খাবার

0

Last Updated on

দেবতনু ভট্টাচার্য্য

ভেটিয়াড়া পৌঁছতে পৌঁছতে সেই বিকেল পড়ে এল। তাড়াহুড়োয় ট্রেকার থেকে নামতে গিয়ে বাঁ পা-টা বিচ্ছিরি ভাবে কেটে ফেলল পলাশ। বুঝতে পারে নি। বড় বেকায়দায় নামা হয়ে গেছে। তাছাড়া ট্রেকারের ড্রাইভারও তাড়া দিচ্ছিল খুব। সেই সক্কাল সক্কাল আরণ্যক চেপে বিষ্ণুপুর নেমেছিল সে। তারপর এ স্কুল, সে স্কুল ক্যানভাসিং করতে করতে কখন যে বেলা মরে আসছে খেয়াল করেনি। ছুটতে ছুটতে ট্রেকার স্ট্যান্ডে এসে একটু চা-মুড়ি গিলে নিয়ে ফের ট্রেকারে চাপাচাপি বসে পড়েছিল কোনমতে। সোনামুখি যাওয়ার বড়রাস্তা থেকে যেখানে বাঁয়ে কাঁচা রাস্তায় বাঁক নিতে হয় জয়কৃষ্ণপুরের মোড়ে, ঠিক সেখানটাতে নামতে গিয়েই এই বিপত্তি। কাঁধ থেকে বেদম ভারী বইয়ের ঝোলাটা নামাল পলাশ। পা টাকে একটা চাটানের ওপর তুলে ভাল করে দেখে নিল একবার। নাঃ,এ পা নিয়ে হাঁটা যাবে না। বুড়ো আঙুলের নখ সমেত ছাল উপড়ে উঠে এসেছে একটা কালো ভারী ইঁটের মাপের পাথরের আঘাতে। বেলা শেষের পড়ে আসা আলোয় দেখে মনে হচ্ছে, পুরনো কলকাতার ট্রামরাস্তার মত পাথর অনেকটা। এ তল্লাটে বেমানান। এ তল্লাট লাল মাটির। তাছাড়া সুড়কি রাস্তায় এই পাথর থাকার কথা নয়। হয় তো এখানকার মোরামের সাথে আসেনি। রাস্তা হওয়ার সময় কেউ বাইরে থেকে ফেলে গেছে। এমনও হতে পারে যে কারোর অন্য প্রয়োজনে লেগেছিল এই পাথর। নিয়ে যাওয়ার সময় পড়ে গেছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে। যাই হোক, পলাশ সময় নষ্ট না করে যে স্কুলে যাবে সেখানকার কর্মচারীকে ফোনে ধরার চেষ্টা করল। যদি কোন সুরাহা হয়। এই পা নিয়ে আর এক পা-ও এগোনো যাবে না। তাছাড়া রক্ত বন্ধ করাটা খুব দরকার।

স্কুলের কর্মচারীকে মোবাইলে ধরা গেল না। নট রিচেবল বলছে। অগত্যা কি করবে ভাবছে ও, এমন সময় হুড়মুড় করে বৃষ্টি নামল। কাছাকাছি যে ক’জন তাও দেখা যাচ্ছিল, তারা দুদ্দাড় ছুট লাগাল। মিনিট দুয়েকের মধ্যে পলাশ আবিষ্কার করল যে সে এই ধ্যাদ্ধেড়ে গোবিন্দপুরে সম্পুর্ণ একা একটি ছাউনির তলায় দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গী বলতে কেবল মাত্র সুড়কি ধোয়া ঘোলা জলের তোড়, বিদ্যুৎ চমকের আলো, ব্যাঙ ও ঝিঁঝিঁপোকার আর্তনাদ আর বাঁ-পায়ের বুড়ো আঙুলের যন্ত্রণা। ঠিক এই সময় বিরক্তিকর মোবাইলটা বেজে উঠল। পলাশ কোন রকমে বই গুলো ভাল করে মুড়ে রাখছিল জলের ঝাপ্টা থেকে বাঁচিয়ে, তাড়াহুড়োয় ফোনটা পকেট থেকে বার করতে গিয়ে ছিটকে জলের ওপর গিয়ে পড়ল। হায় হায় করে উঠল পলাশ! তাড়াতাড়ি তুলে নিয়ে দেখে, মোবাইল দেহ রেখেছে। কোন মতে ব্যাটারী ও সিম খুলে নিয়ে পকেটে মুছে ওটাকে ঢুকিয়ে নিয়ে অসহায় পলাশ এবার ভাবতে লাগল কি করবে। রাতের আকাশে মেঘ জমলে এক লাল আভা ফুটে ওঠে। পলাশ বুঝতে চেষ্টা করল সে লাল আর কতটা বিপদ ডেকে নিয়ে আসতে পারে এই মুহুর্তে। আকাশের যা অবস্থা, তাতে এ রাতে আর বৃষ্টি থামবে বলে মনে হচ্ছে না ওর। অকস্মাৎ মুখে একটা চড়া এল-ই-ডি টর্চের আলোয় কড়কড় করে উঠল ওর চোখ দুটো। আলোটাকে হাতের আড়াল করে বুঝতে চেষ্টা করল এ কাজ কার। একটা গুরুগম্ভীর গলা ভেসে এল –“কে ওখানে?” পলাশ চুপ করে রইল। লোকটা ততক্ষণে আরো এগিয়ে এসেছে। কালো বর্ষাতি ঢাকা বিশাল দেহী এক ছায়ামুর্তি। আরো কাছে এগিয়ে আসতে বুঝল,লোকটা পুলিশ। দেখে অফিসার গোছেরই মনে হল। আচরণে শিক্ষিত ছাপ থাকলেও, বলিষ্ঠ গোঁফ ও চওড়া থুঁতনিতে ধূর্ততার ছাপ স্পষ্ট। সাধারণত পুলিশ সান্নিধ্যে এক অদ্ভুত অনীহা থাকলেও, পলাশ এই মুহুর্তে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল যেন। সবিস্তারে বলল নিজের পরিস্থিতি। লোকটি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে চিন্তা করল কি যেন। তারপর খুব অনিচ্ছাভরে যেন বলে উঠল, “আমার বাসায় আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। প্রাথমিক শুশ্রুষা আর রাতের খাবার খেয়েই কিন্তু উঠে পড়তে হবে”। পলাশ বেশ অবাক হল। এমন প্লাবনের দিনে এমন প্রস্তাব কেউ দিতে পারে,তাও একজন পুলিশ, এ তার কাছে ভীষণ অবাক করা ব্যাপার। হয় তো বাড়িতে কোন বিশেষ অসুবিধে আছে, তা হতে পারে। পলাশ বলল, “সেরকম হলে আমি আপনার থানাতেও রাত কাটাতে পারি। আমার অসুবিধে হবে না”। একটা অব্যক্ত হাসি খেলে গেল যেন লোকটার কাঠিন্য ভরা মুখে। যেন একটু রহস্য করেই বলল, “আমি পুলিশ নই। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের রেঞ্জ অফিসার। জঙ্গলে পড়ে থাকি। তবে অতিথি সৎকারে আমি কোনরকম কার্পণ্য করি না কখনো। আমার মদ খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। তাই আপনাকে আমার বাড়িতেই নিয়ে যাচ্ছি। নেশা না জমলে কি আর অতিথিসেবায় মজা আছে? আর তাছাড়া এই ঝড় জলের রাতে টাউনের হোটেল গুলোয় ঘুরে ঘুরে ঘর খুঁজে মরার কোন ইচ্ছে আমার নেই। আসুন”। বলে এক ঝটকায় ভারী বইয়ের ব্যাগটা নিয়ে সে পা বাড়াল জিপের দিকে।

মানুষ কতটা বেহায়া হলে এত সহজে নিজের নেশা দুর্বলতার ইচ্ছে অনায়াস ব্যক্ত করতে পারে, এই সব ছাই পাঁশ ভাবতে ভাবতে পলাশ লঝঝড়ে জিপটায় কোন মতে চড়ে বসল। জিপের হলদেটে হেডল্যাম্পের আলো যেন রাস্তাটাকে আরো অন্ধকার ও রহস্যময় করে তুলেছে। জিপের ইঞ্জিনের গরমে পলাশ এতক্ষণে টের পেল তার ক্ষিদের আর্তি। লোকটার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। একাই বেপরোয়া ড্রাইভ করতে করতে পাশে রাখা মদের বোতলের ছিপি খুলে খেতে শুরু করে দিয়েছে ততক্ষণে। বর্ষাতি খোলায় এতক্ষণে তার চেহারা কিছুটা হলেও পরিষ্কার হল পলাশের সামনে। এককালে সুঠাম থাকলেও, অনিয়ম আর সম্ভবত পেশার প্রয়োজন লোকটাকে কুৎসিত করে তুলেছে। দু’চোখের কোল জুড়ে মাংসল বর্তনী আর জালার মত ভুঁড়ি যেন অনিচ্ছাকৃত সাক্ষী বহন করে চলেছে সেই সব না বলা অত্যাচারের।

যে দিকে গাড়ি ছুটে চলেছে, তা ফের বিষ্ণুপুরের দিকেই নির্দেশ করছে। লোকটা নির্বিকার। পলাশ কিছুক্ষণ ইতস্ততঃ করে গলা খাঁকরালো,“ ইয়ে, মানে স্যর, আপনি কি বিষ্ণুপুরের দিকে চলেছেন? “কেন, আপনার আপত্তি আছে?” একটা ঝাঁঝাল জবাব এল লোকটার থেকে। পলাশের হঠাত প্রচণ্ড রাগ হল। অসভ্য ইতর একটা জানোয়ারের সঙ্গে এই অবস্থায় পড়তে হবে জানলে ও কিছুতেই রাজী হত না আসতে। ও আর কথা বাড়াল না। গাড়ি ক্রমশঃ এগিয়ে চলেছে। মুষলধারা বৃষ্টির চোটে বড় রাস্তাতেও জলের তোড়। পুরনো জিপের ইঞ্জিন এক অজানা আক্রোশে গোঁ গোঁ করতে করতে এগিয়ে চলেছে। উইণ্ডস্ক্রিনের দুটো ওয়াইপার চলছে বটে, কিন্তু তা প্রায় না চলারই সমান। বড় অসহায় লাগছিল পলাশের। এই প্রতিকূল পরিস্থিতি, অর্ধোন্মাদ এক সাহায্যকারী, ভাঙাচোরা জিপ গাড়ি আর সর্বোপরি নিজের কাহিল অবস্থা। প্রতিটা মুহুর্তে পলাশের মনে হচ্ছিল এই বুঝি জিপটা রাস্তা ছেড়ে নেমে নিচের ঢালু জমিতে উলটে যাবে। আর প্রতিবারই ওকে ভুল প্রমাণিত করে লোকটা জিপটার স্টিয়ারিং ঠিক ঘুরিয়ে নিয়ে রাস্তায় চাকা রাখছিল। লোকটাকে হঠাৎ এক অমিত পরাক্রম দানব বলে মনে হতে থাকে পলাশের। বুঝতে পারে না, লোকটা মানুষ না কোন নররূপী পিশাচ। ইশ্বর-অবিশ্বাসী পলাশের মুখ থেকে হঠাৎ করেই অস্ফুটে “হা ইশ্বর, করুণা কর” গোছের একটা স্বগতোক্তি বেরিয়ে আসে। লোকটা কিন্তু এই প্রবল বৃষ্টি আর গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ ছাপিয়েও ঠিক শুনতে পেয়েছে। “কি বললেন? ইশ্বর? হা হা হা! আপানার ধারণা ইশ্বর নামক অলীক কেউ আপনাকে বাঁচাতে আসবে?” বুক ঢিপ ঢিপ করতে থাকে পলাশের! লোকটা শুনতে পেল কি করে? এক অদ্ভুত অসাড়তা গ্রাস করছে পলাশকে! কিছুক্ষণ গলা দিয়ে কোন শব্দই সে বার করতে পারল না। তারপর কোনরকমে গলায় জমা শ্লেষ্মা খাঁকড়ে প্রায় ছুঁড়ে দিল কথাগুলো – “ আ—আপনি কি করে শুনলেন? ইয়ে মানে আমি তো নিজের মনে বলছিলাম—“ “রীতিমত নাক ডেকে ঘুমোচ্ছিলেন মশাই। ঘুমোতে ঘুমোতে হঠাৎ অমন চেঁচিয়ে উঠলে এক মাইল দূর থেকেও লোকে শুনতে পাবে, আর আমি তো আপনার পাশের সিটে বসে গাড়ি চালাচ্ছি, তাই না?” লোকটা ঘুরে তাকাল। ঠিক এই সময় সামনের দিক থেকে আসা একটা লরির আলোয় পরিষ্কার দেখা গেল লোকটার মুখ-চোখ। পলাশ হাঁ হয়ে লক্ষ করল, এক, লোকটার চোখের দৃষ্টি হিম-শীতল। সে দৃষ্টিতে প্রাণের কোন ছাপ নেই। দুই, লোকটার ডান কানটা লতিটা মাঝখান থেকে কাটা। যেন কেউ কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছে।
পলাশ নিশ্চিত জানে, সে ঘুমোচ্ছিল না। তাহলে লোকটা অহেতুক মিথ্যে কথা বলল কেন? নাকি সে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিল? দুঃস্বপ্ন দেখছিল ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে? আচ্ছা, বিষ্ণুপুর তো এল না এখনও? প্রায় ঘন্টাখানেক হতে চলল এদিকে, অথচ বিষ্ণুপুরের নাম গন্ধ দেখা যাচ্ছে না? পলাশের জেদ বাড়ল। ও ঠান্ডা স্বরে বলে উঠল,” বিষ্ণুপুর তো এতক্ষণে এসে যাওয়ার কথা দাদা, এল না যে?” “আপনি ঘুমোচ্ছিলেন, সেই সময় পেরিয়ে এসেছি।“ নির্বিকার উত্তর লোকটার। “গাড়িটা থামান! আমায় এখানেই নামিয়ে দিন।“ ইস্পাতশীতল স্বরে বলে উঠল পলাশ। “ ধমকি দিচ্ছিস নাকি? য়্যাঁ?” লোকটা হিসহিস করে উঠল হঠাত, “শালা তোর চক্করে এখনো ভাল করে পেটে দানাপানি, মাল কোনটাই পড়েনি, বেশি চেঁচামিচি করলে এখানেই পুঁতে দিয়ে যাব!” পলাশ এই অকস্মাৎ আক্রমণে কি করে উঠবে ঠিক বুঝতে পারল না। কিছুক্ষণ সময় নিল। তারপর কিছুটা অনুরোধের সুরেই বলল, “ধমকি নয়। কিন্তু আমার পক্ষে আর বেশি দূর আপনার সঙ্গে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি এইখানেই নেমে যেতে চাই। আপনি যে উপকার করলেন তা ভোলার নয়। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, কিন্তু আমায় এইখানেই নামিয়ে দিলে ভাল হয়।“ ও কি! পলাশ চমকে লক্ষ্য করল, লোকটার হাতে ততক্ষণে একটা রিভলবার চলে এসেছে। “যখন বলেছি আমার বাড়িতে তোর শুশ্রুষা করব, তখন ব্যস! আর কোন কথা নয়। এর পর কথা বললে আর কথা নয়, দানা জবাব দেবে!” পলাশ বুঝল, এই পাগলের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই। আর তার পায়ের যা অবস্থা, তাতে ঝাঁপ দেওয়াও সম্ভব নয় তার পক্ষে। তাই চুপচাপ বসে রইল।

জয়পুরের জঙ্গলমহলের মাঝখান থেকে একটা কাঁচা রাস্তা ধরল জিপটা। এবড়ো খেবড়ো। পলাশ আশ্চর্য হয়ে দেখল, এই রাস্তাটা ঠিক সেই পাথরের রাস্তা, যে পাথরে লেগে তার পা থেঁতলে গিয়েছিল একটু আগে। আশ্চর্য! এই পাথর এখানে এল কোত্থেকে? পলাশের মনে পড়ল, সে কোথাও শুনেছিল যে ব্রিটিশ আমলে এই জঙ্গল ব্রিটিশদের এক গোপন ডেরা ছিল। হয় তো সেই সময় থেকেই এখানে পড়ে আছে। জঙ্গল বলে কেউ নজর করেনি, বা সরাবার প্রয়োজন মনে করে নি। ঝাঁকুনি খেতে খেতে আরো প্রায় দু-আড়াই কিলোমিটার পথ যাওয়ার পর একটা জ্যালজ্যালে পুরনো বাংলোর সামনে এসে দাঁড়াল জিপটা। পলাশ আশ্চর্য হয়ে দেখল, জিপটা ঢোকার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাংলোর দরজাটা খুলে গেছে। এক রমণীর অবয়ব দরজার সামনে দেখা যাচ্ছে। লোকটা জিপ থেকে নামতেই মহিলাটি সুরেলা গলায় বলে উঠল,” এসেছো? আজ এত দেরি হল?” “বৃষ্টিতে।“ কথা বলতে বলতে লোকটা প্রায় হিঁচড়ে টেনে নামাল পলাশকে। মহিলাটি পলাশকে দেখেই বলে উঠল, “ও মা! ইনি আবার কে গো?” “অতিথি। চোট খেয়েছে।“ লোকটার ছোট্ট জবাব। “ভালই হল। এই পোড়া জঙ্গলে তাও একজন মানুষ খুঁজে পেয়েছো। সাপ ব্যাং যে ধরে আনোনি সেই রক্ষে!” বড় আন্তরিক আর সুন্দর সুরেলা গলায় বলে উঠল সেই মহিলা। বসার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে পলাশ এক ঝলক দেখতে পেল মেয়েটিকে। দেখে লোকটির স্ত্রী বলেই মনে হচ্ছে। এমন কুৎসিত বাঁদরের এমন মোহময়ী সঙ্গিনী সচরাচর দেখা যায় না। পলাশ বুঝতে চেষ্টা করছিল এটা লোকটার ক্যারিশমা, নাকি সরকারি চাকরির বোনাস গিফট। এইবার ও যেন ঠিক ঠিক বুঝতে পারল লোকটির ওকে নিয়ে আসায় অনীহার কারণ।

মহিলাটিও হাত লাগিয়েছিল পলাশকে ধরতে। পলাশের ডান হাতটা রাখল নিজের কাঁধের অনাবৃত অংশে। ওই ক্ষুদ্র সময়টুকুর মধ্যেই পলাশ বুঝে গিয়েছিল, কিংবা মহিলাটি পলাশকে বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল, যে তার মধ্যে কি পরিমাণ যৌন আকুতি জমে রয়েছে। আরো একটি ব্যাপার পলাশ লক্ষ্য করল, যে সেই মহিলা, যার নাম সে পরে জেনেছিল তমালি, রীতিমত আধুনিকা এবং শরীরের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীলা। পলাশকে ধরে ধরে বসার ঘরের সোফাটায় নিয়ে যাওয়ার সময় যেন ইচ্ছে করেই তার বাঁ হাত দিয়ে একটু বেশী চেপে ধরেছিল তমালি ওকে। তমালীর বঁদিকের পুরুষ্টু স্তন বারবার ঘষা খাচ্ছিল পলাশের ডান পাঁজরের নিচের দিকটা। আর পলাশ ক্রমশ অবশ হতে থাকছিল। শক্ত হয়ে উঠেছিল ওর পুরুষাঙ্গ তখন। এসব, সেই লোকটার জানার কথা নয়।

সোফায় বসিয়েই সেই লোকটা হুকুম দিল,” তমালি, ওর মরম পট্টি করে খাবার দিয়ে দাও, ওকে ফের নামিয়ে দিয়ে আসব।“ এই বলে লোকটি ভেতরের ঘরে চলে গেল। বোধ হয় মদের বাকি রয়ে যাওয়া কোটা পূর্ণ করতে। ঘরে তখন পলাশ আর তমালি শুধু। খাবার তৈরী ছিল। তমালি ঘরের একটা কোণে রাখা টেবিল থেকে কিছু স্যান্ডউইচ আর ফ্রুট জ্যুসের ক্যান এনে সাজিয়ে দিল পলাশের সোফার সামনে রাখা ছোট টেবিলটায়। তারপর উঠে গিয়ে পাশের একটা কাঠের শো-কেস থেকে তুলো আর ডেটল বার করল। ওষুধ সাজিয়ে রেখে, শো-কেসের পাশের টেবিলে গরম জলের ইলেক্ট্রিক কেটলিতে জল গরম করতে করতে পলাশের দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল একবার। পলাশ স্যান্ডউইচে কামড় দিতে দিতে পেছন থেকে হাঁ করে মাপছিল তাকে। ফর্সা গায়ে হাল্কা নীল রঙ এর শাড়ি পরেছে তমালি। পলাশের মনে হল, তমালির অমন ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো দেখার জন্য আরো একশ বছর সে এই পোড়া জঙ্গলে পড়ে থাকতে পারে! অমন পুষ্ট নিতম্ব আর হেলে সাপের মত কোমরের ভাঁজে আগামী এক যুগ বিরামহীন ঘষে যেতে পারে সে নিজের নাক মুখ! তমালি ওর ওই অবস্থা দেখে ঠোঁট কামড়ে মুচকি হাসল যেন। তারপর চোখ বড় বড় করে ধমক দিয়ে ভেতরের দিকে চলে গেল। পলাশ প্রমাদ গুণল! তবে কি তার অনুমান মিথ্যে? মেয়েটি কি সত্যিই সে যা ভেবেছে তা নয়? ইস! বুঝতে পেরেছে হয় তো তার এই অসভ্য প্রগলভতা! হয় তো তার স্বামীকে ডেকে আনতে গেছে, হয় তো বা পলাশের উপস্থিতিকে ইতিমধ্যেই অনভিপ্রেত মনে করতে শুরু করেছে। পলাশের বুক ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করল। ছি ছি ছি! এরপর কি হবে কে জানে! কিন্তু কিছুই হল না। তমালি একটা খালি পাত্র হাতে নিয়ে ফেরত এল। ঘরে ঢুকে ভেতর দিকে যাবার দরজাটা ভেজিয়ে দিল। তারপর পাত্রে গরম জল নিয়ে তাতে পরিমাণ মত ডেটল ঢেলে এগিয়ে এল পলাশের দিকে হাতে তুলোর প্যাকেট আর অয়েনমেন্টের টিউবটা নিয়ে। “ ও নেশায় চুর হয়ে ঝিমোচ্ছে। এখন আর উঠবে না। কই দেখি আপনার পা টা?” এই বলে তমালি সোফার সামনে একটা ছোট টুল নিয়ে বসে পলাশের ক্ষত বিক্ষত পা খানা নিজের কোলে তুলে নিল। পলাশ ইঙ্গিতটা বুঝল। হিসেব মিলে যাওয়ায় আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করল ক্রমশ। নিচু টুলে আলগা হাঁটু ঠেলে বসার ফলে ফুলে উঠেছে তমালির স্তন দুটো। ঘোর লাগছিল পলাশের ক্ষুধার্ত চোখে। “এ বাবা! ইস! এ তো অনেকটা থেঁতলে গেছে! কীভাবে হল?” সম্বিত ফিরে পেয়ে চোখ সরাল পলাশ। বলতে শুরু করল তার সারাদিনের ঘটনা। তমালি ক্ষতে মরম পট্টি করতে থাকল। গল্প করতে করতে অসাবধানে কখন যেন তমালির বুক থেকে আঁচল পড়ে গেছে। পলাশ জানে সেটা তমালির অসাবধানতা নয়। গল্প করতে করতে আস্তে আস্তে তমালি পলাশের পাশে ঘন হতে থাকে। অমাবস্যার চাঁদ যখন মাঝ রাতে তার ঘোলাটে উপস্থিতির জানান দিল, দুটো অর্ধ-উলঙ্গ মানুষ ততক্ষনে পরম উল্লাসে পরস্পরের উষ্ণতায় ডুব দিয়েছে। দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অবৈধ উত্তেজনার চরমে যখন পলাশ, তখন তমালীর বড় বড় নখযুক্ত আঙুলগুলো পলাশের পিঠকে ছালাছালা করে কেটে বসে গেছে। সেই জ্বালা উপেক্ষা করেও যে মুহুর্তে পলাশ তমালির স্তনে মুখ ডুবিয়েছিল, ঠিক সেই সময় নিজের ডান কানে এক অমানুষিক যন্ত্রণা অনুভব করে ওঠে ও! সে যন্ত্রণার তীব্রতা এতটাই ছিল যে মুহুর্তে পলাশের মোহভঙ্গ ঘটল। ছটফটিয়ে ছাড়িয়ে নিতে চাইল সে নিজেকে। কিন্তু পারল না। তমালির অমন কোমল শরীরে যে এমন আসুরিক শক্তি লুকিয়ে আছে এমনটা সে আন্দাজ করে উঠতে পারে নি! বুঝে ওঠার আগেই চকিতে পলাশের গলাটা শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরল তমালীর দুটো হাত। সময় পেল না পলাশ। আরো অকেজো হয়ে পড়তে থাকল। দম বন্ধ হয়ে আসতে আসতে কোন মতে শেষ চেষ্টা করেছিল একবার। পারেনি। জ্ঞান হারাবার আগে শুধু তমালির জান্তব ফোঁস ফোঁসানির শব্দ শুনতে পেয়েছিল শেষবারের মতো।

*********

সমুদ্রবাঁধের ধারে একটা ডান কান কাটা লাশ ঘিরে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে গত দুদিন হল। এই বাঁধটা জয়পুরের জঙ্গলের থেকে মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে পড়ে। জলে ভিজে আরো ফুলে উঠেছে লাশটা। স্থানীয় পুলিশ কোন কূল কিনারা করতে না পারায় কলকাতা থেকে একটা দল তদন্ত করতে এসেছে এই অদ্ভুত ঘটনাটির। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান বলছে, কোন হিংস্র শ্বাপদের আক্রমণ মৃত্যুর কারণ। যেখানে লাশটা পড়ে ছিল, সেখানটা জরিপ করে সব সূত্রগুলো বুঝে নিয়ে রওনা দিতে দিতে প্রায় রাত দশটা হয়ে গেল ফটোগ্রাফার হীরেনের। হিরেন আপাতত বিষ্ণুপুরেই রাতে থাকবে। কালকেও আসতে হবে তাকে। ব্যাচেলর ও ডাকাবুকো হিরেন বাকি সব্বাই রওনা হওয়ার পর নিজের সুইফট গাড়িটা বনলতা রিসর্টের দিকে ঘুরিয়ে দিল। ওখানে এমু পাখির মাংস পাওয়া যায়। এই মুহুর্তে তার দরকার বেশ কিছুটা মদ আর মাংস। সারাদিন ধরে পচা গলা লাশের ছবি তুলে তার গা গুলোচ্ছে। অন্ধকার গ্রামের রাস্তায় কিছু তাল গাছের মরা পাতা জড়ো করে রাখা আছে। হিরেন বেপরোয়া তার ওপর দিয়েই চালিয়ে দিল। হঠাৎ একটা দড়াম ধাক্কা খেয়ে গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে গেল। ধাক্কার এতটাই জোর ছিল যে গাড়ির এয়ার ব্যাগ দুটোও খুলে গেছে। হীরেন কোনমতে গাড়ি থেকে নেমে দেখল কিছু মিশমিশে কালো রঙের পাথর পড়ে রয়েছে পাতার আড়ালে। বোধহয় বাচ্চারা ক্রিকেট বা গিট্টু খেলছিল ওইগুলো নিয়ে, সরায় নি। অন্ধকারে মিশে থাকায় বুঝতেও পারে নি হিরেন। পাথরগুলোও অদ্ভুত। এ তল্লাটের নয়। পুরনো কলকাতার ট্রামরাস্তার মত পাথর অনেকটা। এ তল্লাটে বেমানান। এ তল্লাট লাল মাটির। তাছাড়া সুরকি রাস্তায় এই পাথর থাকার কথা নয়। হয় তো এখানকার মোরামের সাথে আসেনি। রাস্তা হওয়ার সময় কেউ বাইরে থেকে ফেলে গেছে। এমনও হতে পারে যে কারুর অন্য প্রয়োজনে লেগেছিল এই পাথর। নিয়ে যাওয়ার সময় পড়ে গেছে গাড়ির ঝাঁকুনিতে।

হিরেনের গাড়িটার সামনের দিকটা বিশ্রী রকম দুমড়ে গেছে। রেডিয়েটর ফেটে গিয়ে সামনের রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সবুজ কুল্যান্ট। হিরেনের মনে হল একবার মোবাইলটা হাতে নেওয়া খুব দরকার, ইন্টারনেট ঘেঁটে কাছাকাছি যদি কোন অথরাইজড ডিলারের ফোন নাম্বার খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু এয়ার ব্যাগের কাপড় চোপড়ের মধ্যে ঝাঁকুনির সময় কোথায় যে মোবাইলটা পড়ে গেছে খুঁজে পেল না। কি করবে ভাবছে হিরেন, এমন সময় দূরে একটা হলদেটে জিপ গাড়ির আলো দেখা গেল। হিরেন হাতে চাঁদ পেল যেন। হাত দেখিয়ে থামাতে চাইল। ধীরে ধীরে গাড়িটা তার সামনে এসে দাঁড়াল। অন্ধকারে একটা বিশাল দেহি ছায়ামুর্তি নেমে এল তার থেকে। হিরেনের মুখে জোরাল এল ই ডি টর্চের আলো ফেলে জিজ্ঞেস করল,“কে ওখানে?”

ছবি শান্তনু ব্যানার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here