জলচিত্র

0

Last Updated on

অর্পিতা গোস্বামী চৌধুরী

টিপ টিপ বৃষ্টির বিরাম নেই। সারাদিন পর লাট্টু ফিরে এল যখন গ্রাম জুড়ে অন্ধকার। ঘরের ভেতর যে টিমটিমে বাতিগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে তার বিস্তার বড় কম। জ্বলজ্বলে আগুন আছে আলো নেই। এই তো সেদিন মেম্বার এসে বলে গেল আর কদিন সবুর কর, ঘরে ঘরে ইলেক্ট্রিক চলে আসবে। ভর্তুকি আছে, টাকাও বেশি লাগবে না। সবুর তো করেই আছে কবে থেকে। সারের দোকানের ম্যানেজার লাট্টু যখন দোকান বন্ধ করে ফেরে খালপারের ওপাশে ঝকঝকে আলো আর এপাশে আসতে আসতে অন্ধকার যেন ব্যঙ্গ হয়ে চেপে ধরে। আজ খালের জলটা বেশ বেড়েছে । ওনেকদিন আগে এটা একটা নদী ছিল আসলে। কেশাই নদী। ছোট বেলাতেও ভালোই জল থাকত ওতে। বর্ষাকালে সুপুরি গাছের ডাল বেঁধে ব্রিজ বানিয়ে পার হতে হত। অন্য সময় বাঁশ বা যা হোক কিছু থাকত। ইদানীং ঢালাই ব্রিজ হয়েছে কিন্তু জল নেই। ভাদ্র মাসে একটু খানি হাঁটু ভেজা জল হয় যদি, সারা বছর শুকনো মাটি। এখন আর কেউ কেশাই নদী বলে না। খালই বলে। বাড়িতে ঢুকে স্নান সেরে এলো ।

—-মা ছোট্টুর জ্বর কমল!

—- এখন একটু কম মনে হচ্ছে। ছোট্টুকে কোলে নিয়ে বসে আছে গীতা । দুদিন ধরে জ্বর।

দীপালি বারান্দায় উনুনে ডাল চরিয়েছে। এই বর্ষায় ওর খুব কষ্ট হয়। খড়িগুলো স্যাঁতস্যাঁত করে আগুন জ্বলতে চায় না। খালি ধোঁয়া আর ধোঁয়া। বারান্দার বসতেই ভাত বেড়ে দিল । বলল, খালের জল দেখেছ! নদী হয়ে গেছে একদম।

—-হ্যাঁ, দেখলাম তো, কোন দিন এত জল দেখিনি, সেই ছোটতেও না।

—–তুমি বলছিলে না এটা আগে নদী ছিল আর কি যেন নাম — গল্পটা বল না একবার।

বৃষ্টি ধরেছে তখন। ঘন কালো মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে আছে গোল পূর্ণিমার চাঁদ। সুন্দর মায়াময় জোছনা দীপালির মুখ জুড়ে। লাট্টু বলল, বান আসবে রে।

—–কেন? বান আসবে কেন! হয়তো নদীটা আবার আগের মতো —।

—–এমন জল আগে কখন দেখিনি, শুনলাম কুচবিহার জলপাইগুড়ি সব জায়গা জলে ঢুবে গেছে। এবার এদিকেও—। মেঘ আবার কখন ছেয়ে গেছে। চাঁদ আড়ালে। দীপালির মুখে কালো ছায়া নেমে এলো । খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল, লাট্টু উঠে পরল। ছোট্টু ঘুম ভেঙে আবার কাঁদছে। কাল খাল পারের ওষুধের দোকানটাতে নিয়ে যাবে।

একটা কোলাহল শোনা যাচ্ছে কিসের! কান পাতল লাট্টু। হ্যাঁ কোলাহলই বটে। ক্রমশ বাড়ছে ওটা। বাইরে বেরিয়ে এলো। আশেপাশের বাড়ি থেকেও বেড়িয়ে এসেছে পানু কাকা, রাজেন মিস্ত্রি, হরিদাস। পেছন পেছন মেয়ে বৌ-রা। বান আসছে! ওপারটা নিচু, ওদিকে আগে জল উঠেছে। মানে জল বাড়লে এদিকেও ভেসে যাবে আর জল নাকি বেড়েই চলেছে। চুর্ণির বাঁধ কি ভেঙে গেল! খালের ওপারের জনরব এপারেও সংক্রামিত হল দ্রুত। সকলে ব্যস্ত হয়ে পরল। ঘরের জিনিস পত্র যা ছিল, আলমারি, টিনের বাক্স চৌকি সবকিছুর তলে ইট দিয়ে যতটা পারা যায় উঁচু করা হল। রান্নার জিনিস পত্র চৌকির উপর। নতুন বাঁশের বেড়া দিয়েছিল কদিন আগেই লাট্টু। সেটা উপড়ে এনে আরও মজবুত করে দড়ি বেঁধে টিনের চালায় ঠেস দিয়ে রাখল। দরকারে যেন দীপালি এমনকি মা আর ছোট্টুকেও ছাদে তোলা যায়। একটা বড় প্লাস্টিক আছে ওর। সেটা বের করে রাখল হাতের কাছে , বৃষ্টি বাদলার দিন, ছাদে উঠতে হলে —-। এসব করতে করতে তখন মাঝ রাত্রি। বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। ছোট্টুর জ্বর বাড়ছে। দশ পনেরো মিনিট ঘুমচ্ছে কি ঘুমচ্ছে না, আবার কেঁদে উঠছে। কখনো দীপালি গিয়ে দুধ খাওয়াচ্ছে তো কখনো গীতা সরষার তেল মালিশ করে দিচ্ছে হাতে পায়ে গলায়।

—–কাল বড় ডাক্তার না দেখালেই নয়। স্বগতোক্তি করলো লাট্টু।

—- জলের তোড়ে যদি ব্রিজটা ভেঙে যায়!

বলেই নিজের মুখ চেপে ধরল দীপালি। — এ কি অলুক্ষুনে কথা বলে ফেললাম গো!

—- কিছুই বলা যায় না, সন্ধ্যাবেলায় যেমন পাগলা দেখে আসলাম খালের জল—- সত্যি যদি বাঁধ ভেঙে যায়—।

দুজনেই একসাথে তাকালো ছোট্টুর দিকে। —– ওকে হোমিওপ্যাথি ওষুটা খাইয়েছিলি?

—- কাল থেকে তো ওটাই খাইয়ে যাচ্ছি।

—— খাওয়ার জল ভরে রাখিস। কথা ঘোরাল লাট্টু। তারপর বলল, ছেলেটা ঘুমিয়েছে দেখছি। মা-ও ঘুমিয়ে পরেছে । পাশে তুইও ঘুমিয়ে নে একটু। তিনটা সারে তিনটা বাজে।

—— আর তুমি! তুমি কোথায় ঘুমবে ! ওই ঘরের চৌকিতে তো জিনিসপত্র স্তুত ।

—-আমি চালায় উঠব। বৃষ্টি কমে গেছে। গরমও লাগছে ।

—- না না তারচেয়ে তুমি শোও এখানে আর আমি মাটিতে।

—- যা বলছি শোন না। খুব গরম লাগছে, এখানে আমার ঘুম হবে না।

পানু কাকা বাইরে থেকে ডাক দিয়ে বলল, কিরে লাট্টু জিনিসপত্র গোছানো হল? লাট্টু দরজার কাছে এগিয়ে বলল এইতো হয়েই গেল প্রায়। আমাদের আর কটা জিনিস!

—- বাঁধের ব্যাপারে শুনেছিস নাকি কিছু!

—– কই না তো! কেন তুমি কিছু শুনেছ?

—– বিকালে শুনছিলাম কয়েক যায়গায় ফাটল ধরেছে। কি যে অবস্থা —-।

—- আমাদের গ্রামে তো টিভি দেখে জানার উপায় নেই। সন্ধ্যা বা বিকালে তো ওই পারা থেকে জেনে আসা যায় কিন্তু এতো রাতে—।

—– সেই তো! যা আরাম কর গিয়ে। ঘুম তো আর হবে না, যা হোক একটু শুয়ে নে। কি যে আছে কপালে। আবার সেই অভিশাপটার কথাও ভাবছি। তোর মা কই রে?

তাড়াতাড়ি লাট্টু বলে উঠল ঘুমচ্ছে, ঘুমিয়ে গেছে। যাও তুমিও একটু ঘুমিয়ে নাও।

পানু কাকা চলে যেতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল লাট্টু। বেশ বুঝতে পারছে গ্রামের বয়স্ক মানুষগুলোর মধ্যে একটা চাপা সংশয় কাজ করছে সমান্তরাল ভাবে। ও আর সেটাকে হাওয়া দিতে চায় না।

টিনেরচালে হাতের উপর মাথা দিয়ে শুলো লাট্টু। ক্লান্ত শরীরে ঘুম নেমে এসেছিল কিন্তু কিছুক্ষন পরই একটা আওয়াজে ভেঙে গেল। আবার মেঘের ফাঁক দিয়ে চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। দেখল দীপালি উঠে আসছে ছাদে। বলল, উঠনে জল ঢুকে গেছে। নিচ থেকে ডাকছিলাম—।

—— কি আর করার আছে!

দীপালি বসল পাশে। চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট।

লাট্টু বলল —কেশাই-এর গল্পটা শুনবি?

—- বল।

দীপালি নিরুৎসাহেই বলল কিছুটা। ওর মনে এখন জলের ভয়।

—– এই গ্রামে তখন রাজার শাসন। রাজার একটাই মাত্র মেয়ে ছিল, কেশমালা।

কেশমালা! এ কেমন নাম!

হ্যাঁ যেমন তার রূপ তেমন তার চুল। চুল নাকি মাটি ছুয়ে থাকতো। যাই হোক, তো সেই কন্যা পণ করেছিল, যে গ্রামে নদী আনবে তার সাথেই বিয়ে করবে সে। রাজবীর ছিল তেমনই সুপুরুষ। চুর্ণি নদী থেকে খাল কেটে নিয়ে এল এই নদী, ভগীরথ-এর মতো।

—– সেই থেকেই নাম কেশাই নদী!

—- তারপর আমাদের গ্রামে আর কোন অভাব থাকলো না। উপচে পরল সোনার ফসল। গোলায় যায়গা হত না। সুখ সমৃদ্ধি ধরে না যেন।

—– তারপর! কি যেন একটা অভিশাপের কথা শুনছিলাম!

—- অভিশাপ! কার কাছে শুনলি!

—– সকালে মা বলছিল, চুর্নির বাঁধ ভেঙে যদি বান আসে তো গ্রাম মুছে যাবে সেই জলে। অভিশাপ কখনো মিথ্যা হয় না।

আমি জিজ্ঞেস করলাম কিন্তু কিছুতেই মুখে আনলো না আর কিছু। আতঙ্কে বার বার শুধু কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করছিল।

—– গলায় কথা আঁটকে গেল লাট্টুর। ও আসলে সেই গল্পটা বলতে চায়নি দীপালিকে। আর এখন তো একেবারেই না। তবু দীপালি নাছোড়।

সুতরাং বলতেই হলো । সুখ কারো চিরকাল সয় না। ওই সেগুনের জঙ্গল আছে যে, সেখানে গজিয়ে উঠেছিলো এক ডাকাতের দল। একদিন ওরা হামলা করলো। সবার হাতে বিশাল বিশাল তলোয়ার। রাজার একটা ছোট্ট বাহিনী ছিল। ওদের অবশ্য সৈন্য না বলে পাহারাদার বললেই মানায় বেশি। তাদের নিয়ে রাজবীর প্রবল পরাক্রমে বাধা দিল ওদের। কিন্তু এত গুলো সসস্ত্র ডাকাতের সাথে বেশিক্ষণ পেরে উঠল না। এদের কাছে অস্ত্র বলতে লাঠি আর দু-চারটা বল্লম। তলোয়ার শুধু রাজবীরের হাতে। সেদিন যদি গ্রামের লোক একসাথে বেরিয়ে আসত তাহলে হয়তো—। ভীতু লোকগুলো দরজা বন্ধ করে বসে থাকল। নৃশংস ভাবে রাজবীরকে খুন করল ওরা। কেশমালার উপর অত্যাচার করল নির্বিচারে। রাজা বাধা দিতে গিয়ে খুব মার খেয়েছিল। তারপর ওরা চলে গেল একসময় । গ্রামের লোক একে একে বেরিয়ে এল। দেখল কেশমালা দুই হাতে রাজবীরের মৃত শরীর টেনে নিয়ে যাচ্ছে নদীর দিকে। গ্রামের লোক এগিয়ে গেল কিন্তু কেশমালা হাত তুলে থামিয়ে দিল সবাইকে। কিছু বলার প্রয়োজন ছিল না ওর। সেই বিধ্বংসী রূপ দেখে কেউ এগনোর সাহস পায়নি। আসলে নিজেদের বিবেক ওদের ওখানেই পুঁতে ফেলল যেন। সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য। মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া কেশমালার সেই এলোমেলো রক্তে ভেজা চুল আর রক্তাক্ত স্বামীকে টেনে নিয়ে যাওয়া। পেছনে পেছনে শুধু কোন মতে চলেছিল রাজা। রাজবীরকে টেনে নদীতে নামাল রাজকন্যা। তারপর নিজেও নেমে পরল। গলা জলে দাঁড়িয়ে ফিরে তাকাল। বলল, ছারখার হয়ে যাবে সব, এই নদীর বিধ্বংসী বানে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে জনপদ। তারপর তলিয়ে গেল ওরা। হঠাৎ করে যেন প্রাণ ফিরে পেল আতংকিত জনতা, আছড়ে পরল রাজার পায়ে। দোহাই রাজা, এই অভিশাপ থেকে আমাদের বাঁচান। বারবার আর্তনাদ করতে থাকল ওরা। রাজা তখন নদীতে হাঁটু সমান জলে দাঁড়িয়ে। ঘোর লাগা চোখে ঘরঘর করে কোনমতে বলল, এই গ্রামে একটা লোকেরও যেদিন সাহস হবে, খালি হাতে গোখরো সাপ এই জলে ডুবিয়ে মারার সেদিন এই পাপ খণ্ডন হবে আর অভিশাপ মুক্ত—। বলতে বলতে কাটা গাছের মত জলে মুখ থুবড়ে পরে আর সাথে সাথেই স্রোতের টানে ভেসে গিয়েছিল। কারো সৎকার হল না।

—– বিশ্বাস করো এই গল্প !

—- কি জানি! যে ভাবে শুনে এসেছি, সেভাবেই বললাম। শুনেছি তারপর অনেক সাধু তান্ত্রিক আসে, পূজা পাঠ হয় আর তারপর ওই চুর্ণি নদীর বাঁধ। বন্যা তো দূরে থাক চুর্ণি নদীই শুকিয়ে গেল প্রায় তো কেশাই আর বাঁচে কোথা থেকে! লোকে ভুলেই গেল, এমনকি নামটাও।

—- শুধু বয়স্করা ছাড়া।

মনে মনে আশ্বস্ত হল লাট্টু দীপালি অভিশাপের গল্পে ভয় পায়নি।

—– আজ পূর্নিমা তাই না!

ওরা দুজনেই তাকিয়ে থাকে শেষ রাতের ঝকঝকে চাঁদের দিকে। একটু একটু করে কালো মেঘ আশেপাশে ভীড় জমাচ্ছে । ছোট্টু উঠে গেছে, আবার কাঁদছে। ওরা নিচে নেমে এলো। এইটুকু সময়ে এতো জল! উঠন ছাপিয়ে বারান্দায় উঠে গেছে, ঘরেও ঢুকি ঢুকি করছে। গীতা ছোট্টুকে কোলে নিয়ে বসে আছে। বলল, জ্বর আবার বাড়ছে। লাট্টু বলল, চল দীপালি ওকে নিয়ে এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে যেতে হবে না হলে ব্রীজ ভেঙে গেলে—।

—- পাগোল হলি নাকি! ব্রীজ কি এখন আছে! তাছাড়া ওদিকে আরও জল। আট কিলোমিটার রাস্তা এই জল ঠেলে, আবার মাঝে নদী। সেও তো —। কিছুক্ষন চুপ করে থেকে যেন দম নিয়ে বলল, চুর্ণির বাঁধ ভেঙে গেছে।

শেষের কথাটা তবু কেমন ফিসফিস করে বেরিয়ে এলো। বৃদ্ধার মুখ সাদা হয়ে গেছে। দীপালির দিকে তাকিয়ে বলল, সকালেই বলছিলাম না, দেখ কত তাড়াতাড়ি জল বাড়ছে! নিশ্চয় বাঁধ ভেঙে গেছে। ওরা কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেল। বাইরে মুহুর্তে শুরু হয়েছে তুমুল ঝড় বৃষ্টি। হাওয়ার দাপটে লন্ঠন নিভু নিভু । চরাৎ চরাৎ শব্দে বাজ পরছে। প্রচণ্ড বিদ্যুতের আলোয় দেখতে পেল চৌকির এক কোণায় মাথা উঁচু করে বসে আছে একটা গোখরো সাপ। ছড়ান ফনায় স্পষ্ট মূর্তিমান আতঙ্ক। তিনজনেরই শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে হিমেল স্রোত। গীতা হঠাৎ ছট্টুকে নামিয়ে রেখে ঝড়ের গতিতে গিয়ে চেপে ধরল গোখরোর মাথা। পাগলের মতো আওরে চলল, তোকে আমি ডুবিয়ে মারব। বিশাল সাপটাও মুহূর্তে মরিয়া। পেঁচিয়ে ধরেছে গীতাকে। গীতা ডান হাতে চেপে ধরেছে ওটার গলা আর বাঁ হাতে চেপে ধরে লেজের দিকটা। কিন্তু লেজের দিকে ছাড়িয়ে নেয় সাপ নিজেকে। লাট্টু একটা লাঠি তুলে নেয় কিন্তু কোথায় মারবে কি ভাবে মারবে বুঝতে পারে না। দীপালি একটা বস্তা এনে বলে এতে ঢুকিয়ে দাও, এতে ঢুকিয়ে দাও। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত মাত্র। গীতা সাপটাকে নিয়ে নেমে পরে উঠনে। বলে একে ডুবিয়ে মারবো। বলেই দৌড়াতে থাকে নদীর দিকে। উঠনে কোমরের নিচে জল কিন্তু বাড়ি থেকে বেরতেই জলও বাড়তে থাকে। জল ঠেলে গীতা ছুটছে পেছনে লাট্টু। পাড়ার লোকেরাও বেরিয়ে এসেছে। গীতা হুমড়ি খেয়ে পরে বুক জলে পৌছে। তবু ছেড়ে দেয়নি গোখরোর মাথা। প্রচণ্ড বৃষ্টি, বিদ্যুতের চমকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে দুজনের তোলপার দৃশ্য। তারপর শান্ত হয়ে যায়। অতিরিক্ত শান্ত। কে কোথায় গেল! পাড়ার লোকেদের টর্চের আলোয় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। বৃষ্টি আরও জোরালো হয়ে উঠছে। জলও বাড়ছে পাল্লা দিয়ে।

চারিদিকে স্থির জলচিত্র। ঘরের ভেতর প্রায় এক মানুষ জল। ধানের ক্ষেত রাস্তা নদী মাঠ সব জলের তলে। চারিদিকে শুধু জল আর জল। চালার উপর সারাদিন বসে আছে দীপালী আর লাট্টু ছোট্টুকে কোলে নিয়ে। জ্বর এখন অনেকটা কম তাই ঘুমচ্ছে। ওদের মতো অনেকেই আশ্রয় নিয়েছে চালায়। অনেকে আবার আগেই বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে দূরে কোন উঁচু যায়গায়। ভাগ্যিস আর বৃষ্টি হয়নি আজ। কিন্তু গনগনে রোদ আর জলীয় বাষ্পের মিলমিশে দম বন্ধ হয়ে আসছে যেন। চালার উপর তোষক পেতে প্লাস্টিক টাঙিয়ে ওরা বসে আছে সারাদিন। জল আর বাড়েনি। বিকেলের দিকে এখন মনে হচ্ছে কমছেই বরং কিছুটা। সারাদিন পেটে কিছু পরল না ওদের। কাল রাতের ভয়ঙ্কর ঘটনা বারবার পুনরাবৃত্ত হচ্ছে যেন চোখের সামনে। মাঝে মাঝেই লাট্টু ঢুকরে কেঁদে উঠছে। কাল ওর কোন হুঁশই ছিলনা বলতে গেলে। পাড়ার লোকরাই ওদের জিনিসপত্র সহ ছাদে তুলে দিয়েছে।

এবার বাচ্চাটা আবার কান্না জুড়ল। দীপালি বলল আমাকে কিছু খেতেই হবে, ছোট্টুর জন্য। কিন্তু কোথায় খাওয়ার! পানীয় জলও প্রায় শেষ হতে চলল। দীপালি বলল মা হঠাৎ কেন যে এমন বোকামোটা করল! আমার তো মনে হয় না গল্পটা সত্যি। আর যদি সত্যিও হয় তো ওই বৃদ্ধ রাজা মরার সময় ঘোরে কি বলেছে সে বিশ্বাসে এতবছর পর মা—।

কে জানে কিন্তু আমার মা তো চলে গেল। মাকে তো আমি আর পাব না।

—– তোর মা বলিদান দিয়েছে রে লাট্টু। ওমন করে কাঁদিস না।

নিজেদের চালার উপর থেকে চিৎকার করে বলল পানু। কিন্তু এতে লাট্টুর কান্না থামল না উলটে আরও বেড়েই গেল।

সুর্য ডুবে যাচ্ছে পশ্চিম আকাশ লাল করে আর খিদের আগুন জ্বলে উঠেছে সকলের পেটেই ভীষণ ভাবে। একটা বোতলের তলানি জল বাঁচিয়ে রেখেছে ছোট্টুর জন্য। রাজেন মিস্ত্রি চিৎকার করে বলল, দেখলি তো তোদের সরকার খোজ নিচ্ছে একবারও। বাঁচলাম না মরলাম এত গুলো মানুষ! আসুক ব্যাটা ওই বজ্জাতগুলো ভোট চাইতে। আর মেম্বারটাকে তো দেখলেই সোজা প্যাঁদব আমি। খিদায় তেষ্টায় মরতে বসেছি আমরা।

সারারাত কি ভাবে যে কাটল কে জানে। সকালে চোখ বন্ধ করে শুয়েই ছিল। পেট মুচ়্ড়ে বমি চলে আসছে বারবার। কিসের একটা আওয়াজে তাকিয়ে দেখল গ্রামের ছেলেরা আসছে নৌকা চালিয়ে আর ওদের সাথে আরও কিছু অচেনা মানুষ। ওদের সবার মাথায় টুপি আর তাতে লেখা “ সমাজবন্ধু “ ওদের সঙ্গে রান্না করা খিচুড়ি, দুধ, জল, ওষুধ এমনকি জামাকাপড়ও। আনন্দে চোখে জল চলে এল দীপালির। মানুষ দাঁড়িয়েছে মানুষের পাশে। তবে সত্যি শাপমোচন হয়েছে এই গ্রামের!!

ছবি : দেবরাজ লাহিড়ী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here