কমরেডারি

0

Last Updated on

কৃষ্ণলাল সরকার

ঝমঝম শব্দ করে ট্রেনটা ছোট্ট জংশন স্টেশনটাতে এসে থামল । রাত কটা হল; সিদ্ধার্থ রিস্টওয়াচের দিকে এক ঝলক চেয়ে নিল। এগারটা, কিছুই বেশি রাত নয়; কিন্তু জানুয়ারির সেকেন্ড উইকের জমাটি ঠাণ্ডা, তার সাথে যা কুয়াশা পড়েছে আজ ! জ্যাকেটের হেডক্যাপটা দিয়ে মাথা কান ঢেকে নিয়ে সিদ্ধার্থ একটু নিশ্চিন্ত হল। ঠান্ডাও বাঁচবে ,লোকে চিনতেও পারবেনা। এবারে টিকিট কালেকটারকে টিকিট দেখিয়ে রিটায়ারিং রুমটার হদিশ জেনে নিয়ে গুটিগুটি সেইদিকে এগিয়ে চলল। গুন্টুর যাবার ট্রেন সেই ভোরসকালে।

‘ হাওড়া থেকে ডাইরেক্ট ট্রেন নেবেনা, সাবধানের মার নেই,’ দলনেতা কাম বন্ধুস্থানীয় কমরেড সুধাকর রাওই সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে । ‘কদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে হবে , বিশেষ করে তোমার মতো নেতাগোছের কমরেডদের। এজন্য অন্ধ্র কমিটির নেতারা তোমার জন্য গুন্টুরে ব্যবস্থা করে রেখেছেন’।

‘ হুঃ,ক্যাডারই নেই তার আবার নেতা’, হতাশা আর চাপতে পারলনা সিদ্ধার্থ। গত ক’মাস ধরে প্রচণ্ড পুলিশ আর প্যারা মিলিটারি ফোরসের দাপট চলছে, সংগঠনের ত্রাহিত্রাহি অবস্থা। এর মধ্যে আবার শুরু হয়েছে পার্টির মধ্যেকার বিশ্বাসঘাতক রেনিগেডদের খেলা। কিষেনজিকে পুলিশ মেরে ফেলার পরে তাই পার্টিনেতৃত্ব দ্রুতএলাকা খালি করার নির্দেশ জারি করেছে। সত্যিই, দলে এখন ক্যাডার,নেতা কোনকিছুই খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ‘কমরেড, তোমার মতো পোড়খাওয়া সিনিয়ার নেতার মুখে এ কথা ? সেটব্যাক তো বিপ্লবী লড়াইয়ের সময় আসেই, তাই বলে …’ এই পর্যন্ত বলে কথাটা থামিয়ে দিয়েছিল সুধাকর, আর বলারই বা কি আছে !

ব্যাগ থেকে শাল বের করে মুড়িশুড়ি দিয়ে ওয়েটিংরুমের এক কোণে চেয়ারে গা ছড়িয়ে বসল সিদ্ধার্থ , রাজ্যের চিন্তা মাথায় ভেসে আসছে, সত্তরের দশকের সেই দিনগুলোর ছবি। কতোই বা বয়স তখন তার,আর রাজনীতির কীই বা বুঝত; সবে যাদবপুর বি ই কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। দলে দলে ছাত্রযুবরা চারু মজুমদারের নামে যেন হিসটিরিয়া রুগীর মতো তার দলে নাম লেখাচ্ছে। গনতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের নিরাপদ ছত্রচ্ছায়ায় থেকে দূর থেকেই সব দেখে যাচ্ছিল সিদ্ধার্থ এই নিজের ঘরে আগুনলাগানো রাজনীতির কর্মকাণ্ড।অবশ্য সেই বয়সে এতটা বুঝবার মত বুদ্ধি তার ছিল কী? আজ নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে। নাহলে কিছুদিনের মধ্যে সেই বা কী করে এই কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিল সেদিন, আগুন দেখে ঝাঁপিয়ে পড়া পোকার মতো? একের পরে এক প্রিয় বন্ধুরা তখন হয় জেলে নাহয় পুলিশের সঙ্গে অসম যুদ্ধ করে মারা যাচ্ছে। আসলে এক অচেনা আবেগ তাকে তাড়িয়ে নিয়ে আসে।একদিন সে হঠাৎ আবিষ্কার করে নিজেকে তথাকথিত নকশালপন্থীদের দলে।

কলকাতার অলিতে গলিতে তখন বিপ্লবের নামে চলছে খতমের রাজনীতি, এক দুর্বোধ্য আত্মহননের লড়াই,”কেবা আগে প্রাণ …” । আর একতরফা মার খেতেখেতে পালটা মার দিতে শুরু করেছে সেইসময় পুলিশ আর প্রতিরোধবাহিনী, সিদ্ধার্থ হঠাৎ ধরা পড়ে গেল তখন।

‘বিপ্লব করতে এসচে’, ঠাস করে গালে এক বিরাশি সিক্কার চড়, মাথা ঘুরে পড়ে গেল সিদ্ধার্থ। ‘এঃ, নাক টিপলে দুধ বেরোয়, চেহারা দেক ! ভাজামাছটা উল্টে খেতে জানেনা যেন ! আবার নকশাল গুন্ডা হয়চে। এই শুওরের বাচ্চা ঘোড়া চালাস , ঘোড়া’?এবার হাতে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে পুলিশ অফিসারটি।

‘মানে’? ঘোড়া চালাতে যাবে কেন সে?

‘ন্যাকামো হচ্চে’?সপাটে পিঠে এক রুলের বাড়ি পড়ল এবার। ‘পুলিশ মেরেচিস কটা? শা…,মা…’ লাল চোখটা তখন ঘুরছে বোঁ বোঁ করে।‘একরত্তি ছেলে, বাবামা কেঁদে মরচে, সেদিকে খেয়াল নেই, পড়াশুনা ছেড়ে বাবু বিপ্লব করতে লেগেচেন! বল কটা পুলিশ মেরেচিস?’ রুলারটা মাথার দিকে নেমে আসতে আসতে থেমে গেল পাসের ঘরে ওঠা হৈহৈ চীৎকার আর হাততালিতে। আকাশবানীতে তখন ফুল ভল্যুমে ইলেকশন বুলেটিন চলছে, “এইমাত্র খবর পাওয়া গেল,বরানগরে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতিবসু পরাজিত হয়েছেন”।ইলেকশন রেজাল্ট বেরোচ্ছে, একের পর এক সীটে সিপিএম ধরাশায়ী, একতরফা জিতছে কংগ্রেস। আনন্দের চোটে মারধর তখনকার মত বন্ধ। পুলিশ অফিসারেরও দিলখুশ, ‘বুঝলি রে ফুটো বিপ্লবী, তোরা মরচিস গুলিখেয়ে, জেলেপচে আর তোদের নেতারা সব দিল্লীতে কংগ্রেসের গেস্টহাউসে বসে আরাম করছে। ওই চারু মজুমদারকে আমরা যখনতখন ধরতে পারি, আগে তোদের শেষ করি, তারপর ধরব তোদের নেতাদের’।

‘ওরেব্বাস, বলে কীরে, এযে রীতিমতো গটআপ গেম!’ মারের ভয়ে কুকড়ে ছিল সিদ্ধার্থ এতক্ষন,এবার মনেমনে হেসে নিল “জগৎ আনন্দময়…।

‘দে ব্যাটাকে লকআপে পুরে, আজকে এই আনন্দের দিনে আর ওটাকে মারতে ইচ্চা করচেনা’। বাঁচা গেল, মারের হাত থেকে তো এখনকার মত রেহাই মিলল।

‘দাদা কোন্ ট্রেন ধরবেন?’ কোণের চেয়ারটায় একজন বসে আছে এতক্ষন খেয়ালই হয়নি,চমকে উঠল সিদ্ধার্থ। ঘরের উষ্ণতার ওমে একটু বোধহয় চোখ ধরে এসেছিল, তার ফাঁকেই কখন আগন্তুকের প্রবেশ হয়েছে বা। বোঝ ঠেলা, এখন তার কথাবলার ইচ্ছাই নেই, আর ইনি রয়েছেন খোসগল্পের মেজাজে, ‘হাওড়া থেকে আসছেন তো? সেই প্লাটফরমেই দেখেছিলাম।এখানেও আপনি। ভালোই হল, একজন সঙ্গী পাওয়া গেল। আমার মশাই রাতে নিজের বিছানা ছাড়া ঘুম হয়না, বেশ আপনার সঙ্গে গল্প করে কাটান যাবে।

সিদ্ধার্থ এবার ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে দেখল বাধ্য হয়ে, মাঝ পঞ্চাশের ফরসা গাট্টাগোট্টা চেহারা। ‘জব্বর শীত পড়েছে মশাই, হাতপা একেবারে জমে গেল’, বেশ গপ্পেগোছের হাবভাব। অন্যসময়ে হলে জমিয়ে গল্প করতে ভালোই লাগত,কিন্তু এখন একটা ভদ্রতা রাখার মত হাসি দিয়ে এড়িয়ে যেতে চাইল।

‘আমি যাব সেই গুন্টুর, আপনিও নিশ্চয়ই তাই, আর তা ছাড়া আর ট্রেন আছে কোথায়’।‘ ওঃ,সর্বনাশ, পুরো রাস্তাটা এই উপদ্রব সহ্য করতে হবে! একটা ভদ্রতাসূচক হা না গোছের ভঙ্গি করে অন্যদিকে চোখ ফেরাল সিদ্ধার্থ। ‘ঠিক আছে আপনি একটু ঘুমিয়ে নিন, ট্রেনতো সেই শেষরাত্রে। আমি ঠিক সময়মতো ডেকে দেব, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন’। ওঃ , আচ্ছা জ্বালাতন তো, এতো গায়েপড়া ভাব ! মনেমনে বেশ বিরক্ত হলেও করার কিছু নেই, ঘুমের ভান করাই একমাত্র বাঁচার পথ।

“সত্তরের দশক মুক্তির দশক” উল্টোপথে খুব শীঘ্রই সত্যি হয়ে গেল। একাত্তর সালের মধ্যেই কলকাতা ও তার আশপাশ হল নকশালপন্থীদের থেকে প্রায় মুক্ত। অন্য অনেকের মত জেলথেকে ছাড়াপেয়ে সিদ্ধার্থও সমাজের মুলস্রোতে ফিরে এসেছিল।আজ এতদিন বাদে এই প্রৌঢ়বয়সে ,এবার তার গায়ে লেগেছে মাওবাদী ছাপ।সে আবার ঘরছাড়া। অবশ্য ঘর সে করল কোথায়, বিয়ে না করলে আর ঘর করা হয় কী করে !

‘দাদা ঘুমাননি দেখছি।জানতাম।বাড়ির বিছনা ছাড়া কী ঘুম আসে? তার চে’ আসুন গল্প করেই রাতটা কাটিয়ে দিই’।দরাজ গলায় সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন ভদ্রলোক, যেন এ কথার আর কোন নড়চড় নেই।‘এক কাপ চা পেলে মন্দ হতনা,দেখছি দাঁড়ান’। ভদ্রলোক বেশ করিৎকর্মা বোঝা গেল, একটুপরেই এক চাওলা কে নিয়ে হাজির।

এই শীতে চা নয়তো যেন সঞ্জীবনীসুধা, পরপর দুকাপ চা খেয়ে নিয়ে মনটা বেশ খুশি হয়ে উঠল ভদ্রলোকের পরে।‘এইদেখুন, এতক্ষন এক সঙ্গে আছি, আর আমাদের পরিচয়টাই এখনও হয়নি।অবশ্য অফিসিয়াল ইন্ট্রোডাকসন হয়নি বলাই ভাল, আমিতো কোন ছোটবেলা থেকেই আপনাকে চিনি। অবাক হচ্ছেন তো! সেতো হবেনই, আসলে আপনিতো সেই জেলথেকে ছাড়া পাবার পরে আর বারাসাতেই থাকলেননা, হস্টেলে থেকে পড়াশুনো,তারপরে চাকরি’।

সিদ্ধার্থ অবাক মানে অবাক! ‘’আর আপনি?’অস্ফুটে প্রশ্নটা করে তাকিয়ে রইলেন।

‘আর এতদিন পরে আমাকে কী আর চিনবেন? আমি ভোলা, পার্কের পাড়াতে থাকতাম। আপনাদের থেকে অনেক ছোট’।এবারে সুর অন্তরঙ্গ করে চোখের কোণে বাঁকাভঙ্গি করলেন, আমাদের কাজ ছিল পুলিশ আসলে আপনাদের খবর দেওয়া’। সিদ্ধার্থর অবাক হতে কিছু বাকি থাকলনা আর। হ্যা,সেই সত্তরের দশকের দিনগুলিতে তাদের জন্য ছিল বৈকি এই ধরনের সাহায্যকারীরা। ক্ষুদিরামরূপী এইসব প্রায়কিশোর ও ছোটছোট ছেলেগুলো রামচন্দ্রের সেতুবন্ধনে বানরসেনার মত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেইসময় বিপ্লবের কাজে সাহায্য করতে , কেউ বুঝে কেউ না বুঝে।এবার ভালোভাবে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল সিদ্ধার্থ ,অনেক চেষ্টা করেও কিন্তু চিনতে পারলনা সেদিনের ভোলাকে। এতদিন পরে !

‘আরে ছেড়ে দিন , এত পুরনো কথা কী মনে থাকে’? তারই চিন্তার প্রতিধ্বনি করল যেন লোকটি। ‘জানেন, আপনাদের মতো আমিও স্বপ্ন দেখতাম সেইসময় সমাজপরিবর্তনের। সেই কিশোরবয়েসে কীইবা বুঝতাম!কিন্তু কিছু একটা তো চিন্তা করেছিলাম, লালঝান্ডা হাতে নেওয়ার যে উত্তেজনা! মানে একটা জোশ! মানে আমি আপনাকে ঠিক বোঝাতে পারছিনা’।হঠাৎ কিছুটা আবেগবিহ্বল হয়ে পড়লেন যেন ভদ্রলোক।‘আচ্ছা কী হল বলুনতো এতসব করে? মিছিমিছি এতো লড়াই, এতো খুনোখুনি!’সিদ্ধার্থের জবাবের অপেক্ষা না করেই একটানা প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গে বকে চলেছে লোকটি। পোড়খাওয়া ঝানু রাজনীতি করা সিদ্ধার্থ এই সব কথাবার্তা এড়িয়ে যেতেই চাইল।এসব ক্ষেত্রে উত্তর না দেওয়াই নিয়ম, কোন কথায় কোন বেফাঁস কথা বেরিয়ে যায় !

ঠিক এই সময়েই ট্রেনের সময় ঘোষনা হোল, “ইয়্যাত্রিয়ো ধ্যান দে,…”এবারে উঠবার সময় হল, দ্রুতহাতে গোছগাছ শুরু করে দেয় সিদ্ধার্থ, ‘চলুন, যেতে যেতে আপনার সঙ্গে গল্প করা যাবে’।

‘বসুন, বসুন এখনই আপনার যাওয়া হচ্ছেনা সিদ্ধার্থবাবু’, ভদ্রলোকের এতক্ষনের চটুল গলার স্বর হঠাৎ বেশ গম্ভীর আর ভারিক্কি শোনাল। মানে ? সিদ্ধার্থের sixth sense হঠাৎ বিপদের গন্ধ পেলো, পকেটের দিকে হাত চলে গেলো অবধারিতভাবে দ্রুতগতিতে। ‘উহুহু, নড়বেননা একেবারে’। ভদ্রলোকের হাতে উঁচানো সার্ভিস রিভলভার,’আপনাকে অ্যারেস্ট করা হলো’।এরপরে দ্রুতহাতে পেশাদারিভঙ্গীতে সার্চ করতে শুরু করলেন। সিদ্ধার্থর পকেট থেকে বিদেশী পিস্তল আর মোবাইল ফোনটা নিয়ে নিজের পকেটে পুরে ফেলেছেন এতক্ষনে। ‘কিছু মনে করবেননা, এ দু’টো আমি বাজেয়াপ্ত করলাম। আমি দেবব্রত সেন, কলকাতা স্পেশাল ব্রাঞ্চ ইন্সপেক্টার’। আইডিকার্ডটা বের করে সগর্বে নিজের পরিচয় দাখিল করে বসে পড়লেন তার নিজের পুরোন চেয়ারে।

অবশেষে ধরা পড়ে গেলেন আবার! হতাশ সিদ্ধার্থ ধপাস করে বসে পড়লেন চেয়ারে। আবার লকআপে, আবার ইন্টারোগেশনের নামে অকথ্য অত্যাচার! পার্টির আর একটা সেটব্যাক, শিরদাড়ার ভিতরে একটা শিরশির করে ঠান্ডাস্রোত বইতে শুরু করল।কিছুটা ভয়ও পেয়েছেন, এনকাউন্টারের নামে একগুলিতে শেষ হয়ে যেতে পারে তার জীবন, হয়তো আজ রাতেই। অথচ তার গতিবিধি এরা জানল কী করে? সে আর সুধাকর রাও ছাড়া কারো জানার তো কথা নয়। তবে? পার্টির ভিতরের রেনিগেডদের কান্ড?

দুই

একটা ফার্স্টক্লাস ক্যুপেতে তারা দুজন, দরোজা ভিতর হতে বন্ধ; ট্রেন হাওড়ামুখি চলেছে। ‘কোথায় নিয়ে চলেছেন আমাকে’?

‘ভয় পাবেননা, আপনারা বিপ্লবীরা পুলিশ দেখলেই যেমন মেরে ফেলেন আমি সে দলের না। আপনার গন্তব্য আপাতত লালবাজার লকআপ’।

‘আপনি এভাবে আমাকে অ্যারেস্ট করতে পারেননা, আমি একজন রিটায়ার্ড গভর্নমেনট অফিসার, ওয়ারেন্ট কোথায় আপনার কাছে ‘? নিস্ফল হবে জেনেও একবার শেষ চেষ্টা করল সিদ্ধার্থ । ‘আপনার মত একজন হাইপ্রোফাইল ওয়ান্টেড প্রাইজক্যাচের জন্যে কোন আইনের কচকচি নেই সিদ্ধার্থবাবু, এটা নিশ্চয়ই আপনাকে নতুনকরে বোঝান লাগবেনা’।

‘কিন্তু আমার বিরুদ্ধে চার্জ কী ?’

‘শুনতে চান? তবে শুনুন, একাত্তরের শেষে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আবার ছাত্রজীবনে ফিরে গেলেও আপনি পার্টিকর্মীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে গেছেন। এইসময়ে আপনি পার্টির হার্ডকোর মেম্বারদের নিয়মিত আশ্রয় দিয়ে গেছেন, বিয়ে করেননি সারাজীবন ব্যাচেলর থেকেছেন তাও পার্টির কাজের স্বার্থে। চাকরি জীবনে গোপন সঙ্গঠকের দায়িত্তে ছিলেন গত পনের বছর ধরেই’।

‘কী সব আজগুবি মিথ্যার ঝাঁপি খুলেছেন মশাই, এর একটা কথাও সত্যি না’।অস্বীকার করে লাভ নেই জেনেও বলে সিদ্ধার্থ, এর প্রতিটি কথাই সত্যি। ‘আরো শুনুন, ঝাড়গ্রামে চাকরিতে থাকাকালীন আপনার কোয়ার্টারে নিয়মিত পার্টির কোরকমিটির মিটিং হয়েছে।তখন একাধিকবার কিষেনজীসহ অনেক গুরুত্বপুর্ন নেতারা আপনার কোয়ার্টারে রাত কাটিয়েছেন। এরপরে চাকরি থেকে ভলান্টারি রিটায়ারমেন্ট নিয়ে হোলটাইমার হয়ে আপনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। আর এই সময়েই আপনার বিরুদ্ধে আমাদের সবচেয়ে বেশী অভিযোগ, অন্তত সাতটি বড়সড় একশানের মাস্টারমাইন্ড হিসাবে আপনার নাম রয়েছে আমাদের কাছে’।একনাগাড়ে ঝড়ের মত কথা বলে থামলেন ইন্সপেক্টার সেন।

সিদ্ধার্থ অবাক, এতো নিখুঁত খবর এরা পেল কীভাবে! যা সে জানতো পার্টির একান্ত গোপন সাঙ্গঠনিক খবর হিসাবে, এরা সেগুলি পেল কী ভাবে। প্রতিবাদ নিরর্থক জেনে চুপ করল সে।

ট্রেন ছুটে চলেছে তার নিজের গতিতে, সিদ্ধার্থের মনের মধ্যে ঝড় বয়ে চলেছে। মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ইস্টার্নজোনের মাথা , তাঁকে পেলে তো মিডিয়ার হইচই শুরু হবেই। ভাগ্য যদি প্রসন্ন থাকে তাহলে তিনি সরকারিভাবে বন্দী হবেন, আর না হলে …

‘একদিন আমিও লালঝান্ডা ধরেছিলাম , মনে আমারও চিন্তা ছিল আপনারই মত সমাজসংস্কারের, কিন্তু কী লাভ হল বলুনতো?’ সিদ্ধার্থ ইন্সপেক্টর সেনের কথায় ফিরে তাকালেন। ‘বলতে পারেন এই গৃহযুদ্ধ কী করে শেষ হবে? ট্রেঞ্চের ভিতরে বসে দুইদল সৈনিক একেঅপরের সঙ্গে লড়তেলড়তে দেহেমনে ক্লান্তহয়ে একসময় যুদ্ধবিমুখ হয়ে পড়ে। তখন আসে বাড়ি ফেরার টান। মনে মনে চিন্তা করে , কবে এই যদ্ধ শেষ হবে। তখন তারা মনের দিকথেকে একইদলে চলে আসে, তাই নয় কি?’

কিছুক্ষন চুপকরে রইলেন পুলিশঅফিসার দেবব্রত সেন, যেন নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলেছেন।তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে ওঠেন,’আজ আমাকে পুরোন স্মৃতিগুলো এসে ভীষণ দুর্বল করে দিচ্ছে সিদ্ধার্থবাবু।আপনাকে আমার কেন যেন সহযোদ্ধা, সাথী মনে হচ্ছে। যারা যুদ্ধবিমুখ, ঘরে ফিরতে উৎসুক।আজকে আমি আর আপনি মুখোমুখি দুইযোদ্ধা একে অন্যের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে রয়েছি,কিন্তু আমরা কী সহযোদ্ধা হয়ে নেই মনের দিক হতে? ভাবুনতো দিনেরশেষে আমি কী পাব আপনাকে কাস্টডিতে চালান করে! হয়তো একটা ইনক্রিমেন্ট বা খুববেশী হলে একটা পুরস্কার’।

‘কোথায় এলো ট্রেনটা?’বাইরের দিকে একবার তাকিয়ে হঠাৎ তৎপর হয়ে উঠলেন, যেন মনের থেকে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ কাটিয়ে উঠে তার পুরনো কথার রেশ টেনে আবার বলে উঠলেন, ‘তারথেকে আপনি চলে যান, আপনাকে ছেড়ে দিলাম কমরেড’। বলে কিছুটা নাটকীয় ভঙ্গীতে ক্যূপের দরজা খুলে দিলেন ইন্সপেক্টর সেন, বিস্মিত সিদ্ধার্থের চোখের সামনে।

ট্রেন তখন ধীরে ধীরে হাওড়া ষ্টেশনের প্লাটফর্মে ঢুকছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here