মেঘভাঙা রোদ্দুর

1

Last Updated on

প্রবীর চক্রবর্তী

লোকটা মাথায় বস্তা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল আর হাঁকছিল, ‘পুরোনো

খবরের কাগজ, বই, খাতা–’

সুমনরা রাস্তার ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। একজন ডাকল, ‘এই যে ভাই শোনো!’

লোকটা দাঁড়িয়ে পড়ল- ‘আজ্ঞে! আমাকে ডাকছেন?’

‘হ্যাঁ! তোমাকেই ডাকছি। এদিকে এসো।’

দেওয়াল-লিখন চলছিল। রাস্তার ধারের পাঁচিল, বাড়িগুলো আঁকাবাঁকা, আলকাতরা

দিয়ে লেখা বিপ্লবের ডাকে ভরে উঠেছে। আঁকাবাঁকা হওয়ারই কথা। এরা কেউ

পেশাদার আঁকিয়ে নয়। স্কুল-কলেজ, দোকান, কারখানা থেকে বেরিয়ে এসে

শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। উনিশশো একাত্তর সাল শুরু হয়েছে।

বাতাসে বারুদের গন্ধ, আকাশে রক্তের রং।

রোগা, কালো লোকটার পরনে ময়লা, ছেঁড়া লুঙ্গি, গেঞ্জি; কথায় হিন্দি টান।

বয়স বছর চল্লিশেক হবে।

‘কোথায় যাচ্ছো?’

‘ঘুরে ঘুরে পুরোনো কাগজ কিনে বেড়াই। এখন পালপাড়ার দিকে যাচ্ছি।’

‘আমাদের দিকে তাকাতে তাকাতে যাচ্ছিলে কেন? কাকে খুঁজছিলে?’

‘মানে?’ হতভম্বের মতো তাকাল। ‘আজ্ঞে! আপনারা কী বলছেন আমি বুঝতে পারছি না।’

‘মানে বুঝতে পারছিস না! শালা খোচোর! আজ তোকে ভালো করে মানে বুঝিয়ে দেব।’

সুমন দেখল ওর মুখে ভয়ের ছায়া পড়েছে। সামনে এগিয়ে এসে বলল, আপনার নাম কী?’

‘রামভরস মাহাতো।’

‘বাড়ি কোথায়?’

‘নুরপুকুর।’

বাড়িতে কে কে আছে?’

‘আমার মা, পরিবার, ছেলে আর দুটো মেয়ে।’

‘পুরোনো কাগজ দিয়ে কী করেন?’

‘ঠোঙা বানিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি করি।’

সুমন একটু থেমে বলল, আপনার কথা সত্যি হলে ভয়ের কিছু নেই। আমরা মেহনতি

মানুষ, মানে শ্রমিক-কৃষক, খেটে-খাওয়া মানুষের জন্যে লড়াই করছি।’

‘হ্যাঁ, জানি। সব পার্টি আমাদের হয়ে সরকারের সঙ্গে ফাইট করছে।’ ও বলল।

সুমনের লোকটাকে তেমন ধূর্ত মনে হচ্ছে না। কারা ওকে ধরেছে এখনও যেন আন্দাজ

করতে পারছে না। একটু তোয়াজ করে গোলমাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

তবু আরও যাচাই করা দরকার। কেটে কেটে বলল, ‘কিন্তু আইবি হলে তাকে আমরা

ছাড়ি না।’

‘আইভি?’

‘ন্যাকা! কিচ্ছু জানে না!’ রাজীব ওর দিকে তেড়ে যেতে সুমন আটকে দিল।

‘আইবি পুলিশ কাকে বলে জানেন না! আপনার মতো এরকম সেজে পাড়ায় ঢুকে খবর জোগাড় করে।’

‘আজ্ঞে! আমি ওসব কিছু নই।’ ও এবার সত্যিই ভয় পেয়েছে। ‘পেটের দায়ে ঘুরে

বেড়াই। অনেকে মানা করে, এখন দিনকাল ভালো না, তুমি এভাবে যেখানে-সেখানে

যেয়ো না। কিন্তু কী করব বলুন, না বেরোলে খাওয়া জুটবে না আমাদের।’

রাজীব বিরক্ত হয়ে বলল, ‘অত কথার কী আছে! দেখেই বোঝা যাচ্ছে লোকটা আইবি।

সেদিন এরকমই একজন পাড়ায় ঢুকেছিল, তারপরেই নরু অ্যারেস্ট হল।’

‘তার থেকে প্রমাণ হয়ে যাচ্ছে না এ-ও আইবি।’

‘তাহলে কীভাবে প্রমাণ হবে? তুই কী প্রমাণ চাস?’ রাজীব গলা চড়াল।

‘আমরা ওকে আটকে রেখে নুরপুকুরে গিয়ে যাচাই করে দেখতে পারি সত্যি বলছে কিনা!’

রাজীব ধৈর্য হারাল- ‘এভাবে বিপ্লব হয় না। সব ব্যাপারে এত মেপে মেপে, টিপে

টিপে চললে বিপ্লবের কাজ এগোবে কী করে?’

‘ওর কথা সত্যি হলে আমরা একজন সাধারণ মানুষকে খুন করছি আর তার পরিবারকে

মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি।’

‘বিপ্লবের মতো এত বড়ো একটা ব্যাপারে এক-আধটা অমন হতেই পারে, অত ভাবলে চলে

না। চেয়ারম্যান বলেছেন, বিপ্লব কোনো সূচিশিল্প নয়, ছবি আঁকাও নয়, প্রবল

বলপ্রয়োগ, যার দ্বারা এক শ্রেণি আর এক শ্রেণিকে উৎখাত করে।’

‘চেয়ারম্যান কখনও বলেননি নির্বিচারে মানুষ মারতে হবে, তাহলে

প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গে আমাদের তফাত কোথায় থাকল!’

‘নুরপুকুর থানার পাশে। ওখানে গেলে তোলতাই করে নেবে। এটাও ওর একটা চাল।

মালটাকে কেটে দে, ঝামেলা মিটে যাবে।’

‘আমরা বিপ্লবী। বিপ্লবের শত্রুদের অবশ্যই খতম করব। কিন্তু অকারণে একজন

মানুষকেও মারব না। প্রত্যেকটা জীবনের দাম আছে।’

ওরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে অবশেষে সুমনের কথাই মেনে নিল।

‘কিন্তু নুরপুকুরে যাবে কে?’

অঞ্জনের কথার উত্তরে সুমন বলল, ‘আমি যাব।’

অঞ্জন চমকে উঠল- ‘তুই যাবি মানে? পুলিশ তোকে পাগলা কুকুরের মতো খুঁজছে।

ধরতে পারলেই গুলি করে দেবে।’

‘কাউকে তো যেতে হবে। ঘুরে পিছন-দিক দিয়ে ঢুকব। অসুবিধে হবে না।’ সুমন

হাসল- ‘এপথে নেমেছি যখন মৃত্যু আমাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী। ও নিয়ে অত ভাবি

না।’

লোকটা একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সুমন একটা সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

নুরপুকুর মাইল-দু’য়েক দূরে। রাজীব ওর সুরক্ষার প্রশ্ন তুলে জোর করে আর

একজনকে সঙ্গে দিয়েছে। মনে মনে হাসল। আসলে রাজীব ওর ওপর ভরসা করতে পারছে

না বলে সাক্ষী রাখছে। এর আগেও সুমন অ্যাকশনে এরকম বাধা দিয়েছে। কাটার

জন্য হাত যেন নিশপিশ করছে ওর। পার্টিতে এখন অ্যাকশনের খুব কদর, হয়তো ও

এভাবে পার্টির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চাইছে।

          মূলত বিহার থেকে আসা মানুষদের বস্তি এটা। ঘিঞ্জি, নোংরা, কাঁচা

বাড়িগুলোর ওপর খোলা বা টিনের ছাদ। সুমন একজনকে জিজ্ঞেস করল- ‘ভাই! রামভরস

মাহাতোকে চেনেন?’

‘হ্যাঁ। চিনি। কী দরকার?’

‘এখানে এই নামে ক’জন আছে?’

লোকটা এক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে বলল, ‘ওই একজনই আছে।’

‘আচ্ছা! ও কী করে?’

‘বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো কাগজ কিনে ঠোঙা বানায়। কেন বলুন তো?’

‘ওর বাড়িতে কে কে আছে?’

‘বাবা নেই। মা, বউ আর তিনটে ছেলেমেয়ে। কিন্তু এত কথা জেনে আপনার কী হবে? কে আপনি?’

লোকটার মুখে সন্দেহের ছায়া পড়েছে। খুব স্বাভাবিক। দেশের পরিস্থিতিই যে

এখন অস্বাভাবিক।

‘ও রাস্তার ধারে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। আমরা তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভরতি

করে দিয়েছি। ওখানে সঙ্গে সঙ্গে স্যালাইন চালু করে দিয়েছে। যখন একটু জ্ঞান

ছিল তখনই এগুলো বলছিল। আবার অজ্ঞান হয়ে গেল, তাই ভালো করে জেনে নিতে

পারিনি। আমরা ঠিক জায়গায় এসেছি কিনা বুঝে নিচ্ছি। আচ্ছা! দেখতে কেমন বলুন

তো?’

‘রোগা, লম্বা, কপালের ডানদিকে কাটার দাগ।’ লোকটা নিজের কপালের ডানদিকে হাত রাখল।

সুমনের মনে পড়ল কপালের ডানদিকে বড়ো দাগ দেখেছে। ‘হ্যাঁ, ও-ই।’

‘কোন হাসপাতালে আছে?’

‘সদর হাসপাতালে। ওর বাড়িটা আমাদের দেখিয়ে দিন।’

লোকটা উত্তর না দিয়ে চিৎকার জুড়ে দিল- ‘সবাই শোন। হাসপাতালে যেতে হবে।

রামভরসের অবস্থা খুব খারাপ, স্যালাইন দিচ্ছে। বাড়িতে খবর দে।’

‘সুমন ওর হাত ধরে বলল, ‘বাড়িতে আমরা খবর দিচ্ছি। আপনারা বরং হাসপাতালে

চলে যান। কোন বাড়িটা?’

‘একটু এগিয়ে বাঁদিকের গলিতে ঢুকে যান, একদম শেষের বাড়িটা।’

সুমন ঘড়ি দেখল। হাসপাতাল এখান থেকে মাইল-দেড়েক হবে। ওদের ঘুরে চলে আসতে

অন্তত বিশ মিনিট লাগবে। তার আগে এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। এমনিতেও দেরি

করা যাবে না। রাজীবরা কিছু ভেবে নিয়ে একটা কাণ্ড করে বসতে পারে।

          খোলা নর্দমার পাশে মাটির দেয়ালের বাড়ি, টালির ছাদ। দেয়ালে বড়ো

ফাটল দেখতে পেল। ‘এটা রামভরস মাহাতোর বাড়ি?’

একজন ক্ষীণদৃষ্টির বৃদ্ধা আস্তে আস্তে এগিয়ে এল। হতদরিদ্র পরিবার। একটাই

ঘর, আর বারান্দা। ঘরে আসবাবের বালাই নেই। দু-দিকে দুটো দড়িতে কিছু

জামা-কাপড় ঝুলছে। একজন উবু হয়ে বসে কী যেন করছে। লেখাপড়া করছে! অন্ধকারে

ভালো দেখা যাচ্ছে না। বারান্দায় একজন মহিলা আর দুটো বাচ্চা মেয়ে গোল হয়ে

বসে ঠোঙা তৈরি করছে। সবারই পরনে মলিন, ছেঁড়া পোশাক। জানুয়ারি মাস চলছে।

আজ বেশ শীত আছে, ঠান্ডা বাতাস বইছে। ছোটো বাচ্চাটার বয়স সাত-আট বছর হবে।

লেখাপড়া করছে না, খেলছে না, হাড়জিরজিরে মেয়েটা পাতলা জামা পড়ে হি হি করে

কাঁপতে কাঁপতে কাগজে আঠা লাগাচ্ছে। এধরনের দৃশ্য দেখলে পুলিশের খাতায়

ভয়ংকর উগ্রপন্থী সুমন পালের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চায়। প্রাণপণে দমন

করে। রুমাল বের করে চোখের কোণ মুছতে মুছতে চোয়াল শক্ত করে মনে মনে বলল,

তোমাদের জন্যই আমার লড়াই, মৃত্যুর আগে অবধি এই লড়াই জারি থাকবে।

বৃদ্ধা চোখের ওপর একটা হাত রেখে বলল, ‘কাকে চান?’

সুমন কিছু বলার আগেই একজন মহিলা হাঁউমাউ করতে করতে এসে বলল, ‘মাসি!

রামভরস হাসপাতালে ভরতি হয়েছে।’

বৃদ্ধা ডুকরে কেঁদে উঠল। অন্যরাও ছুটে এসেছে। সবাই কাঁদছে। সুমন তাড়াতাড়ি

বলল, ‘ভয় পাবেন না। আমরাই ভরতি করে খবর দিতে এসেছি। একটু মাথা ঘুরে

গিয়েছিল, এখন ভালো আছে। কিছুক্ষণ পরে ছেড়ে দেবে, বাড়িতে চলে আসবে।’

বৃদ্ধাকে শান্ত করা যাচ্ছে না। কান্নাজড়ানো গলায় বলল, ‘পব্‌না! জলদি হাসপাতালে যা।’

এতক্ষণে সতেরো-আঠারো বছরের ছেলেটাকে ভালো করে দেখতে পেল। লুঙ্গি আর ছেঁড়া

গেঞ্জি পরে আছে। তবে স্বাস্থ্য ভালো, লম্বা-চওড়া চেহারা। ধীর-স্থির,

উজ্জ্বল দুটো চোখ নিয়ে তাকে দেখছে। দেখেই সুমনের ভালো লেগে গেল। সামনে

গিয়ে বলল, ‘তোমার নাম কী?’

‘পবন মাহাতো।’

‘তুমি কী কর? পড়াশোনা কর?’

‘এবার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেব।’ পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছে ও।

সুমন চমকে উঠে বলল, ‘তোমার পরীক্ষার তো আর দেরি নেই।’

বৃদ্ধা আবার কেঁদে উঠল- ‘দেরি করিস না পব্‌না। জলদি যা।’

সুমন বৃদ্ধার হাত ধরে বলল, ‘দিদা! আপনার ছেলে ভালো আছে। চিন্তা করবেন না।

ওর পরীক্ষা, ওকে বরং পড়তে দিন।’

‘দিদা’ সম্বোধনে বৃদ্ধা অবাক হয়ে তাকে দেখল।

সুমন ঘড়ির দিকে তাকাল। আর এখানে থাকা ঠিক হবে না। এধরনের দ্বিচারিতা এর

আগেও করেছে। পার্টি বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার লাইন নিয়েছে। ও

নিজে কলেজ ছেড়েছে, অন্যদের সঙ্গে স্কুল-কলেজে ভাঙচুর করেছে, পুড়িয়ে

দিয়েছে। কিন্তু এত প্রতিকুলতার মধ্যেও যে ছেলেটা লেখাপড়া করে যাচ্ছে,

নিশ্চয়ই কোনো ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে, একটা মিথ্যে কারণে পরীক্ষার মুখে

তার সময় নষ্ট করে দিতে ইচ্ছে করছে না।

          রাতের খাওয়া সারা হয়েছে। একটু আগে ডাক্তারবাবু দেখে চলে গেলেন।

সুমন দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে তাকাল। মাত্র আটটা বাজে। বেডের পাশে দুজন

সশস্ত্র কনস্টেব্‌ল সর্বক্ষণ পাহারায় থাকে। একটা হাত হাসপাতালের লোহার

খাটের সঙ্গে শিকল দিয়ে বেঁধে তালা লাগানো। শুধু খাওয়ার সময় আর বাথরুমে

গেলে খুলে দেয়।

প্রায় একমাস যাবৎ এটাই ওর ঠিকানা। পুলিশের নৃশংস অত্যাচারে মৃত্যুর খুব

কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। হাসপাতালে কিছুদিন সম্পূর্ণ অচেতন অবস্থায় ছিল।

এখন অপেক্ষাকৃত ভালো। শরীর অত্যন্ত দুর্বল হলেও বসে নিজে খেতে পারে,

হেঁটে বাথরুমে যেতে পারে। হেপাজতে নিতে মরিয়া থানার দারোগা অনেক চাপ

দিয়েও একগুঁয়ে ডাক্তারবাবুকে ডিসচার্জ করতে রাজি করাতে পারেননি।

ডাক্তারবাবু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন রোগী আরও স্থিতিশীল না-হওয়া অবধি তিনি

ছুটি দিতে পারবেন না। কয়েকবছর অবিরাম ছোটাছুটির পর এখন অখণ্ড অবসর।

সুমনের সারাদিন কাটে অতীত, বর্তমান আতিপাতি করে ঘেঁটে আর ভবিষ্যতের

ভাবনায়। দুর্বল মস্তিষ্ক ক্লান্ত হয়ে পড়লে চোখ বুজে শুধু শুয়ে থাকে।

          গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েকদিন আগে অঞ্জনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। অঞ্জন

শুধু কমরেড নয়, ওর কলেজের সহপাঠী, বন্ধু। ও আর আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত

থাকতে চায় না। বাড়ির থেকে ব্যবস্থা করেছে, ব্যাঙ্গালোরের কলেজে ভরতি হয়ে

আবার পড়াশোনা শুরু করবে।

‘আমি হতাশ সুমন। শ্রমিক-কৃষকের নেতৃত্বে জনগণের সশস্ত্র অভ্যুত্থান দিয়ে

শোষণমুক্ত সমাজ তৈরি হবে, এই স্বপ্ন নিয়েই তো লড়াই-এ নেমেছিলাম। কিন্তু

তারপর কী হল! আমরা স্কুল-কলেজ পোড়াচ্ছি, মনীষীদের মূর্তি ভাঙছি। পাড়ার

বাসিন্দা নীচুতলার পুলিশ কর্মচারী, ব্যবসায়ী, পুলিশের চর সন্দেহে সাধারণ

মানুষ, এদের খতম করছি। অন্য বামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করে অকারণে

শক্তিক্ষয় করছি। কিন্তু মূল লক্ষ্যের দিকে আমরা কতটুকু এগোতে পেরেছি!’

আন্দোলন এখন অনেক স্তিমিত। সরকার সর্বশক্তি দিয়ে তাদের উৎখাত করতে

ঝাঁপিয়ে পড়েছে। ব্যাপক পুলিশি অভিযানে অসংখ্য কমরেড শহিদ হয়েছে অথবা জেলে

বন্দি আছে। বহু জায়গায় এখন সংগঠনের অস্তিত্বই নেই। সুমন অঞ্জনের সঙ্গে

বেশিরভাগ বিষয়েই একমত। তারা কানাগলিতে আটকে পড়ে রাজপথের সন্ধান পাচ্ছে

না। এ নিয়ে পার্টিতে বারবার কথা বলেও কোনো ফল হয়নি, বরং নিজেই কোণঠাসা

হয়ে গেছে।

‘পুলিশ ব্যাঙ্গালোরে ধাওয়া করবে না?’

‘আমরা তো বড়ো নেতা নই, বাইরে চলে গেলে পুলিশ আমাদের নিয়ে আর মাথা ঘামাবে

না। অনেকেই এরকম চলে গেছে।’ অঞ্জন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বলল, ‘সুমন

তুইও চল না! কলেজে ভালো স্টুডেন্ট ছিলি, তোর কোনো অসুবিধে হবে না। তুই

রাজি থাকলে আমি ওখানে সব ব্যবস্থা করে ফেলব।’

‘সুমন মজা করে বলল, ‘আমাকে কলেজের নাম, ধাম, সবকিছু বলে দিলি। ধরা পড়লে

পুলিশকে যদি জানিয়ে দিই!’

অঞ্জন হেসে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘সুমন পালকে আমিই বোধহয় সবথেকে ভালো

চিনি। বাজে কথা ছাড়। কথাটার উত্তর দিলি নাতো! আমি কিন্তু ভেবেচিন্তেই

বলেছি।’

সুমন ধীরে ধীরে বলল, ‘আন্দোলনে ভুলত্রুটি হয়, কিন্তু লক্ষ্য স্থির থাকলে

পরে সঠিক পথের দিশাও পাওয়া যায়। পৃথিবীর সব দেশের ক্ষেত্রেই এটা ঘটেছে।

হয়তো নতুন পার্টি তৈরি হবে, মানুষগুলোও বদলে যাবে, অতীতের ভুল থেকে

শিক্ষা নিয়ে আবার নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করবে। কিন্তু এর জন্য মাটি কামড়ে

পড়ে থাকতে হবে। আমরা সবাই যদি এরকম দূরে সরে যাই, এগুলো কে করবে! জনগণের

মুক্তিই বা কী করে আসবে!’

অঞ্জন চুপ করে শুনছিল। সুমন আবার বলল, ‘কলেজ থেকে ফেরার পথে একদিন

শিয়ালদা স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটা দূরপাল্লার ট্রেন প্লাটফর্মে

দাঁড়িয়ে। ট্রেনের একজন যাত্রী খোসা-ছাড়ানো আধা-খাওয়া একটা কলা জানলা

গলিয়ে প্লাটফর্মে ফেলল। কলাটা হয়তো পচা ছিল। প্লাটফর্মের বাসিন্দা দুটো

বাচ্চা ছুটে এসে কলার দখল নিতে নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করল। হঠাৎ

একটা বাচ্চা দুটো বগির ফাঁকে নীচে পড়ে গেল। ট্রেন তখন চলতে শুরু করেছে।’

অঞ্জন চমকে উঠল- ‘তারপর কী হল?’

‘তারপর যা হবার তাই হল। ট্রেনটা চলে গেলে দেখা গেল ওর ছোট্ট বুকটার ওপর

দিয়ে চাকাগুলো একে একে চলে গেছে। বিস্ফারিত চোখদুটো যেন তাকিয়ে আছে সবার

দিকে। সেদিন শপথ নিয়েছিলাম যে সমাজে একটা পচা কলার জন্য একজন মানুষকে

জীবন দিতে হয়, সেই মানুষমারা ব্যবস্থাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়াই আমার জীবনের

ব্রত হবে। আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব না অঞ্জন, ওই চোখদুটো আমাকে

তাড়া করে বেড়াবে।’

          দুজন করে কনস্টেব্‌ল দিনে ও রাতে দুটো শিফ্‌টে ডিউটি দেয়। এক

সপ্তাহ পরপর নতুন পুলিশের দল আসে। দু-দিন হল একটা নতুন দল এসেছে। ওরা

প্রয়োজন ছাড়া তার সঙ্গে কথা বলে না। টুলে বসে থাকে অথবা নিজেদের মধ্যে

গল্প করে। একজন খেতে বা বাথরুমে গেলে অন্যজন কিছুক্ষণের জন্য একা হয়ে

যায়। ভিজিটিং আওয়ার্স চলছে। সুমনের সঙ্গে অবশ্য কারও দেখা করার অনুমতি

নেই।

‘আমাকে চিনতে পারছেন?’

চমকে ঘুরে তাকিয়ে দেখল কনস্টেব্‌লদের একজন ওর কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।

উর্দি-পরা, অল্পবয়সি কনস্টেব্‌লটিকে চিনতে পারল না।

‘আমি পবন মাহাতো।’

এবারও সুমনের ভাবান্তর হল না।

‘আমার বাড়ি নুরপুকুরে। আমাদের বাড়িতে আপনি একবার গিয়েছিলেন।’

মুহূর্তের মধ্যে সব কথা মনে পড়ে গেল। সদ্য মৃত্যুর দরজা থেকে ফেরা সুমনের

শীর্ণ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল- ‘ও—! তাই নাকি! তুমি সেই ছেলেটা!’

‘পাশ করার পরে চাকরিটা পেয়ে গেলাম। আমি কিন্তু আপনাকে দেখেই চিনেছিলাম।’ ও হাসল।

সুমন আবার দ্বিচারিতার কবলে পড়েছে। তাদের শত্রু পুলিশের চাকরি করলেও ওর

সত্যিই আনন্দ হচ্ছে। হতদরিদ্র পরিবারটা এখন নিশ্চয়ই কিছুটা

স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখেছে।

‘বাবা বাড়িতে ফিরে আসার পর সব জেনেছিলাম। সেদিন আপনি না থাকলে বাবাকে

হারাতাম, আমাদের পরিবারটাও ভেসে যেত। মাঝেমাঝে বাড়িতে আপনাকে নিয়ে কথা

হয়। অন্য কোনো মানুষকে আমরা এত শ্রদ্ধা করি না।’ ও হঠাৎ নীচু হয়ে সুমনের

পা ছুঁয়ে প্রণাম করল।

‘আহা! কী করছ!’ সুমন বাধা দিতে গেল।

‘খবরের কাগজে যখন দেখি পুলিশের চর সন্দেহে, অন্য দলের লোক বলে পার্টিগুলো

মানুষ মেরে ফেলেছে, এখনও শিউরে উঠি। পার্টির আন্দোলনে যোগ দিয়ে পুলিশের

গুলিতেও কত লোক মরছে। ছবিগুলো দেখলে বোঝা যায় কত গরিব সবাই, অসহায়

আপনজনরা মৃতদেহ ঘিরে কাঁদছে। তাদের কী দশা হয় কেউ তার খবর রাখে! গরিবরাই

তো মরে, বড়োলোক ক’জন মরছে বলুন! পার্টিগুলো সবাই দাবি করে ওরা জনগণের

জন্যে লড়াই করছে। লাশ নিয়ে ঘটা করে শোভাযাত্রা বের করে। কিন্তু সাধারণ

মানুষের জীবনের কোনো দাম নেই ওদের কাছে। মশা-মাছির মতো মানুষ মরছে।

বোড়েরা শুধু জীবন দেয়, আর রাজা ক্ষমতায় আসে।’

পবন হঠাৎ খুব কাছে এসে নীচুগলায় বলল, ‘একদম ডানদিকের বাথরুমটার পেছনে

একটা দরজা আছে। বাইরে থেকে ছিটকিনি আর তালা লাগানো ছিল। আমি একটু আগে

ছিটকিনি খুলে, তালা ভেঙে দিয়ে এসেছি।’

ঘটনার আকস্মিকতায় সুমন হকচকিয়ে গিয়ে শুধু বলল, ‘কী?’

‘আপনি বাথরুম দিয়ে পালিয়ে যান। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে নোংরা জায়গাটা

পার হয়ে একটা গলি দেখতে পাবেন। ডানদিকে কিছুটা এগিয়ে গেট পেরোলেই বড়ো

রাস্তায় উঠে যাবেন। আমার পার্টনার একটা জরুরি দরকারে বাড়িতে গেছে। আমি

ইচ্ছে করেই ওকে ছেড়ে দিয়েছি। হাতে ঘণ্টাখানেক সময় আছে, আপনি বেরিয়ে যান।’

সুমনের শরীর, মস্তিষ্ক আবার টানটান হয়ে উঠছে। দুর্বল হাতের মুঠোগুলো শক্ত

হচ্ছে। তবু বলল, ‘কিন্তু তোমার? তোমার কী হবে?’

ও হাসল- ‘সাসপেন্ড করবে, চাকরি চলে যেতে পারে। জেলও হতে পারে। কিছু ক্ষতি

হবে ঠিকই। কিন্তু আমাদের অনেক বেশি ক্ষতি হবে আপনাদের মতো মানুষ জেলে

আটকে থাকলে, যারা সবার ওপরে রাখে মানুষকে। এই সময়ে বড়ো দরকার আপনাদের। আর

দেরি করবেন না দাদা, এখনই চলে যান। সারা দেশ আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে|

ছবি: শুভাশিস মজুমদার

1 COMMENT

  1. অত্যন্ত ভাল লেখা। খুব ভাল লাগল।
    এই দিনগুলো আমাদের অল্প বয়সে দেখেছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here