নীল তিমির ডাক অথবা বিজ্ঞাপনের ভাষা

1
Blue Whale

Last Updated on

ঈশা দেব পাল

এক
ফোনটা যখন এল, তখন সোমক সাঁতার কাটছে। তিমি মাছের সঙ্গে। উফ কী ভীষণ লোভনীয় !! নীল জলের মধ্যে যেন একটুকরো নীল তিমি মাছ। মাছটা যেকোনো মুহূর্তে লাফিয়ে উঠতে পারে এমন ই তার ভাব। ওই ভাবটুকু দেখেই মানুষের মনে যেন লোভ জাগে। ঐভাবেই ডিজাইনটা বানানো হয়েছে আসলে। সোমক লোভে পড়ে যাচ্ছে । একবার নিজের মলিন মোবাইলটার দিকে চোখ ও গেল। যে মডেলটাকে সে গত পনেরদিন ফলো করছে আজ বাড়ি ফিরেই সেটা অনলাইন বুকিং করবে। যতই নীল তিমি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা চালু হোক, এই বিজ্ঞাপনী কন্সেপ্ট সে পছন্দ করে ফেলেছে। এখন হাত ফাঁকা, তাও সে নিজের জন্য এই মডেল টাই কিনবে। রুম্পার অত মোবাইলে শখ নেই। নাহলে সিওর দুটো কিনতে হত। দুজন সমবয়সী বন্ধু বিয়ে করলে হিস্যা বরাবর । সোমক এর কাজ করতে করতেই হাসি পেল। রূম্পা তাকে মাঝে মাঝেই বলে, সে নাকি তার দশ বছরের বালক মনোজগৎ থেকে আজও বের হতে পারেনি। হবেওবা। দশ বছর বয়সে তার চোখ জোড়া স্বপ্ন যেমন ছিল, দারিদ্রর অভিজ্ঞতা ও তো ছিল তেমনি সেদিন। সেই মিশ্র দুঃখ-আনন্দ থেকে সে সত্যিই হয়ত বেরোতে পারেনা।
রুম্পার অস্থির গলার স্বর শুনে সে ভয় পেয়ে যায় প্রথমে। সবে কনসিভ করেছে। এই সময় তারা দুজনেই ভয়ে ভয়ে আছে। কিন্তু রুম্পার বক্তব্য শুনে সে প্রায় আকাশ থেকে পড়ল। একটি ছেলে নাকি তাদের বাড়ি হাজির। বছর দশেক বয়স। বলছে পাশের পাড়ায় থাকে, এসে বলছে তার মা কে নাকি তার ঠাকুমা আর কাকা মিলিয়ে পুড়িয়ে মারছে। তাই সে পালিয়ে এসেছে। সোমক কাঁপা হাতে বাইক স্টার্ট দেয়। বাড়ি যেতে মিনিট কুড়ি লাগবে। তার আগে সে শুধু বলে দিল পাশের ফ্ল্যাটের চন্দ্রাদি কে ডেকে যেন সব বলে রূম্পা। একা না থাকে।

আরও পড়ুন:https://risingbengal.in/assignment/


দুই
বাড়িতে তখন গান বাজছিল জোরে। তার মা চা করতে গেছিল রান্নাঘরে। কাকু আগেই গ্যাসের পাইপ কেটে দিয়েছিল, আর তার ঠাকুমা দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল বাইরে থেকে। সে এই অব্দি দেখে দৌড়ে পালিয়ে এসেছে। এখানে এসে হাঁফাচ্ছিল। তখন বারান্দায় ঐ কাকীমাকে দেখে সে জল চায়। এই বলে রুম্পাকে সে দেখায়। চন্দ্রা আর রূম্পা তাকে নানাবিধ প্রশ্ন করছিল দুজনে। সোমক কে দেখে ছেলেটা একটু ভীত চোখে তাকায়। সোমক দেখে ছেলেটার চোখ দুটো অতীব মায়াবী আর চাহনিটা যেন তার ভীষণরকম চেনা। তাকে দেখেই চন্দ্রাদি জানায়, পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে। রাজদা অফিস থেকেই দিয়েছে। পুলিশ আসছে। সোমক বেশ বিরক্ত ই হচ্ছিল এই উটকো ঝামেলায়। আজ শুক্রবার। কাল পরশু ছুটি। সে আর রূম্পা উইকএন্ড টাই নিজেদের মত করে কাটায়। কিন্তু ছেলেটার অদ্ভুত মায়াবী চোখগুলো দেখে সে থমকে যাচ্ছিল। তাকে আটকে দিচ্ছিল ছেলেটার মায়া। রান্নাঘরে রূম্পা চা করার সময় সে গিয়ে দাঁড়াল। বসার ঘরে তখন ছোটখাটো ভিড়। ফ্ল্যাটের অনেকেই এসেছে এরকম একটা আজব ব্যাপার শুনে। নানা মুনির নানা মত ও আদান-প্রদান চলছে। সোমক রুম্পার ্কাছে গিয়ে এমনি ই দাঁড়াল। সে কিছু একটা বলতে চাইছিল, যা বললে এই টেনশনটা ভাগ করে নেওয়া যায় আরকি। কিন্তু রুম্পাই তাকে একটা অধভুত কথা বলল,—দেখ ছেলেটা যা বলছে ওদের নাকি আমাদের এই গড়িয়াতেই তিনতলা বাড়ি, বাড়িতে দুটো কুকুর, দামী মিউজিক সিস্টেম এ গান বাজছিল, বাবার নাকি বিয়াল্লিশ ইঞ্চি টিভি আছে দোতলায়, এসব ই তো বিরাট ব্যাপার। অথচ ছেলেটাকে দেখতে কেমন গরীব গরীব না ? নাম ও বলছে পল্টু। নামটা ও কেমন গরিবি। তাই না ?
রুম্পার কথার যুক্তি সোমক কে স্পর্শ করলনা, সে হঠাত খুব আহত হল যেন এটা শুনে। তিরস্কারের মত করেই বলল- তোমরা মেয়েরা পারো ও। নামের আবার গরীব –বড়লোক কি। আর বাচ্ছা ছেলে, মাঠে ঘাটে খেলে বেড়ায়, তাই ওরকম চকচকে নয়। সে কি করা যাবে ? রূম্পা কিছু আর বলেনা। এরকম একটা অপ্রস্তুত সময়েও তার মনে পড়ে যায় সোমক সব কিছুকেই অত্যন্ত পার্সোনালি নিয়ে নেয়। যেন তার ছোটবেলা থেকে লেপ্টে থাকা দারিদ্র আর সেই লড়াই থেকে বড় হয়ে ওঠা এসব কিছুকেই রূম্পা আঘাত করে ফেলল একটা কমেন্টের মধ্যে দিয়ে। ছোটবেলায় বাবা মারা গেছিল সোমকের। মা হস্পিটালের আয়ার কাজ করে বড় করেছে তাকে। অথচ দুচোখ জোড়া স্বপ্ন ছিল তার। সেই স্বপ্ন ই এখন তার সাফল্যের চাবি। দারিদ্র এখন শুধু ছোটবেলার দুঃস্বপ্ন।
চা খেতে খেতে সোমক নিজের সঙ্গে লড়াই করল একটু। কারণ রুম্পার কথার যুক্তিগুলো তাকে ছুঁয়ে ফেলেছিল। তবু ছেলেটার চোখে কি অসম্ভব মায়া তাকে একটা বিশ্বাসের পৃথিবীতে টেনে আনছিল বারবার। পুলিশ আসার আগেই রুম্পার জামাইবাবু এলেন। অনেক গম্ভীর জ্ঞান দিলেন । অবশ্যই যেন পুলিশ কে জমা করে দেওয়া হয় বাচ্ছাটাকে। অথচ যে ছেলেটাকে আড়াল করে এই আলোচনা চলছিল, সে তখন বসার ঘরে সোমকের প্রিয় স্মার্ট টিভি তে মগ্ন। একা একা ই হাসছে বিজ্ঞাপন দেখে। ঝড়ের বেগে মুখস্ত বলে দিচ্ছে এড এর ট্যাগ লাইন। সোমকের তাক লেগে যায়। আর ছেলেটাকে সে যেন আরো একটু ভালবেসে ফেলে।

আরও পড়ুন: https://risingbengal.in/ventilation/


তিন
থানা থেকে এক অফিসার সত্যিই চলে আসেন দুজন কনস্টেবল নিয়ে। থানার জিপ আসাতে হঠাত কেমন হয়ে গেল গোটা ফ্ল্যাট বাড়িটা। যারা ভিড় করছিল, তারা চলে গেল এদিক ওদিক। অফিসার এসেই রুম্পাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন পরপর। ঠিক যা যা হয়েছিল বিকেলের পর। রূম্পা রোজকার মতই দুপুরের ঘুম সেরে উঠে বারান্দায় বসেছিল একা। হঠাত দেখে বছর দশেকের ছেলেটি নিচে দাঁড়িয়ে আছে, হাঁফাচ্ছে ও। তাকে দেখে জল খেতে চায়। সে দোতলায় উঠে আসতে বলে। ছেলেটার চোখ দুটো এত স্বপ্নালু যে তার মায়া লাগছিল দেখে। ওপরে এসে জল খেয়ে ছেলেটা হঠাত কেঁদে ফেলে আর তারপর ওই ভয়ানক কথাটা জানায়। তার মা কে মেরে ফেলার কথাটা। রূম্পা যতক্ষ্ণ বিবৃতি দিচ্ছিল , পল্টু সোমকের স্মার্ট ফোন নিয়ে অনায়াসে গেম খেলছিল একমনে। । যেন তার কথা নয়, অন্য কারোর কথা বলা হচ্ছে । কথা শেষ হতেই অফিসার উঠে দাঁড়ান আর নির্দেশের মত করেই সোমক কে বলেন, আমি বাচ্ছাটাকে নিয়ে যাচ্ছি আর আপনি ও আসুন। আগে ওর বাড়িটা খুঁজে বার করি। হিসেব মত সোমকের বাড়ি থেকে ওর বাড়ি মিনিট পাঁচেক। কলেজের পিছন দিক দিয়ে সোজা গেলেই নাকি ওদের তিনতলা হ্লুদ রঙের বাড়ি। ওর বাবার ট্র্যাভেল এজেন্সি আছে। তাই দাস বললেই সবাই চিনবে। সোমক রাজাদা কে ও সঙ্গে নেয়। ওরা সবাই চলে গেলে রুম্পার শরীর খারাপ লাগে। এতক্ষ্ণে তার খেয়াল হয় নিজের তিনমাসের ব্যাপারটা। গা গোলাতে থাকে। দুটো বিস্কিট খেয়ে শুয়ে পড়ার সময়ে ও সে একটা জ্বলন্ত আগুনের শিখা দেখে শুধু। সে চিরকাল বাবা-মায়ের আদুরে সন্তান। এরকম থানা-পুলিশের অভিজ্ঞতা ও তার আগে কোনোদিন হয়নি। সে সোমকের মত নানারকম জীবনযুদ্ধ করেনি। তাই এই ঘটনায় সে যারপরনাই পীড়িত হয়ে পড়ে। এই ছোট্ট ফ্ল্যাট তার পরম মমতা দিয়ে সাজানো। বিয়েতে এটাই ছিল তার মা আর বাবার উপহার। বাবা-মা কাছেই থাকেন, তাতেই তার সুবিধে। সোমকের মা-দাদারা থাকেন বর্ধ্মানে গ্রামের বাড়িতে। পল্টু যে সংসারের বিবরণ দিল, তার সনগে তার বই এ পরিচয় আছে, বাস্তবে নেই। তার ভাবনার মধ্যেই মায়ের ফোন এল, এবং যথারীতি দিদির থেকে সব শুনে মা খানিক হাঁউমাঊ চেঁচামেচি করল। তাও একবার ডিটেইলসে সবটা শুনতে ও চাইল। রূম্পা বলতে অবাক হয়ে বলল, কি একটা জনপ্রিয় সিরিয়ালে মাস দুই আগে ঠিক এইভাবে একটা বউ কে পুড়িয়ে মারার কথা দেখিয়েছে। সেটা শুনে রূম্পা অবশ্য আর এক ধাপ অবাক হয়ে গেল সব মিলিয়ে।

আরও পড়ুন: https://risingbengal.in/akta-name-dite-hobe-rabiadda/


চার।
সব সকালের ই একটা নিজস্ব আনন্দ থাকে। সব দুঃখের অবসানের মত রাত ফুরোয়। রূম্পা জবাদির সঙ্গে কথা বলতে বলতে চা খাচ্ছিল। সোমক আর পল্টু পাশের ঘরে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। ছেলেটার একটা পা সোমকের গায়ে তোলা। থানা থেকে জানিয়েছে , ছেলেটা কে দুদিন তাদের কাছেই রাখতে। অতটুকু ছেলেকে থানায় রাখার চেয়ে এটা ভাল ব্যবস্থা। কারণ কাল প্রায় ঘণ্টা তিনেক ঘোরার পর ও ছেলেটা নিজের বাড়ি চিনতে পারেনি। দূর থেকে বলছে, এই গলিটা দিয়ে গেলেই প্রথম বাড়ি কিংবা বাঁদিকের গলি দিয়ে গেলে তিন নম্বর বাড়ি। কিন্তু বাড়ির কাছে এসে চিনতে পারছেনা। সেসব বাড়ির লোকেরাও তাকে চিনতে পারছেনা। পুলিশ ই জানিয়েছে , অত্যধিক ভয় পেলে এমনটা হতে পারে। তাই দুদিন যাক।
রবিবারের সকাল মানেই সমস্ত আকাশ বাতাস জুড়ে আলস্য। অন্য রবিবার তারা দুজন মিলে বেরিয়ে পড়ে এদিক ওদিক। আজ রূম্পার সমস্ত শরীর জুড়ে অন্যরকম মন্থরতা। একটা ভয়, শিহরণ তার মনে জায়গা করে নিয়েছে। শুধু ছেলেটির অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ দেখে সে অবাক হয়ে যাচ্ছে। কাল রাতে চেয়ে চেয়ে ভাত, মাছের ঝোল খেল। অত রাতে ও টিভি দেখতে চাইল। তারপর ঘুমোলো। এবং এমন ই অনায়াসে সোমকের পাশে শুয়ে ঘুমোলো যেন এরকম ই ব্যবস্থা তার চলছে আজীবন। রূম্পা ভাবে, অবোধ শিশু মা হারানো কী জিনিস এখনো বুঝতেই পারছেনা। আর কদিন পর ই কঠিন পৃথিবী অপেক্ষা করবে তার জন্য।
সোমক আর পল্টু উঠতেই ওদের সে জলখাবার দিয়ে চট করে একটা সালোয়ার পরে বলল,– আমি একটু দেখে আসছি জায়গাটা। কাছেই তো। একটা তিনতলা বাড়ি তো আর উবে যাবেনা। রিক্স করে যাব আর আসব। সোমক বারণ করার আগেই ধাঁ করে বেরিয়ে গেল রূম্পা। নিজের চোখে বিষয়টা না দেখে তার ঠিক লাগছিলনা। আর প্লটুর নির্দেশমত বাড়িটার সামনে এসে সে সত্যিই অবাক। একটা লাল দোতলা বাড়ি। নেমপ্লেটে লেখা—-আর, এন , চ্যাটার্জি। কিন্তু পল্টু যে বলল, ওরা দাস ? ওর বাবার নাম রাজেন্দ্রনারায়ন দাস ? সিকিউরিটির লোকটা কে গিয়ে প্রশ্ন করেই ফেলল– পল্টু নামক একটা বাচ্ছা ছেলে কি এই বাড়িতে থাকে ? লোকটা বিরক্ত হয়ে জানালো—এই বাড়িতে ছোট দুই যমজ মেয়ে আছে, কোনও বাচ্ছা ছেলে থাকেনা।
বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার সময় ই ফোন এল সোমকের—এক্ষুণি এস। থানা থেকে ডেকে পাঠিয়েছে। এদিকে পল্টু কান্নাকাটি করছে , যেতে চাইছেনা।

আরও পড়ুন:https://risingbengal.in/rabiadda-shiksha/

বাড়ি ফিরল যখন তারা দুজন ,তখন সন্ধে । অন্যান্য রবিবারের সন্ধের সঙ্গে আজ কোনো মিল নেই। দুজনের ই মনে হচ্ছিল তাদের যৌথ জীবনে আজকের মত নিরানন্দ দিন আর আসেনি। থানায় যেতেই তারা সেই অস্বাভাবিক সত্যর মুখোমুখি এল। থানায় অপেক্ষারত এক সাদা শাড়ি পরা ফ্যাকাশে , সর্বাঙ্গে দারিদ্রের চিহ্নমাখা মহিলাকে দেখে পল্টু লুকিয়ে পড়ছিল তাদের আড়ালে। উনি ই নাকি ওর মা। আয়ার কাজ করেন। সারাদিন এক মামার কাছেই থাকে পল্টু। বাবা নেই। বাকি গল্প বানানো। টিভি দেখার নেশায় আর মোবাইলে গেম খেলার নেশায় ও পালায়। এই নিয়ে তৃতীয়বার । কোনো দামী বাড়ি দেখে আশ্রয় নেয় এভাবেই। সোমক মানতে পারছিলনা। রূম্পা ও না। এখনো পারছেনা। ঘর অন্ধকার করে ড্রয়ই রুমে বসে আছে তারা দুজন। রূম্পা ভাবছে, অন্তত বধূহত্যার দুঃস্বপ্ন থেকে তারা মুক্তি পেল। কিন্তু নীল তিমির দুঃস্বপ্ন থেকে কি তারা বেরোতে পারবে ? সোমক ভাবছে, নীল তিমি তাহলে কতরকমভাবে তিল তিল করে মৃত্যুর দিকে ডাকে। ভাবে, একটু পরেই তার মাঝারি মাপের মোবাইল থেকেই অনলাইন বুকিং ক্যান্সেল করে দেবে সে। কাল ই যে মোবাইলটা বুক করেছিল সে, সেটা আর চাইনা। দারিদ্র আর তার স্মৃতি থেকে সে মোটেই ত্রাণ চায়না আর।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here