স্ট্যাচু

4

Last Updated on

১]

সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শিলান্যাস সম্পূর্ণ। নয় নয় করে প্রায় দুই দশক । সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার কাজ এখনও অব্যাহত। পুরাতন আইন কানুন, সংস্কার, সংস্কৃতি বাতিল করে সব ঢেলে সাজানো হয়েছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলে কিছু নেই। নির্ধনের প্রতিশোধ স্পৃহাকে কাজে লাগিয়ে অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন মানুষের উপর নিপীড়ন নামিয়ে আনা হয়েছে। রাজনৈতিক দল, নির্বাচন ব্যবস্থা সব বাতিলের খাতায়। একটি মাত্র দল। সর্বশক্তিমান কম্যুনিস্ট পার্টি। সব কিছুর নিয়ন্তা তথা ভাগ্যবিধাতা মহা প্রতাপশালী একজন ডিক্টেটর। তিনিই মহামহিম চেয়ারম্যান।

আর একটি কর্মব্যস্ত দিন । কাঁটায় কাঁটায় এগারোটা। সাম্যবাদী নেতার মুখোমুখি বিশ্বস্ত আপ্ত সহায়ক।

“স্যার, জরুরি কথা ছিল।”

“তাই নাকি ? কিন্তু আপনার গোঁফটির এমন দুর্দশা কেন? দুটি প্রান্তের দৈর্ঘ্যে চরম অসাম্য !”

“সরি স্যার। সেলুনওয়ালার কীর্তি। খেয়াল করিনি। কী বিশ্রী যে লাগছে! তবে আমারই তাড়াহুড়ো ছিল। আপিস ফেরত আবার ঢুঁ মারব।”

“সন্ধে পর্যন্ত অপেক্ষা? অসম্ভব। জানেন তো আমি discrimination অর্থাৎ বৈষম্য একদম সহ্য করতে পারিনা। আসুন আমার ড্রয়ােরেই কাঁচি আছে।”

“একে কি বৈষম্যমূলক বলা যায় স্যার? নেহাতই ভুল করে—”

“উঁহু কথা নয়। বসে পড়ুন।”

ড্রয়ার খুলতেই রূপোলি ঝলক। একটা কাঁচি। ছোট্ট, পরিপাটি। গোঁফ কাটার কাঁচি যেমন হয়। তবে বেশ মহার্ঘ এবং সৌখিন। চেয়ারম্যানের কাঁচি বলে কথা। মহামহিম আঙুল ছুঁয়ে এক লাফে আপ্ত সহায়কের গোঁফ ছুঁয়ে ফেলল। তারপর খচাখচ শব্দ। প্রথমে এদিক, তারপর ওদিক। নিপুণ আঙ্গিকের চলন বলতে যা বোঝায়। এভাবেই কয়েকটি মুহূর্ত!

“বাহ, এই দেখুন। দু প্রান্তই নিখুঁত। একেই বলে সাম্য। যান দেখে আসুন। নতুন আয়না লাগানো হয়েছে। এক্সপেন্সিভ বেলজিয়াম গ্লাস। কি হল যান—”
ওকে স্যার।

“জাস্ট আ মিনিট।”

মহামহিমের চোখে অদ্ভুত চাহনি। নিবিষ্ট চিত্তে কি যেন দেখছেন।

“আচ্ছা, আপনার নামটি যেন কি? বার বার ভুলে যাই।”

“আজ্ঞে, টমাস স্যার। টমাস ডুলিটল।”

“ডুলিটল !হা হা হা! একেবারে সার্থক পদবি। মাথাতেই ছিলনা। এবার বুঝতে পারছি আপনি এত কম কাজ করেন কেন! ডু লিটল ! হা ! হা ! হা !”

“কী যে বলেন স্যার! সব সময়ই তো কিছু না কিছু করছি। নির্ধারিত সময়ের আগেই দপ্তরে ঢুকি। কখনও কখনও রাতেও থেকে যাই।”

“মিস্টার টমাস ডুলিটল, পরিমাণ নয় গুণগত মানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কতক্ষণ দপ্তরে থাকছেন, কত পরিমাণ কাজ করছেন, তার চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আপনি কতটা দক্ষতা এবং কুশলতার ছাপ রাখছেন। পদবিটি নিয়ে ভাবতে হবে। আজ থেকে আপনার সারনেইম হবে ডু ইকুয়াল। অর্থাৎ এদেশের সবাই যেমন দক্ষতায় কাজ করেন, আমি যে কুশলতায় কর্ম সম্পাদন করি, আপনিও তাই করবেন।”
“বেশ। আপনার ইচ্ছেই পূর্ণ হোক, স্যার। এবার কাজে লেগে পড়ি?”

“অবশ্যই। আপনি এবার ডেক্সে ফিরে যান।”

“চেম্বারে প্রবেশ করতে না করতেই ঘন্টার শব্দ। চেয়ারম্যান সাহেব নির্ঘাত কিছু ভুলে গিয়েছেন!”

বলুন স্যার, আপনার জন্য আর কী করতে পারি!

“হ্যাঁ, মিস্টার ডু ইকুয়াল। আপনি যখন হাঁটছিলেন, আর একটি অসঙ্গতি লক্ষ করলাম। যা আপনার অদক্ষতার মূল কারণ। হাতদুটিকে টেবিলের উপর রাখুন তো!”
“এই যে স্যার, রেখেছি।”

“উঁহু মুঠো করে নয়। আঙুলগুলিকে ছড়িয়ে রাখুন।”

“এভাবে?”

“হ্যাঁ মিস্টার ডু ইকুয়াল। এই তো! যা ভেবেছি ঠিক তাই। আপনি কখনও খেয়াল করেছেন?”

“কি স্যার?”

“চরম অসাম্য। আপনার হাতের আঙুলগুলোর দৈর্ঘ্য সম মানের নয়। আর এই কারণেই আপনার কাজে কুশলতার অভাব। ভাবনার কথা। সাম্য ছাড়া অগ্রগতি ? অসম্ভব !”

“বুঝলাম না স্যার। এটিই তো স্বাভাবিক। আঙুল ছোট বড় হওয়াতেই গ্রিপ করতে সুবিধা হয়। এটি তো প্রকৃতির বিধান।”

“হা হা হা! প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই তো মানব সভ্যতার অগ্রগতি মিস্টার ডু ইকুয়াল। চিন্তা করবেন না। খুব সহজেই এই সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব।”

“কী বলতে চাইছেন স্যার? মাথা মুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিনা। আপনার আঙুলগুলিও তো অসমান !”

ভ্যাবাচ্যাকা আপ্ত সহায়কের চোখে বিস্ময়ের অবগাহন।

“হা ! হা ! হা ! আইন প্রণেতা চিরকালই আইনের উর্ধ্বে। চিন্তার কোনো কারণ নেই। বসে পড়ুন তো! ব্যাপারটা জলের মত সহজ। ক্ষুদ্রতম আঙুল অনুযায়ী অবশিষ্ট আঙুলগুলির দৈর্ঘ্য স্থির করতে হবে। কী হল বসুন!”

কিংকর্তব্যবিমূঢ় আপ্ত সহায়কটিকে চমকে দিয়ে একনায়কের ড্রয়ারটি আরেকবার খুলে গেল। ফ্লোরেসেন্ট ঔজ্জ্বল্যের ভেতর চকচক করে উঠল আর একটি কাঁচি। আকারে অনেকটাই বড়।

প্রচণ্ড ধার। একবারের বেশী হাতল চাপতে হয়না। মশা কামড়ানোর মত একটু যন্ত্রণা। মালুমই পাবেননা। কোন হাত দিয়ে শুরু করব ? ডান বা বাম ?

আপ্তসহায়ক টমাস কি ভয় পেয়েছেন ? পাওয়ারই তো কথা। অসাম্যের অজুহাতে জন্মগত আঙুলের দৈর্ঘ্য ছেদন হলে কারই বা ভাল লাগে ! তাও আবার বৈজ্ঞানিক যুক্তির অনুপস্থিতিতে ! ক্ষমতামদমত্ত একজন সাইকোপাথের খামখেয়ালিপনা কোন সীমা স্পর্শ করতে পারে ভেবে অন্যরকম একটা বিস্ময়ের জন্ম হচ্ছে। শুধুই বিস্ময় নয়, চরম এক বিপন্নতা ! অথচ বিপ্লবের মিছিলে এই মহামহিম একনায়কটি সবার সঙ্গেই পা মিলিয়েছিলেন। টমাসের প্রেমিকা লিলিও ছিল এই মিছিলে। কী অপরিসীম আবেগ নিয়ে সাংস্কৃতিক মঞ্চের দায়িত্ব সামলেছে। তখন ওদের একটিই পরিচয়—কমরেড। বিপ্লবের জন্য, সর্বহারার মুক্তির জন্য বলিপ্রদত্ত। তবে উইলিয়ামকে আর নাম ধরে ডাকা যায়না। সে এখন সর্বময় কর্তা। মহা প্রতাপশালী চেয়ারম্যান। লিলিও অবশ্য লিল হয়ে উঠেছে। প্রেমিকা থেকে সহধর্মিনী।

“কী হল টমাস ডু ইকুয়াল ! বলুন কোন হাত দিয়ে শুরু করব ! এব্যাপারে আপনার মতটিই চূড়ান্ত ! নইলে এখুনি বলে বসবেন আমার রাষ্ট্রে আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই ! কি হল ! নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন নাকি সেন্ট্রি ডাকতে বাধ্য হব!”

টমাস ডু লিটল থেকে টমাস ডু ইকুয়ালে পরিণত হওয়া আপ্তসহায়কটি একটুও নড়লেননা। প্রাথমিক বিস্ময় কাটিয়ে মস্তিষ্কটি ক্রমশ সজাগ হয়ে উঠছে। চেয়ারম্যানের আদেশ অমান্য করবে এমন দুঃসাহস কারই বা আছে। পালাবার পথও নেই। ঘন্টি বাজালেই কয়েক ডজন সেন্ট্রি। তবু একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। সকাল থেকেই জরুরী কথাটি বলতে চাইছেন। পারছেননা। মহামহিম নিজস্ব এজেন্ডা নিয়েই ব্যস্ত।

“উইলিয়াম ! মশকরা ছাড়। কথা আছে। খুব জরুরি। শুধু দেশের স্বার্থে নয়। তোরও মঙ্গল হবে।”

উইলিয়াম ! সত্যি শুনছে তো ! নিজের কানকেও বিশ্বাস হচ্ছেনা। মহাপরাক্রমশালী একনায়কেরও যে একটি নাম থাকতে পারে, ধ্বনি এবং উচ্চারণে সেটিও আম জনতার মতই, ভাবলেই কেমন অবাক হতে হয়। অথচ বছর কুড়ি আগে এই নামটি ছাড়া তাঁর আর কোনো পরিচয়ই ছিলনা। উইলিয়াম, চল পোস্টার লিখতে হবে, উইলিয়াম চল, আজকের স্ট্রিট কর্নারে তুই-ই প্রথম বক্তা, উইলিয়াম, তোর ডেরাতেই এ সপ্তাহের মিটিং ! উইলিয়াম ! উইলিয়াম ! উইলিয়াম ! চব্বিশ ঘন্টার ভেতরে কতবার যে উচ্চারিত হত ! প্রথমে পাড়া, তারপর ওয়ার্ড, বরো ছাড়িয়ে সমগ্র মহানগর, রাজ্য, অবশেষে দেশ ! আর এখন তো সমগ্র পৃথিবীই চেনে ! মহা পরাক্রমশালী এক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মহা প্রতাপশালী ডিক্টেটর। তবে এব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই টমাস এবং লিলির মুখেই উইলিয়াম নামটি সবচেয়ে বেশি বার উচ্চারিত হয়েছে। একই ইউনিটের সদস্য ছিল ওরা। কিন্তু এর চেয়ে অনেক বড় কথা টমাসই ওঁর দীক্ষা গুরু। মার্ক্সবাদ তথা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সঙ্গে প্রথম পরিচয় এই টমাসের হাত ধরেই। মহাকালের অনিবার্য পরিক্রমণ গুরুটিকেই চাকর বানিয়ে ছেড়েছে। চেলাটিকে চেয়ারম্যান। তাতে কি ! এমন অনেক হিসেবই তো উল্টে পালটে যায় ! কিন্তু এতদিন পর আবার কবর খুঁড়ে উইলিয়ামকে বের করা কেন বাপু ! প্রাণ বাঁচানোর জন্য মানুষ যে কত কাকুতি মিনতি, কত কৌশলের আশ্রয় নিতে পারে উইলিয়াম ওরফে মহামহিম চেয়ারম্যান সেটি ভাল করেই জানেন। মৃত্যুর কিনারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সকাতর আর্তি, চোখে মুখে ফুটে ওঠা অনিবার্য অসহায়তা কিন্তু মন্দ লাগেনা। দণ্ড মুণ্ডের কর্তা হিসেবে নিজেকে কেমন ইয়ে ইয়ে মনে হয়। নিজের হাতে বানানো আইন এবং দণ্ডবিধি, নিজেই বিচারক। এর যে কী স্বাদ, যে পেয়েছে কেবল সে-ই বোঝে। কতবার যে নিজের ইচ্ছেমত বদলে নিয়েছে। এই তো গত মাসের ঘটনা। একটি যুবক। খুব যে বড় অপরাধ এমন নয়। কম্যুনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়ে একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা।যদিও নাম উল্লেখ ছিলনা। কিন্তু ব্যঙ্গের লক্ষ্য যে স্বয়ং চেয়ারম্যান বুঝে নিতে কোনো সমস্যা হয়নি। সব দেখে শুনে ঠিকই করে ফেলেছিল, বছর পাঁচেকের জন্য লেবার ক্যাম্পে পাঠাবে। সেই মত রায়ও লেখা হল। হঠাত মনে হল বেজায় লম্বা তো ! দু এক ইঞ্চি বেশি হলে তবু মানা যায়।এ তো দেখছি সাড়ে ছ ফুট ছাড়িয়ে গেছে।অর্থাৎ প্রায় এক ফুট বেশি। এমন কুৎসিত অসাম্য কাঁহাতক সহ্য করা যায়। সাহস তো কম নয়। খোদ চেয়ারম্যানের উচ্চতা যেখানে সাড়ে পাঁচ ফুট, এ কিনা বারো ইঞ্চি বেশি হাইট নিয়ে পথে ঘাটে হেঁটে বেড়াচ্ছে। এক লহমায় রায় বদলে গেল। লেবার ক্যাম্প নয়, ছোকরার দেহ থেকে বাড়তি অংশটা ছেঁটে ফেলা হোক। হা হা হা ! এমন কত ঘটনা ! মনে পড়লেই হাসি পায়। উপায় কি ! নিজের খামখেয়ালিপনাতে নিজেকেই হাসতে হয়।অন্য কেউ হাসবে এমন পরিস্থিতিও নেই ! কিন্তু আপ্তসহায়কটি তো বড়ই ধুরন্ধর ! স্ট্রেইট ড্রাইভ দূরের কথা। হাল্কার উপর সুইপ করতে চাইছে। কাকুতি মিনতি নয়, সকাতর আর্জিও নয়, সোজা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল ! একেই বলে উপস্থিত বুদ্ধি !

“হা হা হা ! এক ধাক্কাতেই আপনি থেকে তুই !যাক, বাবা মার দেওয়া নামটি আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। ধন্যবাদ জানাতেই হয়। তবে এখানে প্রথাগত শিষ্টাচার মেনে আপনিই বলতে হবে যে। হা হা হা !”

“বেশ তাই হোক। দেখি কতক্ষণ এই প্রোটোকল মেনে বাক্যালাপ করা যায়। কিন্তু এমন অট্টহাসির উদ্রেক হল কেন ? আমি কি খুব হাস্যকর কিছু বলে ফেলেছি মহামহিম চেয়ারম্যান ?”

“হা হা হা ! সে আর বলতে। বিষয় এবং সময় নির্বাচন দুটোই। আপনি কি সত্যিই ভেবেছেন আপনার আঙুল কাটব ! নিখাদ মজা মশাই ! Just a piece of humour, albeit a little dark ! এই কাঁচিটি আমার বাগিচায় কাজে লাগে। ডালপালা ছাঁটি। হ্যাঁ, কি যেন বলছিলেন ! রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রাধিনায়কের মঙ্গলার্থে অমূল্য কোনো প্রস্তাব ! বলুন, আমি প্রস্তুত !”

“ধন্যবাদ স্যার। আমি বলতে চাইছি–”

“আরে দাঁড়ান ! দেখেছেন ! কেমন ভুলো মনা হয়ে উঠেছি। দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা !”

মহামহিম উঠে দাঁড়ালেন। পুরো দস্তুর মিলিটারি কায়দায়। আলমারিটির দিকে এমনভাবে হেঁটে গেলেন, যেন সেরিমনিয়াল মার্চ। কম্বিনেশন লকের বিপ বিপ শেষ হতেই সবচেয়ে উপরের তাকে হাত । প্যাকেট বন্দি বস্তুটি হস্তগত হতেই আলমারির দরজাটি আবার স্বস্থানে। মহামহিমও নিজের চেয়ারে। মোড়ক খুলে ফেলতেই একটি ডায়েরি। উজ্জ্বল গোলাপি রঙের।

“দেখুন তো চিনতে পারেন কিনা !”

একী ! টমাস কি পাগল হয়ে গেল ? সত্যিই কি এসব ঘটছে ? নাকি suspension of disbelief ! কোলরিজের কবিতা ! লৌকিক থেকে অলৌকিক !কিন্তু ডায়েরিটা?তাকে কিভাবে অস্বীকার করবে ! গোলাপি রঙ, মজবুত বাঁধাই। টেবিলের উপর পড়ে থাকা বিশাল কাঁচিটি যদি সত্য হতে পারে, তবে ডায়েরিটিও একই রকম সত্য ।অবিশ্বাস্য ! লিলি ! লিল ! একটা সকাল উড়ে এল। ক ঘন্টাই বা হয়েছে। বড় জোর আটচল্লিশ !

২]

“ডায়েরিটা আবার ফেলে রেখেছ ! কতবার বারণ করেছি। যদি উইলিয়ামের হাতে পড়ে, তোমার কী পরিণতি হবে, বিন্দুমাত্র ধারণা আছে ? চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে যেভাবে বিষোদ্গার করে চলেছ—তোমার যে কবে একটু বুদ্ধি হবে, টম !”

“আমি কি অন্যায় কিছু বলেছি ! তুমিও তো সেদিন বললে যা হচ্ছে ভাল হচ্ছেনা। পার্টির ভেতর ব্যাপক স্বজনপোষণ, দুর্নীতি। যোগ্যতা এবং মেধাকে ধ্বংস করার সুপরিকল্পিত চক্রান্ত চলছে। সব কিছুই চলছে সাম্যবাদের দোহাই দিয়ে। দেশ পিছিয়ে পড়ছে। যৎসামান্য মেধার যা প্রয়োগ হচ্ছে সবটাই যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণে। কিন্তু কেবল অস্ত্র বানিয়ে সামগ্রিক প্রগতি অসম্ভব। এসব তো তোমারই কথা লিল।”

“হ্যাঁ, আমারই কথা। কখন অস্বীকার করলাম ? বিয়ের পর পনেরোটা বছর। তবু আমাদের দেহ মন তো এক সুরেই বেজে চলেছে টম। কেউ কি স্বপ্নেও ভেবেছি উইলিয়ামের এই পরিণতি হবে! ক্ষমতায় আসতে না আসতেই যেভাবে নৃশংস হয়ে উঠল। সত্যিই অভাবনীয়। শ্রেণি সংগ্রামের নাম করে নির্দোষ নিরীহ মানুষগুলোর উপর কী অত্যাচার ! লেবার ক্যাম্প, পাবলিক এক্সিকিউশন, এমন কি একটার পর একটা জিনোসাইড ! হিটলারও বোধ হয় এতটা নির্মম ছিলনা। স্বজাতি এবং আপনজনের উপর এত ভয়াবহ আক্রমণ সেই নাজি নেতাও নামিয়ে আনেননি। তার বিষ নজরে ছিল ইহুদি, কম্যুনিস্ট, রোমা জিপসি আর সমকামী। কিন্তু উইলিয়াম ! সে তো তার পার্টি কমরেডদেরও একের পর এক –কখনও নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে, কখনও দলের কর্মীদের লেলিয়ে দিয়ে—না, টম এ শ্রেণি সংগ্রাম নয়, পৈশাচিক বর্বরতা ! অক্ষম অপদার্থ মানুষের প্রতিহিংসাকে সর্বহারার বিপ্লব নাম দিয়ে গৌরবান্বিত করা। কিন্তু মহান মার্ক্স তো একথা বলেননি। উনি তো সুসংহত সংগ্রামের কথা বলেছেন। উইলিয়ামের মত পিশাচের জন্য তো এই মহান মতবাদটি মিথ্যে হয়ে যায়না !”

“এখানেই তো সমস্যা লিল। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে সশস্ত্র লড়াইয়ের কথাই বলা হয়েছে। অন্তিম অংশটিতে চোখ রাখলেই দেখবে forcible overthrow of all existing social conditions” অর্থাৎ বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই স্থিতাবস্থার সমূল উৎপাটন। তুমিই বল ঘৃণা, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধের মানসিকতা ছাড়া এই বলপ্রয়োগ সম্ভব ? বিশুদ্ধ মন নিয়ে বুর্জোয়া নিধন সম্ভব ? আক্রোশ ছাড়া কোনো যুদ্ধ হয়েছে ? এই ঘৃণার চাষ অনিবার্য লিল ! প্রতিটি সমাজ বিপ্লবেই সে ফরাসী বিপ্লবই হোক আর নভেম্বর বিপ্লবের দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, সর্বত্রই এই প্রতিশোধের প্রকাশ দেখতে পাই। ফ্রেঞ্চ রেভোলিউশনের আগুনে যেমন ষোড়শ লুইকে পরিবার সহ পুড়ে মরতে হয়েছিল, বলশেভিক অভ্যুত্থানেও রোমানভ পরিবার রেহাই পায়নি। প্রতিশোধস্পৃহাই সর্বহারা বিপ্লবের চালিকা শক্তি!”

“আমারও তাই মনে হয় জানো। তবু মাঝে মাঝে ভাবি, এই ঘৃণা, এই প্রতিশোধ পরায়ণতা যদি ভাল কাজে লাগে মন্দ কি ! এতে যদি সমাজের শোষণমুক্তি ঘটে, সবাই মানুষের মত বাঁচতে পারে, নিজেদের অধিকার ফিরে পায়—”

“হা হা হা ! লিল ! আমিও তো তাই ভাবতাম। প্রারম্ভিক অন্ধকার অতিক্রম করে আমরা আলোর পথযাত্রীই হব। সাম্যের জয়গানে দূর হবে অসাম্যের অমানিশা। কিন্তু প্রতিহিংসা থামলনা। প্রথমে ধনী বুর্জোয়াদের আক্রমণ করা হল। সেখানে অর্থনৈতিক মানদণ্ডটিই মুখ্য ছিল। সম্পদ ভোগের শীর্ষের অবস্থানকারী এই সব ধনকুবেরদের পতন মেনে নিতে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু আক্রমণটা এখানেই থামলনা। মধ্যবিত্তরাও আক্রান্ত হলেন । অথচ এঁরাই চিন্তায় চেতনায় মেধায় সমাজের এগিয়ে থাকা অংশ। কম্যুনিস্ট পার্টি এঁদেরকেও ঘৃণার নিশানা বানিয়ে ফেলল। বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া বিদ্বেষটি অবিশ্বাস্য সব শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে ক্রমে ক্রমে মহীরুহ হয়ে উঠল। আর্থ সামাজিক বৈষম্যকে ছাপিয়ে মেধাকেও গ্রাস করা শুরু করল। কারণ সেখানেও অসাম্য ! অপদার্থ, নিম্ন মেধার মানুষ উচ্চ মেধার মানুষের উপর অত্যাচার নামিয়ে আনল। আবহমানকাল ধরে চলে আসা পরশ্রীকাতরতা, ঈর্ষাকেও শ্রেণি সংগ্রামের তালিকাভুক্ত করা হল। পার্টির উচ্চপদে আসীন কমরেডটি নিম্ন পদস্থ কমরেডের মেধাকে মেনে নিতে পারলনা। আরম্ভ হল এক পূতিগন্ধময় “সাম্য” প্রতিষ্ঠার লড়াই। আর্থিক সাম্য তবু কিছুটা দূর পর্যন্ত মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু মেধার সাম্য ? সেও কি সম্ভব ? প্রকৃতি স্বয়ং যেখানে বৈপরীত্য এবং অসাম্যের উপর দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এই জাতীয় সাম্যের ভাবনা সভ্যতাকে পিছিয়ে দিতে বাধ্য। নিতজের মত মহা প্রতিভাবান দার্শনিকও এই egalitarianism কে অবৈজ্ঞানিক বলে নস্যাৎ করে দিয়েছেন।”

“জানো টম ! রিটাকেও কাল থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। সকালে কি একটা কাজে বেরিয়েছিল। আমার খুব ভয় করছে জানো। বসের সঙ্গে সম্পর্কটা ভাল যাচ্ছিলনা। কি একটা প্রজেক্টের ব্যাপারে ওর নকশাটাই নাকি কর্মচারীদের ভাল লেগেছিল। বসও একটা প্ল্যান দিয়েছিলেন। সেটা নাকি কারও পছন্দ হয়নি। এতেই নাকি ইগোতে লেগেছে। আমার একটাই ভয়। বসটি এখন পার্টির উচ্চপদে। চেয়ারম্যানের সঙ্গে ওঠাবসা।”

“রিটা ? কোন রিটা ?”

“সেকী! ভুলে গেলে ! ওই যে নীল চোখ, সোনালী চুল। রোগাটে গড়ন। মুখটা এত নিষ্পাপ যে পুলিশের ঝামেলা হতে পারে এমন সব কাজই ওকে দিয়ে করানো হত। ইউনিটের যত নিষিদ্ধ পোস্টার, ইস্তেহার, রিটাই তো ডেরায় ডেরায় পৌঁছে দিত। পুলিশ ফাঁদ পাতে। এক রবিবারের বিকেলে ও ধরা পড়ে যায়। সারারাত ধরে সেই বীভৎস অত্যাচার—উফ !”

“মনে পড়েছে। স্মৃতির কী দোষ ! মগজের উপর আস্ত একটা জগদ্দল পাথর। হ্যাঁ লিল ! আমরা প্রত্যেকেই অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। আদর্শের জন্য, পার্টির জন্য। রিটার নারীত্ব, তোমার চাকরি, আমার কারাবাস এমন অনেক অনেক ত্যাগের বিনিময়ে এই যুদ্ধজয়।”

“জানি টম। প্রতিটি মুহূর্তে তোমাকে যে যন্ত্রণা, আত্মপীড়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়, আমিও অনুভব করি। একসময়ের সহ যোদ্ধা হলেও জ্ঞানে, গুণে প্রজ্ঞায় যে তোমার চেয়ে কয়েক যোজন পিছিয়ে, সে-ই এখন সর্বময় কর্তা হয়ে উঠেছে। সহস্র গুণ যোগ্য হয়েও তোমাকে তার অধীনে চাকরি করতে হয়। এ যে কত বড় অপমান ! আর এই কারণেই অন্যমনস্কতা । মারাত্মক সব ভুল করে ফেল।”

“কী ভুল লিল ?”

“এই যে আজও আবার ডায়েরিটা সঙ্গে নিচ্ছ ! মৃত্যুবাণটা কি নিজেই ওর হাতে তুলে দেবে ? এই ডায়েরিতে যা যা লিখেছ, কতটা বিপদজনক নিশ্চয় বোঝ ?”

“হা ! হা ! লিল, তুমিও ! আমি যে এসব পরোয়া করিনা, তোমার চেয়ে ভাল কে জানে। মানুষের জন্যই একদিন জীবনের বাজি ধরেছিলাম—সে প্রাণ যদি যায় যাক।”
“না, টম। এখনও যে অনেক কাজ। প্রতিজ্ঞার কথা ভুলে গেলে ? তোমার জীবন অমূল্য ! এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠা বোকামি। উইলিয়াম পারেনা, এমন কোনো কাজ নেই।”

“সে কি আমার অজানা ! তবে আর বেশিদিন নয়। মানুষ আর এসব মেনে নেবেনা। প্রতিবাদ হবেই। ঝড় আসন্ন !”

“সে হয়ত হবে ! কিন্তু ভুলে যেওনা। সব ক্ষমতা এখনও উইলিয়ামের হাতে। পার্লামেণ্ট ভেঙে দিয়েছে, পরিচালন সমিতিকেও বরখাস্ত করেছে। সেনাবাহিনীও ওর কব্জায়। তোমার মতিগতিও ঠিক বুঝতে পারিনা ।মাঝে মাঝে গায়েব হয়ে যাও। চারদিকে গুপ্তচরের জাল। বড্ড ভয় করে।”

“কী যে বলো। আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার আগে ও দুবার ভাববে । আমার হাত ধরেই রাজনীতিতে আসা। পার্টির সদস্যপদটিও আমার অবদান। যাক, কি করলে তোমার দুর্ভাবনা কমবে বল।”

“তোমার ডায়েরি। ওটা আর সঙ্গে রেখোনা। আমাকে দাও। লুকিয়ে রাখব। যখন নতুন কিছু লেখার ইচ্ছে হবে, চাইলেই দিয়ে দেব। বুঝলে ?”

৩]

সেই উজ্জ্বল গোলাপি রঙের হাতবদল কিভাবে যেন উইলিয়ামের টেবিলটিও ছুঁয়ে ফেলেছে ! কিন্তু কিভাবে ? ওটা তো নিছক ডায়েরি নয়। মৃত্যু পরোয়ানা। লিলি তো তেমনই বলেছিল।

“কী ভাবছেন টমাস ইকুয়াল টু ডু ? হা হা হা !”

অট্টহাসিটি নতুন নয়। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে এ হাসি অনেকবার দেখেছে। কিন্তু আজই প্রথম লক্ষ্য করল ব্যঙ্গের মাত্রাটা শব্দের প্রাবল্যকে রীতিমত টক্কর দিচ্ছে। কাঁপতে থাকা পেপারওয়েটটা থিতু হয়ে বসতেই প্রশ্নটা আবার কড়া নাড়ল। ডায়েরিটা এখানে কেন ?না, নিছক প্রশ্ন নয়, একটা আশঙ্কা ! অন্য রকমের !

“কমরেড টমাস ! চরম আহাম্মকটিও বলে দিতে পারবে এই মুহূর্তে আপনি কি ভাবছেন। প্রিয়তমা লিলির হাতে দেওয়া আপনার মৃত্যু পরোয়ানাটি আমার আলমারিতে কিভাবে ঢুকে পড়ল তাই না ? হা হা হা ! কমরেড ! সবাই সাফল্যের পূজারী। নারীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং একটু বেশিই। লিলিও তাই করেছে। আপনি যদি ওর জায়গায় থাকতেন, কাকে বাছতেন ?অনুগত আপ্তসহায়ক নাকি রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তা ? ভাবুন কমরেড , ভাবা প্র্যাকটিস করুন।”

এসব কী বলছে উইলিয়াম ! লিলিও কি তবে ? সেদিন থেকেই নিখোঁজ ! ফোনও করেনি। জরুরী কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে। আপিস থেকেই পাঠাচ্ছে। হ্যাঁ, তেমনই তো বলেছিল।আপিস ট্যুরের নাম করে লিলি কি তবে —— ! নিখুঁত এক পরিকল্পনা ! না, নিছক পরিকল্পনা নয় ‍! ষড়যন্ত্র ! নীরব অথচ নিখুঁত !এমন এক ছোবল যাতে কোনো শব্দ নেই, শুধু বিষ আছে; নিবিড় এবং নির্মম ! সব কিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। পায়ের তলার মাটিটা ঠিক আছে তো ? সত্যিই কি এসব ঘটছে ! নাকি শক্তিশালী হয়ে ওঠা পরাবাস্তবের জগতটা একটু একটু করে—নিজেকে চিমটি কেটে দেখার পূর্বজ প্রক্রিয়াটিকে আরেক বার ঝালিয়ে নেওয়ার কথা ভাবতেই সেই আলো আঁধারি ! না ঠিক রাত নয়— চার্চের চূড়া ছুঁয়ে ফেলা অক্টোবরের ভোর — না, ঠিক ভোরও নয়— এ পাড়ার একমাত্র ম্যাপল গাছের মাথায় রাত্রি তখনও শেষ লড়াইটা জারি রেখেছে—লিলিকে নিয়ে শুরু করা সংসারের বয়স তখন মাত্র এক মাস, বিপ্লবের এক বছর—উইলিয়ম তখনও কম্যুনিস্ট পার্টির এক সাধারণ সদস্য—কিন্তু অনেক অনেক কাছের–

৪]

“কী ব্যাপার লিল ! ফিরতে এত রাত হল !
“ওই যে পার্টি মিটিং ‍ !”
“হা হা হা ! আরে মিটিং তো আমিই ডেকেছিলাম। সে তো সন্ধের আগেই মিটে গেছে। তোমাকে উইলিয়মের সঙ্গে দেখলাম। নদীর দিকে হেঁটে গেলে—”

“হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছ ! ওর সঙ্গেই ছিলাম।”

“বেশ। আমাকে বলে যেতে পারতে !”

“কেন বলো তো ! সব ব্যাপারেই তোমাকে বলে যেতে হবে ! অনুমতি নিতে হবে ! ভুলে যেওনা টম, দেশটা বদলে গেছে। দুদিন পরেই মহান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বর্ষপূর্তি ! পুরুষ পুরুষ ব্যাপারটা একটু কমাও–”

“এসব কি বলছ, লিল ! আমি কবে পুরুষ ছিলাম ! প্রেমিক হয়েই তো তোমার সঙ্গে পথ চলা। দুশ্চিন্তা বলে একটা শব্দ আছে ! একী! তোমাকে এমন এলোমেলো দেখাচ্ছে কেন লিল ! আগে তো কখনও এভাবে —!”

“প্লিজ টম। দোহাই তোমার। কিছু জানতে চেওনা। সামনে অনেক কাজ। দেশটাকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। তোমার আমার স্বপ্নের দেশ।”

৫]

টমাস কোনো প্রশ্ন করেনি। অভিমুখ বদলে ফেলা লিলের চোখদুটোকে কেন এমন উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছিল, অবিন্যস্ত চুলের বৃত্তান্তে কোন কালবৈশাখীর পদচিহ্ন, উজ্জ্বল লাল রঙের টপটিতে আটকে থাকা রোজনামচাটা আকস্মিক এমন এলোমেলোই বা হয়ে গেল কেন এসব অনুচ্চারিত প্রশ্ন দেশ গঠনের কার্যক্রমে হাস্যকর এবং অপ্রাসঙ্গিক। তাই কালের গর্ভেই বিলীন হয়ে গেল সেই কাক ভোরের বর্ণমালা। লিলির প্রতি উইলিয়ামের দুর্বলতার খবর মাঝেমধ্যেই কানে এসেছে । একটুও অবাক হয়নি। সুন্দরী নারীর প্রতি পুরুষের দুর্বলতা চিরকালীন। আর লিলের মত আকর্ষণীয়া রমণী এ তল্লাট কেন, সমগ্র দেশেই বিরল। চল্লিশে পৌঁছেও দীপ্তিতে তেমন ভাঁটা পড়েনি।তবু দ্বিতীয় কোনো পুরুষের প্রতি লিলির আকর্ষণ বা সখ্যতার কোনো তথ্য নেই। কিন্তু ডায়েরিটা ? উইলিয়ামের হাতে পৌঁছে যাওয়া টমাসের প্রাণ ভোমরা ! তাকে কিভাবে অস্বীকার করবে ? লিলির সম্মতি ছাড়া যা অসম্ভব। বিস্ময়টা সত্যিই বিপন্ন হয়ে উঠছে। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি ! এমন মুহূর্তগুলিই বোধ হয় দার্শনিকের জন্ম দেয়। There are more things in heaven and earth, Horatio, Than are dreamt of in your philosophy. হ্যাঁ এই জাতীয় মাহেন্দ্রক্ষণেই কবিতা, দর্শন সব একাকার হয়ে যায়। অকল্পনীয় এই পরিবর্তন টমাসকেও হ্যামলেটের কথা মনে করিয়ে দিল। সব কিছু কেমন অর্থহীন লাগছে। একটি মাত্র মুহূর্ত ! কিন্তু কত অসীম তার ক্ষমতা। ডায়েরি থেকে অনেক আগেই চোখ সরিয়েছে। টমাসের দৃষ্টি এখন জানালায়। সেগুনের ফ্রেম থেকে লালাভ পর্দার আচ্ছাদন অনেকটাই সরে গেছে। সুবিশাল উদ্যানের বিস্তারে মনোরম সবুজের সমারোহ। মহামহিম রাষ্ট্রনায়কের দপ্তর ঘিরেই যে দেশের সর্ব বৃহৎ উদ্যানটি গড়ে উঠবে, আর সেই উদ্যানেই তাঁর সর্ব বৃহৎ স্ট্যাচুটির নির্মাণ হবে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।কত মিটার যেন ! মনে পড়েছে। পঞ্চাশ মিটার। নতুন করে রঙ করা হচ্ছে। গত সপ্তাহ থেকে। বড় বড় মই আর উঁচু উঁচু মাচা। তবে এখন কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। হয়ত বিশ্রাম নিচ্ছে। মাথা উঁচু করে আর একবার দেখে নিল। সত্যি সুন্দর ! কী রাজকীয় ভঙ্গিমা ! পরনে মিলিটারি ফেটিগ ! দীপ্তিময় মুখমণ্ডলে সুবিন্যস্ত গোঁফ। কোমরের রিভলবারটিও বড় যত্নে খোদাই করা। না, লিলি কোনো ভুল করেনি। সাফল্যকেই বেছেছে। এদেশের সফলতম মানুষ এখন উইলিয়াম। অপরিসীম ক্ষমতাধর, মহামহিম চেয়ারম্যান। টমাস ডু লিটল থুড়ি ইকুয়াল ডু-র অবয়ব নিয়ে কি এমন কোনো স্ট্যাচুর জন্ম হবে যার রাজকীয় ভঙ্গিমা লিলিকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে ? লিলি ! লিল !কন্ঠনালির প্রত্যন্ত অন্ধকারে কি যেন একটা দলা পাকাচ্ছে ! কী নামে ডাকবে তাকে ? কান্না ? নাকি অভিমান ?

আপ্ত সহায়কটির এই একনিষ্ঠ দৃষ্টিপাত, অন্যমনস্কতা মহামহিম চেয়ারম্যানের চোখ এড়ায়নি। জানালার ওপারে ঠিক কি আছে এবং কোন বস্তুটিকে ভাল করে দেখার উদ্দেশ্যে টমাসকে এত আগ্রহী হতে হচ্ছে সহজেই অনুমেয়। যার হাত ধরে কম্যুনিস্ট পার্টিতে আসা, সেই গুরুটিকেই যদি সুবিশাল চেলা মূর্তির দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকতে হয়, মনের অবস্থা কী দাঁড়ায়, ভুক্তভোগী মাত্রেই বোঝে। সেই চেলাটিই যদি গুরুর প্রিয়তম প্রেমিকা এবং সহধর্মিনীকে এক লহমায় হাতিয়ে নেয়, অনুভূতিটা সোজা সপ্তম স্বর্গ ছুঁয়ে ফেলে ! হা হা হা ! টমাসের মুখ দেখে আবার চেলা হয়ে ওঠার সাধ জাগছে ! তুই তোকারি করে পুরনো দিনগুলিকে কিঞ্চিৎ ফিরিয়ে আনলে কেমন হয় ! মানে মহামহিম উইলিয়াম থেকে চেলা উইলিয়াম হয়ে ওঠা। গুরু শিষ্যের বয়সে তেমন ফারাক নেই। তুই তোকারিই চলত। কিন্তু এখন কি আড্ডাটা জমবে ! এই মুহূর্তে টমাস ডু লিটল এদেশের সবচেয়ে অসহায় এবং বিপন্ন মানুষ। রাষ্ট্র দ্রোহিতার চরম নিদর্শন স্বরূপ গোলাপি রঙের ডায়েরিটা ইতিমধ্যেই মৃত্যু পরওয়ানা লিখে ফেলেছে। চেয়ারম্যান যতই চেলা হয়ে ওঠার ভান করুক, টেবিলটাও জেনে গেছে তার একদিকে শিকার, আরেকদিকে শিকারি। শুধু একটাই সমস্যা। ফাঁসি না ফায়ারিং স্কোয়াড ? পাবলিক এক্সিকিউশনে ঝুঁকি আছে। অসন্তোষ বাড়বে। জনগণের একাংশ ইতিমধ্যেই বিক্ষুব্ধ। কাজটা যত গোপনে সারা যায়, ততই ভাল। কিন্তু একী ! ডায়েরির কোনায় একটা দাগ ! কাল রাতেই তো সব মুছে ফেলেছিল। নিজের হাতেই । কিন্তু এত কিছুর পরও ! অবিশ্বাস্য ! এত নিখুঁত ভাবে ধুয়ে ফেলার পরও –উইলিয়াম কি ভয় পাচ্ছে ? কিন্তু কেন? দাগটা রক্তের বলে ? তা কি করে হয় ? সমুদ্রে যার বিছানা, সে কেন শিশিরে ভয় পাবে ? বিপ্লব করার সময় যত না, তার চেয়ে অনেক বেশি রক্তপাত ঘটেছে ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য। উইলিয়মের চেয়ে ভাল করে সেটা কজন বোঝে ! অথচ সামান্য একটা রক্তের দাগ ওকে এমন করে কাঁপিয়ে দিচ্ছে কেন ? পারাবার পার হয়ে এসে কি শেষে গোষ্পদে ডুবে মরবে ? উত্তরটা অজানা নয়। ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েও আবার জেগে ওঠা দাগটা জেকব, জনসন অথবা ভেরোনিকার হলে কোনো সমস্যা ছিলনা। রক্তটা লিলির ! কিন্তু এমন তো নাও হতে পারত ! দুই দশকের ওপার থেকে একটা দৃশ্য —ফ্ল্যাশব্যাকের মত—

৬]

“এত জেদ কিসের লিলি ?কাছে আয় না । মাত্র এক রাউণ্ডের ব্যাপার। আর চাইবনা।কথা দিচ্ছি।”
“অসম্ভব। কতবার বলব। তুই কি এই জন্যই এখানে নিয়ে এলি ! জরুরী কথার নাম করে। খুব অবাক হই জানিস।”

“হা হা হা ! অবাক হওয়ার কি আছে ! সুন্দরী বলেই তোর সঙ্গে শুতে ইচ্ছে করে। যেদিন প্রথম দেখেছি, সেদিন থেকেই এই একটাই ইচ্ছে।”

“ব্যাস ! এবার থাম উইলিয়াম। সেদিনও আমি টমাসের ছিলাম, এখনও তাই। তখন প্রেমিকা, এখন স্ত্রী, জীবনসঙ্গিনী। সব জেনেও—বলিহারি তোর রুচি !”

“আর তোর রুচি ? মান্ধাতা আমলের মধ্যবিত্ত মানসিকতা নিয়ে বিপ্লব করতে নেমেছিস ! সাম্যবাদী আদর্শের ছিটেফোঁটাও তোর মধ্যে নেই। কম্যুনিজম মানে বুঝিস ? নিজেকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বানিয়ে রেখেছিস ! তোর কি পরিচয় বল তো? টমাসের প্রেমিকা ? টমাসের সহধর্মিনী? তুই মানুষ না মাল ?”

“মানে ? এসব কি বলছিস ? মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছিনা।”

“না বোঝার কি আছে ? এই পৃথিবীর জল বাতাস ফুল পাখি নদী সমুদ্র, খাদ্য পানীয় সব কিছুতেই সবার সমান অধিকার। প্রার্থিত, কাম্য যা কিছু সবই যদি কতিপয় মানুষের কুক্ষিগত হয়ে ওঠে, তবে বিপ্লব করে কী লাভ ! ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে আর কতদিন বাঁচবি ? আয়না লিলি, শুধু একবার—আর চাইবনা। কথা দিচ্ছি !”

“অবিশ্বাস্য ! বিপ্লবের সৈনিক বলেই তোকে এখনও সহ্য করে চলেছি, উইলিয়াম। ভদ্রভাবে বলছি, পথ ছাড়। তোর যুক্তি মাথায় ঢুকছেনা।”
“হা ! হা ! হা ! মাথায় ঢুকছেনা ? ভেরি সিম্পল—তোর মত পরমাসুন্দরী নারীকে আজীবন একজনই ভোগ করবে ! সেটা কি অবিচার নয় ! যাবতীয় সুন্দরকে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই তো এ লড়াই ! যত দেখি ততই মুগ্ধ হই। মধ্য চল্লিশেও তোর বুক আর পাছা একটুও টোল খায়নি ! ভাবা যায় !”

“অসহ্য ! তোর মত সাম্যবাদী যত কম হয় ততই মঙ্গল। পথ ছাড় ! নইলে রিপোর্ট করতে বাধ্য হব ! মাল আর মানুষকে এক করে দেখাটা আর যাই হোক সমাজতন্ত্র নয়।”

৭]

বাগে পেয়েও সেদিন ছেড়ে দিয়েছিল। বলা ভাল বাধ্য হয়েছিল। বিপ্লবের বর্ষপূর্তি হলেও উইলিয়াম তখনও এক সাধারণ মেমবার মাত্র। টমাস তখন জেলার দায়িত্বে, রাজ্য কমিটির প্রভাবশালী মুখ। কর্তৃপক্ষের কানে পৌঁছলে, কেরিয়ারের বারোটা। প্রাণপাখিটিও খাঁচা ছাড়া হতে পারত ।তবে অপেক্ষার মৃত্যু হয়নি। সিঁড়ি ভেঙে যত উপরে উঠেছে, ততই আগ্রাসী হয়েছে সেই উদগ্র কামনা। এত দ্রুত উত্থান হবে, স্বপ্নেও ভাবেনি। মাত্র কয়েকটা বছর। অবশেষে এই মাইলস্টোন ! পার্টির চেয়ারম্যান এবং রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক।মহা পরাক্রমশালী সর্বময় কর্তা। অভীপ্সিত সব কিছুই হাতের মুঠোতে। শুধুই আঙুল তোলার অপেক্ষা। উইলিয়াম আর দেরি করেনি। সুবিশাল স্ট্যাচুটা মেঘের রাজ্যে ঢুকে পড়তেই লিলি নামের বৃষ্টিটাকে করায়ত্ত করা অত্যন্ত সহজ হয়ে উঠল। জরুরি আপিস ট্যুরের অজুহাতে ওকে শহরের বাইরে পাঠানো হল। কলকাঠিটা উইলিয়ামই নেড়েছিল। চেনা ছকের আপিস ঘরের পরিবর্তে বিলাসবহুল পাঁচ তারা স্যুটে ঢুকে পড়ার পর লিলি বেশ চমকেই গিয়েছিল। চেয়ার টেবিল, ড্রয়ারের পরিবর্তে সোফা, ডিভান, বিলাসবহুল বিছানা ! লেজারের বদলে আঙুর, ফাইলের বদলে আপেল, ক্যাসাব্লাঙ্কা লিলি ! না, এবার আর তত্ত্বকথার ধার ধারেনি। সাম্যবাদ কি এবং কেন, নারী এবং মালের মধ্যে কতটা ফারাক, অথবা আদৌ কোনো পার্থক্য আছে কিনা, কতটা ইচ্ছে বা অনিচ্ছে, এসব অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কই ! নিছক কামনা নয়, প্রতিহিংসার মাত্রাটিও আকাশ ছুঁয়েছে। এত ঔদ্ধত্য ! উইলিয়ামের মত একজন সুদর্শন, সুপুরুষকে প্রত্যাখ্যান—অভাবনীয় ! সতী নারীটিকে শিক্ষা না দেওয়া পর্যন্ত শান্তি নেই। চমক ভাঙার কোনো সুযোগই দেয়নি। মে আই কাম ইন বলে ভেতরে ঢোকা মাত্রই জাপটে ধরেছিল। বাঘ যেভাবে হরিণের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার পরিকল্পনা ছিলনা। ধর্ষক নয়, প্রেমিকের মত করেই আদর অর্থাৎ শৃঙ্গার পর্ব সেরে নিয়ে মূল পর্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া। কিন্তু ওই যে ম্যান প্রোপোজেস, গড ডিসপোজেস ! ভগবানে বিশ্বাস না করলেও লিলির ক্ষেত্রে সব হিসেব কেমন গুলিয়ে যায়। ডায়ালেকটিক্স নামের অসীম শক্তিশালী বিজ্ঞানটিই যে মহা বিশ্বের নিয়ন্তা বোঝার উপায়ই নেই ! নইলে চুমু খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন এমন চড় কষিয়ে দেবে ? ও কি জানতনা নারী পুরুষ একে অপরের প্রতি আকর্ষিত হয় ? দৈহিক মিলন বা যৌনতা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। এতে আপত্তির কোনো কারণই নেই। তবে কেন এই মধ্যবিত্ত প্রতিরোধ ? কেন এই হাস্যকর নৈতিকতা ? সাম্যবাদের প্রতি বিন্দুমাত্র ভালবাসা থাকলে কি উইলিয়ামকে এমন নির্মম হতে হত ? ব্রেসিয়ারটা যদি নিজের হাতেই খুলে দিত, কোমরের বেল্টটা স্বতস্ফূর্তভাবে সরে দাঁড়াত, তবে কি এমন বলপ্রয়োগের দরকার পড়ত ? শুধু কি তাই ? প্যান্টির ভেতর লিঙ্গ ঢোকানোর সময় যদি অসভ্যের মত লাথি না ছুঁড়ত, তবে কি গুলি চালানোর প্রয়োজন হত ? ফুল আঁকা বিছানাতে কেবল অরগাজমের স্মৃতিই লেগে থাকত, রক্তের বন্যা অন্তত বইতনা। তবু হাল ছাড়েনি। এতটা এগোনোর পর কি হাল ছাড়া যায় ? সাম্যবাদকে কখনও বিসর্জন দেওয়া যায় ? অপ্রস্তুত যোনিপথেই শিশ্ন ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তৃপ্তিও কিছু কম হয়নি। অর্ধ মৃত নারী শরীরেও যে এত উত্তাপ থাকতে পারে অকল্পনীয় ছিল। ইজাকুলেশনের হ্যাং ওভারটা কাটতে অন্তত দশ মিনিট। হুঁশ ফিরতেই কাজে লেগে পড়ল। লাশ সরিয়ে ফেলা, রক্তের দাগ মোছা। একটুও সমস্যা হয়নি। একটাই ভুল করেছিল। হাতের রক্ত না মুছেই হ্যাণ্ড ব্যাগটা খুলে ফেলা। তাতেই এই বিপত্তি। ডায়েরিটাতেও রক্ত লেগে গেল। হ্যাঁ, এই সেই ডায়েরি ! টমাসের প্রাণভোমরা !আপ্তসহায়কটিকে শাস্তি দেওয়া অথবা বিপদে ফেলার কোনো কার্যক্রমই ছিলনা। সন্দেহ বা অবিশ্বাস করার কোনও কারণই ঘটেনি। এমন বিশ্বস্থ পি এ সর্ব কালেই দুর্লভ। ক্ষমতা দখলের পর প্রথম কাজটাই ছিল টমাসকে চাকর বানানো। জনতার চোখে যতই সম্মানীয় হোক, পেশাগতভাবে যতটা নিচে নামানো সম্ভব, উইলিয়াম সেটাই করেছে। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রথম ধাপ। টমাস কোনো আপত্তি জানায়নি। যদিও লাভ হতনা। শুধু একটা বাড়তি মজা পাওয়া যেত । টমাস সে পথে হাঁটে নি। অনুগত ভৃত্যের মতই প্রতিটি আদেশ মেনে চলেছে। ডায়েরিটা হাতে আসা নিতান্তই কাকতালীয়।নিছক কৌতূহলের বশেই ব্যাগটা খুলেছিল। কিন্তু কেঁচো খুঁড়তে যে এভাবে সাপ বেরিয়ে পড়বে— প্রথম পাতাটা পড়তে না পড়তেই চোখ চড়ক গাছে। আপ্তসহায়কটির মনে যে এত বিষ লুকিয়েছিল কে ভেবেছে। শুধু বিষ নয়, রীতিমত গরল, রাষ্ট্রদ্রোহ বলতে যা বোঝায়। আনুগত্যের মুখোশ পরে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ! টমাসকে প্রাণে মারার কোনো ইচ্ছে ছিলনা। আপ্তসহায়ক বানিয়েই সন্তুষ্ট ছিল। কিন্তু এখন কি করবে ? এর পর ওকে ক্ষমা করা মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা। কিন্তু কিভাবে মারবে ? ফায়ারিং স্কোয়াড না ফাঁসি ? নাকি গুপ্তহত্যা ? তারও কি কোনো প্রয়োজন আছে ? লিলির বিশ্বাসঘাতকতার গল্পটা যদি বিশ্বাস করে নেয়, তবে এমনিতেই ও মরে যাবে। আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনো অপশনই নেই। জল ছাড়া মাছ আর লিলি ছাড়া টমাস দুই-ই অসম্ভব। কিন্তু রক্তের দাগটা ? মুছে ফেলার পরেও ওটা কিভাবে ফিরে এল? টমাসের চোখে পড়লে ? না, উইলিয়াম আর ভাববেনা। দেখুক বা না দেখুক ওর মৃত্যু অনিবার্য ! হত্যাই হোক অথবা আত্মহত্যা। ফলাফল অভিন্ন।
৮]

“কী ভাবছিস উইলিয়াম ? রক্তের দাগটা আমার চোখে পড়েছে কিনা ? দেরিতে হলেও পড়েছে ! নিজের প্রতি ঘেন্না হচ্ছে জানিস ! কারণ কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও আমি তোকে বিশ্বাস করেছিলাম। ভুলে গিয়েছিলাম জ্যান্ত লিলিকে ভগবানও ছুঁতে পারবেনা, তুই তো একটা থার্ড গ্রেডের সাইকো । পারলিনা উইলিয়াম ! মহা মহিম চেয়ারম্যান হয়েও তুই আদতে একটা পরাজিত মানুষ। মানুষই বা বলি কি করে ! তুই একটা নর্দমার কীট ! ছলে বলে কৌশলে ক্ষমতা দখল করলেই নেতা হওয়া যায়না উইলিয়াম। প্রজ্ঞাহীন ক্ষমতা শুধুই ফ্রাঙ্কেস্টাইনের জন্ম দেয়। Power corrupts, absolute power corrupts absolutely !”

“খুব জ্ঞান ঝাড়ছিস দেখছি ! আমার দয়াতেই বেঁচে আছিস বুঝলি। নইলে অনেক আগেই খরচ হয়ে যেতিস। খুব দেমাক না ? তাত্ত্বিক নেতা বলে কথা ! পান থেকে চুন খসলেই হেনস্থা আর অপমান ! সব মনে আছে। প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত ! তবু তোর হাত ধরেই তো পার্টিতে আসা। তাই এখনও শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছিস ! নর্দমার কীট হলেও একেবারে অকৃতজ্ঞ নই। কী বলিস ! হা হা হা !”

টমাস এখন কী করবে ? কী করা উচিত ? উইলিয়ামের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে ? প্রাণাধিক জীবনসঙ্গিনীর উপর আঘাত নেমে এলে এমন প্রতিক্রিয়াই তো স্বাভাবিক। না, মাথা ঠান্ডা রাখাটাই এখন একমাত্র চ্যালেঞ্জ। প্রথমত লিলি জীবিত না মৃত সেটা পরিষ্কার নয়। উইলিয়ামই সত্যটা জানে। লিলির হদিশ পাওয়ার জন্যই ওর বেঁচে থাকাটা জরুরি। তাছাড়া ও সশস্ত্র। কোমরে ঝুলতে থাকা লেটেস্ট মডেলের মাউজারটা কদাচিৎ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তবে আর একটা দিন সময় পেলেও —বিক্ষোভের বারুদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে। উইলিয়ামকে কি ফেরানো যাবেনা ? ব্যক্তিগত আবেগে লাগাম টেনে সেই কাজটাই বরং করা যাক।

“এসব কী বলছিস ? উইলিয়াম ! হেনস্থা ? অপমান ? তোকে ? যা বলেছি, যতটুকু বলেছি সব ভালোর জন্য। পার্টির স্বার্থে, বিপ্লবের স্বার্থে। তোর পথে তো কখনও বাধাও হয়ে দাঁড়াইনি ! তবে এত আক্রোশ কেন উইলিয়াম ?”

বিস্ময় বেড়েই চলেছে। অথচ যন্ত্রণার পাল্লাটিই ভারি হওয়ার কথা ছিল। কেন এমন ঘটছে ? লিলি এখনও বেঁচে আছে ! অকথ্য নির্যাতনের পরেও তো কেউ কেউ শ্বাস নেয়। যদিও সেই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। কারণ প্রাণ থাকতে ও ডায়েরিটা হাতছাড়া করবেনা। সে কারণেই কী এই প্রশান্তি? হ্যাঁ, তাই। লিলি বিশ্বাসঘাতক নয়। টমাসের জন্য ও অবলীলায় মরে যেতে পারে। এই প্রত্যয়ের চাইতে পবিত্র আর কিছু হতে পারে ? উইলিয়ামের রক্ষিতা লিলির চাইতে অনন্তের বাঁকে মিলিয়ে যাওয়া লিল অনেক বেশি আকাঙ্ক্ষিতা। কিন্তু এ কি স্বার্থপরতা নয় ? না, কারণ টমাসও এই একই গন্তব্যে হেঁটে যাবে। আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। তারপরেই ফায়ারিং স্কোয়াড। বড্ড দেরি হয়ে গেল। আর একটা দিনও যদি হাতে থাকত ! হ্যাঁ, এখানেই বিস্ময় ! টমাস নিজের কথা ভাবছেনা। উইলিয়ামের কথা ভাবছে। মহা মহিম চেয়ারম্যান। এত ভালবাসা, এত বিশ্বাস, এত নির্ভরতা দিয়ে লালিত একজন সহযোদ্ধার এই পরিণতি ! একী মেনে নেওয়া যায় ! উইলিয়াম ! নিছক একটি নাম নয় ! উইলিয়াম মানে বিপ্লবের শ্লোগান, মুষ্ঠিবদ্ধ হাতের উড়ান ! উইলিয়াম মানে পোস্টারের রাত, প্যামফ্লেটের দুঃসাহস, দুর্নিবার ব্যারিকেড ! উইলিয়াম মানে এক অমিত সম্ভাবনা ! অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া দূরন্ত এক শঙ্খচিল ! না, অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ছিল ! জানালার ওপাশ থেকে একটা হাওয়া। ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া পর্দায় একটা রাত। বিপুলাকার স্ট্যাচুটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। একটু একটু করে ছোট হয়ে যাচ্ছে আকাশচুম্বী অবয়ব। পরনে মিলিটারি ফেটিগ নয়, চে গুয়েভারার মুখ আঁকা ঢোলা টি শার্ট। ডান হাতে ব্লেইড, বাঁ হাতে সিগারেট। উসকোখুসকো দাড়িতে বাড়তে থাকা অযত্ন। রাত জাগা চোখদুটো তবু কী আশ্চর্য রকমের উজ্জ্বল !

“কিরে উইল, সিগারেটটা ফেল তো! ফিলটারটাও ফুঁকে দিবি নাকি ! সবার হয়ে গেছে। শুধু তুই বাকি।”

অধৈর্য হয়ে ওঠা পিটারের গলাটা যেন অনেক দূর থেকে ভেসে এল। ম্রিয়মাণ হতে থাকা মোমের আলোতেও গ্লাসটা কেমন জ্বলজ্বল করছে। চায়ের পাত্র হিসেবে একটু আগেই যে গ্লাসটা ঠোঁটে ঠোঁটে ঝুলে পড়েছিল, সেখানে এখন শুধুই রক্ত। আপাতত তিন জনের। টমাস, লিলি, পিটার। প্রত্যেকের কব্জি্তেই ব্লেডের দাগ। উইলিয়ামের জন্য অপেক্ষা চলছে। জনযুদ্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। কাল ভোর থেকেই মহা রণ । হাজার হাজার ব্যারিকেড। উত্তেজনার পারদ ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। হাতিয়ার আর ইস্তেহারে উপচে পড়া ডেরা। মাটির দশ ফুট নিচে এই আস্তানাটাকে বাঙ্কারই বলা যায়। গ্রাম শহরের আনাচে কানাচে এমন অজস্র আস্তানা বানানো হয়েছে। পুলিশের বাপের সাধ্য নেই খুঁজে বের করে। কিন্তু শাসকও তো ছেড়ে কথা বলবেনা। সর্বহারার লড়াইকে পিষে মারার জন্য গুণ্ডা থেকে মিলিটারি সব কিছুকেই লেলিয়ে দেবে। কে বাঁচবে কে মরবে ঠিক নেই। আইডিয়াটা লিলির। প্রত্যেকে কয়েক ফোঁটা করে রক্ত দেবে। রক্তের গ্লাস ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করবে কেউ মরে গেলেও বাকিরা এই লড়াই চালিয়ে যাবে। পালাবেনা, ভেঙেও পড়বেনা।

মহান সর্বহারা বিপ্লব সফল হয়েছে। ওদের কেউই মরেনি। কম বেশি আহত হলেও সবাই বেঁচে গিয়েছিল।শুধু টমাসকেই বেশ কিছুদিন শুয়ে কাটাতে হয়েছিল। বুকের ডান দিকে বুলেটের ক্ষতটা এখনও চিনে নেওয়া যায়।তবু মৃত্যু এসেছিল। শত্রুর হাতে হয়। সহযোদ্ধার হাতে। প্রথমে পিটার। মহা মহিম চেয়ারম্যান হিসেবে ক্ষমতায় আসার পরই কম্যুনিস্ট পার্টিতে শোধন কর্মসুচি শুরু হয়। প্রতি বিপ্লবীর তকমা লাগিয়ে সোজা ফায়ারিং স্কোয়াড। কদিন হয়েছে ! বড় জোর দু মাস। আর লিলি ? লিল !
মোমবাতিটা কবেই নিভে গেছে। গ্লাসটারও কোনো হদিশ নেই। উইলিয়ামের শরীরটাও আবার বাড়তে শুরু করেছে। রক্তও নেই, মাংসও নেই। শুধু পাথর আর লোহা, লোহা আর পাথর। মানুষ থেকে মূর্তি হয়ে উঠলে যা হয়।

“হা হা হা ! শুধু আক্রোশ নয় ! ঘৃণা। ঈর্ষাও কম কিছু নয়। বুর্জোয়াদের প্রতি যেমন অনুভূতি থাকা উচিত !”

উইলিয়ামের গলা। তবে সোচ্চার কোনো উচ্চারণ নয়। ফিসফিসই বলা চলে। বিদ্বেষ আর ঘৃণার বর্ণমালায় সেজে ওঠা বিজাতীয় এক স্বগতোক্তি। কিন্তু টমাস কিভাবে বুর্জোয়া হল ? প্রাথমিক শিক্ষকের একমাত্র পুত্র হিসেবে নিদারুণ দারিদ্র না দেখলেও, বিলাসের ছিটেফোঁটাও উপভোগ করেনি। বিপ্লবের দুই দশক পরেও অত্যন্ত শাদামাটা যাপন। উইলিয়াম যে উন্মাদ হয়ে গেছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বিচিত্র এই জীবন। আরও বিচিত্র মানুষের মন। নইলে এমন দুঃসময়েও কৌতূহলের জন্ম হবে কেন ! তবে কিশোরের চোখে বিস্ময় হয়ে জ্বলে ওঠা কৌতূহল নয়। রক্ত, ঘাম আর অশ্রুর ইতিকথা নিয়েও বেশ কিছু জিগীষার উড়ান শুরু হয় ! এমনই এক অনুভব রক্তের ভিতর জমাট বাঁধছে।

“বুর্জোয়া ! আমি ! কেন ! কিভাবে ! কী ঐশর্য আছে আমার !”

“কেন ! লিলি ! ওর চেয়ে অমূল্য কিছু হয় ! যাকে তুই নিজের দখলে রেখেছিলি। বছরের পর পর ! যুগের পর যুগ।”
“লিলি ! লিল ! এসব কি বলছিস উইলিয়াম ! মানুষ আর পণ্য এক করে দিলি ! এ কেমন ডায়ালেক্টিক্স তোর ! লিলি এখন কোথায় ? ডায়েরির মলাটে লেগে থাকা রক্তের দাগটা বলছে ও ভাল নেই।ও বেঁচে আছে তো ?”

“না, নেই। তবে আমি ওকে মারতে চাইনি। কিন্তু যে নিজেই মরতে চায় তাকে কে বাঁচাবে !”
“কিছুই বুঝতে পারছিনা। তোর তো ডায়েরিটাই লক্ষ্য ছিল। তবে কেন—”
কথা জড়িয়ে গেল। গলার ভেতর আটকে থাকা দলাটা ক্রমশ বড় হচ্ছে। প্রতিশোধ স্থগিত করা যায়। কিন্তু কান্না ? তাকে কিভাবে আটকাবে ? চারপাশটা কেমন ধোঁয়াটে হয়ে যাচ্ছে। চেয়ার, টেবিল, আসবাব, জানালা, স্ট্যাচু, মহা মহিম চেয়ারম্যানের মুখ ! লিলি ! লিল !

৯]

“বাব্বা কী পার্শিয়ালটি ! পারিনা পারিনা ! টমাসের পাতে সমুদ্র আর আমার পাতে এক চিলতে ডোবা ! বর বলেই কি এমন বাড়তি বেনিফিট ! লিলি থেকে লিল হয়ে গেলেই কি এমন স্বার্থপর হতে হয় !”
সুদূর অতীত থেকে একটা কণ্ঠস্বর। প্রথম বিবাহ বার্ষিকীতে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত একমাত্র অতিথি। লাঞ্চের পর পিটার চলে গিয়েছিল। কিন্তু উইলিয়ামকে কি ছাড়া যায় ! প্রিয় শিষ্যটির জন্য ভরপেট ডিনারের আয়োজন। উইলিয়াম তখন উইলিয়ামই ছিল। মহা মহিম হয়ে ওঠেনি।

“উফ ! তোকে নিয়ে আর পারিনা উইল। অনেক রান্না করেছি। যত ইচ্ছে খা। স্যামন, টুনা, ল্যাম্ব, কি চাই বল ! তাড়াতাড়ি খাস বলে পাত ফাঁকা হয়ে গেছে। টমাস তো খেতেই পারেনা।”
লিলি কি তখনও জানত স্যামন, টুনা, ল্যাম্বের আড়ালে উইলিয়াম আসলে কোন সুখাদ্যটির ইঙ্গিত রাখছে ?

১০]

সব কিছু কেমন অলীক মনে হচ্ছে। এমনও তো হতে পারে আসলে কিছুই ঘটছেনা। পুরোটাই দুঃস্বপ্ন ! এগারোটা বাজতে না বাজতেই আচমকা বেয়াড়া হয়ে ওঠা দিনটা শুধু একটা রিওয়াইণ্ড বাটনের অপেক্ষায় ! বোতামে চাপ পড়লেই সে আবার আগের অবস্থানে ফিরে যাবে ! এই তো ধোঁয়াটা ক্রমে হালকা হয়ে আসছে। উল্টোদিকে বসে থাকা মুখটিও ক্রমশ স্পষ্ট ! উইল ! উইলিয়াম ! হত দরিদ্র এক কৃষক পরিবারের চতুর্থ সন্তান ! পাতাহীন এক উইলো গাছের নিচে বসে টমাস যাকে শ্রেণি সংগ্রাম বুঝিয়েছিল !

“ডায়েরিটা লক্ষ্য ছিলনা। ওটা কাকতালীয় আবিষ্কার ! নেহাতই কৌতূহলবশত ওর ব্যাগটা খুলে ফেলেছিলাম !”

আর একটা স্বগতোক্তি ! উইলিয়াম যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে।

“তবে ? কী উদ্দেশ্য ছিল তোর ? চুপ করে আছিস কেন ?”

“হা হা হা ! এখনও বুঝলি না !তুই-ই তো জ্ঞান দিতিস ভাই, পৃথিবীর সব সুন্দর, সুস্বাদু জিনিষ কতিপয় মানুষের করায়ত্ত থাকবে, সে কি মেনে নেওয়া যায় ! তবে লিলি এটা বুঝতনা। বুঝিয়েও কোনো লাভ হয়নি। ফাটা ক্যাসেটের মত একটাই বাক্য – “আমি টমকে খুব ভালবাসি, উইল। অন্য কোনো পুরুষের কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা !” যত্ত সব পেটি বুর্জোয়া সেন্টিমেন্ট !

“গড ড্যামনড মেগালোম্যানিয়াক !”

টমাসের বুক ফুঁড়ে চাপা একটা হিসহিস !

গালাগালটা বোধহয় কানে ঢুকলনা। আত্মরতিতে মগ্ন মহামহিমের মুখে যেন খই ফুটছে।

“কী তেজ মাইরি ! জড়িয়ে ধরতে না ধরতেই হাত পা চালানো শুরু করল। লাথিটা একেবারে টার্গেটেই মেরেছিল। সরে না গেলে সারা জীবনের জন্য খোজা হয়ে যেতাম।একটুও ইচ্ছে ছিলনা জানিস। তবু ট্রিগার টিপতেই হল। খুব একটা কষ্ট পায়নি। মিনিট খানেকের ছটফট। তারপর সব চুপ। তাতে কী ! এতদিনের স্বপ্ন ! সে কি বিফলে যাবে ! ব্যক্তিমালিকানার উপর সামাজিক মালিকানা স্থাপন না করলে সাম্যবাদ অসম্ভব। আহ কী তৃপ্তি ! মৃত নারী শরীরও এত উত্তেজক হতে পারে ! ফার্স্ট রাউণ্ডের পর নেশাটা আরও বাড়িয়ে দিল। তারপর—-থাক, তোর কষ্ট হচ্ছে। ভাবছি চল্লিশেই এই স্বাদ, তবে আঠেরোতে কেমন ছিল—তুই সত্যিই ভাগ্যবান টমাস !”

“শুয়োরের বাচ্চা ! আগে যদি তোকে বাগে পেতাম! শালা নর্দমার কীট !”

“হা হা হা ! এই তো ! কুল কাস্টমার বলে পরিচিত তাত্ত্বিক কমরেডটি অবশেষে ফোঁস করে উঠেছেন ! এই মুহূর্তটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। শান্ত শিষ্ট মানুষের উপর গুলি চালাতে কেমন যেন লাগে ! মরার জন্য তৈরি হয়ে যা টমাস ! আর হ্যাঁ, লিলিকে বলিস, চায়ের গ্লাসে আমার রক্ত ছিলনা। তোদের ঢালা রক্তই কব্জিতে লাগিয়ে নিয়েছিলাম। রক্ত ঝরাতে বেশ লাগে। কিন্তু নিজের নয়। তোরা সত্যিই খুব বোকা টমাস !”

১১]

পয়েন্ট ব্ল্যাংকে ওঁত পেতে থাকা মাউজারটা কপাল ছুঁয়ে ফেলেছে। ট্রিগারে আঙুল। চাপ পড়লেই ধেয়ে আসবে মৃত্যু। টমাস অপেক্ষা করছে। ভয় নয়, বরং অনাগত এক শান্তির প্রতীক্ষা। তবে আফশোস আছে। ভুল পথে বেঁকে যাওয়া জীবনটাকে যদি আর একবার ফিরিয়ে আনা যেত ! ইউটোপিয়ার গোলকধাঁধা আরও যে কত রক্ত ঝরাবে ! এই মৃত্যু মিছিলে টমাসই শেষ মুখ হলে, বড় শান্তি নিয়ে চলে যাওয়া যেত। উইলিয়াম হাসছে । কিসের হাসি ? যুদ্ধজয়ের ? নাকি লালসার উল্লাস ? ওই তো আঙুলটা নড়ে উঠেছে ! অথচ পৃথিবীটা কত সুন্দর ! কত কিছু জানা হলনা, দেখা হলনা। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মানুষের কী করা উচিত এই ভেবে টমাসের চোখ আবার জানালার দিকে উড়ে গেল । একী ! স্ট্যাচু ঘিরে একটা ভিড় মনে হচ্ছে । উত্তেজিত, উন্মত্ত ! জটলাটা ক্রমশ বাড়ছে। কারও হাতেই নির্মাণ সামগ্রী নেই। লোহার রড, শাবল আর কুঠার। চোখ কান দুই-ই সজাগ হয়ে উঠল। মই বেয়ে বেশ কিছু মানুষ ইতিমধ্যেই উপরে উঠে গেছে। মহা মহিমের মুখের সামনে একটি লোক ! সমবেত জনতাকে সে-ই যেন পথ দেখাচ্ছে। ঠিক চেনা যাচ্ছেনা। কে হতে পারে ? সের্গেই না মলোটভ ? লোকটা ট্রাউজার্সের জিপ খুলছে কেন ? বুঝে ওঠার আগেই একটি জলস্রোত ! এ কী দেখছে টমাস ! চোখ মুছতে গিয়েও সামলে নিল। কারণ যা ঘটছে, তা দিনের আলোর মতই স্পষ্ট। লোকটা হিসু করছে। উইলিয়াম থুড়ি মহামহিম চেয়ারম্যানের মুখ লক্ষ করে ছুটে যাচ্ছে সেই হলুদাভ স্রোত ! হাসি চাপতে পারলনা !
“হো ! হো ! হো ! হো ! হো !”
হকচকিয়ে যাওয়া উইলিয়াম ঠিক বুঝে উঠতে পারলনা, কি ঘটছে। শিয়রে শমন জেনেও কেই বা এমন করে হাসতে পারে !আপ্ত সহায়কটির দৃষ্টি অনুসরণ করে মহা মহিম চেয়ারম্যান যখন তাঁর পূর্ণাবয়ব আত্মপ্রতিকৃতির দিকে তাকালেন, প্রস্বাবের শেষ ফোঁটাটিও চিবুক ছুঁয়ে ফেলেছে। স্ট্যাচুর পাদদেশে আছড়ে পড়া জনস্রোত। রাশি রাশি শাবল, কুড়ুল আর রডের আঘাতে কেঁপে উঠছে পঞ্চাশ মিটারের গগণচুম্বী নির্মাণ!

“সেন্ট্রি ! গার্ডস !”

কলিং বেলের উপর চেয়ারম্যানের আঙুল।

কেউ কোত্থাও নেই !

“সেন্ট্রি !”

না, সত্যিই কেউ নেই !
বিপদ ঘন্টার উপর মহা মহিমের হাত। আঘাতের পর আঘাত ! প্রতিধ্বনির পর প্রতিধ্বনি।কিন্তু কেউ তো আসছেনা ! মহা মহিম কি কখনও ভেবেছিলেন শত সহস্র ঘণ্টাধ্বনির পরেও এক জন দেহরক্ষীরও দেখা মিলবেনা ? কিছুক্ষণ আগেও যে হাতগুলো স্যালুটের বিভঙ্গে নেচে উঠেছিল, খিদমতের সুবাসে মাতাল হয়ে ওঠা সেই সব আঙুলও মহা মহিমের মূর্তি ভাঙার কাজে সক্রিয় হয়ে উঠবে ? না, কেউ কোত্থাও নেই। উদ্যত রিভলবারের নলটিও নিশানা বদলে ফেলেছে। রাষ্ট্রদ্রোহীর কপাল নয়, তার অভিমুখ এখন মাটির দিকে। নুইয়ে পড়া হাতদুটোকেও শরীরের অংশ বলে মনে হচ্ছেনা।

১২]

টমাস হাঁটতে শুরু করল । মহামহিমকে ভয় পাওয়ার আর কোনো কারণ নেই। নেতিয়ে পড়া আঙুলে আর যাই হোক ট্রিগার টেপা যায়না। পঞ্চাশ মিটারের সুবিশাল আত্মপ্রতিকৃতিটির পতন হলেও, সেক্রেটারিয়েটের বিলাসবহুল কক্ষে সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার আর একটি স্ট্যাচুর জন্ম হয়েছে। রক্ত মাংস দিয়ে গড়া। কিন্তু এই মুহূর্তে চলচ্ছক্তিহীন, জড়বৎ। টোকা দিলেই পড়ে যাবে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাও নেই। লিলিরা চলে গেলে টমাসরা আজও বড় একা হয়ে পড়ে । হল ঘর পেরিয়েই লম্বা বারান্দা। সামনেই পোর্টিকো। সিঁড়িতে পা রাখতে না রাখতেই গুলির শব্দ। কিন্তু কী আশ্চর্য! শরীরে একটুও যন্ত্রণা নেই। তবে কি লক্ষ্যভ্রষ্ট হল? পিছু ফিরতেই যা চোখে পড়ল তা যে একেবারেই অপ্রত্যাশিত বলা যাবেনা। লালে লাল হয়ে যাওয়া টেবিলে উইলিয়ামের মাথা। ডান কানের উপরে সদ্যজাত ফুটোটা এখনও রক্ত ওগরাচ্ছে।
“উইলিয়াম ! উইল ! ভাই আমার ! আমাদের অন্য কোথাও যাওয়ার কথা ছিল। তাই না ?”
বিজয়োল্লাশ নয়, আর্তনাদও নয়। শুধুই একটা দীর্ঘশ্বাস।
বিকেল হচ্ছে। সব্বাইকে ভাল রাখার প্রতিজ্ঞা নিয়ে চার জন যুবক যুবতী এক সঙ্গে রক্ত দিতে চেয়েছিল। চতুর্থ যোদ্ধাটি এইমাত্র তার কথা রেখেছে। গ্লাসটাও কানায় কানায় পূর্ণ। শপথসিঞ্চিত সেই অপরাহ্নের একমাত্র প্রতিনিধি এখন টমাস। লিলি, পিটার, উইলিয়াম কেউই বেঁচে নেই। তাতে কি ! প্রতিজ্ঞাটি এখনও জীবন্ত। পথ কখনও শেষ হয়না। লড়াইও। কিন্তু গন্তব্য ? অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া দিকচক্রবালে অজগরের মত হারিয়ে যাওয়া পথ। তবু স্পষ্ট অনুভব করল পোর্টিকোর দিকে এগিয়ে যাওয়া পাদুটো টমাস ডু ইকুয়াল থেকে আবার টমাস ডু লিটল হয়ে উঠছে।

লেখক:দেবাশিস লাহা
ছবি:বিষ্ণু মাইতি

4 COMMENTS

  1. পড়লাম।। communism এর স্বরূপ।।

    সাম্যবাদ সাম্যবাদ বলে যে চিৎকার,তা কি আদপে সব ভণ্ডামি।। একনায়কতন্ত্রের সামান্য পরিবর্তিত রূপ।।

    এই লেখা ইংরেজি তে যাকে বলে “disturbing and disruptive”..

    দেবাসিসের ক্ষুরধার কলম স্বমহিমায়।।

    তৃপ্ত।।

  2. পড়লাম! অসাধারণ! সাহিত্য আর ইতিহাসের যুগলবন্দী, যুগ যুগ জিও…
    লাল লাল লাল সেলাম…
    আপনাকে আর আপনার লেখনীকে!

  3. অসাধারণ লিখেছেন!!! সব দেশের গল্পেই এটি খাপ খায়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here