হাওয়া বদল

0

Last Updated on

প্রবীর মজুমদার

।। ১ ।।

‘কী দেইখ্যা যে আব্বু তুমার লগে আমার বিয়া দিছিল কে জানে! জীবন এক্কেরে ভাজাভাজা হইয়া গেল।’
মনের রাগ উগরে দেয় জন্নাত। কিন্তু শান্তি পায় কী? না। মেহের আলির নির্বিকার মুখ দেখে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে সে, ‘তুমারে কইতাছি। শোনবার পাও না? সাদির পেরথম পেরথম তো কইতা, আমারে রাণী বানায় রাখবা। হ্যা আর মনে আসে না না?’
মেহের মুচকি হেসে জবাব দেয়, ‘আমিই রাজা-বাদশা কিছু হইতে পারলাম না। যদি হইতাম, তুমি অটোমেটিকলি রাণী কিংবা বেগম হইতা।’
মেহেরের হাসিতে রাগ আরো বাড়ে জন্নাতের। বলে, ‘ক্যান? কেডা বারণ করছে? মাইনা তো কম পাও না, তবু কাঙালিপণা ক্যান? বিবি রাহা এত সস্তা না, বোচ্ছ? আমি ভাল বইলাই তোমার ঘর করতাছি।’
মেহের এবার গান ধরে, ‘তুমি সুখ যদি নাহি পাও তবে সুখের সন্ধানে যাও—’
মেহেরের গলায় সুর আছে। কণ্ঠস্বরেও আছে জাদু। এই জাদুতেই জন্নাত একটা সময় জন্নাত খুঁজে পেত। কিন্তু এখন আর পায় না। বরং মেহের গান গাইলেই তার বিরক্তি লাগে। গুণ যদি কাজেই না লাগে তাহলে সেই গুণ থেকে লাভ কী? যদি এই গুণ ভাঙিয়ে কিছু ইনকাম করতে পারত লোকটা তাও মানা যেত!
জন্নাত বলে, ‘তুমি কি ভাব আমার আর কুন জাওনের জাগা নাই? তালাক দিয়া দেখ। রূপ যৌবন এহনও আমার যায় নাই।’
।। ২ ।।
গড়ে তোলা কষ্টকর। অনেক সাধ্য-সাধনা করতে হয়। কিন্তু ভাঙা খুব সহজ। তিন বার তালাক শব্দটা বললেই হয়। দুটো মানুষের সামাজিক সম্পর্কটা ভেঙে যায় এক লহমায়। কাজি ডেকে একদিন মেহের সত্যি সত্যিই “তালাক” শব্দটা তিনবার উচ্চারণ করল। খোদার আসন কতটা টলল সে তাতে আদৌ আগ্রহী ছিল না, তবে দীর্ঘদিনের শিকলটা ছিন্ন হওয়ায় হৃদয়ে যেন শূণ্যতা বাসা বাঁধল। সেই শূণ্যতায় সে মুক্তির আনন্দকে বরণ করবে না কি হেমন্তের রিক্ততাকে আশ্রয় দেবে বুঝতে পারল না। তবে হেমন্তের পরে শীত। প্রকৃতির তুলির টানে রিক্ততা আবার ভরে ওঠে নানান রঙের সমাহারে। চিরন্তন সেই আশা মেহের ছাড়তে পারল না।
।। ৩ ।।
বড়লোক বাপের আদরের দুলালী জন্নাত। জীবনের কাছে তার আবদার কিছু বেশিই। সেই আবদার না মিটলেই সে বিদ্রোহ করে। ছোটবেলা থেকে এভাবেই তার মানসিকতা তৈরি হয়েছে। মেহেরের কাছে তালাকের আবদার করতেই মেহের প্রথমত সম্মত হয়নি। কিন্তু ঘষতে ঘসতে পাথর পর্যন্ত ক্ষয় হয়। মেহের বিরক্ত হয়ে আবদার মেনে নিল, আর জন্নাতও দুই বছরের বিবাহিত জীবন ছেড়ে বাপের বাড়িতে ফিরে এল। জান্নাতের উপর মেহের কী কী অত্যাচার চালিয়েছে বিগত দুই বছরে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ কাল্পনিক বিবরণ শুনে বাপ জাভেদ আলি বললেন, ‘আল্লা মেহেরবান। জালিম মেহের আলি আমার জান্নাতের খুব বেশি ক্ষতি করতি পারে নাই। আল্লা মেহেরের কসুর মাফ করবে না।’
।। ৪ ।।
জন্নাত এবার মনের মত স্বামী পেল। নাম করা ব্যবসায়ী। অগাধ টাকা। জন্নাতকে তার নতুন স্বামী হায়দার আহ্‌মেদ হানিমুনে নিয়ে গেল মরিশাসে। জন্নাত এবার যেন সত্যি সত্যিই জন্নাত পেয়েছে হাতের মুঠোয়। এখন সে খুশি। তবে সুখি কি? সুখ জিনিসটা ঠিক কেমন?
জীবনের কাছে তার যে চাহিদা ছিল, তা কি সে পেয়েছে? প্রশ্নগুলো তার বুকে যখন বিঁধতে থাকে নির্মমভাবে, তখণ মন ছটফট করে ওঠে। বিদ্রোহ করে ওঠে আবার। তবে এবার বিদ্রোহ জীবনের প্রতি নয়। নিজের প্রতিই বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে সে। কী যেন সে হেলায় হারিয়েছে!
।। ৫ ।।
‘আমারে তুমি ভালবাস না। ভাল যদি বাসতা তাইলে ওই বেশ্যা মাগী স্টেনোটার লগে ফষ্টিনষ্টি করতা না।’ জন্নাত ক্ষব্ধ হয়ে বলে।
হায়দার বলে, ‘তোমারে ভালবাসি কি না বাসি হেইডা বড় কথা না। বড় কথা হইল, আমি তোমারে বিবির সম্মান দিছি। তোমার আব্বু বিজনেসে লস খাইয়া গলা পর্যন্ত দেনায় ডুইবা গেছল। আমি তারে উদ্ধার করছি। বিনিময়ে তিনি তোমারে আমার লগে সাদি দিছে। বলা যায়, তোমারে আমি কিনা নিছি। তুমি হইলা আমার তিন নম্বর বিবি। পরথম দুই জনা আত্মহত্যা করছে। তুমি কী করবা তোমার ব্যাপার। তবে আমি কার লগে শুই তা দেখনের অধিকার তোমারে আমি দেই নাই।’
‘আমি আত্মহত্যা করুম না। আমি তোমার থিক্কা তালাক নিমু।’
হায়দার হেসে ওঠে, ‘কও কী! এত ট্যাকা খরচ করলাম কী তোমারে তালাক দিবার লগে?’
।। ৬ ।।
টানা দুই বছর ঘর করার পর হায়দারের কাছ থেকে অব্যাহতি পাওয়া গেল অযাচিত ভাবেই। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ কাজী সাহেবকে নিয়ে এসে তালাকনামায় সই করে জন্নাতকে দরজা দেখিয়ে দিল হায়দার।
জান্নাতের আব্বু এখন আর ইহজগতে নেই। হায়দারের সংগে জন্নাতের সাদির পর থেকেই মানুষটার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। একটা পাপবোধ কুরে কুরে খেত তাঁকে। অবশেষে মৃত্যুতে যন্ত্রনা জুড়িয়েছে। জাভেদ আলির মৃত্যু নিয়েও ধোঁয়াসা আছে। কেউ কেউ বলে মৃত্যুটা না কি স্বাভাবিক নয়। যাই হোক জাভেদ আলির মৃত্যুতে হায়দার বড়ই লাভবান হয়েছিল। জাভেদ আলির সমস্ত সম্পত্তির মালিক এখন হায়দার। কী করে এমনটা হল, এই গল্পে সেই বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন।
।। ৭ ।।
কপর্দকশূণ্য হয়ে জন্নাত বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিল। সে যাবে খুলনায়। তার মামা বাড়িতে। মামা যদি আশ্রয় দেন, সেই আশায়।
জন্নত এখন আর জন্নত খোঁজে না। জটিল ক্রুর বাস্তব তাকে দার্শনিক করে তুলেছে। সে বুঝেছে জন্নত এমনি এমনি পাওয়া যায় না। তার জন্য উপযুক্ত হতে হয়। সুখের জন্য হাহুতাস করলে সুখ পাখি ধরা দেয় না। ছোট ছোট সুখই জীবন দরিয়ার পারানি। এই পারানিকে যে পায়ে ঠেলে তার কপালে জীবদ্দশাতেই জাহান্নাম অবধারিত।
বাস এসে গেছে। জন্নত যখন বাসে উঠতে যাবে কে যেন তার হাত টেনে ধরল। জন্নতের আর বাসে চড়া হল না।
।। ৮ ।।
ভুল করেও যদি মুখ দিয়ে তালাক শব্দটা তিনবার বেরয়, তাহলেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। তখন এক সংগে থাকা যায় না। ভুল স্বীকার করেও তালাক প্রত্যাহার করা যায় না। শাস্তি পেতে হয়। এই শাস্তি দেওয়া হয় তালাক কার্যকর করে। স্বামী তালাক প্রদত্ত স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করতে পারে, তবে তার আগে স্ত্রীকে অন্য কোনও পুরুষের সঙ্গে ঘর করতে হবে— এক্ষেত্রে নাম মাত্র লোক দেখানো সম্পর্ক হলে হবে না, শারীরিক অর্থেই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে তাদের থাকতে হবে। তারপর নতুন স্বামী তালাক দিলে পুরনো স্বামী সেই মহিলাকে আবার বিয়ে করতে পারে। এটাই শারিয়া আইন। আইনের সমস্ত দিক রক্ষা পাওয়ায় জান্নাতের সংগে মেহেরের পুনরায় বিয়েতে বাধা হল না।
।। ৯ ।।
মেহের বলল, ‘কি গো আমার লগে ঘর করতি আর কষ্ট হইব না তো?’
মেহের কি জন্নতকে ব্যাঙ্গ করার জন্যই কথাটা বলল? জন্নত বুঝতে পারে না। কেঁদে ফেলে সহসা, ‘আমি আর তোমার যোগ্য নাই গো, আমি নষ্ট হইয়া গেছি। আমার শরীর অপবিত্র হইয়া গেছে।’
মেহের বলল, ‘দূর পাগলী! শরীর অপবিত্র হয় না। চান করলেই পরিস্কার হইয়া যায়। অপবিত্র হয় মন। মনরে পরিস্কার করণের লাইগ্যা জ্ঞানার্জন প্রয়োজন। তোমার হেইডা ছেল না। তাই সুখ পাইতা না। তাই তোমার জীবনে এই রকম একডা হাওয়া বদলের প্রয়োজন আছিল।’

ছবি: শুভাশিষ মজুমদার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here