ঝিলিমিলি

0

Last Updated on

প্রবীর চক্রবর্তী

লক্ষ্মীপুজোর ঠিক আগের দিন দুপুরে মৌমিতার প্রবল জ্বর এল।

সঙ্গে মাথা, হাত-পায়ে অসহ্য ব্যথা। একবার বমি করে বেশ কাহিল হয়ে পড়ল।

সুবর্ণ উদ্‌বিগ্ন হল। হওয়ারই কথা। বাড়িতে পুজোর সব আয়োজন সারা হয়ে গেছে।

সকালে মৌমিতার করা লিস্ট মিলিয়ে দোকান-বাজার সেরে ফেলেছে। দুধ, ফলের

অর্ডার দিয়েছে। মৌমিতা পুরোহিতকে বিকেল-বিকেল পুজো করে দিতে বলেছে। এখন ও

পড়ে থাকলে এতকিছু সামলাবে কে!

‘পুজো ক্যান্‌সেল্‌ করে দাও।’ সুবর্ণ বলল।

‘ কী যে বলো! এ বাড়িতে কোনোবার পুজো বন্ধ থেকেছে! এবারেও হবে।’

‘তুমি এই অবস্থায় কী করে করবে?’

‘দেখবে কাল সুস্থ হয়ে যাব। মায়ের পুজো, মা-ই আমাকে দিয়ে করিয়ে নেবে।’

‘হলেই ভালো। বিকেলে অসিতের চেম্বারে নিয়ে যাব।’

‘আমার এখন ডাক্তারের চেম্বারে তিনঘণ্টা লাইন দিয়ে বসে থাকার সময় নেই।

একগাদা কাজ পড়ে আছে। সব গুছিয়ে রেখে আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ব।’

‘মানে? ডাক্তারও দেখাবে না?’

‘অত ভেবো না। এসব ইনফ্লুয়েনজা জ্বর। প্যারাসিটামল খেলেই ঠিক হয়ে যাব।’

সুবর্ণ চুপ করে গেল। বলে লাভ নেই। এই বাড়িতে কর্ত্রীর ইচ্ছেয় কর্ম হয়।

মৌমিতা পুজো বেশ বড়ো কোরে করে। ফল-প্রসাদের সঙ্গে ভোগ রান্না

হয়- খিচুড়ি, বেগুনভাজা, ঘাঁট-তরকারি, চাটনি, পায়েস। রান্নায় ওর সুনাম

আছে। ওর হাতে পুজোর প্রসাদ খেতে অনেকে উৎসুক হয়ে থাকে। আগে বাড়ি বাড়ি

গিয়ে নেমন্তন্ন করে আসত। পুজোর দিন উৎসবের চেহারা নিত বাড়িটা। এখন বয়সের

দরুন অত পারে না। তবে বাড়িতে লোকজন আসার বিরাম থাকে না। ঘনিষ্ঠরা ছাড়াও

রিকশাওয়ালা, ঠ্যালাওয়ালা, মুটে, মজুর- ‘বউদি’, ‘বউদি’ করে কত মানুষ যে

আসে। সুবর্ণ বেশিরভাগকেই চেনে না। আপ্যায়ন করে বসিয়ে খাওয়ায়। সুবর্ণ গজগজ

করে- ‘এদের ঘরের ভেতরে নিয়ে আসার কী দরকার! হাতে হাতে প্রসাদ দিয়ে বিদায়

কর না কেন!’

মৌমিতা হেসে বলে, ‘ওরা আনন্দ করে খায়, এটাই আমার তৃপ্তি।’

সুবর্ণ মনে মনে বলে, ‘তোমার তৃপ্তিতে আমার অতৃপ্তি। খরচ ছাড়াও বাড়ি

লন্ডভন্ড হয়, মিটতে মিটতে মাঝরাত হয়। আজেবাজে লোকগুলোর জন্যে ঘুমের

বারোটা বাজে।

মৌমিতা সন্ধেবেলায় কিছুক্ষণ কাজ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। সুবর্ণ

কাছে যেতে ক্লান্ত গলায় বলল, ‘বড্ড দুর্বল লাগছে। ভাবছি এবার শুধু

ফল-প্রসাদ দিয়ে পুজো দেব। অত রান্না করতে বোধহয় পারব না। সবই আমার কপাল।

তোমার খাবার রান্নাঘরে ঢেকে রেখেছি, খেয়ে নিয়ো।’

‘সেকী! তুমি খাবে না?’

‘একদম খিদে নেই। কিচ্ছু খাব না।’ দু-দিকে ঘাড় নাড়ল কয়েকবার।

পরদিন সকালে পুজো করা দূরের কথা, মৌমিতা বিছানা থেকে ওঠার

ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল। সুবর্ণ ভয় পেয়ে গেল। সে একা কী করে সবদিক সামলাবে!

মেয়ে-জামাই ইউরোপে বেড়াতে গেছে, ফিরতে এখনও এক সপ্তাহ দেরি আছে।

কলিংবেল বাজল। দুধওয়ালা একগাদা দুধের প্যাকেট নিয়ে এসেছে। মৌমিতা পায়েস

রান্নার জন্য অর্ডার দিয়েছিল।

‘পুজো হচ্ছে না। বউদির খুব অসুখ।’

‘আমি এখন প্যাকেটগুলো নিয়ে কী করব?’ ঝাঁঝালো গলায় বলল।

সুবর্ণর মাথা গরম হয়ে গেল। এই লোকটা অনেকবার এই বাড়িতে পাত পেড়ে খেয়ে

গেছে। কিন্তু কিছু বলার আগেই মৌমিতার আওয়াজ পেয়ে তাড়াতাড়ি ঘরে গেল।

মৌমিতা ধুঁকতে ধুঁকতে বলল, ‘দুধগুলো ফ্রিজে রেখে দাও। গরিব মানুষ, ওর

লোকসান হয়ে যাবে অনেক।’

ফুলওয়ালাও অর্ডারের মাল নিয়ে হাজির হল। সুবর্ণ দরজা আগলে দাঁড়িয়ে বলল,

‘বউদি অসুস্থ। এবার পুজো করবে না।’ লোকটা ফুল-মালা হাতে দাঁড়িয়েই আছে

দেখে ধমকের সুরে বলল, ‘দাঁড়িয়ে আছ কেন? বলছি না—-

ও খেঁকিয়ে উঠল, ‘এগুলোর তাহলে কী হবে? আমি গলায় পরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াব?’

এবারও মৌমিতার কথায় নিয়ে নিতে হল।

সুবর্ণ অনেক অনুরোধে অসিত-ডাক্তারকে বাড়িতে আসতে রাজি করিয়ে পুরোহিতকে

ফোন করল। আসতে মানা করে দিল।

পুরোহিত রুক্ষভাবে বলল, ‘আপনাদের বাড়িতে ওই সময়ে যেতে হবে বলে তিনটে বাড়ি

ছেড়ে দিয়েছি। অনেক লোকসান হল আমার।’

‘কত লোকসান হচ্ছে হিসেব করে আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাবেন।’ রেগে দুম

করে ফোন বন্ধ করে দিল। এই পুরোহিতটার মেয়ের বিয়েতে মৌমিতার অনুরোধে

সুবর্ণ সাহায্য করেছিল। সুবর্ণ জানে ও গোপনে অনেককে বিপদে-আপদে সাহায্য

করে। বেইমান লোকগুলো এখন একবার জানতে অবধি চায় না বউদির কী হয়েছে, কেমন

আছে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে মৌমিতাকে বলল, ‘এবার মানুষ চিনতে শেখো। কতবার

তোমাকে সাবধান করেছি।’ মৌমিতার কথা বলার ক্ষমতা নেই। মুখে সামান্য হাসির

রেখা ফুটে উঠল। ওটা তার কথা সমর্থন করে, না অন্যান্যবারের মতোই উড়িয়ে

দিতে, বুঝতে পারল না।

ডাক্তারবাবু দেখেই বললেন, ‘এ্যাখুনি ভরতি করে দিন।’

সুবর্ণর মাথা টলে উঠল- ‘ডাক্তারবাবু! সিরিয়াস কিছু—-

‘আমি হেমার্‌হেজিক ডেঙ্গুর কথা ভাবছি। এখন এদিকে খুব ডেঙ্গু হচ্ছে। আপনি

তাড়াতাড়ি ভরতির ব্যবস্থা করুন।’

‘কিন্তু—

‘কোনো কিন্তু নয়। একদম দেরি করবেন না। মনে রাখবেন এই পেশেন্ট বেশি সময় দেবে না।’

নার্সিংহোমের ডাক্তারবাবু গম্ভীরমুখে জানালেন পেশেন্ট শকে চলে

গেছে, এ্যাখুনি কয়েক বোতল রক্ত দিতে হবে।

সুবর্ণ ভেঙে পড়ল- ‘যা করার করুন ডাক্তারবাবু! ওকে বাঁচাতেই হবে।’

‘নিশ্চয়ই করব। তবে রক্ত আপনাকেই জোগাড় করতে হবে। আমাদের ব্লাড-ব্যাঙ্কে রক্ত নেই।’

‘এসব কী বলছেন? এতবড়ো নার্সিংহোমে—-

‘কী করব বলুন! মানুষ রক্ত দেবে তবে তো থাকবে। রক্ত তৈরি করা যায় না।

আপনার কিন্তু কলকাতা থেকে নিয়ে আসার সময় নেই। অত দেরি করা যাবে না। লোকাল

ডোনর চাই। ‘বি-পজিটিভ’ কমন গ্রুপ, সেদিক দিয়ে অসুবিধে হবে বলে মনে হয়

না।’

মৌমিতা নির্জীবের মতো নার্সিংহোমের বেডে শুয়ে আছে। হাতে স্যালাইনের ছুঁচ,

নাকে অক্সিজেনের নল। সুবর্ণ চোখে অন্ধকার দেখল। সে কী করে ডোনর জোগাড়

করবে! আত্মীয়-স্বজন কেউ পাশে নেই, তার তেমন বন্ধুবান্ধবও নেই। বাইরে হইচই

হচ্ছিল। ডাক্তারবাবু বললেন, ‘সিস্টার! দেখুনতো! চ্যাঁচামেচি কীসের! আবার

কী ঝামেলা শুরু হল কে জানে!’

কী করে যেন জেলাশহরটায় বিদ্যুদ্বেগে ছড়িয়ে পড়েছে, মৌমিতা-বউদিকে রক্ত না

দিলে বাঁচানো যাবে না। ওরা রক্ত দিতে এসেছে। ছোটোখাটো ভিড় তৈরি হয়ে গেছে।

সুবর্ণ ভিড়ের মধ্যে দুধওয়ালা, ফুলওয়ালাকেও দেখতে পেল।

‘ডাক্তারবাবু! আমার রক্ত আগে নিন। মাকে বাঁচাতেই হবে। মা আমার সাক্ষাৎ

লক্ষ্মী। তখন পাশে না দাঁড়ালে মেয়েটার বিয়ে হত না।’ বৃদ্ধ পুরোহিত ভিড়

ঠেলে সামনে এগিয়ে এল।

ছবি: দেবরাজ লাহিড়ী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here