হোক সঙ্গম

0

Last Updated on

(রম্য গল্প)

প্রবীর মজুমদার

হরসিতবাবু চেম্বারে বসে বারেবারে ঘড়ি দেখছেন। সাড়ে সাতটা বেজে গেছে, অথচ ছোকরাটার পাত্তা নেই। কী ব্যাপার আসবে না না কি? কী যেন নাম বলেছিল? হ্যাঁ মনে পড়েছে! শ্রীদাম। শ্রীদাম মল্লিক। তা সেই শ্রীদাম তার কথার দাম রাখবে তো? চিন্তিত হয়ে ওঠেন হরসিতবাবু।

হরসিতবাবু আদাজল খেয়ে আদালতে পড়ে আছেন নয় নয় করেও অন্ততঃ বছর পঁচিশ। মানুষ চেনার চোখ তাঁর আছে। শ্রীদামকে একপলক দেখেই তিনি বুঝেছিলেন বেচারা নেহাত আনকোরা, নাচার হয়েই আদালত চত্তরে পা রেখেছে। এখন উকিলের কিল খেয়ে শুধু দেহ রাখার অপেক্ষা! এক চুমুকে চায়ের ভাঁড় শেষ করে সেটা ডাস্টবিনে ফেলেই তিনি ছোকরাকে পাকড়াও করতে ছুটলেন। পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বীরা ছোঁকছোঁক করছে, তাদের চোখ পড়ার আগেই ছোকরাকে বাগাতে হবে, বাগিয়ে নিজের কাছে রাখতে হবে। এই বাজারে মক্কেল ধরা চাট্টিখানি নয়, যথেষ্ট আক্কেল লাগে। বেআক্কেল হলে উকিল হিসেবে টিকে থাকাই মুস্কিল। কিলবিল করছে শামলা পরা মামলা প্রত্যাশী ল-ইয়ারেরা পুরো আদালত জুড়েই। নতুন মক্কেল পেলে সংগে সংগে ইয়ার বানিয়ে নিতে হয়, এটাই এখানকার দস্তুর। দস্তুরমতো পাকাপোক্ত ব্যবস্থা। একবার ইয়ার বানিয়ে নিতে পারলে তারপর চলুক না মামলা ইয়ারের পর ইয়ার মেগা সিরিয়ালের মতন! ইয়ার যত গড়াবে পকেটেও আসতে থাকবে আক্কেল সেলামী, হাসতে হাসতেই আসতে থাকবে মক্কেলের পকেট থেকে। তাই লেট করা চলে না– জলদি জলদি ছোকরাটাকে পাকড়াও করতে হবে। এই ছোকরাই যে একটা সময় শাঁসালো মক্কেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে না তার নিশ্চয়তা নেই।

কিন্তু যেখানেই বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। ওদিক থেকে এগিয়ে আসছে বিমান মোক্তার। ব্যাটা বড়ই ধড়িবাজ। কাজ– মক্কেল ধরে বড় উকিলদের কাছে বিক্রি করা। কিন্তু বিমান মোক্তার যদি হয় বুনো ওল তাহলে হরসিত উকিলও বাঘা তেঁতুল। মক্কেল তুলবার কায়দা তাঁরও জানা আছে। বিমান মোক্তার ছোকরাকে হাতাবার আগেই হরসিতবাবু ছোকরার হাত ধরে ফেলেন। একগাল হেসে বলেন, ‘কী হে নির্মল? কেমন আছ বল।’

মক্কেলের উপর গোত্তা খেয়ে পড়বার আগেই বিমান মোক্তার গন্তব্য পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। মনে মনে হাসেন হরসিত উকিল। ব্যাটাকে আচ্ছা মতন ভড়কি দেওয়া গেছে।

ছোকরা হাত ছাড়াবার চেষ্টা করতে করতে কাচুমাচু মুখে বলে, ‘আমি নির্মল নই।’
এবার অবাক হবার ভান করে ভ্রু কুঁচকে হরসিতবাবু ছোকরার দিকে তাকিয়ে সবাক হন, ‘নিশ্চয়ই তুমি নির্মল, পরিচ্ছন্ন, খাসা আনকোরা একদম। এই কোর্টে আগে মোটেও তোমাকে দেখিনি। কী ঠিক বলছি কি না?’
‘না, আমি নির্মল নই। আমার নাম শ্রীদাম মল্লিক।’ ছোকরা হাত ছাড়াবার প্রয়াস জারি রেখে একরকম হুকুমই জারি করে বসে, ‘হাতটা ছাড়ুন।’

হরসিতবাবু হাত ছেড়ে নাকের উপর চশমা চড়িয়ে বলেন, ‘হ্যাঁ, বাস্তবিকই তুমি নির্মল নও। তবু পরিচ্ছন্ন, পরিপাটি খাসা ছেলে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তা হঠাৎ কোর্টে কী মনে করে? এফিডেভিট না ভাইভোর্স মামলা?’

‘ডাইভোর্স? নন- না।’ আঁতকে ওঠে শ্রীদাম। তার প্রতি উকিলবাবুর মনযোগকে দাম না দিয়ে সে পারে না। উকিলবাবুটিকে যথেষ্ট দমদার বলেই মনে হয় তার। অন্তত সহজে দমবার পাত্র যে তিনি নন, তা পরিস্কার বুঝতে পারে শ্রীদাম। সে বলে, ‘খুব সমস্যায় পড়েছি। আইন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ বিশেষভাবে দরকার। আমি হরসিত পালুইবাবুকে খুঁজছি।’

নিশ্চিন্ত হন হরসিতবাবু। একগাল হেসে বলেন, ‘তুমি একেবারে সঠিক জায়গায় এসে পড়েছ। আমিই উকিল হরসিত পালুই। তোমার সমস্যাটা কী বলো একবার, তারপর দেখ কী ভাবে তুড়ি মেরে সমস্যা সমাধান করি।’

হরসিত উকিলের খপ্পর থেকে নিস্তার পাওয়া চাট্টিখানি নয়। তিনি খপ করে শ্রীদামের হাত হস্তগত করে টানতে টানতে বটতলায় নিয়ে আসেন। শান বাঁধানো বেদিতে শ্রীদামকে বসিয়ে জিজ্ঞেস করেন অমায়িকভাবে, ‘বলো, কী সমস্যা তোমার? সব খুলে বলো। উকিল আর ডাক্তারের কাছে কিচ্ছু গোপন করতে নেই, তা জান তো?’

শ্রীদাম এদিক ওদিক চাইতে থাকে। সহসা মুখ খুলতে চায় না। চারপাশে এত লোক, এদের কান বাঁচিয়ে কিছু কী বলা যাবে? কথাটা পাঁচ কান হলে মুস্কিল। দিনদিন ধার্মিক লোকেরা যেমন অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে, তাতে কাউকে আপন ভেবে গোপন কথা জানাতে গেলেও পাঁচ বার ভাবতে হয়। শ্রীদামের মনে হয়, তার পণের কথা জানবার জন্যে এই বটতলার অনেকেই যেন উৎকর্ণ হয়ে আছে। প্রমাদ গোনে শ্রীদাম। মনে মনে সংকীর্ণ হয়ে বলে, ‘ইয়ে, মানে বলছিলাম কী, এত ভীড়ের মধ্যে কী আর আলোচনা করা যায়? আপনার সংগে একটু একান্তে কথা বলা যায় না?’

হরসিতবাবু অভয় দিয়ে বলেন, ‘এখানে সবাই খুব ব্যস্ত বুঝলে হে? নিজের নিজের সমস্যায় ব্যতিব্যস্ত প্রত্যেকেই। অন্যের ব্যাপারে নাক গলানোর সময় এখানে কারই-বা আছে? তুমি নিশ্চিন্তে ঝেড়ে কাশতে পারো।’

অন্যের ব্যপারে নাক গলানোর লোকের অভাব হলেও কান গলানোর লোকের অভাব কী? অনেক কান আর অনেক মুখ মিলে মিশেই তো গুজব রটায়। আজব ব্যাপার হল গুজব রটাতে বেশি সময়ও লাগে না। আর একবার গুজব রটলে অনেক ভয়ংকর ঘটনাই ঘটতে পারে। সেক্ষেত্রে গরুর মাংস রাখার অপরাধে গণ-ধোলাই খেয়ে খুন হওয়াও বিচিত্র নয়। আবার ধর্ম অবমাননার অভিযোগে স্বয়ং হেডমাস্টারকেও কান ধরে ওঠ বস করতে বাধ্য হতে হয় মসজিদের মাইক থেকে ধর্মান্ধদের কানে গুঁজে দেওয়া ঐ গুজবের কারণেই। তাই শ্রীদামের শংকা কাটতে চায় না। বুদ্ধি করে বলে, ‘আপনার চেম্বার কোথায়?’

হরসিতবাবু বলেন, ‘আমি তো চেম্বার নিয়ে ঘুরি না ভাই। প্রয়োজনই পড়ে না চেম্বার নিয়ে ঘুরবার।’

‘আহা, আমি সেই চেম্বারের কথা বলছি না। বলছি, আপনি বসেন কোথায়?’

‘ধুর! ওকে চেম্বার বলে না কি! ওকে বলে সেরেস্তা। হাতে কেস না থাকলে, এই বটতলাতেই আমাকে পেয়ে যাবে। বারো মাস। আমি এই কোর্ট সেই কোর্ট ছুটোছুটি করে বেড়াই না। বুঝেছ?’

‘বুঝেছি। আসলে আপনার সাথে গোপনে কিছু আলোচনা করতে চাই। আপনার থেকে পরামর্শ নিতে চাই। আপনার চেম্বারে গিয়ে একান্তে কথা বলতে পারলে সুবিধা হয়।’

‘বেশ তো, আমার বাড়িতে আস না! আজই আসতে পারো। সন্ধ্যে নাগাদ চলে এসো, বেশি দেরি কোরো না যেন!’

এই হল সলতে পাকানোর শুরু। আশার সলতে। মামলা বাগিয়ে ব্যবসা চাগাবার সলতে। পসার না থাকলে আইন ব্যবসা অসার। হরসিত উকিলের পসার নেই তো কী হয়েছে? ওকালতি করেই তিনি সংসার নামক বৃক্ষটির গোড়ায় সার জোগাচ্ছেন।

পৌনে আটটা নাগাদ কলিংবেল বাজল। হরসিত উকিল লাফিয়ে উঠলেন। খান কতক ফাইল টেবিলের উপর ছড়িয়ে নিলেন। তিনি যে উকিল হিসেবে কতটা ব্যস্ত মক্কেলকে সেটা বোঝানোর জন্যেই যে এই ভনিতা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হরসিত উকিল একখানা ফাইল সামনে খুলে নাকের উপর চশমা এঁটে গলাটাকে গম্ভীর করে বললেন, ‘ইয়েস, কাম ইন। দরজা খোলাই আছে।’

বাস্তবিকই দরজায় হুড়কো লাগানো ছিল না। ভেজানো ছিল। দরজা ঠেলে শ্রীমান শ্রীদাম চন্দ্র ঘরে ঢুকল, যেন ভেজা বেড়ালটি। দেরি করে আসায় যেন অপরাধবোধে জর্জরিত হচ্ছিল সে। পথের কোথায় কোথায় ট্রাফিক জ্যাম ছিল তারই ফিরিস্তি দিতে থাকে ম্লান বদনে। শ্রীদাম আদৌ আসবে কি না, কথার দাম আদৌ রাখবে কি না, পাখি আদৌ ধরা দেবে কি না, এই ভেবে হরসিত উকিল এতক্ষণ যথেষ্ট উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি জানেন, রাস্তাঘাটে চলা ফেরায় নানা রকম বাধা বিগ্ন আসে, তার জন্যে অযথা সময়ও নষ্ট হয়, তবু তিনি মক্কেলের কাছে নিজের দাম বাড়ানোর উদ্দ্যেশ্যে বললেন, ‘টাইম ইজ টাইড ওয়েট ফর নান।’

শ্রীদাম কিঞ্চিৎ লজ্জিত হয়ে বলে, ‘ঠিকই বলেছেন স্যার। সময়ের দাম দিতে হয়, নইলে জীবন অন্ধকার। যে সময় চলে যায় তাকে চিৎকার করে ডাকলেও ফিরে আসে না। তবে টাইম এণ্ড টাইডের ব্যাপারটা যে বলেছিল, সে যদি পরে আরেকটা লাইন জুড়ত বেশ হতো।’

‘কী রকম?’ আগ্রহ দমন করতে পারেন না হরসিত উকিল। ভ্রু কুঁচকে তাকান।

শ্রীদাম মুচকি হেসে বলে, ‘টাইম এন্ড টাইড ওয়েট ফর নান। বাট, ট্রাফিক জ্যাম ওয়েটস ফর এভরিওয়ান।’

‘ব্রেভো! ব্রেভো! তুমি তো কবি হে! তাও আবার ইংরিজি কবি। যেন মাইকেল মধুসূদন।’ হরসিত উকিলের মুখ থেকে প্রশংসা ঝরে পড়ে, তেল প্রয়োগে আঁতেল মক্কেলকে খুশি রাখার প্রচেষ্টাতেই বোধহয়!

কবিত্বের দাম পেয়ে শ্রীদামের শ্রীমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

খোলা ফাইলটাকে বন্ধ করে, হরসিত উকিল এবার আরাম করে চেয়ারে গা এলিয়ে দেন। সহাস্যে বলেন, ‘এবার বলো, তোমার সমস্যাটা কী?’

শ্রীদাম মুখ খুলতে গিয়েও পেরে ওঠে না। সন্দিগ্ধভাবে চারিদিক একবার দেখে নেয়।
‘কেউ আড়ি পাতছে না হে। গোপন কথাটি রহিবে গোপনে।’ হরসিত উকিল রবীন্দ্র গানের সুরে সুরে গুনগুনিয়ে উঠে শেষের কথাটা ছাড়েন।

‘আসলে হয়েছে কী–‘ আমতা আমতা করে বলে শ্রীদাম, ‘আমি বিয়ে করতে চাই।’

‘অ্যাঁ? বিয়ে করবে? কাকে?’ হরসিতবাবু আঁতকে উঠলেন। আঁতকে উঠে বিষম খেলেন। বিষম খাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। শ্রীদামকে সহজ সরল বলে মনে হয় না আর। যাকে তিনি মক্কেল হিসেবে বরণ করতে চাইছেন সে জামাই হবার পণ করে তাঁর কাছে এসেছে না কি? সহসা এই ভাবনার উদয় হয় হরসিতবাবুর মগজে।
হরসিতবাবুর এক মেয়ে। নাম নীলোৎপলা। ইংরাজি অনার্স নিয়ে গ্রাজুয়েশন করছে। এখন ফার্স্ট ইয়ার। তাকেই এই হতভাগা বিয়ে করতে চায় না কি?

‘আজ্ঞে, আমি বেসরকারি একটা সংস্থায় চাকরি করি। খুব তাড়াতাড়িই দূরে কোথাও আমার পোস্টিং হয়ে যাবে। এই অবস্থায় ও খুব চাপ দিচ্ছে। বলছে বিয়ে না করে আমি যদি চলে যাই আর ওর বাবা-মা যদি অন্য কারো সংগে ওর বিয়ে দিয়ে দেয়, তাহলে ও সুইসাইড করবে।’

‘সর্বনাশ! বড়ই মর্মান্তিক।’

‘মর্মান্তিক বলে মর্মান্তিক? মরমে মরমে মরে যাচ্ছি স্যার। তাই উপায়ন্তর না পেয়ে আপনার শরণাগত হলাম। আপনিই ভরসা।’

বেশি ভনিতা পছন্দ হল না হরসিতবাবুর। বিরক্তি চেপে বললেন, ‘পাত্রীটা কে? একটু ঝেড়ে কাশো তো!’

‘হয়েছে কী স্যার–‘ শ্রীদাম সরাসরি উত্তরে আসে না, দক্ষিণে থাকতেই পছন্দ করে সে, ভূমিকাতেই প্রদক্ষিণ করতে থাকে, ‘আপনি যদি এই বিয়ের ব্যবস্থা না করেন তাহলে দুটো প্রাণ সংকটে পড়ে যাবে স্যার। ও যদি সুইসাইড করে তাহলে আমিও বাঁচব না।’

‘মেয়েটা কে তা বলবে তো!’

‘ইয়ে– মানে ওর নাম নীলা, নীলো–‘

‘ব্যাস ব্যাস– তুমি তো আচ্ছা বেহায়া–‘ রাগে ফেটে পড়েন হরসিতবাবু, ‘বেয়াদপও বলা যায় তোমাকে। নিজেই নিজের বিয়ের তদ্বির করতে এসেছ? তোমার গার্জিয়ান এসে বললেও একটা কথা হত।’

‘গার্জিয়ান?’ হরসিতবাবুর গর্জনে যথেষ্ট ঘাবড়ে যায় শ্রীদাম। ঢোক গিলে বলে, ‘আবার গার্জিয়ান কেন? আমার বাবা-মা, কাকা-জ্যাঠা কেউ এই বিয়ে মেনে নেবে না।’

‘তা হলে আমিই-বা কেন মেনে নেব?’ হরসিতবাবু বলেন, ‘দেখো বাপু আমার মেয়ের এখনও বিয়ের সময় হয়নি। তুমি আসতে পারো।’

‘আ্যা? আপনার মেয়ে? ন-ন না। আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই না। নীলা কি একমাত্র আপনার মেয়েরই নাম? আর কেউ কি থাকতে নেই?’

খুব বড় একটা বোঝা যেন নেমে গেল হরসিতবাবুর উপর থেকে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘ও– তাই বলো! তোমাদের বিয়েতে পরিবারের লোকেরা অরাজি, তাই তো? তাহলে তোমরা কোর্ট ম্যারেজ করছ না কেন? কিংবা, কালিঘাটে গিয়ে–‘

‘সেই চেষ্টা কি আর করিনি? ম্যারেজ রেজিস্ট্রার, পুরুত ঠাকুর– সবাই ভাগিয়ে দিল।’

‘কেন কেন? পাত্রীর বয়স কি আঠেরর কম?’

‘না তা নয়। আঠেরর বেশিই। সমস্যাটা অন্য।’ এইবার আবার আমতা আমতা করতে থাকে শ্রীদাম, ‘আসলে, হয়েছে কী, ও সম্পর্কে আমার কাকাতো বোন।’

‘নিজের কাকা?’ হরসিতবাবুর মুখ ঘৃণাতে বিকৃত হয়ে যায়।

‘হ্যাঁ, আমার বাবার আপন ভাই।’

‘সহদর ভ্রাতা?’

‘আজ্ঞে।’

‘ছি ছি ছি! যত সব বিকৃত সম্পর্ক!’

‘আমরা যখন প্রেম শুরু করি তখন জানা ছিল না। আমার কাকা বহুকাল আগেই বাড়ি ছেড়ে জেলা সদরে এসে ডেরা গেঁড়েছেন। আমাদের সংগে তাঁর কোনও যোগাযোগ ছিল না। আমিও পড়াশুনার জন্যে জেলা সদরে আসি। তারপরই নীলার প্রেমে পড়ে যাই।’

‘প্রেম কি হাইড্রেনের ঢাকনা ছাড়া ম্যানহোল নাকি যে পড়ে গেলে উঠে আসা যাবে না?’

‘আজ্ঞে আমি উঠে আসতে চাইছি না। চাইলেই বা দেয় কে? আমি নীলাকে বিয়ে করতে চাই। কোনও উপায় বাৎলান।’

‘দাঁড়াও ভেবে দেখি।’

হরসিত উকিল একগ্রমনে টাকে হাত বুলাতে বুলাতে আইনের ফাঁক খুঁজতে থাকেন। শ্রীদাম বেশিক্ষণ ধৈর্য রাখতে পারে না। তার মনে হয় উকিলবাবুকে সঠিক পথে আনতে একটু সাহায্য করা দরকার। সে বলল, ‘শুনেছি মুসলমানদের মধ্যে চাচাতো বোনকে বিয়ে করা জায়েস। কথাটা কি ঠিক?’

হরসিত উকিলের মুখে এতক্ষণে হাসি ফুটল। তিনি যেন এতক্ষণে একটু আলো পেলেন।
‘আলবৎ। তোমরা ইসলাম কবুল কর। তাহলে আর বিয়েতে অসুবিধা হবে না। আইনেও ঠেকবে না। আমিই না হয় সব ব্যবস্থা করে দেব। তুমি তোমার প্রেমিকাকে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে আসবে শুধু। বাকিটা আমি সামলে নেব।’

শ্রীদাম চলে যাবার পর হরসিত উকিলকে একটা অদ্ভুত অস্বস্তি গ্রাস করল। শ্রীদামের থেকে পরামর্শের দাম কড়ায় গণ্ডায় আদায় হলেও হরসিত উকিল ঠিক শান্তি পেলেন না। কাজটা কী ঠিক হল? তিনি বিমর্ষভাবে ভাবতে থাকেন। জীবনে অর্থের প্রয়োজন আছে বটে কিন্তু অর্থলাভেই কি আর মোক্ষলাভ হয়? পরমার্থের কি প্রয়োজন নেই জীবনে? শ্রীদামকে ধর্মান্তরিত হবার পরামর্শ দিয়ে স্বধর্মে আঘাত দেওয়া হল না কি? তিনি ঈশ্বর ভক্ত। বাড়িতে মা কালীর বিগ্রহ আছে। নিজের হাতে তিনি পুজো দেন। আজ তিনি যে পাপ করলেন তাতে মা কালী কী ক্রুদ্ধ হবেন না?
‘হে মা কালী, অপরাধ নিও না মা, জানোই তো সবই করছি এই পাপি পেটের জন্যে।’ মনে মনে আওড়াতে থাকেন হরসিত উকিল, ‘তোমার নাম নিয়েই তো ডাকাতেরা লুঠ করতে বেরত। আমি কি-ই-বা অন্যায় করেছি মা, হিন্দুধর্ম ছেড়ে যবন হওয়া নতুন কিছু তো নয় মা। আগে হিন্দু ধর্মের মাথারা যাদের সমাজচ্যুত করত তাদের যবন হওয়া ছাড়া উপায় থাকত না মা। তুমি তো সবই জানো, ক্ষমা করে দিও…’

পরদিন রাত দশটা নাগাদ গৃহিণী হরসিতবাবুকে যে খবরটা দিলেন, তা শুনে হরসিতবাবুর মুখ চুন হয়ে গেল। শংকিত হলেন মনে মনে।

নীলা কলেজ থেকে বাড়ি ফেরেনি। কলেজের পর কোচিং ক্লাস থাকলেও সাড়ে আটটার মধ্যেই তার বাড়ি ফিরে আসার কথা। তাহলে এখনও সে বাড়ি ফিরল না কেন? যা দিন কাল পড়েছে, রাস্তাঘাটে বেরনোই ঝকমারি! বিপদ আপদ শ্বাপদের মত ওত পেতে আছে।

হরসিত উকিল সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন। ফোন করে যে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে কিংবা নীলার বন্ধু-বান্ধবীর বাড়িতে খোঁজ নেবেন, তাতেও বিপদ। কুৎসা রটতে সময় লাগবে না। আজ না হোক কাল মেয়েকে পাত্রস্থ করতে হবে। সেক্ষেত্রে মস্ত সমস্যা হয়ে যাবে কুৎসা রটলে। কিন্তু তা বলে তো হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না! গৃহিণী অস্থির হয়ে উঠছে। আর অস্থির গৃহিণী কি আর স্বামীকে স্থির থাকতে দেয়? কদাপি না।

পরিস্থিতি যখন ঘোরাল, কোনও আলোরই সন্ধান পাচ্ছেন না হরসিতবাবু, তখন মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। একটা অপরিচিত নম্বর।

“হ্যালো” বলতেই ওপাশ থেকে একটা অপরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, ‘এই যে হরসিতবাবু। মেয়ের বিয়ে হচ্ছে, অথচ আপনার দেখা নেই? আসুন আসুন সানাইয়ে আসুন। সানাই চেনেন তো?’

মাথায় যেন বাজ পড়ল হরসিতবাবুর। সব কাজ ফেলে স্কুটার নিয়ে ছুটলেন তিনি।
সানাই একটা লজ। বিয়ে অন্নপ্রসান শ্রাদ্ধ– এইরকম নানা অনুষ্ঠানের জন্যে সানাইয়ের জুড়ি নাই। ছোট খাট ছিমছাম লজখানা। সস্তায় কাজ হাসিল করতে হলে সানাই চাই-ই চাই।

হরসিতবাবু সানাইয়ে পৌঁছে কলরব শুনতে পেলেন। দেখলেন সেখানে অল্পবয়সী ছেলে মেয়েদেরই ভীড়। সানাইকে বিয়ে বাড়ি বলে মনেই হচ্ছে না। বাজনা নাই, রোশনাই নাই! সংবাদটা ঠিক তো? মানে এখানে সত্যি সত্যিই নীলার বিয়ে হচ্ছে তো? সন্দেহ হল হরসিতবাবুর। নীলাকে এখানে বিবাহিত অবস্থায় পাওয়া গেলে হরসিতবাবু হরসিত হবেন, না কি এখানে আদৌ নীলাকে পাওয়া না গেলে স্বস্তি পাওয়া যাবে সহসা হরসিতবাবু সেই সিদ্ধান্তে থিতু হতে পারলেন না।

ভীড়ের মধ্যে থেকে একদল চটপটে মেয়ে হাইহিল খটখটিয়ে সামনে এসে হরসিতবাবুকে সাদর অভ্যর্থনা জানাল। এই রকম অভ্যর্থনা তিনি জীবনে আরেকবার পেয়েছিলেন। হরসিতবাবু এই বেদনাবিধুরতার মধ্যেও কেমন যেন স্মৃতিমেদুর হয়ে উঠলেন। কুড়ি বছর আগে শালীরা ঘেরাও করেছিল। বলেছিল, নো টাকা, ‘নো বিয়ে!’ আর এখন ঘেরাও হলেন মেয়ের বান্ধবীদের দ্বারা। অবশ্য তারা টাকার ডিম্যান্ড করল না। তাদের এক কথা। নীলার বিয়ে মেনে নিতে হবে। নইলে নীলার সঙ্গে দেখা করতে দেবে না তারা।

‘কী হচ্ছে কী? এটা কি মগের মুলুক?’ হরসিতবাবু বিরক্ত হয়ে গলা চড়ালেন। কয়েকজনকে চড়িয়ে দেবার ইচ্ছে হলেও অনেক কষ্টে সেই ইচ্ছে সংবরণ করলেন তিনি। জেনে বুঝে বিপদবরণ কে-ই-বা করতে চায়? শ্লীলতাহানীর কেস বড় সাংঘাতিক!

‘আইনের শাসন নেই না কি? আমি পুলিস ডাকব।’ হুমকি দিলেন হরসিতবাবু। পুলিশ ডাকার কথা শুনে মেয়েরা ঘাবড়াল না। বরং শ্লোগান দিতে লাগল, ‘বিয়ে বাড়িতে পুলিশ ঢোকানো চলবে না চলবে না।’ সেই শ্লোগানে গলা মেলাল উপস্থিত যুবকদের দল।

অবশেষে সমস্ত দাবি মেনে মেয়ের সামনে যাবার সুযোগ পেলেন হরসিত বাবু।
হিজাবাবৃত মেয়েকে দেখে হরসিতবাবু নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। বিয়ে ভেংগে দেবার রোখ চেপে গেল মনের মধ্যে। নীলার হাত ধরে বললেন, ‘এই বিয়ে আমি মানি না, চল হতভাগী! বাড়িতে চল…’

কিন্তু হরসিতবাবুর ওজোর খাটল না। জোর করে নীলা তার হাত ছাড়িয়ে নিল। “হোক সংগম” বলে যুবক-যুবতীরা তখন উচ্চকণ্ঠে শ্লোগান দিতে লাগল। শ্লোগান শুনে হরসিতবাবু আক্ষরিক অর্থেই হাঁ হয়ে গেলেন।

‘এই হরসিত উকিল গানকেই ভয় পায় না। শ্লোগান দিয়ে আমাকে ঠেকানো যাবে ভেবেছ? আমি অপহরণের কেস দেব।’ হরসিত উকিল ঘোষণা করলেন।

‘কেস দিয়ে কোনও লাভ হবে না স্যার। আপনার মেয়ে আঠেরো পেরিয়ে গেছে।’ কথাটা পেছন থেকে ভেসে এল। গলাটা কেমন চেনা চেনা লাগল। পেছনে তাকিয়ে হরসিতবাবু শ্রীদামকে দেখে চমকে উঠলেন। তাহলে কি শ্রীদামই? শ্রীদামই কি সব কিছুর মূলে?

‘তু-তুমি? তুমি তো বলেছিলে আমার মেয়েকে তুমি বিয়ে করতে চাও না। সেটা কি মিথ্যে কথা?’
‘না স্যার, আমি নই।’ শ্রীদাম জানাল, ‘আপনার মেয়েকে বিয়ে করেছে আমারই এক বন্ধু। নাম শাহানাওয়াজ খান। খুব ভাল ছেলে।’

‘এই বিয়ে আমি মানি না।’

‘মানছেন না কেন? শাহনাওয়াজ মুসলমান বলে? ও সব চলবে না স্যার। আমাদের “হোক সংগম আন্দোলন” সফল হবেই। হামে চাহিয়ে আজাদি। জাতি-বর্ণ-ধর্মসে আজাদি। জাতি-বর্ণ-ধর্ম নির্বিশেষে বিয়ে হবে বুঝেছেন? মানুষে মানুষে মিলে মিশে যাবে। খুব ভাল একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ, তাই না?’ শ্রীদাম হাসল। শ্রীদামকে এখন আর সহজ সরল মনে হল না হরসিতবাবুর।

‘তুমিই কি এদের নেতা?’

‘না, আমি তো স্রেফ আভিনেতা।’ শ্রীদাম বলল, ‘কী চমৎকার অভিনয় করেছিলাম তাই না? আপনি ঘুণাক্ষরেও সন্দেহ করতে পারেননি।’

‘অভিনয়?’ যারপরনাই আশ্চর্য হলেন হরসিতবাবু।

‘স্ট্রিং অপারেশন করতে গেলে অভিনয় না করলে কি চলে স্যার? আপনি দু-টো পয়সার জন্যে মক্কেলকে ধর্মান্তরিত হতে পরামর্শ দিচ্ছেন এমন ভিডিও যদি ভাইরাল হয়ে যায় কী হবে ভাবুন তো? সোসাল মিডিয়ায় মুখ দেখাতে পারবেন না। হিন্দুরা ক্ষেপে যাবে। চারিদিকে যে রকম অসহিষ্ণুতা ছড়িয়ে পড়ছে তাতে আপনার উপর হনুমান-বাহিনী যে চড়াও হবে না, সেই কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। আবার, মোল্লারাও যে তেড়ে আসবে না তারও নিশ্চয়তা নেই। অবৈধ সম্পর্ককে বৈধ করার জন্যে আপনি তাদের ধর্মকে ব্যবহার করছেন, সেটাকে ওরা ধর্মাবমাননা বলে মনে করতে পারে। সেক্ষেত্রে কল্লা ফেলে দেবার ফতোয়া জারি হওয়াও বিচিত্র নয়।’

‘ব্ল্যাক মেইল করছ?’

‘ছি ছি! তা কেন? আপনি আমাকে মুসলমান হতে বলেছিলেন, তাহলে মুসলমান জামাইয়ে আপত্তি করার আপনার নৈতিক অধিকার থাকে কি? মেনে নিন এই বিয়ে। আসলে আপনি যাতে নীলাকে ত্যাজ্য কন্যা না করেন, তার নিশ্চয়তার জন্যেই গোপন ক্যামেরা নিয়ে আপনার সংগে দেখা করেছিলাম। আপনার বাড়িটার দাম নেহাত কম নয়। আপনার মেয়ে ত্যাজ্য হতে চাইছিল না। শাহনওয়াজ বলেছিল, নীলার সংগে ওর বিয়েটা না হলে নীলোফারের সংগে আমার বিয়েটাও আটকে যাবে। তাই অনেক ভেবে আমি নিজেই ওদের বিয়ের দায়িত্বটা নিয়েছিলাম। ভালয় ভালয় সেটা সমাধাও করলাম।’

চক্রান্ত যে আঁটঘাট বেঁধেই করা, তা বুঝতে হরসিতবাবুর কষ্ট হল না। তবে অনেক সময় চক্রান্তই চক্রান্তকারীর অন্ত ঘটিয়ে ছাড়ে। শ্রীদামের ক্ষেত্রে ঘটল এমনটাই।

মাস দুয়েক পর একদিন শ্রীদাম বাড়িতে এসে হরসিতবাবুর সংগে দেখা করল। হরসিতবাবু শ্রীদামকে দেখে প্রবল আক্রোশে বললেন, ‘তুমি আবার এসেছো? এখন আবার কী মতলবে?’

‘আজ্ঞে স্যার!’ শ্রীদাম বলল, ‘আপনি মেয়ে জামাইকে গ্রহণ করেননি বলেই, আপনার সংগে দেখা করতে এলাম।’

হরসিতবাবু বললেন, ‘স্টিং অপারেশনের ভিডিওটার কথা মনে করিয়ে দিতে এসেছ?’

‘আর লজ্জা দেবেন না স্যার। খুব ভুল করেছি। আপনি আপনার মেয়েকে ত্যাজ্য করতে চাইলে করতে পারেন। সেটাই জানাতে এসেছি। ওই ভিডিওটা আমি নষ্ট করে দিয়েছি। শাহনাওয়াজের বিরুদ্ধে আপনার পদক্ষেপ নেওয়া উচিৎ।’

‘হঠাৎ উল্টোগান শুরু করলে যে? হোক সংগম আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছ না কি?’
‘আবার লজ্জা দিচ্ছেন স্যার। শাহনাওয়াজ আমাকে ধোকা দিয়েছে। ও এখন বলছে, আমি ইসলাম ধর্ম না নিলে ওর বোন নীলোফারের সংগে আমার বিয়ে দেবে না।’

‘শাহনয়াজ চাইলেও পারবে না। ইসলামে ওরকম হয় না, কাফেরের মেয়েকে বিয়ে করা যায়। সেটা ইসলামে জায়েস। কিন্তু কাফেরের সংগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া যায় না। কাফেরকে সেক্ষেত্রে ইসলাম কবুল করতে হয়। তুমি তো বিপ্লবী। তুমি পিছিয়ে এলে যে? প্রেমের খাতিরে ইসলাম নিলে না কেন?’

‘ইয়ে মানে–‘ আমতা আমতা করে বলল শ্রীদাম, ‘আমার বাবা বলেছে আমি যদি ধর্মান্তরিত হই তাহলে ত্যাজ্যপুত্র করবে। তাহলে সব সম্পত্তি ভাইয়ের হাতে চলে যাবে!’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here