রাক্ষসের গল্প

0

Last Updated on

দেবাশিস লাহা

একদা এক দেশে সুন্দর একটি গ্রাম ছিল। বর্ধিষ্ণু গ্রাম। অনেক মানুষের বাস। এমন ভাল মানুষ খুব কম দেশেই থাকে। সবাই নিরীহ এবং শান্তিপ্রিয়। নিজের নিজের কাজ নিয়েই থাকে। গ্রামটিও ছবির মত সুন্দর। সবুজ অরণ্য, নদী আর দিগন্ত বিস্তৃত শস্যক্ষেত্র। কতরকমের পাখি। সে দৃশ্য দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। ছোটখাট ঝুট ঝামেলা যে হয়না তা নয়। কিন্তু গ্রামের মাতব্বররা একসঙ্গে বসে সব মিটিয়ে দেয়। আর এই মাতব্বরদের গ্রামবাসীরাও খুব মানে। শ্রদ্ধা ভক্তি করে। এভাবেই বেশ দিন কেটে যাচ্ছিল।

কিন্তু দিন কী কারও সমান যায় ? মহাকালের চাকা যে ঘুরেই চলেছে। একদিন ভয়ংকর এক চিৎকারে সবার ঘুম ভেঙে গেল।সবাই দুড়দাড় করে বেরিয়ে এল। গ্রামের উত্তর দিক থেকে আওয়াজটা আসছে। শুনলেই কেমন রক্ত জল হয়ে যায়। কিন্তু ভয় পেলে তো আর চলবে না। ব্যাপারটা দেখতে হবে। সবাই মিলে এগিয়ে গেল। কী দেখল ? বাপ রে ভয়ংকর দুটো রাক্ষস-রাক্ষসী। ইয়া বড় চেহারা, কুলোর মত কান, মূলোর মত দাঁত! মুখ থেকে লালা ঝরছে। কিন্তু কী আশ্চর্য ! কিছুদিন আগেই তো এদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। একদিন সকালে ওরা গ্রামে ঢুকে পড়ে। দেখে খুব অসুস্থ আর অসহায় মনে হয়েছিল। কাতর প্রার্থনা করে বলেছিল—
“আমাদের একটু থাকার জায়গা দাও না গো। তোমাদের তো কত বড় গ্রাম !”
বলে কী ! রাক্ষসকে গ্রামে থাকতে দেব ! অসম্ভব। রাজি হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু গ্রামের মতব্বররা এগিয়ে আসতেই রাক্ষস আর রাক্ষসী কেঁদে ভাসিয়ে দিল—বিশ্বাস করো, আমরা আর মানুষ খাই না। রক্তেই অরুচি ধরে গেছে। ফল আর শাক সবজি ছাড়া কোনো কিছুই আর মুখে রোচে না। তবু দ্যাখ না পাশের গ্রামের লোক আমাদের মেরে কী হাল করেছে। হাজার হাজার লোক এক জোট হয়েছে আমাদের মেরেছে।”
রাক্ষস আবার মানুষ খায় না ! কি জানি বাবা। গ্রামের মানুষ বেশ থতমত খেয়ে গেল। মাতব্বররা বললো—শোনো এরা খুব অসহায়। এদের আশ্রয় দেওয়া উচিত। আর শুনলেই তো। এরা এখন আরে মানুষ খায় না। তাই এসো ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে থাকি। জোরসে বলো—রাক্ষস—মানুষ ভাই ভাই !”
শ্যাম তবু আপত্তি করেছিল। কিন্তু ও তো একটা বাচ্চা ছেলে। ওঁর কথা কে শুনবে।

এবার কী হবে ? সবাই বেঘোরে মরবে ? কিন্তু ওরা চায় কী ? সেদিনই তো বলল মানুষ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এখন চাঙ্গা হতেই—-!
কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই রাক্ষস রাক্ষসী চিৎকার করে উঠল, “ আমরা তোদের কোন ক্ষতি করব না।শুধু একটা শর্ত আছে। আমাদের খুব খিদে পায়। তাই প্রতিদিন দশটা করে মুরগী পাঠাবি। ব্যাস তাতেই আমরা খুশি। তোরাও ভাল থাক, আমরাও ভাল থাকি।“
বলে কী ? তোমরা কে হে ? যে তোমাদের খিদমত করতে হবে? মনে মনে অনেকেই একথা বলল। কিন্তু বাইরে বলার সাহস পেল না। যাক সেদিন দুপুরেই গ্রামের মাঠে একটা সভা বসল। সবার চোখ মাতব্বরদের দিকে।মোট দশ জন তাঁরাই গ্রামের কর্তা। আর হাজার পাঁচেক গ্রামবাসী।একটা মাচা বাঁধা হয়েছে। তার উপরই বসে আছেন দশ মাতব্বর। সবার কান খাড়া। পিন পড়লেও শব্দ শোনা যায়। মিনিট দশেক বাদে একজন নেতা কথা বলে উঠলেন,
“ভাইসব, তোমাদের থুড়ি আমাদের উদ্বেগের কারণ আমরা সবাই জানি। আপনারা সবাই দেখেছেন আজ সকালে আমাদের প্রিয় গ্রামে দুটো রাক্ষস ঢুকেছে। তাদের দাবীও আমরা শুনেছি। আপনারা চলে যাবার আমরা সব মাতব্বর ওদের সঙ্গে কথাও বলেছি। দেখ, ভাই প্রথমেই বলি দেখতে ভয়ংকর হলেও ওরা কিন্তু খুব একটা খারাপ নয়। কারও চোখ, মুখ, দাঁত দেখে তো তার বিচার করা উচিত নয়। দেখতে ভয়ানক তো কী হয়েছে ? অন্তরটা দেখতে হবে। মানুষেরও মাঝে মাঝে দু মাথাওয়ালা বাচ্চা জন্মায়, কারও কারও হাত পা বেঁকে যায়, খুব ভয়াবহ দেখতে হয়। তার মানে আমরা তাদের ঘৃণা করব ? তাছাড়া ওদের দাবীও সামান্য। প্রতিদিন দশটা করে মুরগী। আমাদের মনে হয়, এই দাবী মেনে নেওয়াই উচিত। ওদের সঙ্গে লড়াই করা তো সম্ভব নয়।অনেক লোকের প্রাণ যাবে।“

সবাই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। ঠিকই তো। লড়াই মানেই রক্তারক্তি। তার চেয়ে ওদের দাবী মেনে নেওয়াই ভাল। সামান্য তো কটা মুরগী । ভগবানের আশির্বাদে গ্রামে তো আর মুরগীর অভাব নেই। কিন্তু আচমকা সেই বাচ্চা ছেলেটা উঠে দাঁড়াল,
“মাননীয় মাতব্বর এবং সম্মানীয় গ্রামবাসী, আপনাদের অনুমতি পেলে আমি দুটি কথা নিবেদন করতে চাই।“
সবাই অবাক। কতই বা বয়স হবে ছেলেটার। বড় জোর পনের। কিন্তু সবাই কম বেশি চেনে। ওর বাবা মা কেউ নেই। একাই থাকে। লোকের বাড়িতে ফায় ফরমাশ খাটে। কারও গরু চড়িয়ে আনে। কারও মাল বয়ে দেয়। কারও মাটি কুপিয়ে দেয়। বাচ্চা হলে কী হবে গায়ে খুব শক্তি। এই বয়সেই কী চেহারা ! এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে বেড়ায়। অনেক কিছু জানে নাকি ছেলেটা ! কিন্তু বাচ্চা বলে কেউ তেমন পাত্তা দেয় না।সবাই ওকে ক্ষ্যাপা শ্যাম বলে ডাকে।
“ সম্মানীয় মাতব্বর, আপনারা একটি ভুল সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন।আমি অনেক দূর দূর গ্রাম ঘুরে এসেছি। আপনারা জানেন আমার ঘুরে বেড়াতে খুব ভাল লাগে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই যা বলার বলছি। এই রাক্ষসদের কথা আমি আগেই শুনেছি। এরা প্রথমে মুরগী দিয়ে শুরু করে। তারপর মানুষ খেতে শুরু করে।এভাবে অনেক গ্রাম জনশূন্য হয়ে গেছে। ওদের মিষ্টি কথায় ভুলবেন না। আসুন আমরা সবাই মিলে ওদের তাড়িয়ে দিই। না হলে সমূহ বিপদ।“
মাতব্বররা তো রেগে আগুন। ছোকরা বলে কী ! বড়দের মুখের উপর কথা।
“এই পাগলা, ভাল করে শুনে রাখ। তোর জন্য গ্রামের শান্তিভঙ্গ হচ্ছে। আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। ঘৃণা, বিদ্বেষ থেকে সহস্র হাত দূরে। তাই আর কখনও লড়াইয়ের কথা বলবি না। আর একবার যদি এসব বলিস, কান ধরে গ্রামের বাইরে বের করে দেব। যত সব পাকামো !”
তারপর যা হবার তাই হোল। ছেলেটি চুপ করে করে গেল। আর প্রতিদিন দশটা করে মুরগী পাঠান শুরু হোল। আহা কী সুন্দর ! ভাগ্যিস মাতব্বররা ছিল। ওঁদের অশেষ দূরদর্শিতা। লড়াই করলে রক্ত ঝরত। দু একজন মারাও যেত নিশ্চয়। এখন কত ভাল আছি ! আহা এমন ভাল রাক্ষস কোথাও আছে ! কোন চাহিদা নেই। শুধু দশটা করে মুরগী। এখন আর ওরা গ্রামের বাইরেও থাকে না। তালপুকুরের ধারে একটা বিশাল বাড়ি বানানো হয়েছে। মাতব্বরদের কোঠাবাড়ির ঠিক পাশেই। সেখানেই ওই রাক্ষস দম্পতী থাকে। শোনা যায় ওরা নাকি মাতব্বরদের কাজ কর্মও করে দেয়। এই তো সেদিন একটা বড় গাছ কাটার কথা হচ্ছিল। বড় মাতব্বরের বাড়ির উঠোনে একটা কাঁঠাল গাছ। সেটা কাটতেই হোল না। রাক্ষস রাক্ষসী মিলে একটা টান দিতেই গুঁড়ি সুদ্ধ উঠে এল। কী মজা ! সেই দৃশ্য দেখতে গ্রামের সবাই ভিড়ও করেছিল। বাচ্চাদের কী আনন্দ ! কয়েক জন ইংরেজি জানা ছেলে পুলে ওদের কী মিষ্টি করে ডাকছিল—“ দেখ দেখ রাক্ষস uncle টার কী শক্তি ! WWF এর বিগ বেন তো বটেই খালিকেও হারিয়ে দেবে। আর রাক্ষসী আন্টি ! she is our pride ! গ্রামের গর্ব !”
শুধু শ্যাম যায় নি। বেশ খানিকটা দূর থেকে ও সব কিছু দেখছিল। রাগে রক্ত গরম। মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কিছু করার নেই। মানুষগুলো এত বোকা !মন খারাপ করে গ্রাম ছেড়ে চলেই গেল ছেলেটা।


তারপর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। ভাবল এবার গ্রামে ফেরা যাক। গ্রামের দক্ষিণদিকে একটা বড় বটপগাছ। তার নিচে একটা বুড়ো। দেখেই চিনতে পারল।
“পেন্নাম অনন্তখুড়ো। তোমরা সবাই কেমন আছ?”
“আরে শ্যাম ক্ষ্যাপা যে ? কতদিন পর তোমায় দেখলুম।সেটাই তো স্বাভাবিক। তুমি যে বাপু ভবঘুরে।“
“হ্যাঁ খুড়ো। ঘুরতে আর জানতে বড় ভালবাসি। বেশ আছি। তা তোমরা কেমন আছ ?মুরগী দিচ্ছ প্রতিদিন ?”
“মুরগী ? কিসের মুরগী?”
“আরে ওই যে রাক্ষস uncle আর aunty কে তোমরা মুরগী দিতে না !”
“ধুত্তেরি, কোন মান্ধাতা আমলের কথা বলছ ? এখন আর মুরগী দেওয়া হয় না। প্রতিদিন পাঁচটা করে ছাগল।পরিবার বড় হয়েছে না। ”
“আচ্ছা বুঝলাম। তার মানে ওনাদের বাচ্চা কাচ্চা হয়েছে। তা হবারই কথা। তা কটা হোল ?”
“ বেশি না মোটে পাঁচটা। তবে শুনেছি রাক্ষসী মা আবার গর্ভবতী হয়েছেন।“
“সেকী ! তবে তো মহা বিপদ। অনন্ত খুড়ো, আমি সব দেখতে পাচ্ছি। আর বেশি দেরি নেই। এবার একটা কিছু করা দরকার। না হলে আমরা কেউ বাঁচব না।“
“তুমি দেখছি আগের মতই আছ ! এত ঘুরেও মনটা বদলাতে পারলে না ! ছি ! ছি! ছি !এত নীচ তুমি ? আমরা কী ছাগল খাই না ? তুমিও তো খাও। ওরা না হয় একটু বেশিই খায়। তাতে কী ?”
“কিন্তু আরও যদি বাচ্চা হয় ?তখন?”
“তখন গরু দেব। গরুর কী অভাব নাকি ? তুমি এসো তো ভাই। নিজের মত থাক। কাউকে কিছু বলতে যেও না।জান আমাদের মাতব্বরদের সঙ্গে ওঁদের কত ভাল সম্পর্ক। যত্ত সব আপদ !”
আবার মন খারাপ হোল। কী আর করবে। শ্যাম আর গ্রামে ঢুকল না। খুড়ো চলে গেলে বটগাছের তলাতেই শুয়ে পড়ল।


আরও কয়েক বছর কেটে গেল। শ্যাম ক্ষ্যাপা আর গ্রামে ঢোকেনি। ঢুকলেও লুকিয়ে। এ দেশ সে দেশ ঘুরে বেড়ায়। দু চার বছর অন্তর বটগাছটার নীচে এসে বসে। সেখান থেকেই গ্রামের খোঁজ খবর পায়। শ্যাম আর বাচ্চা নেই। এখন তিন কুড়ির উপর বয়স।
সেদিন অমাবস্যার রাত। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মনটা কেমন করছে। ভাবল একটু গ্রাম থেকে ঘুরে আসবে। ওরা যে কেমন আছে কে জানে ! বটগাছটার কাছে আসতেই গলার আওয়াজ !
“ পা চালাও বাবা। না হলে ওরা ধরে ফেলবে। গ্রামে আর বুড়ো নেই। তুমি ছাড়া। আজ রাতেই তোমার পালা ! আর ঠেকান যাবে না !”
দুজন মানুষ। চেনা যাচ্ছে। অনন্ত খুড়ো আর তাঁর একমাত্র ছেলে। কিন্তু ব্যাপারটা কী ?
“শ্যাম আর লুকিয়ে থাকতে পারল না। আড়াল থেকে বেরিয়ে এল।
“কী ব্যাপার অনন্ত খুড়ো ? কোথায় যাচ্ছ তোমরা। এই দীপক তোর কী মাথাটা গেছে ? নব্বই বছরের মানুষটা কী করে জোরে হাঁটবে !”
“না হাঁটলে মরবে। শ্যামকাকু তুমি ? তুমি সেই বাচ্চা ছেলেটা না ? তুমিই প্রথম বলেছিলে লড়াইয়ের কথা। তখন আমার জন্মই হয়নি। কিন্তু এখন গ্রামের অনেকেই তোমার কথা বলে। যদিও চুপিচুপি। বলে তুমি-ই নাকি ঠিক বলেছিলে। তোমার কথা শুনলে এদিন দেখতে হোত না।“
“কেন বাপু ? তুমি-ই তো ওদের রাক্ষস uncle রাক্ষস aunty বলে ডাকতে।“
“ভুল হয়ে গেছে কাকু। বুঝতে পারিনি। এখন কী নিয়ম হয়েছে জান ? প্রতিদিন ৪০ টা ছাগল, কুড়িটা গরু আর অমাবস্যার রাতে দশটা করে মানুষ !”
“জানতুম ভাই। সব জানতুম। কিন্তু তোমাদের মাতব্বররা সব মেনে নিল ? গরু ছাগল না হয় বাদ দিলাম। মানুষ পাঠানোর ব্যাপারটাও গ্রামের সবাই মেনে নিল ? তুমি তো জোয়ান, তুমিও কিছু বললে না ?”
“কী করে বলব কাকু ? তুমি যখন লড়াইয়ের কথা বলেছিলে, তখন ওরা মাত্র দুজন ছিল। এখন কতজন জানো ?”
“কতজন ?”
“একশর বেশি। রাক্ষস রাক্ষসী তো বাদই দিলাম। ওদের ছেলেপুলেরও ছেলেমেয়ে হয়েছে। এতগুলোর সঙ্গে লড়া সম্ভব ?তাই সবাইকে মেনে নিতে হচ্ছে। মাতব্বররা ঠিক করেছে যাদের বয়স আশি পেরিয়ে গেছে, তাদের পাঠান হবে। তারপর যা হয় দেখা যাবে। কিন্তু গ্রামে আর বুড়ো নেই। আমার বাবাকে আজ পাঠানোর কথা। প্রাণ হাতে নিয়ে পালাচ্ছি। তুমিও ঢুকো না কাকু। চল পালাই।“
“বেশ। কিন্তু একটা কথার উত্তর দাও। মাতব্বরদের বাড়িতেও তো অনেক বৃদ্ধ থাকার কথা। তাঁদের কী পাঠান হয়েছে ?”
“না না, সেটা কী করে হয় ! ওঁরা যে মাতব্বর। তাই নিজেদের পরিবার থেকে কাউকে পাঠায় না। সব চাপ আমাদের উপর।“
“হা হা হা ! এভাবে কী রেহাই পাবে ? ঠিক আছে তোমরা পালাও। আমি বলে দিচ্ছি কিভাবে কোথায় যাবে। আর আমি ছদ্মবেশে গ্রামে ঢুকব। লুকিয়ে। আমাকে চট করে কেউ চিনতেও পারবে না।“
“খবরদার না । আপনি বুড়ো হয়েছেন। দেখলেই খাবার বানিয়ে দেবে।“
“আরে আমি তালপুকুরের জঙ্গলে লুকিয়ে থাকব। গ্রামের সব কিছু আমার নখদর্পনে। লুকিয়ে কতবার ঢুকেছি। তোমরা যাও।“

এরপর আরও একটা মাস। তালপুকুরের জঙ্গলে শ্যাম ক্ষ্যাপা লুকিয়ে আছে। চুপি চুপি নজর রাখে। গভীর রাতে মানুষের আর্তনাদ শোনা যায়। আর চাকুমচাকুম আওয়াজ। বুঝতে পারে একটার পর একটা মানুষ মরছে। খুব অসহায় লাগে। কিন্তু আর কিছু করার নেই। গ্রামের সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে কেউ পালাতে না পারে। পালিয়ে গেলেই যে রাক্ষসদের খাবারে টান পড়বে। তখন মাতব্বরদের পরিবারও ছাড় পাবে না। কারণ রাক্ষস রাক্ষসীর বাড়ির পাশেই ওরা থাকে। কিন্তু আর কতদিন !
বয়স হলে কী হবে শ্যাম ক্ষ্যাপা এখনও বেশ ভালই শক্তি রাখে।একদিন একটা তেঁতুল গাছের ডালে বসে আছে। উপর থেকে নজর রাখতে সুবিধে হয়। হঠাত দেখল কয়েকজন মানুষ কোথায় যেন যাচ্ছে। খুব চুপিসারে। তের চোদ্দ জন। দু একজন খুব বয়স্ক। একশর কাছাকাছি বয়স। এত বৃদ্ধ ! তবু বেঁচে আছে। কিন্তু দীপক যে বলেছিল সমস্ত বুড়ো ওদের পেটে গেছে। আচ্ছা তার মানে এরা মাতব্বর গোষ্ঠী। তাই এখনো—একজনকে চিনতেও পারল। মতি খুড়ো। একশো ছাড়িয়ে গেছে। শ্যাম ক্ষ্যাপা যখন প্রতিবাদ করেছিল, ইনিই ছিলেন মেজো মাতব্বর !আচ্ছা। শোনা যাক কী বলছে !
“রবিন, তুমি ওদের ঠিকঠাক লুকিয়ে রেখেছ তো ? এত জন লোক। বউ বাচ্চা, ছেলে মেয়ে। রাক্ষসরা দেখে ফেলবে না তো ?”
“ না বাবা চিন্তার কিছু নেই। আমরা তো অনেক আগে থেকেই সুড়ঙ্গটা খুঁড়ে রেখেছিলাম।পোড়ো মন্দিরের ভেতর দিয়ে শুরু আর বটগাছের নিচে শেষ। সবাই এখন ওই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে। সন্ধে হলেই সুড়ঙ্গ ধরে হাঁটা শুরু করবে। তাছাড়া গৌতম আর সুর্য পাশের গ্রামে গেছে। যদি কিছু সাহায্য পাওয়া যায়। মানে অস্ত্র শস্ত্র। আমরা কিছুক্ষণ এই জঙ্গলে কাটিয়ে দেব। ঠিক আটটার সময় বটগাছের নিচে ওরা পৌঁছে যাবে। চিন্তার কোন কারণ নেই বাবা। গ্রামে যে কটা মানুষ ছিল, সব কটা ধরে বেঁধে ওদের বাড়ি দিয়ে এসেছি। এতগুলো মানুষ খেতে ওদের অনেকটা সময় লাগবে। ততক্ষণে আমরা পগার পার। হা হা হা !”


না আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। গাছ থেকে এক লাফে নেমে পড়ল।ষাট বছরের বৃদ্ধ নয়, শ্যাম আবার যেন সেই পনের বছরের বালক। আর এ দেশ সে দেশ নয়। এবার বুক ফুলিয়ে নিজের গ্রামে ঢুকবে। বেশ খানিকটা পথ। সন্ধে হবার আগেই রাক্ষস রাক্ষস-রাক্ষসীকে খবরটা পৌঁছে দিতে হবে। মন্দিরের মধ্যে সুড়ঙ্গ আর তার পাশেই গাদা গাদা খাবার ! আহা কী যে খুশি হবে ওরা। হ্যাঁ ওকেও খেয়ে ফেলবে। সে খাক। অনেক হাফ মানুষ খেয়েছে, এবার না হয় একটা সত্যিকারের মানুষই ওদের পেটে গেল !

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here