আরো অনেক পাখিরা

0
Birds

Last Updated on

মণিরত্ন মুখোপাধ্যায়

যারা আসে তারা সবাই যে খুব পণ্ডিত তা নয়, আছে অনেক চাষাড়ে পাখিও, তবে সাধারণ ভাবে বলতে গেলে তারা মানুষের চেয়ে অনেক উন্নতমানের। তারা আসে, ইচ্ছে হল তো একটু বসল, না হলে উড়ে চলে গেল। কেউ হয়ত ঘাড় ঘুড়িয়ে মৃত্যুঞ্জয়কে একবার দেখল, একটু ঘুরে ফিরে আবার চলে গেল। কিন্তু একটুও হাসল না, এবং হয়ত কিছু বলল
— কী হে, মৃত্যুকে জয় করতে পারনি তুমি? বাবা মা কেমন নাম রেখেছিল তোমার? আমাদের দেখ আমরা কেমন জয় করেছি সবকিছু, সবকিছুকেই।
সেকথা সত্যি, কেননা মৃত্যুঞ্জয়, মানে যার ডাক নাম ভুতো, ভেবে দেখেছে কোন পাখিই মরণের ভয়ে ভীত নয়। তারা খায় দায় ফুর্তি করে, বাঁচার মত বাঁচে, দরকার মত মরে যায়। এই যে দরকার মত মরে যায় তারা, সেটা কিন্তু খুব ইমপর্ট্যান্ট। দরকার মত মরে যেতে পারার নাম জীবন। কারণ ভুতোর বউ সাবু, যার ভাল নাম ছিল সুবর্ণ, তাকে তার বাপের বাড়ি থেকে নার্সিং হোমে ভর্তি করে কিছুতেই মরতে দিচ্ছিলনা। তার নাকে পাইপ, মুখে পাইপ, হাতে পাইপ, নলটল চারিদিকে লাগিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল কতগুলো দিন। দরকার মত তাকে মরতে দেওয়া হচ্ছিলনা। শেষ পর্যন্ত সেই তো পারলনা, ফেল করে গেল, তবু ডাক্তারগুলো বলেছিল – লড়াইটা আমরা ছাড়ছিনা।
কার সঙ্গে লড়াই করছে তারা একবার ভাব তো? সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে ওদের কাজ ওরা করেছে, লড়াই করেছে, ইনজেকশনের ছুঁচ আর বইপড়া বিদ্যে দিয়ে চালিয়ে গেছে যতগুলো দিন পারে। রোজ রক্ত নিয়েছে পরীক্ষা করেছে, তাতে কত কী সব বুঝতে পেরেছে। তবে শরীর যা তৈরি করতে পারছেনা, বেঁচে থাকার জন্যে জরুরি কী সব হিমোগ্লোবিন না লাল কণিকা, তৈরি হচ্ছেনা শরীরে, সেটার কী হয়? সেটা তৈরি হবে কেমন করে তা কী ওরা জানে?
অত সব ভাবার দরকার কী? তার চেয়ে দরকার মত মরে যাওয়া ঢের ভাল। অজ্ঞান হয়ে চোখ বন্ধ করে দিনের পর দিন পরিষ্কার বিছানায় পাইপ টিউব নল জড়িয়ে, হাতে জল ঢুকিয়ে, গলায় দম দেবার হাপড় বসিয়ে বেঁচে থাকার কোন মানে আছে? সাবু শেষ সময়টাতে, তা দিন চল্লিশেক হবে, ভুতোর সঙ্গে একবার কথাই বললনা। একেবারে শেষ হয়ে যাবার পর ওরা দেখালো, এই নাও তোমার সাবুর বডি। তখন সাবুর শরীরটা দেখে কান্না কান্না পাচ্ছিল তার। অত রোগা কোনদিনই ছিলনা সে। ছোট হয়ে এইটুকু হয়ে গিয়েছিল। মাত্র তেত্রিশ বছরে চলে গেল সাবু, নিজের সংসারটা ফেলে পালাল।

আরও পড়ুন :ঝিলিমিলি


পাখিদের দ্যাখে ভুতো আর ভাবে, নিজের সংসার কক্ষনো বলতে নেই। কিসের সংসার, কার সংসার? পাখিদের কোন সংসার নেই, তবু তারা ঠিকমত বাঁচে, তবু তারা ঠিকমত মরে যায়। শেষ সময়ে প্রিয়জনের হাতে হাত রেখে গালে গাল রেখে মরবার সুযোগ পায়। সাবুকে ওরা ঠিকমত করে মরতেও দেয়নি। হাতে হাত রেখে গালে গাল রেখে মরতে দেয়নি। আহা, শেষ দিনগুলোতে হয়ত ভুতোকে খুঁজেছে সাবু, একটু ছুঁতে চেয়েছে হয়ত, একবার বলতে চেয়েছে – আমি চললাম। তুমি তোমার পছন্দের মত কাউকে বিয়ে করে নিও। একা একা পারবেনা সংসারটাকে টানতে। দুজনের দরকার হয় গো।
আর তোমার সংসার! সে আমার নয়, সে তোমার বড় মায়ার জিনিস ছিল। তুমি কত আনন্দ করে সংসারটাকে সাজিয়েছিলে, মরার আগে নিশ্চয় চেয়েছিলে সেটাকে বাঁচাতে। কিন্তু তোমাকে বলতে সুযোগ দেওয়া হয়নি। মৃত্যুঞ্জয় কিংবা ভুতো এখন কী করছে সাবু তো দেখতে আসছেনা। আসবে কী দেখতে? পাখিগুলো হয়ত বলতে পারে।
হঠাত করে মনে হল – পাখিদের কী পুনর্জন্ম আছে? আছে হয়ত, কিংবা নেই। জানা খুব কঠিন, কেননা পাখিরা মানুষের ভাষা বলেনা, তারা নিজেদের ভাষায় কথা বলে। ওদের কথা বোঝা কী খুব কঠিন? আর একটা কথা ইদানিং মনে আসছে, এক এক জাতের পাখির এক এক ভাষা। ওদের মধ্যে কমন ভাষা কোনটা যেটা সব পাখিরা বলতে বা বুঝতে পারে?
ভুতো বা মৃত্যুঞ্জয়ের বয়েসটা কম হলে কী হবে, সে কেমন হয়ে গেল। ভাল করে কথা বলেনা, ভাল করে খায়না, ঠিক করে ঘুমোয়না। সবাই বলল
— ওর খুব শক্ লেগেছে। একবার ডাক্তার দেখানো দরকার।
আবার ডাক্তার! ওপথে আর নয়। ডাক্তাররা মানুষ হয়না, ভুতোকে একবার তার বউ সাবুর সঙ্গে মরার আগে দেখা করতে দিলনা পর্যন্ত। বলল আই সি ইউতে কারো ঢোকা মানা, দূর থেকে কাচের ছোট জানলা দিয়ে দেখুন। তাছাড়া সেখানে সে তো নলটল জড়িয়ে নিয়ে অজ্ঞান হয়ে ছিল, দেখতে গেলেও কী দেখত? সাবুর তো শরীরে কিছু ছিলনা। তবু ভুতো তাকে ছুঁতে পারত একবার একবার। অজ্ঞান থাকলে কী হবে সে নিশ্চয় বুঝত এটা তার বরের ষ্পর্শ। মেয়েরা বরের ষ্পর্শ খুব ভাল বোঝে। ছোঁয়া থেকে বলে দিতে পারে এটা তার বর না অন্য মানুষের ষ্পর্শ। যেমন তারা একটা লোকের চোখ দেখে বলে দিতে পারে লোকটা তাকে অন্য চোখে দেখছে।
একটা শালিক পাখি আছে, তার আবার ভয়ডর খুব কম। সে জেনে নিয়েছে ভুতোর মত ভাল মানুষ আর হয়না। সে এখন বউয়ের কথা ভেবে ভেবে কষ্ট পাচ্ছে। অন্যকে কষ্ট দেবার তার কোন অভিপ্রায় নেই। পাখিটা পায়ের কাছে এসে কটর কটর করে তাকে অনেক কিছু বলল
— চুপ করে বসে না থেকে যাওনা, চান টান করে এস, দুটো খাও। যে চলে গেছে তার জন্যে এত বেশি ভাবো কেন? ভেবে কিছু করতে পারবে?
সেটা উড়ে যাবার সময় ক্লিলিলিং করে পাখার শব্দ হল। তার বলে যাওয়া কথাটা ফেলনা নয়। পাখিদের কোন কথাই ফেলনা নয়। কেননা ফেলনা কথা বলার মত তাদের সময় নেই। ওদের সংসার যেমন নেই, তেমনি বাজে কথা বলে সময় নষ্ট করার প্রবৃত্তিও নেই। ওকে বকে দিয়ে উড়ে গেল শালিখ পাখিটা, যেন সাবুই ওকে বকে দিয়ে গেল,
— যাওনা, চান টান করে এস। বসে বসে কী এত ভাবছ? ভেবে কোন কুল কিনারা করতে পারবে?
সাবু যখন কুল কিনারা করার কথা বলেছিল তখন সত্যি ভুতোর মাথায় একটা বড় চিন্তা ছিল। বড় জামাইবাবু মারা যাবার পর থেকে বড়দিদির ভাসুর দেওর মিলে তাকে পথে বসানোর চেষ্টা করছে। ভুতো একবার গিয়ে শাসিয়ে এসেছিল ওদের, বলেছিল
— দরকার পড়লে কোর্ট থেকে অর্ডার বের করে আনব, আমার সে ক্ষমতা আছে। বেশি বাড়াবাড়ি করবেননা আপনারা।
ওরা জানে তার শশুড় বাড়ি বেশ পয়সাওলা। তারা যদি পাশে দাঁড়ায় তাহলে ভুতো সত্যি ওদের নাকে দম করে দিতে পারে। তবু একটু একটু সে জানতে পারছে, ওরা দগ্ধাচ্ছে দিদিকে। কথায় কথায় খোঁটা দিচ্ছে। ভুতো ভাবছিল দিদির শশুড়বাড়ির তিন ভাইয়ের সম্পত্তি ভাগ যোগ করে নেওয়া উচিত এবার।
আরো দুটো তিনটে পাখি এল, মাটির উঠোনে বসল, ঘুরল এদিক ওদিক, কিছু খুঁটে খুঁটে দেখল। তিনটেই উড়ে গিয়ে আমগাছের ডালে বসল। এই তিনটেকে দেখে মনেহল এরা পণ্ডিত পাখি। এদের কাছে কিছু জ্ঞান পাওয়া গেলেও যেতে পারে। ভুতো ওদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল
বলল, — এখন তুমি একবার বড়দির বাড়ি যাও। উনি তোমার জন্যে খুব চিন্তায় আছেন।
আশ্চর্য হয়ে গেল ভুতো। কত উচ্চস্তরের হলে মনের কথা পড়ে নিতে পারে এরা। পণ্ডিত পাখিদের দুহাত জোর করে প্রণাম জানাল, এবং মনে জোর এসে গেল। এবার থেকে মানুষের বদলে পাখিদের কাছেই পরামর্শ চাইবে ঠিক করে রাখল। ওরা অনেক বেশি জানে, অনেক বেশি বোঝে।

মেমারি বেশ বর্ধিষ্ণু জায়গা, সেখানে ঘরবাড়ি ধানজমি, আলুর চাষ, সব মিলে রমরমা অবস্থা বড়দিদের। ভুতোকে দেখে কেঁদে পড়ল বড়দি, নতুন করে নিজের স্বামীর মৃত্যুটা বুকে বাজল। তবে বড়দির দুটো ছেলেই মানুষ হয়ে গেছে। বড়টা কলেজে পড়ে, ছোটটা এবার মাধ্যমিক দেবে। দেখেশুনে ভুতোর খুব ভাল লাগল। বড়দি বলল
— এখানে থেকে যা ভুতো ক’টা দিন। মনটা ভাল হবে।
মন ভাল করতে পাখিদের চেয়ে ভাল বন্ধু আর নেই। সে শালিক পাখিই হোক, কাক, ঘুঘু কিংবা ছাতারে পাখি। লোকে বলে কাক নাকি বেশি চালাক। সেরকম কিছু দেখেনি ভুতো। তবে তারা একটু বেশি জানে বলে মনে হয়। ভুতোর এখানে থাকার মোটে ইচ্ছে নেই, কিন্তু সেকথা বলা যাবেনা। ঘর তালা বন্ধ করে বেশিদিন ফেলে রাখা ঠিক নয়। এমন নয় যে প্রচুর সম্পত্তি সোনাদানা আছে তার কাছে, তবু যেটুকু আছে চোরকে নিয়ে যেতে দেবে কেন? দিদিকে দেখতে এসেছিল পাখিগুলো তাকে বলেছিল বলে, সেই কাজটুকু করেই চলে যাবে। বড় ভাগ্নেকে জিজ্ঞেস করল
— মানিক, কেমন আছিস রে তোরা?
— ভাল আছি মামা। তুমি কেমন আছ তাই বল? মামিমা যাবার পর থেকে তোমার মনে খুব কষ্ট হয়েছে দেখছি।
— আমি ভালই আছি রে। কেমন দেখছিস আমাকে সত্যি করে বল দেখি?

আরও পড়ুন :ভেন্টিলেশন


হাসিটা ঠিক এলনা। আসলে আজ নিয়ে কতদিন সে হাসেনা। বউ মরেছে তো কী হয়েছে, হাসতে কোনও মানা নেই। তবু চেষ্টা করেও হাসি এলনা। দেখতে দেখতে শুকিয়ে গেল সাবু, সেই ঘটনাটা মেনে নিতে কষ্ট হয় খুব। দরকার মত মানুষ মরে যাবেই, তাতে কারো কিছু করার নেই, তবু গুচ্ছের নল পাইপ জড়িয়ে সাবুর মৃত্যু অসহ্য লাগে। মরতে দিতে আপত্তি নেই, অত পাইপ টিউব জড়িয়ে কেন মরবে? নিজের ঘরে নিজের ভালবাসার লোকেদের হাতে হাত রেখে মরে যাওয়াই তো ভাল। তাতে কত শান্তি। যে মরছে তার, কিংবা যাদের কাছে মরছে তাদেরও। এবার দেখতেও দিলনা তাকে বউটাকে। বউতো নয় নিজের মানুষ, মনের মানুষ, আদরের মানুষ। একটু ছুঁতে পর্যন্ত দিলনা ওরা।
— তোমাকে দেখে ভাল মনে হচ্ছেনা মামা। মা রোজ রোজ বলে তোমার কথা। রোগা হয়ে গেছ তুমি। ভাল করে খাওয়া দাওয়া করনা কেন?
— করি করি। ভাল করেই খাওয়া দাওয়া করি রে। তোদের খবর বল। তোদের খবর নিতেই তো এলাম।
বড়ভাগ্নের সঙ্গে অনেক কথা হল, কলেজের পড়াশুনা, বাড়ির অবস্থা, মায়ের শরীর, জমিজায়গা, লেগে থাকা খুচখাচ অশান্তি। রাতে দিদির সঙ্গেও নানা কথা বার্তা হল। বিশেষ করে ভুতোর বউয়ের নার্সিং হোমের খরচ কতটা হল, কে দিল।
— সাবুর বাবা পয়সা ওলা লোক, ভেবেছিল পয়সা খরচ করলেই সেরে যাবে তাদের মেয়ে। পারলনা পারলনা, মধ্যে থেকে বেজায় কষ্ট দিল সাবুকে। নাকে নল, গলায় ভেন্টিলেটর, কড় কষ্ট পেয়ে মরে গেল। মানুষে মরার সময়ে আশা করে একটু শান্তির, তা পেতে দিলনা।
এই প্রথমবার সে বলে ফেলল কাউকে তার অশান্তির কথা। সাবু মরে যেতই, তবে অমন করে মরবে কেন? এইটা যে তার মনের কথা এই প্রথম প্রকাশ করে ফেলল ভুতো।
— তাহলে তুই এখন কী করবি? একদম একা হয়ে গেলি। দুটো একটা ছেলেপুলে থাকলেও যা হয় হত। আজকাল তোরা যে কী করিস, সময় থাকতে ছেলেপুলে নিলিনা।
দিদি কী করে জানবে, ওসব কিছু নয়, হয়নি, কী করা যাবে? সাবুরও খুব ইচ্ছে ছিল, তা ইচ্ছে থাকলেই তো হবেনা। ইচ্ছে থাকলেই যদি সব কিছু হয়ে যেত তাহলে তো কথাই ছিলনা। মানুষের অনেক রকমেরই তো ইচ্ছে হয়, সব কী আর পূর্ণ হয়? এই যেমন দিদির ভাসুরের সঙ্গে দেখা হল সকালবেলাতেই, সামনাসামনি, একটু ম্লান হসলেন তিনি বললেন
— সব ঠিকঠাক তো ভাই? তুমি ভাল আছ তো?
— ভাল আছি, আপনারা সবাই কেমন আছেন দেখতে এলাম।
আগ বাড়িয়ে কেউ কী আর খারাপ ব্যবহার করে? দেঁতো হাসি হেসে ভুতো উপযুক্ত জবাব দিল। উনি ডেকে নিয়ে গেলেন। সে একপক্ষে ভালই হল, কেননা ওনার সঙ্গে কিছু কথা বলে নেওয়া দরকার ছিল। ওঁদের দিকটা আলাদা, তবে পার্টিশন হয়নি এখনও। আর পার্টিশন করলে বাড়িটার চেহারা নষ্ট হয়ে যাবে। বসে বসে দু চারটে কথার পর উনি জিজ্ঞেস করলেন
— তা তোমার বউটির কী হয়েছিল যে অতবড় নার্সিং হোমও ঠিক করতে পারলনা?
— লিউকেমিয়া।
— সেটা আবার কী হে?
তুমি কী করে জানবে লিউকেমিয়া কী জিনিস? তাহলে তো অনেক জিনিসই তুমি জানতে। ফেল করে করে এইট পর্যন্ত পড়েছ, বেশি জানবার দরকার কী?
— ব্লাডক্যান্সার।
— ওরে সর্বনাশ। এখন কী করবে তাহলে?
জানতে চাইছে কবে আর একটা বিয়ে করবে। হারামজাদা শুয়োর, কথা বলার ধরন দেখ? আমি কী করব তা তোমাকে বলব কেন? মুখে বলল
— দেখা যাক। আপনাদের জমি জায়গা পার্টিশনের কতদূর কী করলেন? আমিন আনার কথা ছিল। আমি এক তৃতীয়াংশের খরচ দিতে রাজি আছি। কবে করবেন জানিয়ে দিলে সেইমত ব্যবস্থা করব। মোটকথা দিদির ছেলেদের অংশ আমি বুঝে নিতে চাই সময় থাকতে।
আশা করতে পারেনি ভুতো তার এত দুঃখের দিনেও এতটা শক্ত কথা বলতে সাহস করবে। আমতা আমতা করে উনি বললেন
— শোনো ভাই, এসব কী তাড়াহুড়ো করে হবার জিনিস? সময় লাগবে।
— তাহলে আমি অন্য ব্যবস্থা করব। আপনাদের সদিচ্ছার অভাব দেখতে পাচ্ছি। আমার স্ত্রীর অসুস্থতার কারণে আসতে পারিনি। সে কথা যাক, আমি দুমাসের মধ্যে সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কোর্ট থেকে অর্ডার বের করে দিলে চলবে, নাকী পার্টি অফিসে যাব, বলুন?
— একটু সবুর কর ভাই, আমি ডেকে পাঠাব আমিন, মাপজোপ করাতে হবে জমি বাড়ি সব। দলিল টলিল গুলো দেখতে হবে।
— বের করুন দলিল, আমি আজই দেখতে চাই। আপনাদের ওপর আমার একফোঁটা ভরসা নেই। আজ কাল করতে করতে বছর ঘুরে যাচ্ছে।
রেগে উঠে এল ভুতো ওদের বৈঠকখানা থেকে। একদিনের পক্ষে যথেষ্ট দাবড়ানি দেওয়া হয়েছে। লোকটা শেয়ালের মত ধূর্ত। যত দিন পারে সমস্ত সম্পত্তির রসটুকু নিংড়ে নিচ্ছে। দিদির প্রাপ্য দিচ্ছেনা। রাগ করে কোনও জিনিসের সমাধান হয়না। সে কথা মনে পড়তে আপনা আপনি রাগ পড়ে গেল। দিদিকে দেখে সংযত হল সে।
— কী বলল আমার ভাসুরঠাকুর?
— কী আর বলবে, দেখছি দেখব বলল। আমি বলেছি কোর্ট থেকে অর্ডার বের করার ব্যবস্থা করছি।
— ভাল করেছিস। ইদানিং একটু ভাল ব্যবহার করছে। তুই এলে ভয় পায়। এবার মনেহয় কিছু করবে।
দিদির এখানে এলে ভাল লাগে। সাবুরও খুব ভাল লাগত দিদির বাড়ি। এখানে এসে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে বসে ক’টা দিন আরাম করত। বলত – দিদি সত্যি আমাদের দিদি।

দিন তিনেক পার করে নিজের ঘরে এসে শান্তি। ধুলো জমেছে চারিদিকে, ঘরদোর লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে। সে সব কাজের মেয়েটিকে দিয়ে সাফসুফ করিয়ে নিতে নিতে বেলা পার। সাবুর অসুখের সময়টাতে একটি রান্নার বউ আসত, সে এখনও আসছে। ওকেই রেখে দিতে হবে। বউটার রান্না খুব সংযত ধরণের, তেল মশলা কম কম দেয়। সাবুরও তেমনি হাত ছিল। চিন্তা করতে হবে, ভুতোকে এখন চিন্তায় পেয়েছে। এখন তার কী কর্তব্য সেটা নিয়ে চিন্তা করতে হয়েছে। সাবুর পর্যায় শেষ হয়ে গেল, অতএব চিন্তা করতে হবে বইকী? এখনও তার শাড়ি শায়া ব্লাউজ় সব এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে আছে। তাদের দুজনের জোড়ে তোলা ছবি এখনও বেডরুমের দেওয়ালে টাঙানো আছে। অফিস যাওয়া আর আসা ছাড়া আর তো কোন উদ্দেশ্য দেখা যাচ্ছেনা। জীবনের মানে খুঁজে পেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কে তাকে বলে দেবে? বউ মরে গিয়ে অনেকের সাধু হতে ইচ্ছে করে। তারপর কিছুদিনের মধ্যে আর একটা বিয়ে করে আবার সেই নিত্যদিনের চিন্তা, নিত্যদিনের টানাপোড়েন। এর কোন সুরাহা খুঁজে দেখতে হবে আগে। মনটা স্থির হতে দিতে হবে কিছুদিন, তারপর দেখা যাবে। কচি ছেলে মেয়ে নেই যে সাত তাড়াতাড়ি আর একটা বিয়ে করে বউ আনতে হবে।

আরও পড়ুন :অ্যাসাইনমেন্ট


আবার পাখিদের নিয়ে পড়ল ভুতো। তার এত পড়াশুনো করা বুদ্ধির চেয়ে পাখিদের না পড়া বুদ্ধি অনেক ভাল। পড়াশুনো করলে মনটাকে একটা লাইনের বাইরে চিন্তা করতে দেয়না। তার চেয়ে সোজাসুজি পাখিদের সঙ্গে কথা বললেই হল। চড়াই পাখিরা বড্ড ছটফটে। একজায়গায় বেশিক্ষণ থাকেনা। তাদের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। ভাল পাখি হল শালিকরা। অনেক কথা বলে। অনেক রকমের কথা বলে।
— এবার আমার কী কর্তব্য বলতে পার তোমরা? একটু বুঝে শুনে কথা বলবে।
— বিয়ে যদি না করতে চাও তো তার চেয়ে বেশি নেশার বস্তুতে মন দাও। কবিতা লিখতে পার?
— কবিতা লেখা আসেনা, তবে কলেজে থাকতে গল্প লিখেছি দুটো একটা।
— ওইটেই করে দেখ দেখি। তবে ছাপাতে যেওনা সাত তাড়াতাড়ি।
আহা, পাখিরা কত ইনটেলিজেন্ট ! কত গভীর মনের মানুষ সব। কত খবর রাখে। বিয়ে করা কিংবা বিয়ে না করা বউয়ের মত একজন মহিলার চেয়ে লেখাপড়া করা আরও বেশি নেশার বস্তু। বলতে পারত মদ খাও, গাঁজা খাও। তা যখন বলেনি তখন ওদের কথা মেনে দেখতে হয়।
ভুতো তিনটে বই আর কিছু রাফ কাগজ নিয়ে একটা উপন্যাসের খসড়া করতে বসল। দুদিন লেগে গেল, মোট সাতাশটা পরিচ্ছেদ করে গল্পটার ছক করতে। প্রতিটি পরিচ্ছেদে কী লিখবে তার একটা হিসেব করে ফেলল। মুস্কিল হল সব জায়গাতেই তার নিজের গল্প এসে পড়ছে অনিবার্যভাবে। নিজেকে সরিয়ে নিতে হবে, নিজেকে একেবারে ইনভল্‌ভ করা যাবেনা। আরো এক দিন লাগল কোন চরিত্রটাকে কেমন করে তৈরি করবে। ছকটা মোটামুটি ঠিক হবার পর লিখতে বসল সে। সেখানেই তাকে মহা মুস্কিলের সামনা সামনি করতে হল। এক কলম লেখা বের হচ্ছেনা। সময় লাগবে সময় লাগবে, সব জিনিস অত সোজা নয়। সব জিনিসের জন্যেই অভ্যাসের দরকার, প্র্যাকটিশ করতে হবে। ভুতোর অফিস করা আর বাড়িতে লেখার অভ্যাসের মধ্যে বেশ একটা সমন্বয় এসে গেল। লেখাটা ভাল হচ্ছেনা তবে চ্যাপটার অনুযায়ী এগিয়ে যাচ্ছে। কাটাকুটি, লাল কালি নীল কালি করে যাহোক কিছু একটা হচ্ছে। দশ পনের পাতা লেখার পর আবার একদিন শালিক পাখিদের বলল
— লেখাটা বিশেষ ভাল হচ্ছেনা। এখন কী কর্তব্য?
— কয়েকটাদিন লেখার বিশ্রাম দাও, ধরো চারটে দিন। ওদিকে তাকিয়ে দেখবে না যেন। ঘরের কাজ কর্ম দেখ।
আলমারির ভেতর রেখে দিল কাগজগুলোকে ভুতো। সত্যি ঘরের অবস্থা খুব খারাপ। উঠোনের টবের গাছ গুলো ঠিকমত সেবা না পেয়ে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছে। খুরপি নিয়ে গুছিয়ে দিল গোড়ার মাটি। জলটল পেয়ে মনেহল তারা খুশি হয়েছে। ঠিক করে রাখল এবার থেকে রোজ দশ মিনিট তাদের দেখবে, জল টল দেবে। বেশি তো আর নয় মাত্র এগারোটা টব। এগারোটা কেন, বেশিও তো হতে পারত? সাবু এগারটা টব করেছে কেন সেটা বোঝার চেষ্টা করল। আরো জায়গা আছে, আরো অন্তত তিনটে টব রাখা যেতে পারে। বাড়িয়ে কী হবে। তারা দুজন মানুষ ছিল, এখন একজন। দুজনের কাজ একজন কী আর পারবে ঠিকমত। তাছাড়া মেয়েদের কাজ তারাই পারে। মেয়েদের কাজ ছেলেরা পারবে কেন? অবশ্য সাবু তার নিজের কাজটি ঠিকমত পারেনি করতে। তারজন্যে তার দুঃখ ছিল মনে। কিন্তু সে সুখি হয়েছিল। তার মনের মত স্বামী পেয়েছিল। ভালবাসত তাকে। সবাই ভাল হলে চলে? বরটি ভাল, বউটি ভাল হলে চলে? ঝগড়া নেই অশান্তি নেই, এমন একখানা সংসার ঠিঁকবে কেন? ভেঙে গেল সব, সব ভেঙে গেল। এবার ঠিক হয়েছে, এবার নে কী করবি কর?
ভুতো হিসেব করে দেখল চার দিন পার, আবার লেখা নিয়ে বসা যেতে পারে। কিন্তু বাংলা লিখতে গিয়ে গায়ে জ্বর আসে যেন। অফিস থেকে ফিরে আগে লেখা নিয়ে বসল। পড়ে ফেলল যতটা লেখা হয়েছে। প্রথম চ্যাপটারে যা লিখবে ভেবেছিল তার থেকে সরে যাচ্ছে গল্প। সবচেয়ে মুস্কিল হল চার লাইনেই বলার কথা শেষ হয়ে যাচ্ছে। একটা বই খুলে দেখল লেখক কেমন পাতার পর পাতা লিখে যাচ্ছেন, গল্প সরছেনা কিন্তু পড়তে মন্দ লাগেনা। এই বিষয়টা বুঝতে হবে। গল্পটাকে এগিয়ে না নিয়ে গিয়ে লিখতে হবে অনেক কিছু। সেটা কেমন করে সম্ভব?
নতুন পরিচ্ছেদ শুরু করে দিল ভুতো। বেশ অনেকটা লিখে ফেলল সে। এখন তাকে গাছে জল দিতে হবে। এখন তাকে খেতে হবে, এখন তাকে নিজের জামা কাপড়গুলো কাচতে দিতে হবে। কলকাতার কাছেই এই বাড়িটা বাবা করে গিয়েছিলেন বলে বাঁচোয়া। দুটো ঘর, ছাতে একটা ঠাকুর ঘর, সেখানে কতদিন কেউ ঢোকেনা। এবাড়িতে সকাল থেকে কাজ চলে পুরোদমে, রান্নার কাজ, কাপড় কাচা, ঘরদোর ধোয়ামোছা। সব মিটিয়ে নটার মধ্যে কাজের মেয়ে দুটি চলে গেলে ভুতোও বের হয়। ওদের একজনের কাছে চাবি থাকে, দুপুরে একবার আসে দুজনেই। মেয়েরা না থাকলে ঘর দোর বজায় থাকেনা। এই বিষয়টা তার বেশ লাগছে। সাবু চলে গিয়েও কেমন ঠিক করে রেখে গেছে। দুবোনের কাছে দিয়ে গেছে তার স্বামীটির রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়।

আরও পড়ুন :একটা নাম দিতে হবে


অতএব সংসারের দিকে বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে ভুতো সাহিত্য নিয়ে পড়ল। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসটা পড়ে ফেলল মন দিয়ে। এতদিন কেবল টাকা পয়সার হিসেব, বাজেট, অডিট, লেজার, ডে-বুকের জগত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে বাঁচল। কিন্তু তার একটা দিক এখনও ফাঁকা হয়ে রইল। মাঝে মাঝেই মনে হয় সাবু তাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল। নিজের কাজটি না করেই পালিয়ে গেল। এটা তার ভীষণ অন্যায় হয়েছে। এতদিন সে সঙ্গে থেকেছে, কোনদিন তার অন্যায় দেখতে পায়নি। এই প্রথমবার তার মনে হল সাবু খুব অন্যায় করে পালিয়ে গেছে।
হঠাত একবার মনে হল একটা খুব খারাপ কাজ করে ফেলেছে সে। যাদের বাড়ির মেয়ে ছিল তারা কেমন আছে, তাদের মেয়ে মরে যাবার পর থেকে তারা কী করছে, কী ভাবছে একবার দেখা উচিত ছিল। হিসেব বলছে সাবু মরেছে তেত্রিশ দিন। ঠিক একমাস তিনদিন আগে সাবু মরে গেছে। তার মৃতদেহের পেছন পেছন গিয়েছিল শ্মশান ঘাটে। ভাই করেছিল শেষকৃত্য, ভাই করেছিল শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ। সব হয়েছিল ওদের বাড়িতে। স্বামীর নাকী কোন দায়িত্বই নেই, অন্য রক্ত। একপক্ষে ভাল, বেঁচে গিয়েছিল ভুতো।
বিনা আবাহনে একদিন শশুড়বাড়ি গিয়ে পৌঁছল সে, এবং সকলেই তাকে দেখে খুব খুশি হয়েছে বুঝতে পারল ভুতো। এই তো আর একটা বাড়িতে তার আদর আছে এখনও। সাবু থাকতে তার আদর ছিল, এখনও সেটা আছে। সেদিক থেকে দেখলে ভুতো কোনদিন খারাপ ব্যবহার পায়নি এখান থেকে। কেউ তাকে খারাপ কথা বলেনি। সেও কোনদিন কাউকে অপমানসূচক কথা বলেনি। সুতরাং সবার সঙ্গে একটু একটু কথা বলল ভুতো। মুখটাকে করুণ করে রাখার চেষ্টা করেছিল যতটা পারা যায়। বেশি কথা বলছিলেন শালাজ, তিনি আবার কলেজে পড়ান। মাষ্টারনির মত প্রশ্ন করে করে জেনে নিচ্ছিলেন তার মতিগতি।
ভুতো একবারও বললনা যে সে এখন লেখা নিয়ে গবেষণা করছে। সে ভুতটা ছাড়তে কতটা দেরি আছে নিজেও জানেনা। পাখিরা বলেছে এখন কোন লেখা ছাপতে দেবেনা। তাই সই, লিখে লিখে পাহাড় তৈরি করবে ভুতো। জীবনানন্দের মত ট্রাঙ্কের মধ্যে রেখে দেবে লেখাগুলো। আজ না হোক কাল পরশু তাদের কদর হবে। কিন্তু একটা কথা, টাইম পাশ করা এক জিনিস আর কালজয়ী লেখা আর এক জিনিস। দেখতে হবে, তার মধ্যে পার্টস্ আছে কীনা? নিজেই বুঝতে পারবে। তুলনা করে দেখবে ভাল লেখা আর তার লেখার মধ্যে কতটা ফারাক। তবে কবিতা লেখা তার দ্বারা হবেনা সেটা সে জানে। ওসব ভাব ছন্দ কথার মারপ্যাঁচ তার আসেনা।
শাশুড়ি নেই, মারা গেছেন অনেক দিন। শশুড় মশাই বললেন
— আমার কাছে এসে একটু বস।
বসল ভুতো তাঁর সামনে সোফার ওপর। ওঁর দিকে একদৃষ্টে তাইয়ে আছেন তিনি বুঝল। অনেক পরে তিনি বললেন
— স্ত্রী বিয়োগ হলে একদিকটা শূণ্য হয়ে যায়, আমি জানি। সুতরাং তোমাকে ব্যতিব্যস্ত করবনা বাবা। অফিস জয়েন করেছ?
— করেছি।
— গুড। কাজকর্মে মন দাও, দেখবে একলা ভাবটা কেটে যাচ্ছে একটু একটু করে। সাবু তোমাকে পছন্দ করে বিয়ে করেছিল। তাতে আমাদের সামান্য দুঃখ হলেও মেনে নিয়েছিলাম। কেননা তুমি আসলে মানুষটা ভাল। তবে তোমাদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা পছন্দ হয়নি আমার। এসব তোমাকে আগেও বলেছি। আর তুমি যে আমাদের সঙ্গে মানিয়ে চলেছ সেকথাও আমি স্বীকার করি। সাবু তোমার কাছে ভাল মনে ছিল, সুখি হয়েছিল কীনা জানিনা, তুমি ভাল বলতে পারবে। তবে দুঃখী হয়নি তা আমরা জানি।
ভুতো মনে মনে ভাবছিল এবার তোমার লেকচারটা বন্ধ করো শশুড়মশাই।
— রাতে খেয়ে যেও এখান থেকে।
— আমার রান্নাবান্না করা আছে। সব নষ্ট হবে। সকালে আবার অফিস যেতে হবে। আমি ফিরব বাবা।
ওই বাবা কথাটায় গলে গেলেন মিত্তিরমশাই। ভুতো কোনদিন তাঁকে বাবা বলেছে মনে পড়েনা। মেয়েটা তাঁর প্রাণ ছিল, সেটাই চলে গেল। জামাইকে তো নিজের বলে কোনদিন মনে হয়নি। তবে মৃত্যুঞ্জয়কে বিয়ে করাটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তাঁরই মেয়ে তাঁরই কথা না শুনে এক মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি নিতান্ত সুবোধ ছেলেকে পছন্দ করবে।
বাড়িতে ফিরে এসে অপার শান্তি। কী ভাগ্যি মিত্তিরমশাই জিজ্ঞেস করে বসেননি – কবে বিয়ে করছ?

এবার একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। কী সেই সিদ্ধান্ত? একটা মোটে জীবন, একবারই বিয়ে করেছিল, ভালবাসার বিয়ে। সেটা শেষ হয়ে গেল। ছেলেমেয়ে নেই, সেটা একটা বিরাট স্বস্তি। এবং এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে সেটা একপক্ষে ভালই হয়েছে। মস্ত পেছুটান থাকত। এখন সে তার নিজের মতের মালিক। ইচ্ছেমত ঘোরাঘুরি করা যায়, ইচ্ছেমত যেখানে খুশি চলে যাওয়া যায়। কেবল চাকরিটার জন্যে যেটুকু বন্ধন সেটুকু স্বীকার করে নিতে হবে। পাখিরা কী উপদেশ দেয় দেখা যাক।

আরও পড়ুন :নীল তিমির ডাক অথবা বিজ্ঞাপনের ভাষা


ইদানিং গরম পড়েছে বলে এগারো নম্বর টবের নিচে জল রাখা থাকে মাটির গামলায়, পাখিরা জল খেয়ে যায়। আজ সকালে দুটো টিয়া পাখি এসে জল খেল, ঘরের ভেতর থেকে দেখেছে ভুতো। ওরা আবার একটু বেশি বেশি ভিতু। কাউকে দেখলে গাছ থেকে নামবে না। জল খেয়ে ওরা গাছে বসলে ভুতো বাইরে এসে বলল
— এই যে তোমরা, টিয়াপাখিরা, এসেছ, জল খেয়েছ বেশ করেছ। তোমাদের জন্যই তো জল রেখে দি। এখন বল দেখি তোমাদের মতে আমার ভবিষ্যত জীবনটা কেমন হওয়া উচিত। আমার বউটা মরে গেল। সে থাকতে দুজনে বেশ ছিলাম, ভবিষ্যত বলে কিছু চিন্তা করতাম না। এখন আমি লেখা নিয়ে পড়েছি। কিন্তু তাতেও খুব একটা গুছিয়ে উঠতে পারছিনা। বল, তোমাদের কী মত?
ট্যাঁ করে আওয়াজ করল একটা টিয়া। সে আওয়াজটা কর্কশ লাগল কানে। তারপর সেটা পরিষ্কার ভাষায় বলে গেল
— ভবিষ্যত আবার কী? ভবিষ্যত বলে কিছু নেই, কোনওদিন ছিল না। যা করছ করো, পরে কী হবে সে নিয়ে চিন্তা কোরোনা। তুমি কে হে মাণিক, ভবিষ্যত নিয়ে ভাবছো? ভেবে কিছু করতে পারবে? যতটা পার চিন্তা কমাও, মনের বোঝা কমাও। ভাল থাকবে।
ওই যে বলল, যা করছ করো, সেই কথাটাই আসল। ভুতো বলল
— থ্যাঙ্ক ইউ।
এখন থেকে মৃত্যুঞ্জয় সামন্ত আর কিছু চিন্তা করেনা, কেবল লেখা নিয়ে পড়ে আছে। পড়ে আর লেখে, ভাল ভাল বই পড়ে দেখে কেমন করে লিখেছে, সেই রকম লেখার চেষ্টা করে। লেখে আর আলমারিতে রেখে দেয়। যেদিন পাখিরা বলবে এবার ছাপতে দাও, সেদিন থেকে ছাপতে দেবে। তার বাড়িতে কাজ করে যে দু-বোন, একমাত্র তারাই জানে বাবু অনেক কিছু লেখা লেখি করে, বই লেখে। আর সবাই মনে করে বউটা মরে গিয়ে লোকটা কেমন যেন হয়ে গেছে। ঘর থেকে বের হতে চায়না একদম।
মৃত্যুঞ্জয় জানে সে বেঁচে আছে, সুখে আছে এবং কাজের মধ্যে ডুবে আছে। এখন বাংলা লিখতে তার খুব একটা কষ্ট হয়না। পাখিরা বলেছে, মদ মেয়েমানুষের চেয়ে এ নেশাটা ভাল নেশা। রাত জেগে পাতার পর পাতা লিখতে পারা কী সোজা কাজ? নেশাগ্রস্ত নাহলে কেউ পারে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here