাশটা। বসন্ত গাছটার দিকে তাকায়। পাখিগুলো সবুজ পাতার সঙ্গে গা মিলিয়ে ছোটো ছোটো লাফ দিয়ে এ ডাল ও ডাল করে বেরাচ্ছে। ট্রেজারির বারান্দায় বিনয়বাবু আর মধুবাবু অপেক্ষা করছে।
ওরা বললো, ‘স্যার কাঁসাইয়ের জল নেমে গেছে, মানবাজার দিয়ে গেলেই হবে’।
বসন্ত বলে, ‘বাঁচা গেল, আপনারা গাড়ীতে গিয়ে বসুন, আমি টুকিটাকি কয়েকটা জিনিস কিনে আনছি’।
কাপড় গলির ভেতর দিয়ে যেতে গিয়ে হঠাৎ তার মনে হল, চিরকালের জন্য চলে যাবে, জবাটার জন্য একটা নতুন জামা কিনলে হয়। মোটামুটী পছন্দ করে জংলা ছাপার একটা জামা কেনে। রাধাকৃষ্ণ মোড়ে গিয়ে নিজের জন্য একটা আফটারশেভ লোশান, রেজার, ভালো কলম কিনলো। উল্টো দিকে বইয়ের দোকান থেকে জবার জন্য একটা ছড়ার বই কিনে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়ালো। ট্যাক্সিতে তার জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল, সে যেতেই গাড়ী ছেড়ে দিল। সাধন বকবক করা শুরু করে, ‘সে সিনেমা দেখতে গেছিল। ছবিটা খুব আসনাইয়ের ছিল কিন্তু হাফ দেখে চলে আসতে হল। বসন্তর পেটের ভেতর আনন্দ সংবাদটা গুরগুর করছিল। কাঁসাইয়ের ব্রীজ পার হতেই সে আর চাপতে পারে না। বলে ফেললো।
সাধন যেন কঁকিয়ে ওঠে, ‘তু হামাদেরকে ছেড়ে চলে যাবি ছোটাবাবু? তা হই মুরা ছোটোলোক বটে থাকবি কেনে ইখানে?’
বসন্তর অফিসকর্মীরা বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এত আনন্দের খবরটা এই প্রথম বসন্তর কাছে খুব অস্বস্তিকর মনে হয়, সেই সঙ্গে বুকের গভীরে চিনচিনে একটা ব্যাথাও অনুভব করে। বাকী রাস্তাটুকু কেউই আর কোনো কথা বলে না। শুধু মানবাজার ওয়ান আসলে বিধুকে নামিয়ে দেয় বসন্ত। তারপর বোরোতে বিডিওয়ের কোয়ার্টারের সামনে দাঁড়ায়। শ্রী সেনের সঙ্গে একবার দেখা করে যাওয়া দরকার। শ্রী সেন ওয়াকম্যান কানে লাগিয়ে গান শুনছিলেন। বসন্তকে দেখে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কাজ হল?’
‘হ্যাঁ স্যার’ বলে বসন্ত একটু মাথা চুলকে পকেট থেকে ট্রান্সফার ওর্ডারটা বার করে বিডিও সাহেবের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘স্যার সামনের সপ্তাহে যদি রিলিজ করে দেন খুব ভালো হয়’।
শ্রী সেন বেজার মুখে বলেন, ‘আচ্ছা দেখছি, আমারটা যে কবে হবে?’
ব্লকের কাছে আসতে না আসতেই একটা হৈ হৈ শব্দ কানে আসে সকলের। সচকিত বসন্ত বলে, ‘কি ব্যাপার বলতো সাধন, একটা গোলমালের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে!’
সাধন বলে, ‘হ ছোটাবাবু একটা খুকির কান্না বটে’।
গাড়িটা অফিসের সামনে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই জবা প্রায় গাড়ির সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘মা ডারে উরা ডাইন বলিছে ছোটাবাবু। বাপডা আবার বিয়া বসিবেক। মাকে ভিটা ছাড়ী দিতে হবে নইলে পুড়ায়ে মারবে’।
বসন্ত জবার মাথায় হাত রেখে বলে, ‘ঠিক আছে চল আমি যাচ্ছি’।
চন্দ্র কোত্থেকে উড়ে এসে পড়ে প্রায়। ফোঁস করে ওঠে, ‘তু কে বটে? সরকারি আদমী আছিস সরকারি কাম কর। হামাদের গাঁয়ের ব্যাপারে মাথা দিবি না। ভূদেব হেমব্রম হামাদের জানগুরু, উ বলিছে জবার মাটো ডাইন বটে’।
সাধন গাড়ীর ভেতর থেকে একটা রড নিয়ে লাফিয়ে পড়ে, ‘শালো ছোটাবাবুকে ছখ দেখাস!’
বসন্ত সাধনের রডটা চেপে ধরে। চন্দ্র একটু পিছিয়ে গিয়ে পরিত্রাহি চেচাঁচ্ছে ‘উ ডাইন আছে’।
জবা ছোটো ছোটো হাত দুটো দিয়ে বসন্তকে জড়িয়ে ধরে, ‘মা ডারে বাঁচা কেনে ছোটাবাবু’।
পুরুলিয়া শহর থেকে যে দুজন বসন্তর সহকর্মী এসেছিল, তারা বলে, ‘আদিবাসী ছোটোলোকদের ব্যাপার ছেড়েদিন ছোটোবাবু। এক্ষুনি হয়তো তীর ধনুক বার করবে’।
বসন্ত একটু ভেবে জবার হাত দুটো সরিয়ে অফিস বাড়ীর দিকে পা বাড়ায়। টেবিলের উপর হাটের প্যাকেটগুলো ছুড়ে দিয়ে কিছু না খেয়েই শুয়ে পরে। মনে মনে বলে, ‘আমায় ক্ষমা করিস জবা’।

আরও পড়ুন – শিক্ষা

কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল খেয়াল নেই বসন্তর। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। খুলে দেখে – জবা। বাইরে তখনও ভালো করে আলো ফোটেনি।
বসন্ত বলে, ‘তুই?’
জবা হসি মুখে বলে, ‘ভূদেব হেমব্রম বলিছে মা ডারে পুরায়ে মারবে না, যদি হামাকে লিয়ে মা নাচনীর তালিম নেয়। হামি আর পড়বো নারে ছোটাবাবু, নাচ শিক্ষে নাচনী হৈ যাব্ব। বড়ো হয়ে আসরে আসরে যখন নাচ দেখাইবো তুই আসবি তো ছোটাবাবু?’
কোচোর থেকে ক’টা মহুয়া ফুল বসন্তর হাতে দেয়। বসন্তর বুকের ভেতরটা মুচরে উঠে কি যেন বলতে যায় কিন্তু তার আগেই জবা ‘আসিরে ছোটাবাবু’ বলে লাফিয়ে লাফিয়ে বলতে বলতে যায়, ‘হাট্টিমাটিম টীম / তাদের খাঁড়া দুটা শিং / তারা মাইঠে পাড়েক ডিম / তারা হাট্টীমাটিম টীম’।

1 COMMENT

  1. তন্বী হালদারের লেখা ” বদলীর চাকরি ” পড়ে বেশ ভালো লাগলো।মন ছুঁয়ে গেল। আবার
    এমন সুন্দর লেখার অপেক্ষায় থাকলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here