দ্বন্দ্ব

0

Last Updated on

দেবতনু ভট্টাচার্য

ছ’নম্বর পেগটা শেষ করে মেজর রুদ্র যখন গ্লাসটা ঠক করে নামিয়ে রাখলেন ওক কাঠের টেবিলে, ঘড়িতে তখন ঠিক রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষে এই জিম করবেট অভয়ারণ্যের নিভৃত রিসর্টে ভিড় বেশ কম। জায়গার নাম বেলপারাও। এখান থেকে নৈনিতাল মাত্র পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার। বাতাসে কুমায়ুন হিমালয়ের হিমেল হাওয়া অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছে থেকে থেকেই। সঙ্গে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, ব্যাঙের ঘড়ঘড় আর সিঙ্গল মল্ট স্কচের খুশবু। এ ছাড়া, হ্যাঁ, এ ছাড়াও আরো কিছু প্রাকৃতিক শব্দ আছে, যা অনভ্যস্ত কানে ভয়ংকর শুনতে লাগে, যেমন প্যাঁচার ডাক, যেমন দূর থেকে ভেসে আসা শিয়ালের ডাক। আমি একটা পাতলা শাল গায়ে চাপিয়ে বসেছি, মেজর রুদ্রের ওসব বালাই নেই, বিশাল বপুতে একটা নাইকের টি শার্ট আর শর্টস চাপিয়ে রাত্রি উপভোগ করছেন। ছ’নম্বর পেগটা শেষ করে মেজর খুব হাল্কা স্বরে ঠুংরি ধরলেন, “ইয়াদ পিয়া কি আয়ে…”। চাপাস্বরে হলেও, সমঝদার গায়কী, অন্তত চার পেগ টানার পর আমার শুনতে বেশ লাগছিল। কাঁচা বয়সে একসময় সিংগিং বারে যেতাম। যখন দেখতাম যে শুরু থেকে অসহ্য বেসুরো গায়কদের শুনতে আর বেগ পেতে হচ্ছে না, তখন বুঝতাম নেশা জমেছে, এইবার কেটে পড়া দরকার। এক্ষেত্রে তা নয়, সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে আগেও মেজরের সাথে সাক্ষাত হয়েছে এবং ওনার গান শুনেছি, তাই আমি যে বেসুরো শুনছি না সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম।
কিছুক্ষণ গাইবার পর মেজর চুপ করলেন। আবার পেগ বানাবেন। আমার সাংবাদিক সত্তা এই ফাঁকে চাড়া দিয়ে উঠল। প্রশ্নটা করেই ফেললাম, “এ প্রিয়া কেমন প্রিয়া মেজর?”
হো হো করে হেসে উঠলেন মেজর। দূরে একটা গেছো বেড়াল ভয় পেয়ে ধড়মড় করে গাছের ডাল থেকে পড়ে গিয়েই ছুট লাগালো। বেচারা নিশ্চয় ঘুমোচ্ছিল, হঠাত শব্দে চমকে উঠে ব্যালেন্স রাখতে পারে নি হয়ত। ভাগ্যে এইসময় ট্যুরিস্ট কম, তাই অন্য ঝামেলা পোহাতে হল না আমাদের। মুখ মুছে মেজর বললেন, “সে ছিলেন একজন, আমায় সহ্য করতে না পেরে কেটে পড়েছেন”।
“গল্পটা কি বলা যাবে? এইধরনের ঘটনা একান্ত ব্যক্তিগত ধরে নিয়ে মুখ লুকিয়ে এড়িয়ে যাওয়ার মতো পুরুষমানুষ তো আপনি নন বলেই জানি। অবিশ্যি যদি আমাকে বলতে আপত্তি না থাকে।” ইচ্ছে করেই খোঁচা দিলাম, যাতে গল্পটা শুনতে পারি। মেজরের ঠ্যাং নাচানোর ধরন দেখে বুঝলাম কাজ হয়েছে। হাতের গেলাস এক চুমুকে ফাঁকা করে মুখ মুছে মেজর শুরু করলেন –

“আমি তখন আসামে। সালটা ২০০৫ এর এদিক ওদিক। United Liberation Front of Assam বা ULFA, অর্থাৎ সংযুক্ত মুক্তিবাহিনীর কুকুরগুলো গ্রাম কে গ্রাম ছারখার করে দিচ্ছিলো। সঙ্গে যোগ হয়েছিল কিছু উটকো আপদ, যেমন নাগাল্যাণ্ডের Nationalist Socialist Council of Nagaland অর্থাৎ NSCN, কামতাপুরী আর গোর্খা মুক্তিমোর্চার মতো কিছু ভাগাড়ে শকুন, যারা প্রত্যক্ষ না হলেও, পরোক্ষ মদত দিয়ে চলেছিল এদের। এছাড়া চায়নার মদত তো ছিলোই। অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ডের পাহাড়ি গিরিপথ ধরে চোরাগোপ্তা অটোম্যাটিক রাইফেল সাপ্লাই হতো, আর হাওয়ালার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে পাচার হত টাকা। এই ‘আলফা’রা বেশ কয়েকটি জায়গায় শক্ত ঘাঁটি গেড়ে নিয়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম মূল জায়গাগুলো ছিল আসামের নীচের দিকের উদলগুড়ির চা বাগান ও জঙ্গল, বংগাইগাঁও, ডিব্রুগড়, অরুণাচলের পাদদেশে শিলাপাথর নামের জায়গা ও তার আশপাশের এলাকা। লক্ষ্য করে দেখো এই প্রত্যেকটি জায়গাই ভৌগলিক দিক থেকে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। বংগাইগাঁও উড়ে গেলে, ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে রেল ও সড়ক পথ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, আর তার পাশাপাশি ইন্ডিয়ান অয়েলের বিশাল রিফাইনারি বেদখল হয়ে যাবে। উদলগুড়ির চা বাগান গরীব কুলিমজুরদের ক্ষেপিয়ে তোলা, লুকিয়ে থাকা ও বড় ব্যাবসাদারদের চাপ দিয়ে তোলা তুলতে সাহায্য করত, আর ডিব্রুগড় ও শিলাপাথর দিয়ে বিপদকালে নিশ্চিন্তে অরুণাচল হয়ে চিনের কোলে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া যেত।

আমাদের সেবার সিক্রেট মিশন ছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটো, এক, গুপ্ত হত্যা করে আলফাকে দুর্বল করে তোলা, দুই, আলফার সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে জনপদ ও জীবন বাঁচানো। আমাকে নিয়ে দশজন স্পেশাল অফিসার সারা অসম রাজ্যের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলাম। আমার দায়িত্ব ছিল শিলাপাথরের দিকে। অসংখ্য গুপ্তচর আমাদের মদত করছিল, যারা লোকাল পুলিশের সাথে যুক্ত নয়। কারা ছিল এরা? এরা ছিল মূলত সেইসব মানুষ, যাদের পরিবার নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল আলফা বাহিনী, এবং লোকাল পুলিশ কার্যত চুপ করে বসেছিল। পুলিশদের চুপ করে থাকার মূলত দুটি কারণ ছিল। প্রথমত, তারা অপদার্থ ছিল, আর দ্বিতীয়ত, তারা অপদার্থ ছিল। তাদের না ছিল সেল্ফ রেস্পেক্ট, না ছিল পর্যাপ্ত পরিমাণে অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, আর না ছিল ট্রেনিং। তার পাশাপাশি এতবড় দেশে স্বার্থান্ব্যেষী দেশদ্রোহী রাজনীতিকদের অভাব যে নেই, সে তো তুমি ভাল করেই জানো। এদের চিত্তবৈকল্যের কারণ না ঘটিয়ে তাই কেন্দ্রীয় সরকার থেকে একটা লিস্ট চাওয়া হয়, আলফাদের হত্যা করা আত্মীয় পরিজনদের বিবরণ চেয়ে। ব্যাপারটা খুব একটা অসুবিধের হয় নি, কারণ কেন্দ্র ও রাজ্যে তখন একই সরকার, তাই এইভাবে সাজানো হয়েছিল যে কেন্দ্র একটা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সেইসব পরিবারদের। ফলে যেটা দাঁড়ালো, তা হলো এই যে, গাধাদের সামনে মুলো নাড়ানো হল, এবং তারা আরো কিছু ফাটকা উপার্জনের আশায় হড়হড় করে নাম ঠিকানাগুলো বিস্তারিত দিয়ে দিল। এরপরের কাজটা আরো গোপনে করা হল। আর্মি থেকে এক এক করে সেইসব লোকজনদের যোগাযোগ করা হল, তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হল। সেই হতভাগ্য মানুষগুলো এতদিন পরে প্রতিশোধ মেটানোর এক চিলতে আলো দেখতে পেল। এমনই এক হতভাগ্য ছিলেন শিলাপাথরের প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষিকা পলি সরকার।এইফাঁকে জানিয়ে রাখি, শিলাপাথরে মূলত বাঙালীদের বসবাস। এই বাঙালীরা আমাদের কলকাত্তাইয়া বাঙালী একেবারেই নন, মূলত বাংলাদেশ থেকে হয় বহু আগে এসেছেন, অথবা আসামের আদি বাসিন্দা। শিলাপাথর টাউনটি গড়ে উঠেছে মূলত রেল কলোনীর জন্য।

আমার তখন জমজমাট প্রেম চলছে নীরার সাথে। নীরা, হ্যাঁ, এটাই তার নাম ছিল। সাড়ে পাঁচফুট লম্বা চওড়া শরীর নিয়ে যখন সে গ্রুপ থিয়েটারের রিহার্সালে যেত, তাকে অনেকটা অপর্ণা সেনের মতো দেখতে লাগত। ফোর্ট উইলিয়ামে পোস্টেড থাকতে থাকতেই আলাপ হয়েছিল তার সাথে, কারণ আমি ফাঁক পেলে প্রায়ই আকাদেমি-নন্দন চত্বরে ঘুরঘুর করতাম, যদিও তা আর্মির স্বভাবের সাথে মানানসই নয় মোটেই। ঠিক ছিল এই মিশন শেষ করে ফিরে গেলেই দুই বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা পাকা করে ফেলা হবে। যাই হোক, ফিরে যাই আমার মিশনের গল্পে।

হঠাত খবর এলো, আলফারা একটা বড়সড় চক্রান্ত করছে শিলাপাথরের রেল লাইন ওড়ানোর। কামরূপ জেলার রঙ্গিয়া জংশন থেকে প্রায় চারশ কিলোমিটার এই রেলপথ একবার উড়িয়ে দিতে পারলেই ভারত সরকার ব্যবস্থা করে ওঠার আগেই টুক করে চিনা সেনারা নেমে এসে সীমানা বাড়িয়ে নিতে পারবে অনেকটাই। পলিই খবরটা এনেছিল। আমি শিলাপাথরে ব্রাজিলিয়ান ট্যুরিস্ট হিসেবে প্রবেশ করেছিলাম, যাতে কেউ সন্দেহ না করতে পারে। ব্রাজিলিয়ান ট্যুরিস্ট হওয়ার তিনটে মূল সুবিধা- এক, চামড়া ও চোখের রঙ মিলে যায়, দুই, ওদের মূল ভাষা পর্তুগিজ, যা সহজেই ভারতে শিখে নেওয়া যায়, আর তিন, গরীব দেশ, তাই এই অখ্যাত জায়গায় পড়ে থাকলেও লোকে বিশ্বাস করে যে এরা এইধরনের পরিবেশে অভ্যস্ত এবং খুব একটা মাথা ঘামায় না। এই ছোট্ট জনপদে সাকুল্যে তিনটি হোটেল ছিল, যার সবচেয়ে ভাল হোটেলটির সবচেয়ে ভাল রুমেও টিমটিমে আলো, ছারপোকা মারার স্প্রে’র গন্ধযুক্ত বিছানা আর জলের আয়রন পড়ে খয়েরী হয়ে যাওয়া কমোডের প্যান।

তখন রাত প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। এখানে সন্ধ্যে সাতটার পর দোকান পাট বন্ধ হয়ে যায়, রাত সাড়ে নটা মানে নিঃঝুম পরিবেশ। তার ওপর পাহাড়ের পাদদেশে হওয়ায় প্রায়শই বিচ্ছিরি বৃষ্টি হয়, সেদিনও হচ্ছিল। আমি সবে আড়াই পেগ মতো হুইস্কি খেয়েছি, এমন সময় ধমাস ধমাস করে দরজা ধাক্কানোর শব্দ হল। এমন অসময়ে কারুর আসার কথা নয়, তাই সঙ্গের নাইন এম এম টা ঝট করে হাতের তোয়ালের মধ্যে লুকিয়ে নিয়ে দরজা সামান্য ফাঁক করতেই দেখি পলি বাইরে দাঁড়িয়ে। ফরসা মুখ চোখ চাপা উত্তেজনায় লাল হয়ে আছে। ভাল করে চারপাশ চোখ বুলিয়ে নিয়ে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখেই চোস্ত ইংরেজীতে জানতে চাইলাম সে এসময় এখানে কেন এবং কার সাথে এসেছে? আমাদের একটা কোড ছিল। কোডটা এইরকম, যদি কোন বিপদ না থাকে, তবে ভেতরে আসতে চাওয়া লোকটি বলবে যে দরকার আছে, এবং ঈশ্বর সর্বদা তার সঙ্গে আছেন। আর যদি বিপদ থাকে, তবে তাকে আসার কারণ হিসেবে যা শিখিয়ে দেবে দুর্বৃত্তরা, তাই বলবে আর বলবে একা এসেছে। পলি প্রথমটাই অবিশ্যি বলেছিল। দরজা খুলে সরে দাঁড়ালাম আমি। মুহূর্তমাত্র দেরী না করে ঝড়ের মতো সে ঘরে ঢুকে পড়ে খাটের কোণায় বসে হাঁফাতে লাগল। দেখলাম, সে পুরো ভিজে গেছে। আমি হাতের টাওয়েল তাকে এগিয়ে দিয়ে জানতে চাইলাম তার আসার কারণ। হাঁফাতে হাঁফাতে পলি বলল যে বার্মা থেকে একটা দল আর দিন দুয়েকের মধ্যে এখানে ঢুকছে। সমস্ত খুঁটিনাটি জানার পর আমি সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে দিলাম প্রয়োজনীয় বিভাগে। মোবাইল ছাড়াও আমি সঙ্গে একটা ছোট্ট স্যাটেলাইট ফোন এনেছিলাম, যা, শুধু আমার ট্রুপের সাথে গোপন তথ্য আদান প্রদানের জন্যই ব্যবহৃত হত। আমার বিশেষ কিছুই করার ছিল না। যেহেতু কোন পথে আসছে এবং কতজন আসছে সবই জানা হয়ে গিয়েছিল, তাই বর্ডারেই ভবলীলা সাঙ্গ করার ব্যবস্থা করা গেল, এবং তা হয়েও ছিল। পলি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রয়োজনীয় সব তথ্যই যোগাড় করে দিয়েছিল।

সবকিছু মিটিয়ে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি রাত প্রায় একটা বাজে। পলি তখনো ভিজে কাপড়েই বসে রয়েছে। এদিকের বাসিন্দা হওয়ায় এদের শরীরে এক আশ্চর্য পাহাড়ি লাবণ্য দেখা যায়। ফরসা, নিটোল শরীর। এই প্রথম আমি পলির দিকে এত ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম। স্কুলের শিক্ষিকা হওয়ার কারণে রীতিমত রুচিশীলা, কিন্তু এক মেঠো বন্যতা আছে, যার নেশা, প্রায় একমাস পর সেদিন প্রথম অনুভব করেছিলাম। কিন্তু আর্মি আমাকে ডিসিপ্লিন শিখিয়েছে। আমি সাময়িক দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে পলিকে জিজ্ঞেস করলাম,
“এই বৃষ্টি মাথায় করে এত রাতে কি তুমি একা যেতে পারবে? কারণ একজন বিদেশীর তোমাকে বাড়ি অবধি ছেড়ে আবার হোটেলে ফিরে আসাটা সন্দেহের উদ্রেক জাগাতে পারে।”
পলি অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল। বুঝলাম, এইভাবে এই বাঁধভাঙা বৃষ্টিতে ওকে চলে যেতে বলাটা মোটেই ঠিক হয় নি। তাছাড়াও এইসব জায়গায় সারারাত সেনা রুটিন টহল দেয়, অন্তত সেইসময় দিত, মায় গৌহাটির পল্টনবাজারের মতো ব্যস্ত জায়গাও আটটার পরেই সেনায় ভর্তি থাকত। কোনরকম সন্দেহ করলেই ইন্স্যাসের বুলেট পলিকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে যাবে, এবং আমি থেকেও কিচ্ছু করতে পারব না। কারণ আমাদের কারুর একজনের পরিচয় ফাঁস হওয়া মানেই মিশন আনসাক্সেসফুল। পলিকে আশ্বস্ত করে তাই আবার বললাম,
“তুমি বরং এইখানেই থেকে যাও, আমার কিছু একটা পোশাক পড়ে খাটে শুয়ে পড়ো, আমি সোফায় কাটিয়ে দেব”। এক ছোট্ট জনপদের এক অচেনা নারীর চোখে সেদিন যে কৃতজ্ঞতা ও ভরসা ফুটে উঠতে দেখেছিলাম, তা জীবনে ভুলব না।

পলি শুয়ে পড়ার পর আমার মদ খাওয়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার ছিল না। টেবিল ল্যাম্পটা জ্বেলে ঘরের মূল আলো নিভিয়ে জানলার একটা পাল্লা একটু ফাঁক করে বৃষ্টি উপভোগ করছিলাম। এমন সময় পলি হঠাত বলে উঠল,
“জানেন স্যর, আমার বাবা বেঁচে থাকার সময় বাবার সাথে এইরকম বৃষ্টি হলে মাঝে সাঝে আমিও হুইস্কি খেতাম। বাবার খুব ইচ্ছে ছিল, স্কটল্যান্ড, সুইটজারল্যান্ড ঘুরে আসার।” এদের বাংলা টান অন্যরকম, শুনতে খুব মিষ্টি লাগে।
আমি বললাম,”এসো, একসাথে খাওয়া যাক, অনেকটা আছে”।
পলি উঠে এলো। আমার হাত থেকে পেগ নিয়ে চুমুক দিয়ে গল্প শোনাতে লাগল। জীবনের গল্প, মৃত্যুর গল্প। আনন্দের গল্প, যন্ত্রণার গল্প। পাওয়ার গল্প, হারানোর গল্প। আমি একমনে শুনছিলাম তার পরিবারের ছারখার হয়ে যাওয়ার ঘটনা। তার নিরাপত্তাহীন জীবনের কথা। আমি বুঝতে পারছিলাম, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা কতটা গভীর দাগ কাটলে পলির মতো একজন সাধারণ সিভিলিয়ান প্রতিশোধস্পৃহাবশে এতটা ঝুঁকির কাজ করতে পারে।
মদ শেষ হয়ে এলো। পলিকে বললাম,
“এবার শুয়ে পড়ো।”
পলি খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিসিয়ে বলেছিল, “অচেনা জায়গায় একা থাকতে আমার খুব ভয় করে…””

মেজর চুপ করল। আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে ছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ নিজেকে তোলপাড় করে ভাষা খুঁজে পেলাম,
“আর নীরা?”
“কলকাতায় ফিরে নীরাকে সব বলেছিলাম। নীরা মানতে পারে নি। ‘স্কাউন্ড্রেল’ বলে চলে গিয়েছিল।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে মেজর আবার বলে উঠলেন, ” আজও মনে করি না আমি কোন অন্যায় করেছি। অভুক্তকে খাদ্য দেওয়ার মতোই পূণ্য হয়েছিল সেই দিন। সেই একটামাত্র দিন।”

আমি চুপ করে রইলাম। “পলির সাথে এখনো যোগাযোগে আছেন?”
মেজর দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন,”দিন দুয়েকের মধ্যেই খুন হয়ে গিয়েছিল, বাঁচাতে পারিনি।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here