বিপ্লবের সন্ধান

0

Last Updated on

পথিক শাহু


পুচুবাবু বড্ড পরশ্রীকাতর মানুষ। থেকে থেকে ক্ষেপে উঠে গা ঝাড়া দিয়ে নিজের দৈন্যতার ক্লেশ শ্রেনীশত্রুর নামে পার্সেল করে দেন। পরম পরাক্রমে জগতের মঙ্গলের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। কেবল চিন্তাই পারে এই জগত পালটে দিতে। উনি মস্তিষ্ক ব্যাবহার করতে থাকেন চা পানের সাথে। সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে কর্ম্যোদ্যোগীদের সমৃদ্ধি ছেঁটে ভারসাম্য তৈরীর অকুন্ঠ প্রয়াস জারী রাখেন নিজের প্রতিবাদী ভাষায়। তাঁর কাছে এটাই সাম্যের গান। ধনীর ধনে টানমেরে আর মানীর মানে খোঁচা মেরে বিপ্লবে বাজার গড়েন।
শরতের সকাল, সোনালী আলোয় চনমনে মনে হৃদয়ে পেজাতুলোর চাষ করছিলেন তখন। পুঁজিবাদ অগ্রাহ্য করে কার কাপড় টেনে কাকে পরাবেন এমনতর অভিনব বস্ত্রশিল্পে লকআউটের সম্ভাবনা দেখা দিল কাঁচামালের আমদানি সমস্যায়! তুলো চাষে অকাল বর্ষণ করে চলেছে নিজের সন্তান! সাথে স্ত্রীর বজ্র হুমকি। দুদিন বাকি দুর্গা পূজো, সন্তানের বেয়ানাক্কা বস্ত্র বায়নায় বিরক্তি চেপে দুর্জ্ঞেয় হাসি হেসে সকালে পুচুবাবু বাজারে বেরোলেন।
বিপ্লবে অযাচিত বাধায় যত রাগ প্রথমেই উগরে দিলেন দুর্গার ওপরে!

তোমার দুর্গা বৈভবে মেতে কাশে হিল্লোল তোলে
পথ্য পায়নি আমার দুর্গা, সারা রাত কেশে চলে!
মনে হওয়া মাত্র সামনের মিত্তিরদের সাদা দেওয়ালে দিলেন ইট ভাঙ্গা দিয়ে লিখে। জমাটি বিপ্লব হয়েছে ভেবে উৎফুল্ল চুনুবাবু নিজের অপারগতা জাত দারিদ্র্যের এমন বানিজ্যিকরনের মূলধন সেই ইট ভাঙ্গা ছুঁড়ে দিলেন পথের ধারে।
মিত্তিরদের বাড়ির কাজের মেয়ে সবে সাত সকালে বাড়িতে ঢুকবে, পড়বি পড়, ছোটো ইট ভাঙ্গাটা তারি গায়ে পড়ল!
একদম গায়ে এবং পিত্তে আগুন জ্বালিয়ে সাত পাড়া ব্রম্ভতালুতে তুলে মিত্তিরবাবুকে ডাকে কাজের মেয়ে।
-কাকামশাই, আপনার প্রাচীরের দেওয়ালে কালকের মিনসে ফের কীসব লিখে পালাচ্ছে। টমিকে লেলিয়ে দিন, নাহলে পালাবে!

টমি ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধস্তাধস্তি শুরু করে পুচুবাবুর সাথে। বিস্তর লোক জড়ো হয়ে যায়! পুচুবাবু বকেঝকে কোনোভাবেই থামাতে পারেন না!
পিছনে পিছনে মিত্তির বাবু এসে দেওয়ালে লেখা দেখলেন। কুকুরকে কথায় না শান্ত করতে পেরে চেন টেনে ধরলেন।
বিপ্লব বিধ্বস্ত পুচুবাপু, সক্ষেদে বললেন, আমায় এভাবে গোটা গায়ে, মুখে কুকুর দিয়ে মাংস মাখালেন কেন?
কুকুরটা দিশি, ছোটবেলায় ভাগাড়ের মাংসে বড় হয়েছে! ভাগাড়ের মাংস এতদিন লোকে হোটেল-রেস্তোরায় খেত বলে এরা পেত না। কিছু মাস আগে সরকার ধরপাকড় করায় ইদানিং ভাগাড়ে মরাপশু পড়ে থাকে। সেখান থেকেই একটুকরো শূয়োর মাংস টমি নিয়ে চলে আসে মিনিট কয়েক আগে। আমি ওকে ফেলে আসতে বলি, আর এই সময়েই মাসি টমিকে লেলিয়ে দেয়।

  • আপনি শুয়োর মাখালেন গায়ে?
  • কেন, আপনারাতো সাম্যবাদী! যদ্দুর জানি গরু-শুয়োরেও ফারাক করেন না।
  • শুয়োর এক কমিউনিটি খায়, এক কমিউনিটি খায় না। এটা কমিউন্যাল। পুচুবাবু গম্ভীর ভাবে বললেন।
  • বেশ করেছে মাখিয়ে। দেওয়ালের এইসব লেখা, অশ্লীল লেখা কি আপনি লিখেছিলেন?
  • অশ্লীলের কী আছে? বলুন এক টুকরো কাপড় ছিল না! সে জন্যই বস্ত্র বিপ্লবের জন্য পুঁজিহীন বিপ্লব গড়া দরকার। বুর্জোয়ার কাপড় খুলে হেব্লাগুলোকে ঝেড়ে কাপড় পরানো দরকার। তাতে বিপ্লবও হয়, ভোটও আসে!… হুম, আপনার কাপড়ে তবে কেউ আগেই টান মেরেছে, তাই বস্ত্র না থাকায় আপনাকে অশ্লীল লাগছে! আমরা বিপ্লবী, কিন্তু পারভার্টেড নই! আমাদের জনসমর্থন বাড়ছে দেখছি! কিন্তু, আপনার কুকুর আমাদের বিপ্লবের কী বোঝে যে এমন করে ছেড়েদিল!
  • আমি গাড়িতে টমিকে নিয়ে সেদিন যাদবপুরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। যাদবপুর বিপ্লবে গরম তখন। রাস্তার মাঝে সেদিন ভালোবাসার ঢল। আপনি গালে দাঁড়ি, কাঁধে ব্যাগ নিয়ে যাচ্ছেন দেখে প্রথমে কুকুরটা ঝাঁপিয়ে পড়লেও ও পরে ছেড়ে দেয়। বিপ্লবিদের ও নিজের লোক মনে করে!
    খোঁচাটা বুঝে পুচুবাবু বললেন, আপনি যা করলেন, তা ক্ষমাহীন অপরাধ! বুর্জোয়াদের মত কুকুর লেলিয়ে জনকন্ঠ দাবিয়ে রাখতে চাইছেন!
  • না… আমরা অত্যন্ত দুঃখিত! আপনি আমাদের বাড়িতে আসুন। স্নান করে পরিষ্কার পাজামা পাঞ্জাবি পরে, চা খেয়ে যাবেন আসুন।
    না না, কুকুরের মুখে আসলে মাংস ছিল না। ও ঘেউ করতে গিয়েই মাংস পড়ে যায়। আর তেমন কিছু হয়নি।
    এক বাক্যেই পর্কের টাচ অগ্রাহ্যকরে নিজের বিপ্লবী স্ট্যাটাস বাঁচিয়ে দিলেন অভুতপূর্ব বাকমুনসিয়ানায়!
    কুকুরের পরীক্ষায় পাশ করে হর্ষ চিত্তে পুচুবাবু এগিয়ে চললেন মাথায় বৃহত্তর বিপ্লবের চিন্তা করতে করতে। পকেট থেকে স্মার্টফোন বের করে সোশাল মিডিয়ায় স্ট্যাটাস দিলেন, ‘’বুর্জোয়া মালিকের হাত থেকে পরিচারিকা উদ্ধারে নেমেছিলাম। কুকুর লেলিয়ে শ্রেনী সংগ্রাম স্তব্ধ করতে চেয়েছিলেন সেই বুর্জোয়া। পরিচারকাকে তাঁর স্বামীর কাছে ফিরিয়ে দেই। বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!’’

ছবি শুভাশিস মজুমদার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here