শিক্ষা

2

Last Updated on

মৌমিতা ঘোষ

“তুমি বেরিয়ে যাও ঘর থেকে | বেরিয়ে যাও বলছি | ”
চিৎকার করে ওঠে জিৎ
“উফ| ছেলে তো নয় | ধানি লঙ্কা একটা | কেন রে ? তোর কোন পাকা ধানে আমি মই দিয়েছি ?” চিৎকার করে বলেন ঠাম্মা |
জিতের দাদু অবিনাশ এগিয়ে আসেন | “তুমি এলেই বাচ্চাটা ভয় পাচ্ছে, এতটুকু বাচ্চাও তোমাকে সহ্য করতে পারছে না দেখো |”
“তোমার বউ এই শিক্ষাই তো দিচ্ছে, আর তুমি তাতে উস্কানি দাও| সব শত্তুর আমার |”
“প্লিজ,সায়নী, পয়ত্রিশ বছর কলকাতায় এত বড় ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের হেডমিস্ট্রেস ছিলে তুমি | বাংলা সিরিয়ালের মতো আচরণটা বন্ধ কর|আর কতদিন একই রকম চালাবে তুমি ?”
“তোমার কেন পোষাবে আমাকে? ফস্টিনষ্টির ইতিহাস বলে দিই ?”

জিতের ঘর থেকে ভেসে আসছে এই সব কথার টুকরো | এই ফ্ল্যাটে তিনটে ঘর | এখন যেটায় জিত পড়াশোনা করে,আগে ওটায় শাশুড়ি থাকতেন | ওই ঘরে জিতের পড়ার টেবিল ছাড়া একটা ছোট্ট পাতা আছে | আরেকটা ঘরে সুমেধারা শোয় | ড্রয়িং রুমে লাগোয়া বেডরুমে অবিনাশ থাকেন | আর তার উল্টো দিকে রান্না ঘর|সুমেধা রুটি বানাচ্ছে ওখানে |

“এক গলা ভর্তি বিষ নিয়এ আবার এ বাড়িতে চলে এসেছে,উফ”…রেবা তরকারি নাড়তে নাড়তে বলে | রেবা এ বাড়িপর পুরোনো কাজের লোক | গত বারো বছর আছে |

সুমেধা ফিসফিস বলে, “চুপ ,চুপ আর কথা বাড়িও না | আমার ছেলেরই তো দোষ | ঠাকুমা পড়াতে গেলে এরকম বলে কেউ ?”
কাঁদতে কাঁদতে রান্না ঘরে আসে সায়নী |
শুনলে, “তোমার ছেলের কথা ? একমাত্র নাতি আমার ,সে বলছে বেরিয়ে যাও | আর তোমার শ্বশুর সায় দিচ্ছে |”
“আমি বকে দিচ্ছি মা |”
সুমেধা বেডরুমে গিয়ে খুব বকা লাগায় জিতকে | “এটা কি অসভ্যতা জিত? ঠাম্মার সঙ্গে কেউ এভাবে কথা বলে? আমি তোমাকে কি এই শিক্ষা দিয়েছি ?”
জিৎ আরো জোরে জোরে কাঁদতে থাকে ।
“এই চুপ । একদম চুপ । অন্যায় ও করবে , আবার বাড়ি মাথায় করে তুলবে, চলবে না।”
“মাম্মা, তুমি ঠাম্মা কে চলে যেতে বলো।”
জিৎ কাঁদতে কাঁদতে বলে। এবার সুমেধা ঠাস করে এক চড় লাগায় জিৎ কে । অবিনাশ এসে বলেন , “হচ্ছে টা কি ? চার বছরের ছেলে এখন না পড়লে এমন কিছু ক্ষতি হবে না । তুমি এস দাদুভাই ।”জিৎকে নিয়ে বেরিয়ে জান অবিনাশ ।
“এ বাড়িতে আমি আর আসব না । নাতি থেকে দাদু কেউই যখন ছয় না …”কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন সায়নী ।
“মা, প্লিজ, এই তিনদিন আছো । থাকো । আমি জিত্কে দেখছি । তুমি একটা হেড মিস্ট্রেস ছিলে । একটু দুষ্টু বাচ্চাকে সামলানোর আর্ট তো তোমার আসা উচিত।”
“ও, তুমিও এখন বোঝাতে চাইছ , আমার দ্বারা কিছুই হবে না , তাইতো ? “
“কী শেখাচ্ছিলেন মা ?”
“সাব্স্ট্রাক্শণ।”
“ও । বিয়োগ টা ওর কাছে নতুন তো । হয়তো তাই কঠিন লাগছে বলে বাহানা বানাচ্ছে । আপনি খেয়ে নিন ।”
“দাও।”
সুমেধার বাপের বাড়ির উপহার ডাইনিং
টেবল । সেগুন কাঠের ।

ডাইনিং টেবল বিয়েতে দেননি সুমেধার বাবা । শাশুড়ি আগের ডাইনিং টেবল টা পুরোনো বলে জোর করে বিক্রি করে দিলেন । তখন সুমেধার আট মাস প্রেগনেন্সি,নীচে বসে খাওয়া অসম্ভব । অগত্যা এল বাপের বাড়ি থেকে এই টেবল ।

খেতে দেয় সুমেধা ।
lসায়নী বলে , “আর দু পিস মাংস দাও আমাকে। “
“আজ একটু কমই রান্না হয়েছে মা , আপনার তিন পিস , বাবার তিন পিস , জিতের দু পিস , আর ওর বাবার আর আমার দু পিস করে । “
“আমি পাঁচ পিসের নীচে কোনোদিন খাই না ।”
“ও । ” দুপিস মাংস তুলে দেয় সুমেধা শাশুড়ির পাতে।
ওদের দুটো বাড়ি , একটা তে শাশুড়ি একা থাকেন । পয়সার অভাব নেই । আরেকটাতে বাকিরা । শ্বশুর ও শাশুড়ির বনিবনা একদম নেই বলে এই ব্যবস্থা ।
শাশুড়ি শুয়ে পড়লেন গিয়ে সোফায়।
“ঘরে গিয়ে শোও।”
“নাহ । ঐ ঘরের দরজায় তোমরা জিৎ লিখে রেখেছ । মানে এখন ওটা ওর ঘর হয়ে গেছে । আমি যাব না । “
“তোমার বাড়ির দরজায় তো তোমার নাম লেখা শুধু । আমরা কী যাই না , শুই না ? “আচ্ছা , শুচ্ছি । “
জিৎ চকলেট কিনে দাদুর সাথে ফিরেছে ।
ঘরে ঢুকতে সুমেধা ওকে নিয়ে গিয়ে সোফায় বসায় ।
“ঠাম্মা শুয়েছে তোমার ঘরে বেটা । কোনো অসভ্যতা নয় কিন্তু ।” জিৎ গিয়ে দাদুর কাছে শোয় ।
আবার পরের দিন একই নাটক, “তুমি বাজে লোক । তুমি চলে যাও ঠাম্মা” জিৎ কাঁদছে আর চেঁচাচ্ছে ।
শাশুড়ি চেঁচাচ্ছেন , “এই শিক্ষা তোর বাংলা মিডিয়াম মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিস তো ! এর বেশি আর কী হবে ? আমি চলেই যাব । যাব এক্ষুনি। “
“যাও না । ” বলে জিৎ ।
“না , মা , আপনি কোথাও যাবেন না । আমি দেখছি ।”
“কী ব্যাপার ? আজ তোর ঠাম্মাকে পড়াতেও বারণ করেছিলাম , গল্প বলতে বলেছিলাম , তাতেও তোমার সমস্যা , জিৎ ? “
“ঠাম্মা বাজে , মাম্মা তুমি আমার কাছে শোও । মাম্মা তুমি থাকো আমার কাছে । “
“এবারে কিন্তু বাড়াবাড়ি করছ জিৎ , মার খাবে । সে সরি টু ঠাম্মা ।”
“কক্ষনো না। “
“থাক সুমেধা, ছেলেকে আমার বিরুদ্ধে বিষিয়ে আর না হয় এমন লোকদেখানি শাসন নাই করলে ।”
“আমাকে বলো জিৎ কী হয়েছে ? বলো কেন এরকম আশ্চর্য্য বিহেভ করছো ?”
জিৎ মায়ের গলা জড়িয়ে কাঁদতে থাকে।
“থাক না এসব কথা । আমি তো চলেই যাচ্ছি।”
“না , আপনাকে যেতে বারণ করলাম তো মা।”
“বলো জিৎ।”
“বাচ্চা ছেলে এত কাঁদছে, থাক না।”
“মাম্মা , আমাকে সাব্স্ট্রাক্শন শেখাতে গেলেই ঠাম্মা একজ্যামপেল দেয় “ধরো আমরা পাঁচ জন মেম্বর , তুমি , বাবা , দাদু , আমি আর মা । ধরো মা মরে গেল তোমার , ক’জন বেঁচে থাকবে ফ্যামিলিতে ? আমি বললাম মা মরবে কে ? বলে অঙ্কতে মরছে তো , সত্যি সত্যি তো না। আজ গল্প বলছিল রাক্ষসীর । বলে রাক্ষসী তোর মায়ের হাত মুচড়ে দিল , পা ধরে টেনে নিয়ে গেল , তারপর চিবিয়ে খেয়ে নিল । সবসময় তোমার মরে যাওয়ার কথা বলে । আই হেট হার । আই হেট হার । ” মাকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকে জিৎ । “তুমি মরে যেও না মাম্মা । আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি । “
গোটা বাড়ি চুপ । থমথমে । পিন পড়লে শব্দ হবে ।
সুমেধা গিয়ে ইংলিশ মিডিয়াম হেডমিস্ট্রেসের ব্যাগ গোছাতে থাকে ।

2 COMMENTS

  1. এরকম কি হয় না? হয়। মা, ঠাকুমা পরস্পরের বিরুদ্ধে বাচ্চার মনে বিষ ঢোকাচ্ছে তা হয়। আবার এক পক্ষেও হয়। শাশুড়ি আর ছেলের বউ ইটার্নালি কম্পলিকেটেড সম্পর্ক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here