শ্রেণিশত্রু

0

Last Updated on

প্রবীর চক্রবর্তী


    ‘বন্ধুগণ!আপনারা নিশ্চয়ই জানেন গত এগারো বছর আমাদের ইউনিয়ন কীভাবে কলেজের উন্নয়নযজ্ঞে শামিল হয়েছে, যে কোনো সমস্যায় বন্ধুর মতো ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।—-’
কলেজের ছুটির পর ইউনিয়ন মিটিং ডেকেছিল। অরূপ শুনতে শুনতে মাঝেমাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছে। মফস্‌সলের স্কুল থেকে এসে কলকাতার এই নামী কলেজটায় ভরতি হয়েছে মাসখানেক হল। মনে হচ্ছে বদ্ধ পুকুরে সাঁতার কাটতে কাটতে হঠাৎ দুকুল-ছাপানো নদীতে এসে পড়েছে। এখন নৌকা বাইতে বাইতে দু-চোখ ভরে শুধু দেখছে। এখানে স্যরদের শাসনের বাঁধন নেই, স্কুলের মতো অতক্ষণ থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। ইচ্ছে করলে ক্লাসে কাউকে প্রক্সি দিতে বলে দিব্যি কেটে পড়া যায়। একগাদা বই-খাতা ব্যাগে পুরে নিয়ে আসতে হয় না। মেজাজে স্যরদের নোট নেওয়ার জন্য একটা-দুটো খাতা, পেন হাতে করে নিয়ে এলেই হল। আজ ক্যানটিনে তাকে আলাদা করে ডেকে ইউনিয়নের দুজন সিনিয়র দাদা অনেকক্ষণ কথা বলেছে। তাদের কর্ম-কাণ্ড ব্যাখ্যা করেছে, বিভিন্ন বিষয়ে তার মত জানতে চেয়েছে। তারপর অনুরোধ করেছে আজকের সভায় আসার জন্য। অরূপ উপভোগ করছিল। এর আগে এভাবে গুরুত্ব দিয়ে বড়োরা কখনও তার সাথে কথা বলেনি, মতামত জানতে চায়নি। নিজেকে একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ বলে ভাবতে ইচ্ছে করছে। রাস্তাঘাটে মাঝেমাঝে ‘আপনি’ সম্বোধন শুনতে পাচ্ছে। অরূপের ঠোঁটে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি খেলে গেল। কলেজ তাকে এক ধাক্কায় অনেক বড়ো করে দিয়েছে।
‘আগামী সাতাশে সেপ্টেম্বর কলেজ-ইউনিয়নের নির্বাচন। আপনাদের কাছে একান্ত অনুরোধ আমাদের প্রার্থীদের বিপুল ভোটে জয়ী করুন।’
তুমুল হাততালির মধ্যে মিটিং শেষ হল। দাদাদের একজন তাকে দেখে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করল-‘থ্যাঙ্ক ইউ। আবার আসবে কিন্তু, ইউ আর অলওয়েজ  ওয়েলকাম।’
অরূপ মাথা নেড়ে বেরিয়ে এল। সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। আজ বাড়ি ফিরতে বেশ দেরি হয়ে যাবে। কলেজের গেটের কাছে অন্ধকারে কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা ডাকল তাকে। এদের মধ্যে দু-তিনজনকে চেনে। এরাও সিনিয়র দাদা।
‘তুমি ফার্স্ট-ইয়ারে পড়ো না! এতক্ষণ ওদের মিটিংএ ছিলে?’
অরূপ ঘাড় নাড়ল।
‘তা কী বলল দাদারা?’
অরূপ কী বলবে বুঝতে পারছিল না-‘অনেককিছুই তো বলল—’
‘সব ডাহা মিথ্যে কথা। তোমাদের নতুন পেয়ে মগজধোলাই করছে। উন্নয়ন! ল্যাবরেটরিতে অর্ধেক যন্ত্রপাতি নেই, লাইব্রেরিতে বই নেই। কতকাল ধরে ইকনমিকসে‌র তিনজন প্রফেসর নেই, অনার্সের ক্লাস অবধি মাঝেমাঝে বন্ধ থাকছে। এসএলটি হলে ছাদের দিকে তাকিয়েছ? যে কোনো সময়ে মাথায় ভেঙে পড়তে পারে, কারও হুঁশ নেই। ছাতার উন্নয়ন করছে।’
পাশ থেকে আর একজন বলল, ‘ওরা বিপদে-আপদে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ায়! ঠিক এর উলটোটাই করে। অথরিটির সাথে পুরো সাট আছে। গতবার কয়েকজনকে কোনো কারণ ছাড়াই পরীক্ষায় বসতে দিল না। ওরা কিছু করেছে?’
অরূপ চুপ করে শুনছিল। এটা সত্যি সে অনেককিছু জানে না। তবু এদের কথায় মন সায় দিচ্ছিল না।
‘তোমার বাড়ি কোথায়?’
‘দত্তপুকুর।’
‘সেটা কোথায়?’
‘বনগাঁ লাইনে।’
‘ও! সে তো অনেক দূর। তোমাকে আর আটকাব না। তুমি বেরিয়ে পড়ো। পরে আবার কথা হবে।’
অরূপ ঘড়ির দিকে তাকাল। সাড়ে-ছটার ট্রেনটা ধরতে হবে। এই প্রথম একা যাচ্ছে। প্রতিদিন যাতায়াতের সঙ্গী সুনীল আজ নেই। ও মিটিংএ থাকতে চায়নি। আগেই চলে গেছে। ওরা দুজন ছোটোর থেকেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। দত্তপুকুরের স্কুলে একসাথে পড়ত। বাড়িও একই পাড়ায়।
        _            _        _
    ওরা দত্তপুকুর থেকে সকাল আটটা-চল্লিশের ট্রেন ধরে। কম্পার্টমেন্ট নির্দিষ্ট থাকে। মধ্যমগ্রাম থেকে সৌমিত্র উঠে ওদের সাথে যোগ দেয়। ভিড়ের ট্রেনে তিনজনে গল্প করতে করতে চলে আসে। ফেরার ট্রেনের ঠিক থাকে না। এক-এক-দিন এক-এক-রকম ক্লাস থাকে। তবে সাধারণত ওরা একসাথেই আসে। ইদানিং অবশ্য গল্পের বদলে তর্কটাই বেশি হচ্ছে। কলেজে দুটো ছাত্র-সংগঠন আছে। ক্ষমতাসীন প্রগ্রেসিভ অ্যাসোসিয়েশন অব্‌ স্টুডেন্টস আর বিরোধী ডেমোক্রেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব্ স্টুডেন্টস। সংক্ষেপে  প্রগ্রেসিভ আর ডেমোক্রেটিক বলে সবাই। অরূপ প্রগ্রেসিভের সমর্থক, সুনীল ডেমোক্রেটিকের। দুজনেই তাদের প্রিয় সংগঠনের পক্ষে প্রাণপণ যুক্তি খাড়া করে। যুক্তির লড়াই ক্রমশ দুই তরুণের অহংএর লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। সৌমিত্র নির্দিষ্টভাবে কোনোপক্ষেই নেই। মাঝেমাঝে মন্তব্য করে শুধু। তর্কাতর্কি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে ওদের দুজনকে থামিয়ে দেয়।    ‘অরূপ! আজ তিনটের সময় একজিকিউটিভ কমিটির মিটিং আছে, চলে আসিস।’ ইউনিয়নের সহকারী সম্পাদক বলল।
অরূপের সাথে ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন দাদার অন্তরঙ্গ সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ওকে একজিকিউটিভ কমিটির মেম্বার করে নিয়েছে, কেমিস্ট্রি-অনার্স ব্যাচের দায়িত্ব দিয়েছে।
অরূপ দ্বিধা করছিল-‘তিনটের সময় ‘জেবি’র ক্লাস আছে।‘
‘একটা ক্লাস না করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। নেতা হয়েছিস, মাঝেমাঝে ক্লাস কামাই হবে।’ দাদা অরূপের কাঁধে হাত রেখে হেসে বলল, ‘জনগণের সেবা করতে নেমে ব্যক্তিস্বার্থ ভাবলে চলবে!’
‘নেতা’ কথাটায় অরূপের সারা শরীর বেয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল।
কলেজের ছাত্র-ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বলতে শুরু করল, ‘আজ বিশেষ কারণে এই জরুরি মিটিং ডাকা হয়েছে। আমরা জানি কিছুদিন পরেই কলেজে নির্বাচন। বিরোধীরা আমাদের হটাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নানারকম অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সম্পর্কে জঘন্য কুৎসা করছে, এমনকী ইউনিয়ন-ফান্ড তছরূপের মতো মারাত্মক অভিযোগও এনেছে। আমার কানে এসেছে সাধারণ ছাত্ররা এতে বিভ্রান্তও হচ্ছে। গত এগারো-বছর আমরা ক্ষমতায় আছি। আমার মতে এত কড়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আর কখনও হইনি। এই পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কী আপনারা একে একে বলুন।’
‘আমাদেরও পালটা-প্রচারে নামতে হবে।’ ‘ঠিক। সেটা যথেষ্ট আক্রমণাত্মক হতে হবে।’ ‘ধরে ধরে প্রতিটি ছাত্রর কাছে পৌঁছতে হবে, তাদের বোঝাতে হবে।’ ‘ব্যাপকভাবে পোস্টারিং, ওয়ালিং করতে হবে।’
অনেক প্রস্তাব উঠল। সাধারণ সম্পাদক এতক্ষণ চুপ করে সবার কথা শুনছিল। এবার বলল, ‘আপনাদের প্রতিটি প্রস্তাবই অত্যন্ত মূল্যবান। সবগুলোই আমরা গ্রহণ করছি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এটাও যথেষ্ট নয়।’
সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সম্পাদক আবার বলল, ‘একবার ভাবুনতো বিরোধীরা হঠাৎ এত শক্তিশালী হল কী করে! পোস্টার, লিফ্‌লেট, এসব করতে অনেক খরচ আছে। টাকা জোগাড় করছে কীভাবে! ওদের তো কোনো ফান্ড নেই। তবে! নিজেদের পকেট থেকে সব দিচ্ছে, এটা আমি অন্তত বিশ্বাস করতে পারছি না।’ সম্পাদকের মুখে তির্যক হাসি খেলে গেল। ‘আমার কাছে খবর আছে ওরা স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতার সাথে যোগাযোগ করেছে, তারাই ওদের সাহায্য করছে।’ একটু থেমে বলল, ‘এই অবস্থায় আমাদের কী করা উচিত! আমার প্রস্তাব, টিকে থাকতে হলে আমাদেরও রাজনৈতিক দলের সাহায্য নিতে হবে। ওদের বিরোধী একজন নেতার সাথে আমি দেখা করেছিলাম। তিনি আমাদের কথা শুনতে রাজি হয়েছেন। আপনারা সম্মতি দিলে আজ বিকেল পাঁচটায় ওঁর বাড়িতে যাব। বাড়ি কলেজের কাছেই।’
জোরালো গুঞ্জন শুরু হল। এটা একটা সন্ধিক্ষণই বলতে হবে। এই কলেজের ছাত্র-সংগঠনগুলোর সঙ্গে বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর যোগাযোগ কখনও ছিল না। বিশেষ অনুষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষা বা সংস্কৃতিজগতের ব্যক্তিত্বদের আনা হয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের নয়।
ক্রীড়া-সম্পাদক বলল, ‘আমি এই প্রস্তাব সমর্থন করতে পারছি না। এতো খাল কেটে কুমির ডেকে আনা হচ্ছে। এরপর রাজনীতির নেতাদের কথায় আমাদের ওঠা-বসা করতে হবে। কলেজের ছাত্রদের স্বার্থরক্ষা করতে, সমস্যা মেটাতে আমাদের সংগঠন। এর ভেতরে বাইরের লোকজনকে নাক গলাতে দেব কেন!’
ক্রীড়া-সম্পাদকের আপত্তি সত্ত্বেও অধিকাংশর সমর্থনে প্রস্তাব গৃহীত হল। অরূপের কাছে সবকিছুই নতুন অভিজ্ঞতা। এর আগে কখনও রাজনীতির নেতাদের কাছ থেকে দেখেনি। বাড়ি ফিরতে দেরি হবে জেনেও তীব্র কৌতূহল ওকে টেনে নিয়ে চলল নেতার বাড়িতে। নেতা আদর করে ওদের ড্রয়িং-রুমে বসিয়ে চা-বিস্কুট খাওয়ালেন। বললেন, ‘তোমরা অলরেডি পিছিয়ে পড়েছ। তোমাদের আর একটা সংগঠন অনেক আগেই আমাদের বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। আমার কাছে সব রিপোর্ট আছে।’ 
অনেকক্ষণ কথা হল। নেতা সব ধরনের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন। অর্থ, ক্যাডার, প্রয়োজন হলে নিজেও যাবেন।
_            _            _ 
    ঠিক এক সপ্তাহ পরে ছাত্র-ইউনিয়নের নির্বাচন। গোটা কলেজ উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছে। পোস্টারে, দেয়াললিখনে প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে কলেজ-চত্বরের বাড়িগুলো। ঘন ঘন মিটিং ডাকছে দুই তরফই। কলেজের সাথে সম্পর্ক নেই এমন বাইরের লোকজনদের হামেশা দেখা যাচ্ছে। পুরনো ছাত্ররা, শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মীরা সবাই একবাক্যে স্বীকার করছেন এমন পরিস্থিতি আগে কখনও দেখেননি। কয়েকদিন আগে প্রগ্রেসিভের সভায় স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতা এসেছিলেন। আইন বাঁচিয়ে চত্বরের ঠিক বাইরে ফাঁকা জায়গাটায় সভা হল। ক্লাস ফেলে অনেক ছাত্র সেখানে যোগ দিল। অরূপও ছিল। সে এখন ইউনিয়নের ক্রীড়া-সম্পাদকও। মতের অমিল হওয়ায় আগের সম্পাদক পদত্যাগ করেছে। অরূপ ‘শ্রেণিশত্রু’ কথাটা সেদিন প্রথম শুনল। অর্থটা দাদাদের কাছে ভালো করে জেনে নিল। সাধারণ কোনো শত্রুতা পরে মিত্রতায় পরিণত হতেও পারে। কিন্তু শ্রেণিশত্রু জাতশত্রুর মতো, হয় তুমি থাকবে না-হয় ওরা থাকবে। রক্ত গরম-করা বক্তৃতা দিয়ে নেতা চলে গেলেন। পরের দিন ডেমোক্রেটিকরা একজন নামী রাজনৈতিক নেতাকে এনে একই জায়গায় সভা করল। সেদিনও বেশ ভিড় হয়েছিল।
    দুপুরবেলায় ঘটনাটা ঘটল। প্রগ্রেসিভের সমর্থক কয়েকজন ছাত্রর নজরে এল খেলার মাঠের পাশে কয়েকটা পোস্টার ছিঁড়ে পড়ে আছে। তাদের বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হল না এই কাজ কারা করেছে। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল বিরোধীরা পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে। কলেজের দারোয়ান অবশ্য বলেছিল গতকাল বিকেলে একদল পাড়ার ছেলে এসে অনেকক্ষণ মাঠে ফুটবল খেলেছে। এই পাড়ায় মাঠের অভাব থাকায় পাড়ার ছেলেরা সুযোগ পেলে এখানে এসে খেলে যায়। কাল রবিবার ছিল। ঝামেলা এড়াতে দারোয়ানরা ওদের বাধা দেয় না। দারোয়ানের কথায় কেউ কর্ণপাত করল না। ক্যানটিনে দু-পক্ষ মুখোমুখি হলে তুমুল বচসা শুরু হল, সঙ্গে কুৎসিত গালিগালাজ। অরূপের এখন গালাগালি করতে সংকোচ হয় না। ওদিকে সুনীলকে দেখতে পেল। অরূপ জানে সুনীল এখন ফিজিক্স-অনার্স ব্যাচে ডেমোক্রেটিকের সংগঠনের দায়িত্বে আছে। হাতাহাতি অবশ্যম্ভাবী ছিল। কলেজের কয়েকজন অধ্যাপক মাঝখানে এসে পড়ায় শেষ অবধি এ-যাত্রায় হল না।
ওদের তিনজনের দল ভেঙে গেছে। অরূপের সাথে সুনীলের বাক্যালাপ বন্ধ। একই ট্রেন হলেও দুজন আলাদা কম্পার্টমেন্টে যাওয়া-আসা করে। সৌমিত্র কখনও ওদের কারও সঙ্গে যায়, কখনও একা-একা। আজ অরূপ আর সৌমিত্র একসঙ্গে ছিল।
সৌমিত্র মৃদুগলায় বলল, ‘আমাদের আড্ডাটা একদম ডকে উঠে গেল।’
‘উঠবেই। শ্রেণিশত্রুর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যায় না।’
‘মানে?’ সৌমিত্র হাঁ হয়ে গেল। ‘কে শ্রেণিশত্রু?’
‘কেন! সুনীল! ও এখন যে পার্টির কাছে ভিড়েছে, তারা আমাদের শ্রেণিশত্রু। আর শ্রেণিশত্রুকে যে সাহায্য করে সেও শ্রেণিশত্রু।’
সৌমিত্র হাসল-‘এই পার্টির দাদারাই তোদের মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছে।’
অরূপ রেগে বলল, ‘আজেবাজে কথা বলবি না সৌমিত্র!’
সৌমিত্র হা হা করে হেসে উঠল-‘আমিও শ্রেণিশত্রু হয়ে গেলাম নাকি রে?’
অরূপ থমথমে মুখে চুপ করে থাকল।
সৌমিত্র আবার বলল, ‘মনে হচ্ছে ইলেকশনের দিন গোলমাল হতে পারে। এটাই আমার খারাপ লাগছে। একই কলেজের দুই-দল ছাত্রর মধ্যে লড়াই লাগবে। বাইরের লোকরাই দু-পক্ষকে তাতিয়ে দিচ্ছে। আমার কথা শোন। ওদের বাদ দিয়ে দুটো সংগঠন মুখোমুখি আলোচনায় বসে সমস্যা মিটিয়ে নে।’
‘যারা ‘বাবা-মা’ তুলে নোংরা গালাগালি করে তাদের সঙ্গে আবার আলোচনা কীসের?’
‘ওকথা বলে লাভ নেই। গালাগালি তোরাও করেছিস।’
‘ওরা আগে শুরু করেছে।’
‘একই অভিযোগ ওরাও আনবে।’
অরূপ উত্তর না দিয়ে গুম হয়ে থাকল। একটু পরে হঠাৎ ডান হাত মুঠো করে ঝাঁকিয়ে বলল, ‘দেখি শালা! কী করে জেতে ওরা!’
শিয়ালদা এসে গেছে। সৌমিত্র হেসে দরজার দিকে এগোল।
    নির্বাচনের দিন কলেজ যেন চেনা অবয়ব পরিবর্তন করে যুদ্ধক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছে। সংগঠনের কর্মীরা ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে। কলেজ-চত্বরে প্রচুর লোকজন, তার মধ্যে চওড়া-ছাতির অচেনা যুবকরাও আছে। কিছু পুলিশও আছে। হঠাৎ তুমুল হৈ-হল্লা শুরু হল। ডেমোক্রেটিকরা অভিযোগ করল তাদের একজন সমর্থক ভোট দিতে গিয়ে দেখেছে তার ভোট আগেই পড়ে গেছে। যুযুধান দু-পক্ষ এখন মুখোমুখি। চরম আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ল একে অন্যের ওপর। লাঠি, রডগুলো কোথাও মজুত করা ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশাল পুলিশবাহিনী ঢুকল কলেজে। অধ্যক্ষ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করলেন।
            _            _            _
    ভিজিটিং আওয়ার্স। অরূপ হাসপাতালের সার্জিকাল ওয়ার্ডে চোখ বুজে শুয়ে আছে। অন্যান্য রোগীদের বাড়ির লোকজনরা এসেছে। তাকে দেখতে অবশ্য কেউ আসবে না। বাড়িতে ফোন করে জানিয়েছে বিশেষ দরকারে বাইরে যেতে হয়েছে, কয়েকদিন পরে ফিরবে। মাথায়, ঘাড়ে অনেকগুলো সেলাই পড়েছে। কেউ লাঠির বাড়ি মেরেছিল। তার মতো আরও কয়েকজন হাসপাতালে ভরতি হয়েছে। জানতে পেরেছে সুনীল পাশের অর্থোপেডিক্‌স ওয়ার্ডে আছে। ওর পা ভেঙেছে।
    হঠাৎ হাতে কার স্পর্শ। চোখ মেলে চমকে উঠল-‘মা! তুমি!’
বাবা এখন বাইরে আছে জানে। মফস্‌সলের অনভ্যস্ত, অল্পশিক্ষিতা মা এত বড়ো শহরে একা-একা এল কী করে! জানালই বা কে! মা ওর অবস্থা দেখে প্রথমে কেঁদে ফেলল। তারপর চোখ মুছে থমথমে গলায় বলল, ‘লেখাপড়া করতে কলকাতার কলেজে ভরতি করলাম, আর এই কাণ্ড করেছিস। ছিঃ’
‘তুমি এখানে এলে কী করে? কার সাথে এলে?’
‘কী করে আবার! সুনীলের মা আমাদের বাড়িতে এসেছিল। তার কাছেই সব জানলাম। তারও নিয়ে আসার মতো কেউ নেই বাড়িতে। এদিকে মন তো মানছে না। দুজনে যুক্তি করলাম একসঙ্গে যাব। তারপর দুজনে মিলে লোককে জিজ্ঞেস করে করে ঠিক চলে এলাম।’ মা এবার একটু হাসল।
‘তুমি শ্রেণিশত্রুর মার সাথে এলে?’ অরূপ উত্তেজনায় উঠে বসল।
‘মানে?’
‘শত্রু–মানে–মানে—’
‘চুপ কর। আমাকে আর মানে বোঝাতে হবে না। সুনীল তোর খুব বড়ো শত্রু, তাই তো! বোকা কোথাকার। ও তোর শত্রু হতে যাবে কেন রে! তোরা আলাদা কীসে! লেখাপড়া শিখে এই বুদ্ধি হয়েছে! কোথায় মিলে-মিশে পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াবি, তা না, মারামারি করছিস।’ পশ্চিমের জানলা দিয়ে এক টুকরো সোনালি রোদ এসে মার মুখে পড়েছে, সেখানে ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ সব একসাথে মিশে আছে। মা আবার বলল, ‘শোন। সুনীলের মা তোকে দেখতে আসবে। একদম অসভ্যতা করবি না বলে দিলাম। সুনীলকে আমি দেখে এসেছি। ও বলল এখন পারল না, পরে বাড়িতে গিয়ে আমাকে প্রণাম করে আসবে।’ মার গলা ধরে এল।
ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ। অরূপ দেখল দুই মা ভিড়ে ছিটকে যাওয়ার ভয়ে হাত-ধরাধরি করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। ট্রেন ধরতে যাবে।
______

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here