প্রদীপের আলো

0
Sunday story Pradiper Alo

Last Updated on

–চুমকি চট্টোপাধ্যায়

জরুরী মিটিং চলছিল প্রদীপের অফিসে। ফোন ভাইব্রেট করতেই চোখে পড়ল, আলোর নাম। নিশ্চই তেমন জরুরী কিছু নয়। জরুরী হলে ফোন করতেই থাকত। সারাদিনে কতবার যে করে। এই জন্যেই প্রত্যেকের কিছু কাজ করা উচিৎ। বলেওছে কত বার। কিন্তু ওর ওই এক কথা… একটা বাচ্চা দাও আমায়, সব ঠিক হয়ে যাবে।
প্রবলেম টা আলোরই। নাম করা একাধিক গাইনি তাই বলেছে। প্রদীপ অনেক বুঝিয়েছে আলোকে, যতটা মোলায়েম করে বোঝান যায়। আলোর বক্তব্য ঈশ্বর চাইলেই হবে। বড্ড ছেলেমানুষ।
অল্প সময়ের জন্যে অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল প্রদীপ। প্রদীপ চুপ করে যাওয়াতে বাকিরাও চুপ করে গেছে। সরি জেন্টলমেন, লেট আস প্রসিড…। আলোচনায় ঢুকে পড়ে আবার।
অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে আলোকে ফোন করল প্রদীপ ।

আরো পড়ুন :শতরূপার ড্রেসিং টেবিল

বলো আলোরানি, কী সমাচার? তখন জরুরী মিটিং এ ছিলাম।
জরুরী মিটিং কে পাত্তা না দিয়েই কলবল করে ওঠে আলো। ‘ জানো রাজেনের বিয়ে। ব্রজেনদা কার্ডের সঙ্গে দু পাতার চিঠি পাঠিয়েছে। যোগমায়া মাসিমা লিখেছেন, না গেলে সম্পর্ক শেষ। আসছে রোববার ফোন করবে তোমাকে। এটা জানাতেই ফোন করেছিলাম তখন। টিকিট কাটতে হবে তো! দেরি হয়ে গেলে আবার দাম বেড়ে যাবে… তাই..
ওকে, ওকে ডার্লিং, বাড়ি ফিরে বাকিটা শুনছি। এই এসে গেছি প্রায়। রাখছি এখন । স্কুল জীবন থেকে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ব্রজেন। ওরা উত্তর প্রদেশের লোক। কিন্তু তিন পুরুষ ধরে কলকাতায় আছে। ব্রজেন রোহতগি। কথা শুনলে যে কোন বাঙালীও লজ্জা পাবে, এতটাই পরিষ্কার বাংলা বলে। শুধু পরিষ্কার বাংলা বলাই নয়, মনটাও স্ফটিকের মতো পরিষ্কার। নিরামিষাশী বৈষ্ণব পরিবার ওদের। বন্ধু বান্ধবদের মধ্যে একমাত্র প্রদীপেরই যাতায়াত ছিল ওদের বাড়িতে। মানে পারমিশন ছিল অন্দরে যাবার। ব্রজেনের বাবা সুরজমল, মা যোগমায়া পছন্দ করতেন প্রদীপকে। আর পছন্দ করত টুটু, ব্রজেনের বোন ।

ওদের সবার চেহারাতেই খানদানি ছাপ। সবাই সুন্দর। ব্রজেনের দেখার মতো চেহারা। শুধু হাইট টা শর্ট। টুটুও সুন্দর। কাটা কাটা চেহারা। বাবার সঙ্গে খুব মিল। তবে সুরজমল রোহতগির টকটকে রঙটা পায়নি টুটু। ব্রজেনের থেকে আঠেরো বছরের ছোট রাজেন। প্রদীপরা যখন কলেজে পড়ে, ও তখন খুবই ছোট। সেই রাজেনের বিয়ে।
ওদের সমাজের তুলনায় একটু বেশি বয়েসেই বিয়ে করছে রাজেন। মাঝখানে তো বিয়ে করবেনা বলে এঁটে বসেছিল। ব্রজেনের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোমাত্রাতেই আছে, তবে যাতায়াত আগের থেকে কমেছে। কাজের চাপে আসা যাওয়া আর হয়ে ওঠেনা। তবে সুখের বিষয় এটাই যে, দুই গিন্নি, মানে আলো আর সরিতার মধ্যেও খুব ভাব। ওরা নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়ায়। সরিতার মুখেই প্রদীপের প্রতি টুটুর আকর্ষণের কথা শুনে থাকবে আলো। হয়ত মজা করেই বলেছে সরিতা কিন্তু বিস্তর প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে প্রদীপ কে।

বাড়ি ফিরতেই এক গাল হেসে কার্ড টা হাতে ধরিয়ে দিল আলো। লখনৌ থেকে সরাসরি এসেছে।

যেতে তো হবেই বলো? রাজেনের বিয়ে বলে কথা। পনেরো দিন বাকি আর, তুমি টিকিট টা কেটে ফেল।
হুম্।
আরে? হুম হাম করছ কেন? যাবে না?
আলোরানি, আমার একটা চাকরি আছে। সেই চাকরিটা না বাঁচালে তোমার জন্য ভালো কাপড় জামা, সুন্দর গয়না, দারুণ খাওয়া…এসবের ব্যবস্থা করব কী করে? ছুটি পাব কিনা দেখি ওই সময়। ছটফট করলে হবে সোনা আমার!
কত দিন বেড়াতে যাইনি। এই সুযোগে একটু ঘুরে আসা যেত। সারাদিন যে কী ভাবে কাটে আমার!
দুঃখের ঘেরাটোপে ঢুকে পড়ে আলো। বাচ্চা না হওয়ার দুঃখ। বাচ্চার এতো চাহিদা অথচ অন্য কোন উপায়ে বাচ্চা হোক, সেটা চায়না। আজকাল তো কতো উপায় আছে। কিন্তু না। আলোর ধারণা, মাতৃগর্ভে বেড়ে না উঠলে মায়ের সঙ্গে সন্তানের বন্ধন তৈরি হয়না। নাড়ির যোগ থাকলে তবেই না নাড়ির টান!
তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুমে ঢুকে যায় প্রদীপ। বলে যায়, ফ্রেশ হয়ে এসে এ ব্যাপারে কথা বলবে।
শাওয়ারের তলায় দাঁড়াতেই জলের তোড়ের সঙ্গে লক্ষ স্মৃতি ঝাঁপিয়ে এসে ভিজিয়ে দেয় প্রদীপ কে। ছবির মতো ভেসে ওঠে সেই দিন গুলো। ব্রজেনদের বাড়িতে রাত জেগে পড়াশোনা চলছে।

কখনো এর বাড়ি কখনো ওর বাড়িতে রাত জেগে পড়া হয়। ব্রজেনদের বড় বাড়ি তাই ওখানেই বেশির ভাগ রাত জাগা চলে। সামনে বিএসসি ফাইনাল। দুই বন্ধু মিলে পড়ে, একা ঠিক হয়না পড়া। রাতে চায়ের সাপ্লায়ার টুটু। ফ্লাস্কে চা রেখে দিয়ে ওকে ঘুমোতে বললেও ও কিছুতেই শোনে না। প্রদীপের মনে হয়, টুটু যেন এই অছিলায় প্রদীপকে দেখতে আসে। ওর চোখে প্রেমের আভাস। প্রদীপ খুব ভালোই বোঝে, এটা কোনমতেই সম্ভব নয়। দুই পরিবারের সম্পূর্ণ আলাদা ধরণধারণ। ওরা নিরামিষাশী, প্রদীপ রা কট্টর আমিষাশী। সেটা বিশাল ব্যাপার ছিল না হয় তো। কিন্তু যে বিশ্বাসে প্রদীপ কে অন্দরে ঢুকতে দিয়েছিলেন সুরজমল রোহতগি, সেটা ভাঙতে রাজি নয় প্রদীপ। তাছাড়া ব্রজেনের মতো বন্ধুকে হারাতে চায়না ও। প্রদীপের আত্মসম্মান বোধ প্রবল। হৃদয়ের থেকে মস্তিষ্ক প্রাধান্য পায় বেশি। টুটুকে বোঝাবার সুযোগ পাওয়া যেত না। বাড়ি ভর্তি লোক। কাকাদের পরিবারও থাকত ওখানেই। দাদাজী, পরদাদাজী মিলিয়ে বাড়ির তুলনায় লোক বেশি।
একবার সুযোগ এসে গেল। প্রদীপদের বাড়িতে কালি পুজো হত। সেই পুজোয় প্রদীপের মা সপরিবার নেমন্তন্ন করেন সুরজমল আর যোগমায়া কে। ওরা সবাই এসেছিল। খানিকটা সময় পেয়েছিল প্রদীপ। আর সেই টুকুতেই বুঝিয়ে দিয়েছিল টুটুকে যা বোঝাবার। অঝোরে কাঁদছিল টুটু। অপ্রস্তুত প্রদীপ কী করবে বুঝতে না পেরে বেরিয়ে গেছিল ঘর থেকে ।

প্রদীপের মায়ের পছন্দ ছিল টুটু কে। কিন্তু মুখে প্রকাশ করেন নি। জানতেন কুলীনত্ব না থাকলেও বাঁড়ুজ্জে হবার গর্বেই কত্তা রাজি হবেন না। আরো নানান সমস্যা হতে পারে ভেবে পছন্দের কথা মনেই রেখে দেন উনি।
এর বছর খানেক পর বিয়ে হয়ে যায় টুটুর। স্বস্তি পায় প্রদীপ। খারাপ লাগত মেয়েটার করুণ চাউনি দেখে। এবার ও আর প্রদীপের কথা ভাববে না। ওর বর লোকনাথ ভালোই হয়েছে। খুব ভালোবাসুক টুটু কে। ভুলিয়ে দিক ওর দুঃখ, কষ্ট, আদরে আদরে ভরিয়ে রাখুক — মনে মনে চাইল প্রদীপ। মেয়েটা সত্যিই ওর জন্যে পাগল। নিজে শক্ত না থাকলে মুশকিল ছিল।
এর পরের ঘটনা অবিশ্বাস্য! বিয়ের পর বছর দুয়েক কেটে গেলেও সন্তান আসছে না দেখে ডাক্তার দেখায় টুটু আর লোকনাথ। লোকনাথের সমস্যা ধরা পড়ে। ডাক্তার পরামর্শ দেয় ল্যাবরেটরিতে শুক্রানু ডিম্বানুর নিষেক ঘটিয়ে টুটুর গর্ভে সেই ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের। কিন্তু সেক্ষেত্রেও শুক্রানু কোন দাতার থেকে নিতে হবে। লোকনাথের শুক্রানু দিয়ে হবে না।
আরো দু বছর অপেক্ষা করাই যেত কিন্তু ওদের সমাজে বিয়ে, বাচ্চা, সবেরই তাড়া। টুটুও হয়তো চাইছিল সন্তান। টাকা পয়সা কোন সমস্যাই নয় ওদের। তাই ওরা ব্যাপারটাতে সম্মতি দেয়। কিন্তু অন্য দাতার শুক্রানুর ব্যাপারটা লোকনাথ বাড়িতে জানাতে বারণ করে দেয় টূটু কে। সমস্যা হতে পারে আন্দাজ করে।
প্রদীপের ডাক আসে কানপুর থেকে। টুটু সংখেপে লিখেছে, ‘ আরজেন্টলি নিড ইয়োর প্রেসেন্স।প্লিজ কাম অ্যাস আরলি অ্যাস পসিবল। লাভ ‘। বুক কেঁপে ওঠে প্রদীপের! টুটু কী এখনও প্রদীপের চিন্তা থেকে বেরতে পারেনি? কী সমস্যা কে জানে। তবে জেতে হবে। কি ভেবে ব্রজেন কে কিছু জানায় না প্রদীপ। কারণ টুটু ওর জন্যে বুক করা হোটেলের ঠিকানা পাঠিয়ে দিয়েছে।
এর পরের ঘটনা এরকম– প্রদীপ পৌঁছতে টুটু আসে হোটেলে। প্রদীপ কে সব খুলে বলে।

তুমি কি আমাকে সন্তান দিতে পারো প্রদীপদা?
চুপ করে ঘামতে থাকে প্রদীপ। মুখ চোখের অবস্থা দেখে হেসে ফেলে টুটু।
ওহ! বীরপুরুষ কে দেখ। চিরকাল একই থেকে গেলে প্রদীপদা। নিজেকে সেফ রাখার চিন্তা! আর ঘামতে হবে না। আমার সঙ্গে ডাক্তারের কাছে চলো।
ডাক্তারদের হাত ধরে প্রদীপের শুক্রানু, টুটুর ডিম্বানু কে নিষিক্ত করে ল্যাবরেটরির ঠান্ডা ঘরে পেট্রি ডিশে। আজীবন ব্যাপারটা গোপন রাখার অঙ্গীকার করে প্রদীপ আর টুটু। এরপর কি হবে জানেনা প্রদীপ। টুটু অন্তঃসত্ত্বা জেনে আনন্দের বান ডেকে যায় ওর শ্বশুর বাড়িতে।
লোকনাথ কে টুটু বলেছিল সব। শুনে লোকনাথ সামান্য হেসে বলেছিল, ‘ গ্রেট! ‘ নিজের অক্ষমতা ঢাকতেই হয়তো আর বেশি কথা বাড়ায়নি লোকনাথ। তাও বলব, লোকনাথের হৃদয় বড়। এই খবরটা টুটু দিয়েছিল প্রদীপকে। ব্রজেনও জানে হয়তো!

কানপুর পৌঁছে ওরা দেখে গাড়ি পাঠিয়েছে ব্রজেন। যেতে যেতে আলো বলে, ‘ তোমার নিশ্চই বেশ একটা আনন্দ হচ্ছে, না গো? কতদিন পর টূটুর সঙ্গে দেখা হবে। ওর তোমাকে খুব পছন্দ ছিল। আমি জানি। বিয়ে করলে না কেন বলো তো? সুন্দর দেখতে তো! ‘
আমার ইচ্ছে করেনি। প্রদীপের আলোই ভালো। নিওন লাইটের দরকার ছিলনা।
বিশাল রিসর্ট ভাড়া নিয়ে বিয়ে হচ্ছে। ব্রজেন সহ অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে গেটের সামনে। প্রদীপ আর আলো কে ওদের জন্যে রাখা ঘরে নিয়ে গেল ব্রজেন।
ফ্রেশ হয়ে নিচে আয় তোরা। কিছু খেয়ে নে। তারপর সকলের সঙ্গে দেখা করিস।
ডাইনিং হলে যেতেই পরিচিত মুখগুলো দেখতে পেল প্রদীপ। যোগমায়া মাসীমা বসে আছেন। প্রণাম পর্ব সেরে এ কথা সে কথার পর মাসীমা বললেন, ‘ টুটুর সঙ্গে দেখা হয়েছে? ওর মেয়েকে দেখেছ? খুব সুন্দর আর বুদ্ধিমতী হয়েছে বাচ্চাটা।’
পাশ ফিরতেই দেখল টুটু মেয়ের হাত ধরে এগিয়ে আসছে। সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল প্রদীপের। ওই বাচ্চাটা তো…টুটুর চোখে চোখ পড়তেই একটা জিতে যাওয়া চমক লক্ষ্য করে প্রদীপ। যেন বলতে চাইছে, ‘ তুমি আমাকে গ্রহণ না করলে কি হবে, আমার সন্তানের বাবা তুমিই! ‘ অবন্তিকা কে কোলে নিতেই অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল শরীর মন জুড়ে। পিতৃত্বের স্বাদ কি? সারাক্ষণই বাচ্চাটাকে আদর করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু না…প্রদীপ সংযত রাখে নিজেকে।

আরো পড়ুন :ঝিলিমিলি

বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকেই আলো বলল, টুটুর মেয়ে অবন্তিকার না তোমার সঙ্গে খুব মিল। মনে হচ্ছিল যেন তোমারই মেয়ে। তোমাকে ওর খুব পছন্দ হয়েছিল।খালি তোমার কাছে আসছিল। আমার হিংসে হচ্ছিল জানো। মনে হচ্ছিল বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে আসি। আমি কী খারাপ না গো? কেমন খারাপ খারাপ কথা ভাবি!
প্রদীপ কী বলবে ভেবে পায়না। কোন অপরাধ না করেও অপরাধী মনে হয় নিজেকে। আলোকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ তুমি প্রদীপের আলো। তুমি কখনো খারাপ হতে পারো? চলো, আমরা আবার ডাক্তারের কাছে যাই। এবার আর জেদ কোরোনা। আমাদের সন্তান আসবেই। আমি জানি কি ভাবে। এবার আর জেদ ধরে বসে থেকোনা। ‘
প্রদীপের বুকে মুখ লুকোয় তার আলো। অবন্তিকার মুখটা ভেসে ওঠে প্রদীপের মনে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here