একটা নাম দিতে হবে

1

Last Updated on

মণিরত্ন মুখোপাধ্যায়

এক

আমি আরও পড়তে চাইছিলাম। আমার পড়া চালাতে কোনও দিক থেকেই অসুবিধে ছিলনা। ভালভাবে মাধ্যমিক পাশ করেছি, আশা করছিলাম ভালভাবেই উচ্চমাধ্যমিকটা পাশ করে বিএ পড়ব। তারপর চাকরির পরীক্ষাগুলোতে বসব। পরের পর কেমন করে এগুবো সব ছক কষে রেখেছিলাম। আসলে আমাদের অঙ্কের মাস্টার মশাই বিধুবাবু আমাদের প্রত্যেককে বলেছিলেন কার দ্বারা কতটা পড়া সম্ভব। কার কোন ধরণের যোগ্যতা আছে। আমার দিকটাতে অসুবিধে একটাই। আমি চাষীর বাড়ির ছেলে। আমাদের বাড়িতে লেখাপড়ার বেশি চল নেই। বাবা জ্যাঠারা প্রাইমারি পাশ করেই ক্ষেত খামারের কাজে লেগে পড়েছে। তাতে ক্ষতি হয়নি কিছু। আমিই বরঞ্চ অনেক বেশি পড়ে ফেলেছি। বাবা আমাকে বলল,
— তোকে হোষ্টেলে রেখে পড়াতে গেলে আমার আর ছেলে মেয়েগুলো খেতে পাবেনা। এবার তুই রোজগারের চেষ্টা কর।
আমার বুকটা ধ্বক্ করে উঠল। একনম্বর, আমি আর পড়তে পারব না। দুই, মাধ্যমিক পাশ করে আমি হাতিঘোড়া কী এমন রোজগার করতে পারব? অতএব আমি বেকার হয়ে বসে রইলাম আর পাঁচটা ছেলের মত। আমার মুস্কিল হচ্ছিল চাষবাসের কাজে হাত লাগাতে। লেখাপড়া শিখে শেষে চাষের কাজে হাত লাগাব? কবে থেকে ভেবে রেখেছিলাম অন্তত বিএ পাশ করব, কমপিটিশনে বসব। একটা না একটা চাকরি পাবই পাব। বাবা রাজি হলনা, অতএব আমি বেকার হয়ে বসে রইলাম। আমার পরের ভাইটা বেশ কাজের ছেলে। যখন তার পনের বছর বয়েস, বাবার জমির কিছুটা অংশে, তা বিঘে দুয়েক হবে, সে দুটো শবজি ফলানোর চেষ্টা করল। তেমন ভাল ফলন হলনা। টমেটো লাগাল যে বার, সেবার বেশি বৃষ্টি হয়ে নষ্ট হয়ে গেল ফসল। যেবার বেগুন লাগালো, সেবার পোকা ধরে গিয়ে দাম ভাল পেলনা। তবে খরচ খরচা উঠে এল। তারপরের বছর করলা লাগালো, উচ্ছে নয়, করলা। এত ফলন হল যে খুব ভাল লাভ পেল। নিজেই পুঁটলি বেঁধে রোজ বাসের মাথায় তুলে দিত। ডানকুনির বাজারে তার চেনা ফড়ে ছিল, সে নামিয়ে নিত বাসের মাথা থেকে। কন্ডাক্টর ছেলেটাকেও কিছু পয়সা দিতে হত। এতসব আমার দ্বারা হবেনা কোনদিনই। ওর মত নিচের তলায় নামা আমার দ্বারা সম্ভব হবেনা। আমার জন্ম বাজারের তরি-তরকারির কারবারের জন্য নয়। তাহলে আমি কী করব?
এইসব ভাবতে ভাবতে আমার বয়েস বেড়ে গেল। খাইদাই আর এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াই উদ্দেশ্যহীণ হয়ে। নিজের ওপর ঘেন্না ধরে গেল, ঘেন্না ধরে গেল সবার ওপর। চারটে বছর এমনি করে কাটিয়ে দিলাম। সুখের কথা আমাদের বাড়িতে খাবার অভাব নেই, সুতরাং কেউ আমাকে সে বিষয়ে কিছু বললনা। আমার মা খুব ভাল মানুষ লোক, কখনও কারো সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে শুনিনি। কোনদিন বাপের বাড়িতে যায়নি মা। আমদের কোনও মামার বাড়ি ছিলনা। পুরুলিয়ার দিকে কোথাও ছিল বাপের বাড়ি শুনেছি। মোটকথা কুড়ি বছরের মাধ্যমিক পাশ বেকার ছেলের জন্যে আমার মা ছাড়া কারো চোখের মধ্যে দুশ্চিন্তার ছায়া দেখিনি। মা কতবার বলেছে
— যাবি ঘরের বাইরে? আমি চিঠি লিখে দেব, ওখানে কিছু না কিছু হয়ে যাবে দেখিস? মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকার চেয়ে তো ভাল হবে।
ওই কিছু না কিছু হয়ে যাবে কথাটা আমার ভাল লাগত না। কিছু না কিছু মানেটা কী? সেখানেও যদি আমাকে ক্ষেতে হাল ধরতে বলে তখন? আমি যে অত বয়েস পর্যন্ত কোনদিন হাল ধরিনি, বলদদের সঙ্গে চলাফেরা করিনি। তাদের শরীরের ভাষা, ব্যবহার চালচলন আমি কিছুই বুঝিনা। আমি কেমন করে অমন কাজ করব? মা বলল,
— তুই ওখানে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াতে পারিস। হাল ধরতে নাই বা জানলি। পৃথিবীতে তো আরও কত রকমের কাজ আছে। আমার কথা শোন, চলে যা, আমি বলছি তোর ভাল হবে।
কথাটা ফেল্‌না নয়। অনেকদিন ধরে তো চেষ্টা করে দেখলাম, কত দিক দিয়ে ভাবলাম, কত লোকের সঙ্গে দেখা করলাম। কিছুতেই কিছু হলনা। এটাকেও চেষ্টা করে দেখি। মা যা বলছে তা কতটা কাজের হবে সন্দেহ আছে। সবচেয়ে চিন্তা হচ্ছে দেশ ছাড়া হতে হবে। মাথার ওপর থেকে বাবা মায়ের ছাতাটা চলে যাবে। সেখানে নিজেকেই সব কিছু করতে হবে, রান্না খাওয়া থাকার ব্যবস্থা হয়ত আমাকেই করে নিতে হবে। মা বলল,
— তোকে আমি যাঁর কাছে পাঠাব তিনি একজন খুব ভাল লোক, ছেলের মত তোকে ভালবাসবেন দেখিস। তোর থাকা খাওয়ার সুবিধে অসুবিধে সব তিনি দেখে দেবেন। তবে তিনি বিয়ে থা করেন নি, সুতরাং মেয়েমানুষ নেই এমন ঘরে যে অসুবিধে হয় সেটা সহ্য করতে হবে। দরকার মত তুই নিজেও বিয়ে করে নিতে পারিস ওখানে।
নিজের ঠিকানাই তৈরি হলনা এখনও, মা আমাকে বিয়ে করে নিতে বলছে। বুদ্ধির বলিহারি। একটা কথা আমার মাথায় ঢুকেছে, সেটা হল কমাতে হবে, আমার নিজের চাহিদা কমাতে হবে। আমাকে তৈরি হতে হবে, আর এখানে থাকলে তৈরি হওয়া যাবেনা। আমি ওখানে গিয়ে পড়শুনাটা করতে পারব। প্রাইভেটে পাশ করতে পারব। টেন পাশ করেছি, পাঁচবছরের মাথায় বিএ পরীক্ষা দিতে পারব ইউনিভার্সিটি থেকে। আমার উত্তেজনা বেড়ে গেল। ঠিক আছে আমি যাব। কাজ করতে করতে পড়তে পারব। বাবার কাছ থেকে সাহায্য নেব না। কতবার মা বলেছে,
— তুই তো ছেলে, আমাদের মেয়েদেরই যত রকমের ভয় থাকে। মনে কর তুই মিলিটারিতে ভর্তি হয়েছিস, তোকে পাঠিয়ে দিয়েছে দূর দেশে। তারপর একদম অজানা জায়গায় তো যাচ্ছিস না। আমি চিঠি লিখে দেব, মণিকাকা মারা যাবার পর তাঁর ছেলে চন্দ্রদা এখন চালাচ্ছে। ওদের অনেক বড় কারবার, ইস্কুল আছে একটা, দোকান আছে একটা, চাষবাস তো আছেই। চলে যা চন্দ্রদার কাছে, কাজের অভাব হবেনা। ইচ্ছেমত যে কোনও একটাতে হাত লাগাতে পারবি।
এতসব কথার পরেও মনস্থির করতে পারছিলাম না। এটা আমার একটা দুর্বলতা আমি জানি। আর এই দুর্বলতার জন্যেই এতদিন ধরে বসেবসে অন্নধ্বংস করছি, ইচ্ছে থাকলেও কোনও কাজে হাত লাগাচ্ছিনা। একটা পান বিড়ির দোকান দিলেও কিছু তো রোজগার করতে পারতাম। অন্তত নিজের খরচটা চালাতে পারতাম। আমারও মনেমনে বিয়ে করার ইচ্ছে আছে। কিন্তু ইচ্ছে থাকলেই তো হবেনা, ব্যাটাছেলেদের রোজগার না থাকলে মেয়ের বাপ বিয়ে দেবে কেন? সে বউকে খাওয়াবে কী?
শেষ পর্যন্ত মায়ের বোঝানোটা কাজের হল। যেন মায়ের মন রাখতেই আমি রাজি হলাম। তাও দোনামনা করতে করতে একসপ্তাহ কেটে গেল। বাবা বলল,
— চন্দ্রদাকে মা চিঠি লিখে দেবে, তোর কোনও ভয় নেই। ঠাঁই নাড়া হলে দেখিস ভাল লাগবে। যেটা পছন্দ হয় করিস। চন্দ্রদা একা মানুষ, তোকে সঙ্গে পেলে সে মানুষটারও উপকার হবে।

দুই

হাওড়া থেকে পুরুলিয়ার ট্রেনে উঠে বসবার জায়গা পেয়েছিলাম জানলার পাশে। আমার সঙ্গে একটা বড় ব্যাগ, আর একটা ছোট ব্যাগে খাবার জিনিস, জলের বোতল। মা এত রকমের খাবার দিয়েছে সঙ্গে যে কোনও কিছু কেনার দরকার নেই। বাবা বলে দিয়েছিল হাওড়ায় প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দেবার সময়েই উঠে পড়বি, খালি কামরা দেখে জানলার ধারে বসবি। মন ভাল করে যা, তোর ভাল হবে। তুই তো আমাদের মত না, অন্য ধরণের। চন্দ্রদার হাতে পড়লে দেখিস সব দিক থেকেই ভাল হবে।
এখন জানলা দিয়ে আসা ফুরফুরে হাওয়ায় সত্যি মনটা ভাল হয়ে গেল। যেন মুক্তির স্বাদ পেলাম। একই জায়গা, একই লোকজন, একই প্রশ্ন প্রতিদিন শুনে শুনে বিরক্ত হচ্ছিলাম, সেটা কেটে গেল এইটুকু সময়ের মধ্যে। ঠিক করলাম চন্দ্রজেঠু যেমনই লোক হোন না কেন আমি ওঁর কাছেই থেকে যাব কিছুদিন, তারপর নিজেই কী কিছু করে নিতে পারব না? মা তো বলেছে ওদের অনেক বড় কারবার আছে, দোকান আছে, ইস্কুল আছে, চাষবাস আছে। আমি ইস্কুলটাতে মাষ্টারি করতে পারি। তবে আজকাল ইস্কুলে মাষ্টারি করতে গেলেও পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে হয়। আমি পারব কীনা কে জানে? পড়েছি তো মাত্র মাধ্যমিক পর্যন্ত, আমার এলেম কতটুকু তা তো আমি জানি। প্রাইমারি ক্লাসগুলোতে আমি পড়াতে পারি। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা আমার কাছে পড়বে, মাষ্টারমশাই মাষ্টারমশাই বলে পাশে পাশে ঘুরঘুর করবে। মন্দ কী? আমি অনেক সময় পাব নিজের পড়াশুনাটা করার।
ভাবতে ভাবতে বিকেল হয়ে গেল। শুনলাম আরও আধ ঘন্টা লাগবে আমার স্টেশন আসতে। এদিককার লোকে বড্ড বাড়িয়ে বলে, দশ মিনিটও লাগলনা স্টেশন এসে গেল। ট্রেনে শুনেছিলাম একটাই বাস ছাড়ে ট্রেনের যাত্রীদের নিয়ে, ভিড় হয় খুব। তাড়াতাড়ি করে ট্রেন থেকে নেমেও উঠতে পারলাম না বাসে। ভয় পেয়ে গেলাম, যদি বাসে উঠতে না পারি তাহলে এই নির্বান্ধব স্টেশন এলাকায় একা রাত কাটাব কেমন করে? কেউ একজন বলল ছাদে উঠে পরুন, হা্ওয়া খেতে খেতে চলে যাবেন। তাই করলাম, ছাদে উঠে মনেহল, বাবা বাঁচলাম। রাস্তায় পড়ে থাকতে হবেনা। আর কী আশ্চর্য কণ্ডাক্টর ছেলেটার তদারকে প্রতিটি যাত্রীরই স্থান হল বাসে। কাউকে পড়ে থাকতে হলনা। বাসটা চলতে লাগল, নড়তে নড়তে, দুলতে দুলতে বেশ ভালই চলতে লাগল। আমার নামার জায়গাটা ইস্কুলের সামনে, কয়েকটা দোকানও আছে, ওটাই বাসষ্টপ। নেমে এলাম, পয়সা দিলাম কণ্ডাক্টরকে। বাসটা চলে গেল ধুলো উড়িয়ে।
ভরা বিকেল, একলা আমি, অজানা জায়গা, বেশ ভয় ভয় করছে। সামনের দোকানে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, খদ্দের নেই, আমাকেই দেখছিল সে। এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম
— চন্দ্রনাথ প্রামাণিকের বাড়ি যাব। একটু দেখিয়ে দেবেন?
উত্তর না দিয়ে আমাকে দেখতে ব্যস্ত রইল মেয়েটা। তারপর যেন হঠাত মনে পড়েছে এমন ভাবে বলল
— কে হন জেঠু আপনার?
— কেউ হন না। আমাকে বাবা পাঠিয়েছে, একটা চিঠি আছে।
দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েটা বলল
— আসুন আমার সঙ্গে।
গোটা তিনেক দোকান পেরিয়ে একটা গলি মত কাঁচা রাস্তা, দুপাশে ছাড়া ছাড়া একটা একটা একতলা বাড়ি, তারপরেই লম্বা একটা দোতলা বাড়ি, অনেকগুলো ঘর ওপরে নিচে। মেয়েটা আমাকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিল ব্যারাকের মত বাড়িটাকে, তারপর সন্দেহের চোখে দেখতে দেখতে চলে গেল যেদিক থেকে এসেছিল। তার দোকানটা খোলা আছে। বোকার মত দাঁড়িয়ে আছি, ভাবছি এবার আমি কী করি? কেউ একজন বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল
— কি চাই?
–চন্দ্রনাথ প্রামাণিকের কাছে এসেছি।
— তো ওখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ভেতরে আসুন।
বাবার যদি চন্দ্রনাথদা হয়, তাহলে বাবার চেয়ে বয়েসে বড়ই হবেন তিনি। খালিগায়ে তক্তাপোষের ওপর বসে আছেন যিনি তিনিই হবেন চন্দ্রনাথ প্রামাণিক। পকেট থেকে মায়ের লেখা চিঠিটা বের করে তাঁর হাতে দিলাম। একটা চশমা পড়ে ছিল পাশে, সেটাকে নাকের ওপর লাগিয়ে পড়ন্ত বিকেলের কম আলোয় অনেক সময় নিয়ে পড়লেন চিঠিটা।
— তুমি তাহলে সোনার ছেলে? কী নাম তোমার?
— আমার নাম মলয় আদক, ডাকনাম পিন্টু।
— বেশ বেশ। ভোলা শোন্, পিন্টু এখানে কাজের জন্যে এসেছে, আমাদের এখানেই থাকবে। ওপরের খালি ঘরটা ওকে দেখিয়ে দে। যাও পিন্টু, আগে ঘরে যাও, হাত পা ধুয়ে নাও, জামা কাপড় পাল্টাও। তারপর এখানে এস আমার কাছে। কথাবার্তা বলব তোমার সঙ্গে। কলতলাটা ওকে দেখিয়ে দিস ভোলা।
বাড়িটার পেছনের দিকে হ্যাণ্ডপাম্প, কলতলা। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় ভোলা সব দেখিয়ে দিল। দিনের আলো কমে এলেও এখনও যথেষ্ট আছে। আমাদের গুড়াপের বাড়িতে ইলেকট্রিক আছে, এখানে মনেহয় নেই। দোতলার খালি ঘরটাতে কেউ থাকেনা, অতএব ধুলোভর্তি হয়ে আছে। একটা খালি তক্তপোষ, একটু যেন ছোট সাইজের, ঘরটার ঠিক মধ্যেখানে রাখা। কাঁধ থেকে ব্যাগটা তার ওপরেই নামিয়ে রাখলাম। এত তাড়াতাড়ি এর চেয়ে ভাল ব্যবস্থা আর কী হতে পারে? ভোলা দাঁড়িয়ে আছে, জুল জুল করে আমাকে দেখছে। আমি খাবার ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ঢকঢক করে আগে জল খেলাম। এখানে গরমটা বেশ। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ফ্যান নেই। দেওয়ালগুলোর দিকে দেখলাম, বিজলির আলো নেই। তা হোকগে, না থাকুক বিজলির আলো-ফ্যান, একটা ঘর পেয়েছি আমার নিজের জন্যে এই না কত। গামছা আর পাজামা বের করলাম। সারা দিনের ধকলের পর কলতলায় একটু চান টান করে নিতে পারলে মন্দ হয়না। দুটো জানালা বন্ধ ছিল, ভোলা খুলে দিল। একদিকের জানলা দিয়ে রাস্তাটা দেখা যায়। সেদিকে কোনও ইলেকট্রিকের খুঁটি নজরে পড়লনা। দুজনে বেরিয়ে এলাম।
সত্যি সত্যি ভাল করে চান করলাম, সাবান বের করা হয়নি। তার কোন দরকারও ছিলনা উপস্থিত। বালতি ছিল, মগ ছিল, একটা সিমেন্টের ঘরের মত ছিল, সেটা বাথরুম। ব্যবস্থাটা মন্দ নয়। সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে। ভিজে গামছা তারে মেলে পাজামা গেঞ্জি পরে চব্দ্রজেঠুর ঘরে এলাম। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলাম। উনি তেমনি একজাগাতেই বসে আছেন। বললেন
— থাক থাক, সুখে থাকো আশীর্বাদ করলাম। আমাদের এখানে অনেক সুখ, দুঃখও আছে, কিন্তু কম কম। চা খাবে?
— এখন আমি চা খাবনা। আমার কাজকর্ম কিছু এখানে হয়ে যাবে?
— নিশ্চয় হয়ে যাবে, কত কাজ আমাদের এখানে। সে জন্যে ভেবোনা।
— মাও তাই বলেছিল। কিন্তু আমি যে আরও পড়াশুনা করতে চাই। কতদিন বেকার হয়ে বসে আছি।
— তোমার মা-বাবা আমার খুব কাছের মানুষ ছিল। বিয়ে হয়ে চলে গেছে ওরা। কতদিন দেখিনি। ছেলেটাই কতবড় হয়ে গেছে ওদের। ভাল কথা, আমাদের রাতের বেলা খেতে খেতে ন’টা বেজে যায়। ঝিমলি এখুনি আসবে, এসে ভাত চড়াবে। সকালের ডাল তরকারি আছে, খালি ভাতক’টা হলেই হবে। দু একটা দিন তোমার খেতে অসুবিধে হতে পারে, মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ কোথায় পাবে এখানে? আমরা তিনজন ছিলাম, তুমি এলে, এখন চারজন হল।
ভোলা তিনটে কেরাসিন তেলের লন্ঠন জ্বেলে নিয়ে এল। দুটোকে কমিয়ে রাখল একদিকে। ঘরটাতে আলোআঁধারির খেলাটা এবার জমল আরো ভাল করে। এত কম আলোতে আমার অভ্যেস নেই। ঘরের মধ্যে একটা আলনা আর দুটো চেয়ার ছাড়া বিশেষ আসবাব নেই। আলনাতে অগোছালো ভাবে কয়েকটা ধুতি শার্ট রাখা আছে। চন্দ্রজেঠু বললেন
— আমি বেশি চলাফেরা করতে পারিনা, বসে বসেই থাকি। আমাদের একটা দোকান আছে, বাসরাস্তার ওপর। দেখাশোনার অভাবে ভাল চলেনা সেটা। ঝিমলি আর কত পারবে, ছেলেমানুষ। তবু ও আছে বলে আমরা বেঁচে আছি।
সেই মেয়েটাই, যে আমাকে বাড়ি পর্যন্ত এনেছিল সঙ্গে করে, সেই মেয়েটাই ঝিমলি। ঘরে ঢুকে বিনাদ্বিধায় সে আমার পাশের চেয়ারে বসে পড়ল, বলল
— জেঠু, নতুন অতিথিকে নিয়ে আমরা চারজন হলাম। আজ ভাত না রুটি খাবে?
— শোন ঝিমলি, এর নাম পিন্টু। এর মা-বাবা আমার ছোটবেলাকার চেনা মানুষ। ছেলেটাকে পাঠিয়েছে এখানে আমাকে সাহায্য করতে। পাশ টাশ করে বসেছিল, আরও পড়তে চায়। ওর সঙ্গে পরামর্শ করে দোকানটাকে ভালকরে চালা, দেখি কত তোর বুদ্ধি?
মেয়েটা আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত জরিপ করল ভাল করে। আমিও মেয়েটাকে ভাল করে দেখলাম। মা বলেছে দরকার পড়লে এখানেই একটা বিয়ে করে নিতে পারি। এই মেয়েটা কেমন হবে? কিন্তু এ হয়ত ভোলার বউ। আমি অনেক কিছু ভেবে নিয়েছি এর মধ্যেই। ওসব বাজে চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিলাম। ঝিমলির দোকানের চেয়ে ইস্কুলটাই তো ভাল। ওখানে মাষ্টারির কাজ পেলে আমার উপযুক্ত হয়। আমি আরও পড়বার সময় পাই, কিছু টাকা মাইনেও পাই।
কেউ বলেনি আমাকে, অথচ লন্ঠন হাতে ঝিমলি বেরিয়ে গেলে আমিও তার পেছন পেছন গেলাম, দেখতে গেলাম রান্নার বিলি ব্যবস্থাটা কেমন। একটা মেয়ে দোকান বন্ধ করে এইমাত্র এল, এসেই রান্নার কাজে লেগে পড়েছে আমার জন্যে। তাকে আমি কিছুটা সাহায্য করতে পারি। অবশ্য কী আর সাহায্য করতে পারব আমি?
নিচের তলার পাশাপাশি তিনটে ঘরের মধ্যে একটা হল রান্নাঘর। শেকল তোলা ছিল সেটাতে। রান্নাঘরে ঢুকে আমাকে দেখল ঝিমলি, বলল
— আপনি এখন জেঠুর কাছে বসুন। আমার এখানে কোনও কাজ নেই আপনার। ওপরের খালি ঘরটাতে থাকতে দিয়েছে জেঠু?
— ওপরের ঘরে ব্যাগটা রেখেছি। আপনার কোন কাজ থাকলে আমাকে বলতে পারেন।
— রান্নার এখন অনেক দেরি। বাড়ি কোথায়, বাড়িতে কে কে আছে?
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল। এই ঘরটাতে অন্ধকার আরও বেশি। তবে আধো-অন্ধকারের একটা মহিমা আছে। ঝিমলিকে বেশ সুন্দর দেখালো। এর মনটা সুন্দর, কথাবার্তা অনেক মার্জিত, আশাতিরিক্ত ভাল। আমার এসে পড়ায় কোন রকমের তিক্ততা নেই এর মুখের ভাষায়। বললাম,
— বাড়িতে সবাই আছে, কিন্তু আমি অনেকদিন ধরে বেকার বসে ছিলাম। খুব মনখারাপ করতাম। মা বলল চলে যা চন্দ্রদার কাছে। কিছু একটা হয়ে যাবে। আপনাদের অনেক কষ্ট হবে আমার সেবা করতে করতে।
— কিসের কষ্ট? ছিলাম তিনজন, একা একা থাকতাম, তবু তো নতুন মুখ, তবু তো নতুন হাওয়া এল। এই যে আপনি পেছন পেছন এলেন, কই ভোলা তো কোন দিন আসেনি দেখতে আমি কী করছি?
— না, মানে আমার মনে হল আমি এসে পড়ায় যেন কোন অসুবিধে না হয়, তাই সঙ্গে এলাম। আবার মনে হয়েছিল আপনি হয়ত ভোলার বউ।
হেসে ফেলল ঝিমলি, অন্ধকারের মধ্যে, সামান্য রিন রিন শব্দ হল। অল্প আলোয় দাঁতের সারি দেখা গেল। বোকার মত আমিও একটু হাসলাম। হাঁড়ির ঢাকা খুলে, বাটির ঢাকা খুলে ঝিমলি দেখে নিল রান্নার কতটা কী আছে। একটা তোলা উনুন বাইরে নিয়ে এল, ছাই ঝাড়ল, ঘুঁটে কয়লা সাজালো। কায়েকটা কাগজ জ্বেলে তলায় রাখল। বলল
— উনুনটা ধরুক, আমি ততক্ষণ গা ধুয়ে আসি। আপনি জেঠুর কাছে বসুন। রান্নার সময় আপনার গল্প শুনব।

তিন

আমার আবার গল্প কী? গল্প তো এখানে। জেঠু আছে, তাঁর গল্প আছে। ভোলা আছে, তারও নিশ্চয় একটা গল্প আছে। তারপর ঝিমলি, তারও গল্প আছে। উঠোনটাকে দুপাক ঘুরতে ঘুরতে কতকিছু ভাবছিলাম। ভোলা বা ঝিমলি হয়ত কোনদিন আমার মত করে জেঠুর দরবারে এসে পড়েছিল, ছাড়া পায়নি এখান থেকে। জেঠুর কাছে অনেক কাজ, তারই একটা আধটা করে দিচ্ছে ওরা। পরিবর্তে খেতে পাচ্ছে, শুতে পাচ্ছে। কিন্তু তাতে ওদের চিন্তা কমেছে কী? ঝিমলি ছিল, ভোলা ছিল, এখন তাতে যোগ দিলাম আমি, পিন্টু। এই তিন তিনটে প্রাণীর ভবিষ্যতটা কী? ভবিষ্যতকে ভাগ্য বলে উড়িয়ে দিলে তো চলবেনা, নিজের হাতেও তো কিছু আছে, না নেই? মাকে চিঠি লিখতে হবে, বলতে হবে ঠিক মত পৌঁছে গেছি, থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা ঠিক মতই হয়েছে। ঠিকানাটা দিতে হবে, যদি চিঠিপত্র লেখে মা।
জেঠুর ঘরে এসে বসলাম। একা একা ভুতের মত বসে আছেন জেঠু। বললাম
— দেখে এলাম ঝিমলির রান্নাঘরটা। বেশ ভাল মেয়ে।
— ভাল মেয়ে বলেই তো টিঁকে গেল আমার কাছে। তুমিও ভাল হয়ে যাও, টেঁকে যাবে। ভালরাই টেঁকসই হয়।
— ভোলাকে দেখছিনা? কোথায় গেল সে?
–- গাঁজা খেতে গেছে। এটা ওর গাঁজা খাবার সময়।
আমি হঠাত চুপ করে গেলাম। জেঠু বলছে ভোলা গাঁজা খেতে গেছে। এবং কথাটা এমন করে বলছে যেন ওটা তেমন কিছু ব্যাপার নয়। যেন এককাপ চা খেতে গেছে। চা খাওয়া আর গাঁজা খাওয়া যেন কাছাকাছি। যেন গাঁজা খেলে চা খাওয়ার চেয়ে বেশি কিছু ক্ষতি হয়না। ওটাও এক ধরনের নেশা, তবে অন্যান্য ভয়ঙ্কর নেশাগুলোর থেকে অনেক ভাল। জেঠু বলল
— ঝিমলি গা ধুতে যাবার আগে তোমার ঘরটাকে ধুলো ঝেড়ে খানিকটা পরিষ্কার করে দেবে, ঝাঁটপাঁট দিয়ে দেবে। এসব কথা ওকে বলে দিতে হয়না। একটা লন্ঠন আজ থেকে তোমার জন্যে ও বরাদ্দ করেছে। একফাঁকে বলে গেল তোমার পিন্টুবাবুর একটু উড়ুউড়ু স্বভাব আছে। তবে মোটের ওপর ভাল মানুষ মনে হচ্ছে। বলল, তুমি নাকী আমার এখানে টেঁকে যেতে পার। আজ আকাশে একটু আলো পাবে তুমি পিন্টু, দ্বাদশী হবে হয়ত। কাল থেকে কয়েকটা রাতে ভগবানের দেওয়া আলো পাবে। মন দিয়ে উপভোগ করবে আলো, তাঁর ভাল লাগবে। দিনের আলোর থেকে রাতের আলো ভাল, শরীর মন ভাল করে দেয়।
জেঠু চুপ করে কিছু ভাবতে লাগল অন্য দিকে চেয়ে। উদাস ভঙ্গিটার দিকে চেয়ে রইলাম আমি। মানুষটাকে আমি পছন্দ করে ফেললাম। একটু যেন ভক্তি ভক্তি ভাব আছে ওঁর মনে। মানুষকে ভালবাসা দিতে জানেন মনেহয়। উনি চুপ করে আছেন দেখে আমিও চুপ করে রইলাম। দরজার ওদিক থেকে ইশারায় আমাকে ডেকে নিল ঝিমলি।
অন্ধকার বারান্দাটা দিয়ে ঝিমলির পেছন পেছন পেরিয়ে এসে রান্নাঘরে ঢুকলাম। আমিও গ্রামের ছেলে, সেখানেও সব জায়গায় আলো থাকেনা শহরের মত। তবু অন্ধকারটা পেরিয়ে আলোতে এসে ভাল লাগল। এখানে ঝিমলি আমার চেয়ে এক্সপার্ট। বলল
— উঠোনে উনুনটা ধরে গেছে। ওটাকে নিয়ে আসতে পারবেন?
আমি কোনদিন এসব কাজ করিনি। জ্বলন্ত উনুন কেমন করে আনতে হয় আমি জানিনা। ভাবছিলাম কী করি?
— এই চাটুটা আর এই কাপড়টা নিয়ে যান। চাটুটা আঁচের ওপর বসিয়ে দিলে হাতে আঁচ লাগবেনা। আর কাপড় দিয়ে হ্যাণ্ডেলটা ধরবেন, কেমন? ওটা গরম হতে পারে।
এরা মেয়েরা কত টেকনিক জানে। উনুনটা নিয়ে আসার সময় সে লন্ঠনটা নিয়ে আগে আগে চলছিল। বলল
— এই প্রথমবার উনুন ধরেছেন হাতে, তাই না?
উত্তর দিলাম না আমি। হঠাত করে আমাকে দিয়ে উনুনটা আনানো হল কেন? এও কী তার একটা খেলা নাকী? একটু আগেই আমার নামে জেঠুকে বলে এসেছে, উড়ুউড়ু স্বভাব আছে আমার মধ্যে। কী করে বুঝল ও? পিঁড়িটা পেতে দিল একদিকে, ইশারায় বলল, বসুন।
–জেঠুর এখন একটু একলা থাকার অভ্যেস, ভগবানের চিন্তা করেন। আর হয়ত ভাবছেন আপনাকে দিয়ে উনুনটা আনালাম কেন? বুঝে নিলাম সাংসারিক ব্যাপারে আপনি কতটা উপযুক্ত। একদম অভ্যেস নেই, নয়?
কথা বলতে বলতে মাটির হাঁড়িটা ধুয়ে ফেলল ঝিমলি, উনুনে বসিয়ে জল দিল মগে করে চার মগ। চাল বের করল একটা প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে, চালগুলোকে ধুয়ে হাঁড়িতে দিল, ঢাকা দিল একটা মাটির সরা। কত সাবলীল ওর কাজ করা, কত সহজ ওর কথা বলা।
— এবার বলুন আপনার গল্পটা শুনি।
আমার আবার গল্প কীসের? টপ করে ফুরিয়ে গেল। দুবার বললাম – আমার পড়ার ইচ্ছের কথাটা। বললাম আপনার গল্পটা শুনি। চন্দ্রজেঠুর কাছে কেমন করে এসে পড়লেন? এমন করে একা একা থাকেন, ভয় করেনা?
— যে পাঁকে পড়েছিলাম সেখান থেকে যে কোনদিন বেরিয়ে আসতে পারব মনেই হয়নি। সব বলব, একটু একটু করে সব বলব। কত সুখে আছি এখানে, ভাবতেই পারিনা।
বড় করে নিঃশ্বাস ফেলল ঝিমলি। ওকে আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলাম না। চুপ করে গেলাম। আমি ভাবতাম আমারই ভাগ্যটা ভাল নয়, দুশ্চিন্তাটা আমারই বড্ড বেশি। পৃথিবীর কত মানুষ যে আমার থেকেও ভাগ্যহীণ সে সব তো জানি, কতবার কতলোকে আমাকে কতভাবে উপদেশ দিয়েছে। তবে এখন চোখের সামনে একজনকে দেখে খারাপ লাগছিল।
— এখন আপনি রয়েছেন সামনে, এখন সাহসটা অনেক বেড়ে গেছে। জেঠুর ঘরের তাকে একটা ঘড়ি আছে, দেখে আসুন তো ক’টা বাজল।
ঘড়ি দেখে এলাম মোটে সাড়ে সাতটা বেজেছে। আমার জন্যে নির্ধারিত লন্ঠনটা জেঠুর ঘরে কমিয়ে রাখা ছিল, সেটাকে হাতে করে আসার সময় দেখে নিলাম জেঠুর চোখদুটো বন্ধ হয়ে আছে, শরীরটা স্থির। কোনও আওয়াজ দিলনা আমাকে। হয়ত বুঝতেই পারেনি যে আমি ঘরে ঢুকেছি। রান্নাঘরে ফিরে এসে বললাম
— সাড়ে সাতটা বেজেছে। জেঠু কিন্তু কোনও আওয়াজ দিল না। ধ্যান করছে বুঝি?
— এই সময়টাতে একঘন্টা জেঠু ঈশ্বরের নাম করে। ধ্যান করে কীনা আমি বলতে পারবনা। তবে এই সময় আমরা জেঠুকে বিরক্ত করিনা, কথা বলিনা। এবার ভোলার আসার সময় হয়েছে। ও কিন্তু বেশ ভাল গান করতে পারে। প্রতিটি মানুষের মধ্যে কিছু না কিছু ভাল গুণ থাকে।
— একমাত্র আমি ছাড়া। আমার ভাল গুণ বলে কিছু আছে বলে মনে করিনা।
— আপনিও গুণের অধিকারি। একটা কথা বলব? থেকে যান এখানে। মন ভাল হয়ে যাবে। জেঠু আছে, ভোলা আছে, আমি আছি। আমরা সবাই মিলে আপনাকে দেখব। সুখে ভাসিয়ে দেব আপনাকে। দুঃখ তো আছেই, তাকে পরোয়া করতে নেই। ওই দেখুন, লেকচার দিতে শুরু করেছি। খুব বাজে স্বভাব আমার।
সরার পাশ থেকে ভাপ বের হচ্ছে দেখে সেটাকে সরিয়ে হাতা দিয়ে ভেতরটা নেড়ে দিল। আবার ঢাকা দিয়ে দিল।
— জেঠু বলেছে, দোকানটা চালা দেখি দুজনে মিলে, দেখি তোর কত বুদ্ধি? আসুন না আমার সঙ্গে, একার দ্বারা কী হয়?
ঝিমলি কথা বলছিল, ওর গলাটা বেশ মায়াবী, বলছিল দোকানটা জেঠু কিনেছিল অন্য একজনের টাকায়। সেই টাকাটা সে শোধ নেয়নি। ওটাই এখন জেঠুর অবলম্বন। জমিজায়গা সামান্যই আছে। হবে বিঘে দশেক। ভাগচাষীরা হাত তুলে যা দেয় তাই দিয়ে খাবার চালটা হয়ে যায়। এই বাড়িটার পেছনে যে জমিটা রয়েছে, বিঘে চারেক হবে, ততে ভোলা একজনকে সঙ্গে নিয়ে কুমড়ো, সিম এইসব লাগায়। একটা পাতকুয়ো কেটেছে, সেখান থেকে জল তুলে তুলে জমিতে দেয়। মোটকথা ভোলা নিজের খরচটা তুলে আনে। আর আমি দোকানটা দেখি। আমরা সকলেই কিছু না কিছু রোজগার করি। আপনিও করবেন। যাক না দুটো দিন, একদম জলে তো পড়ে যাননি আমার মত। বড়বড় চোখে আমাকে দেখে নিল একবার, কী দেখল সেই জানে।
টগবগ আওয়াজ করে ভাত ফুটছিল, হাতায় করে কয়েকটা ভাত তুলে টিপে দেখে সন্তুষ্ট হল ঝিমলি। একটা গামলার ওপর ভাতের হাঁড়ি উপুর করল অভ্যস্ত হাতে। ফ্যানটা ঝড়তে লাগল গামলায়। উনুনে গনগনে আঁচ। ডালের বাটিটা বসাল উনুনে। তাতে একটু জল আর একটু নুন দিল। আমার জন্যে বোধহয় বাড়িয়ে নেওয়া হল। সেটা ফুটে উঠলে শাঁড়াশি দিয়ে ধরে নামিয়ে নিল। প্রতিটি কাজের সময় আমার ভয় করছিল, এই না মাটির হাঁড়ি ভেঙে যায়, এই না গরম ডাল ওর কোলের ওপর পড়ে। কিন্তু ওর কাজ করা এত সুন্দর সহজ ভাবে চলছিল যে আমার ভয়ের সত্যি কারণ ছিল না। কাজের সঙ্গে সঙ্গে ওর কথা বলাও চলছিল।
তবে যে বাবা বলে দিয়েছিল চন্দ্রদার কাছে অনেক কাজ, অনেক বড় ব্যবসা। কিছুই না, তেমন কিছুই না। একটা ঝিমধরা দোকান, একটা ঝিমধরা শাক-শবজির ক্ষেত, একজন ঝিমধরা প্রবীণ মানুষের পরিচালনার সংসার, তেমন কিছুই না। তবু ঝিমলি বলেছে আপনিও গুণের অধিকারি, আপনি থেকে যান, আমরা সবাই মিলে আপনাকে সুখ দেব। কী সুখ আমাকে দেবে এরা সবাই মিলে?
আর ঝিমলি যদি পারে আমি কেন পারব না? আমি একটা গোটা পুরুষ মানুষ। ঝিমলি যদি পাঁক থেকে উঠে আসতে পারে তাহলে আমিও পারব। তবে ও সত্যি গুণী মেয়ে। একা একা নিজেকে চালাচ্ছে তো। গুচ্ছের টাকা নেই ওর, তবু যা আছে তাতেই সুখি।
একটা মোটে তরকারি, সেটা অনেকটা আছে, লোহার কড়াতে গরম করল ভাল করে। জোরে জোরে নাড়ল হাতা দিয়ে। বেশ সুন্দর গন্ধ বের হল। ঝিমলি মেয়েটা কেমন পারে রান্নাবান্না করতে, রান্নায় ভাল গন্ধ বার করতে। আমি কিছুতেই পারব না ওর মত। মেয়েদের ওটা সহজাত প্রতিভা। রান্নার শেষ হল এবং তখুনি গান শোনা গেল রাস্তার দিক থেকে, শ্যামা সঙ্গীত, চমৎকার গলা। ঝিমলি বলল
— ভোলা এল, গানের আওয়াজে জেঠুর ভগবানের নাম করার ইতি হবে। গাঁজা খেলেও ভোলা খুব ভালমানুষ। জানেন, ওরা বেশ অবস্থাপন্ন পরিবার। বাড়িতে অনেক লোকজন, গরু বাছুর, জমি জিরেত। ওর গাঁজার নেশা আর গানের নেশা ছাড়াতে না পেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল ওর বাবা। তারপর কতবার এল ওরা, দলবল নিয়ে এল। পার্টিকে জানিয়েছিল, তারাও এসেছিল। তারপর কারা যেন জেঠুকে শাসাতে এসেছিল। জেঠু বলেছিল পায়ে বেড়ি পরানো নেই, নিয়ে যান আপনারা। পারবেন না ধরে রাখতে। আপনারা ভালবাসতে জানেন না। ও যেখানে ভালবাসা পাবে সেখানেই থাকবে। নিয়ে যান আপনারা। ওরা জোর করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল, বেশ কয়েকদিন পরে ফিরল ভোলা, শরীর খুব খারাপ, গায়ে জ্বর, গাঁজা খেতে দেয়নি তবু চোখ লাল। দু-তিন দিন লাগল ঠিক হতে। এখনও মাঝে মাঝে কেউ না কেউ আসে। ওকে বলে, তোর বিয়ে দেব ভাল ঘরের মেয়ের সঙ্গে। আমাকে দেখিয়ে বলে, এই মেয়েটাকে ছাড়। এ তোকে তুক করেছে। একবার দোকানে এসেছিল আমার সঙ্গে কথা বলতে। বলেছিল কত টাকা চাই? আচ্ছা বলুন দেখি, আমি নাকী ভোলাকে বশ করেছি? কী সব বুদ্ধি!
কলতলা থেকে হাতপা ধুয়ে এল ভোলা। রান্নাঘরে আমরা তখনও ওকে নিয়েই গল্প করছি। একগাল হাসল আমাকে দেখে, সে হাসির তুলনা হয়না। ভোলা সত্যি গুণের মানুষ, নাহলে অমন করে হাসতে পারত না, অমন করে গাইতেও পারত না। ঝিমলি ওকে সত্যি ভালবাসে। নইলে কবেই ও পালিয়ে যেত একটু ভালবাসার খোঁজে। আমার আন্দাজ ঠিক ছিল, ভোলাকে বিয়ে করে নিতে পারত ঝিমলি। কেন করেনি সেই জানে।

চার

রাতে একদম ঘুম হলনা আমার। একে নতুন জায়গা, তায় চৌকিটার ওপর মাত্র একটা শতরঞ্চি পাতা। তোষক নেই, চাদর নেই। দু-একটা মশা কামড়েছে আমাকে। এমনিতেও বেলা পর্যন্ত ঘুমোনো আমার ধাতে নেই। ঝিমলি কাল গা ধুতে যাবার আগে ঘরটাকে অনেকটা জুত করে দিয়েছিল। দুটো পেরেকের মধ্যে একটা দড়ি টাঙিয়ে রাস্তার জামাপ্যান্ট ঝুলিয়ে দিয়েছিল। এখন আমি ব্যাগটা খালি করে সব জামা কাপড়গুলোকেই দড়িতে ঝুলিয়ে রাখলাম। আমার ব্যাগে একটা গায়ে দেবার চাদর আছে, সেটাকেই শতরঞ্চির ওপর পেতে দিলাম। দুটো বই এনেছি, তার একটা ইংরিজি থেকে বাংলা ডিকশনারি, সেদুটোকে খাটের ওপর রাখলাম। ঘরটাকে এখন অনেক গোছানো লাগছে। খাবারের ছোট ব্যাগের ভেতর মা মিষ্টি দিয়েছিল প্যাকেটে করে। সেগুলো দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। কাল রাতে ভাত খাবার সময় মিষ্টিগুলো দিলে কাজে লাগত।
খাবার কথায় মনে পড়ল কাল রাতে রান্নাঘরে ঝিমলি আমাদের জায়গা করেছিল একদিকে দুটো পিঁড়ি, আর একদিকে দুটো আসন পেতে। আমি আর ঝিমলি পাশাপাশি বসেছিলাম। সামনে জেঠু আর ভোলা। ওরা দুজনে কথা কম বলছিল, ঝিমলিই কত রকমের প্রশ্নের উত্থাপন করছিল আর জেঠু তার সমাধান করে দিচ্ছিল। ঝিমলি বলল
— কাল থেকে পিন্টুবাবু তাহলে দোকানে বসবে।
— না, কাল থেকে পিন্টু তোর সঙ্গে দোকানে যাবে, দেখে নেবে বুঝে নেবে। দোকানটা তোর, তুই চালাবি, পিন্টু এখন তোর সহকারি। ওকে দোকানে রেখে তুই যখন ইচ্ছে বাড়ি আসতে পারবি এবার থেকে। পিন্টুকে ট্রেনিং দিবি।
— তাহলে ওর অবদান কী হবে?
— দোকানটাকে ভাল করতে গেলে কী করা দরকার ও দেখবে। পিন্টু, তুমি বুঝে দেখবে দোকানের উন্নতির জন্যে কী কী করা দরকার। অন্য কী কী মাল রাখতে পারা যায়, এইসব দেখবে। অন্য দোকানে রাখেনা এমন কী রাখা যায় আমাদের দোকানে তা বুঝে নেবে।
ভোলা বড়বড় গ্রাসে ভাত তুলছিল মুখে, যেন কতদিনের উপোষী। জেঠুর প্রতিটি কথায় মাথা নাড়ছিল। আমি ভাবছিলাম দোকানটা নিয়ে এদের বেশি মাথাব্যথা। আমার ইস্কুলের চাকরিটার কী হবে তা নিয়ে কথা বলছে না কেউ। ভেবে দেখলাম তাড়াতাড়ি করবনা। যাক না কয়েকটা দিন। বুঝে দেখি কতটা কী করতে পারব। তবে এরা কেউ লোক খারাপ নয়। সুতরাং আমি এখানে থেকে গেলে খারাপ হবেনা। একনজরে দোকানটাকে ভাল লাগেনি, তবে অন্য দোকানগুলোর মত ওটাকেও টেনে তোলা যায়। একা মেয়ে ঝিমলি ঘরের কাজ করে কত আর পারে। আমি এসেছি, আমি ওটার উন্নতি করব সেটাই সাধারণ কথা।
এখন সকাল বেলাতে আমি মিষ্টির বাক্সটা, দাঁতমাজার পেষ্ট আর ব্রাশ নিয়ে খুশি মনে নেমে এলাম। সকাল থেকেই আমাকে কাজে লাগতে হবে, ঝিমলির সঙ্গে দোকানে যেতে হবে। অলসের মত সময় নষ্ট করা ঠিক হবেনা। ভোলার ঘরটা আমার ঠিক পাশেরটা, আর ঝিমলিরটা তার পরে। পরপর তিনটে ঘর শোবার। নিচের তলায় শেষের ঘরটা জেঠুর, একটা রান্নাঘর, মাঝেরটা খালি, ওটাকে ষ্টোররুম বলা যেতে পারে, ভোলার চাষের কিছু মালপত্র ওখানে থাকে। ভোলার ঘরের দরজা খোলা, সেখানেও আমার ঘরের মতন একটা ছোট চৌকি পাতা। আমার ঘরের মতই তাতে আসবাব পত্র কিচ্ছু নেই। একটা দড়িতে কিছু ময়লা কাপড়চোপড় ঝুলছে। ঝিমলির ঘরের দরজা বন্ধ।
কলতলায় এসে ঝিমলির সঙ্গে দেখা। রাতের এঁটো বাসন নিয়ে মাজতে বসেছে। আমি মুখটা ধুয়ে বসে গেলাম মাজা বাসন গুলো ধুতে।
— আপনি বরঞ্চ বালতিতে জল ভরে দিন, তাতে বেশি উপকার হবে। একা হাতে কাজের বদলে দুজন হলে কত সুবিধে হয়। মা কী বলে দিয়েছে যে ওখানে গিয়ে সবার কাজে সাহয্য করে দিস?
— ওসব কিছু বলেনি মা। ভোলা কোথায় গেল?
— ভোর রাত থেকে শাকসবজি তোলে ভোলা, ঝুড়ি ভর্তি করে রাখে। ওর একজন সাকরেদ আছে, তার সঙ্গে একটা চাকা লাগানো ছোট ঠেলাতে করে নিয়ে চলে যায়। আমাদের দোকানটা খোলে, সেখানে ও সবজী বিক্রি করতে বসে যায়। ঘন্টা দুয়েক পরে আসবে, ক্ষেতে জল দেবার ব্যাপারটা দেখবে। ওর বেলা হয় ঘরে আসতে। চা খাবেন তো?
— পেলে ভাল, না পেলেও ক্ষতি নেই।
ঝুড়িতে করে বাসনপত্র হাতাখুন্তি ঝিমলি তুলে নিল কাঁখে, আমাকে দিল না। রান্নাঘরে এসে কেরাসিনের ষ্টোভে তিনকাপ জল বসাল। গুঁড়ো দুধের চা, আর সঙ্গে চারটে করে নান-খাটাই বিস্কুট, সকালের জলখাবার সকলের। ভোলা বাইরেই চা বিস্কুট কিছু খাবে।
আমি আর ঝিমলি তৈরি হয়ে নিলাম, দোকানে এসে ভোলাকে ছেড়ে দিলাম। ও এখন ক্ষেতের কাজে লাগবে। অনেক কাজ থাকে সেখানে। চার বিঘে জমিতে শবজি চাষ করা কম কথা নয়। এতদিন আমার চাষবাস নিয়ে কোনও মাথাব্যথা ছিলনা। আজকে সব কিছু বুঝে নিতে ইচ্ছে করছে। দোকানের বাইরে তিনটে ঝুড়িতে সিম বেগুন আর সবুজ টম্যটো পড়ে আছে। সবকটাই খারাপ, বাছাই করার পর বাদ পরা মাল। ঝিমলি বলল,
— দশটার সময় ওগুলোর জন্যে খদ্দের আসবে। তাতেও শেষ হবেনা, তখন আসবে কয়েকটা গাই গরু। তাদেরও কিছু পাওনা থাকে। তবে ওরা পয়সা দিতে পারবেনা।
আবার মিষ্টি করে হাসল ঝিমলি। ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিল আমাকে দোকানের জিনিসপত্র। এদিককার লোকের হাতে পয়সা কম। দোকানের সবকিছুই অল্পদামি জিনিস। ঝিমলির মহাজন আছে পুরুলিয়াতে। পাশের জামাকাপড়ের দোকান থেকে ফোন করে অর্ডার করতে হয়। কিংবা লোকের হাতে ফর্দ পাঠিয়ে দিতে হয়। এক একবার ভোলাও যায়, মাল নিয়ে আসে, টাকাকড়ি হিসেব করে দিয়ে আসে। এখন আমি এসেছি, একটু একটু করে সকলের সঙ্গে পরিচিত হব।
ঝিমলির দোকানটা বেশ গোলমেলে। এখানে গুঁড়ো চা, চিনি, ডালমুঠ, বিস্কুটের সঙ্গে মাথার কাঁটা আর হাওয়াই চটিও পাওয়া যায়। ইস্কুলের খাতা পেন্সিল শেলেট রাখা আছে একদিকে। যে জায়গার মানুষের যেমন চাহিদা।
— দু একটা ওষুধ বিষুধ রাখতে পারা যায়। আছে নাকি ওষুধের দোকান এদিকে?
— ওষুধের দোকান সেই পুরুলিয়াতে। এখানে একটা গামছা গেঞ্জি ফ্রকের দোকান আছে। একটা চায়ের দোকান, একটা পানবিড়ির দোকান। আর একটা আছে চাল ডাল নুন তেলের মুদিখানা। আমাদেরটই নানা বস্তুর দোকান। সকালে এটা শাক-শবজির দোকান, দুপুরে মনিহারি। আমাকে রান্না করতে যেতে হয়, তাই বারোটা থেকে চারটে পর্যন্ত দোকান বন্ধ থাকে।
কোন জিনিসটার কত দাম আমাকে বোঝাচ্ছিল ঝিমলি। আমি এখন ওর দোকানের সহকারি। দুপুরে যখন রান্না করতে যাবে, তখন আমাকে দেখতে হবে দোকানটা। খদ্দের এলে মাল বিক্রি করতে হবে। সামনের রাস্তাটা পুরুলিয়া যাবার বড় রাস্তার সঙ্গে গিয়ে মিলেছে। পুরুলিয়া যাবার রাস্তার ওপর বলে গ্রাম গ্রাম হলে কী হবে, বেশ কাজের জায়গা। ভোলার ক্ষেতের বাছাই করা বেগুন টমাটো সকালবেলাকার বাসে চলে গেছে। ওর মধ্যে আমি আমার ভাইকে দেখতে পেলাম। মন্দের ভাল আমার ভাই গাঁজা খায়না, কিন্তু সিগারেট খায়।
সারাটা দিন আমার কেটে গেল ঝিমলির সঙ্গে, দুপুরে একবার গিয়ে খেয়ে এসেছি। বিকেলের দিকে বাসটা চলে গেল, এটাতেই কাল আমি এসেছি। ঝিমলি বলল,
— চব্বিশ ঘন্টা হয়ে গেল আপনার এখানে আসা। কেমন লাগছে?
— মন থেকে বলব?
— বলুন বলুন।
— আপনি না থাকলে হয়ত একদম ভাল লাগত না। এখন অতটা খারাপ লাগছে না। আচ্ছা আমাদের মধ্যে আপনি আজ্ঞে করাটা বন্ধ করলে ভাল হয়না?
— নিশ্চয় হয়। আমিও তো তাই চাইছিলাম। তাহলে তুমি বলতে চাও আমি না থাকলে পালাতে এখান থেকে?
— হয়ত পালাতাম না, তবে মন খারাপ করতাম। মনে মনে কষ্ট পেতাম। এখন কষ্টটা তত জানাচ্ছেনা। তবে আমি যে আর পড়তে পারব না সেটা বুঝতে পারছি। এই সব দোকান টোকান বিক্রিবাটা করতে করতে আমি পড়ার দিকে মন দিতে পারব না।
— ছাই বুঝতে পারছ। আমরা কেউই লেখাপড়া করতে পারিনি। জেঠুও নয়। তুমিই একমাত্র নতুন মানুষ, লেখাপড়া করতে ভালবাস, সেটাও তো একটা দিক, নাকী? নতুন নতুন দিক খুলবে তবেই না উন্নতি হবে। উন্নতি করতে হবে বইকি, তবে একটু একটু করে। দুম করে কিছু করতে গেলে গোলমাল লেগে যেতে পারে। বুঝেছ আমার পড়ুয়া সাকরেদ? আজকেও আমরা অন্য দিনের মত দোকান বন্ধ করব ঠিক সময়ে।
এবারে বড় খুশির হাসি হাসল ঝিমলি। খুব যেন আনন্দ পেয়েছে এমন অমলিন হাসি। যেন জেঠুর ওই সাকরেদ কথাটা ওর বেশ পছন্দ হয়েছে। আমি ওর সাকরেদ, এটা কী একটা বিশ্বাসযোগ্য কথা হল?

পাঁচ

গল্প এমনি এমনি হয়না। কারণ গল্প গল্পই হয়না যদি তাতে মানুষ না থাকে, মানুষের শোক দুঃখ ভালবাসা না থাকে। আমি জেঠু ঝিমলি কিংবা ভোলা, সকলেই গল্পের হকদার। সকলকে নিয়েই গল্প। তবে এই গল্পের নায়ক যদি কাউকে বলতে হয় তাহলে সে হল জেঠু। জেঠুকে কেন সকলে ভালবাসে তার একটা কারণ থাকা উচিত। আমিও জেঠুকে কেন ভালবাসব তার একটা কারণ থাকা দরকার। সেই কারণটা এসে গেল অতি সহজে।
রাতে গরমটা জানাচ্ছিল, মশারাও খুব জ্বালাচ্ছিল। গায়ের চাদরটা ঢাকা দিলাম মশার আক্রমণ থেকে বাঁচতে, কিন্তু তাতে আরও বেশি গরম লাগতে লাগল। ভোলা নাহয় গাঁজা খায় বলে তার গরম ঠাণ্ডা কিংবা মশার জ্বালাতনের বোধ থাকেনা। কিন্তু জেঠু, কিংবা ঝিমলি? একটা মশারির কথা বলতে হবে ঝিমলিকে। আমার ঘুম এসে গিয়েছিল, ভেঙে গেছে, এখন আর আসবেনা। এপাশ ওপাশ করতে করতে উঠে পড়লাম। বাইরে মোটামুটি আলো হয়েছে, জেঠু বলেছিল আজ দ্বাদশী, এখন কয়েকটা দিন ভগবানের দেওয়া আলো থাকবে। সেই আলোকে উপভোগ করতে হবে, ভালবাসতে হবে, তবে তাঁর ভাল লাগবে। দিনের আলোর থেকে রাতের আলো ভাল, শরীর মন ভাল করে দেয়।
নিচেরতলায় নেমে এলাম, যেন কেউ জানতে না পরে এত সন্তর্পণে নামলাম। বারান্দার সিঁড়িতে এসে বসলাম। মিঠে মিঠে আলো, আর মন ভাল করে দেওয়া বাতাসকে বুঝতে চাইলাম। আমার মনে যে কষ্ট তাকে ভুলতে চাইলাম। আমাকে বাড়ি থেকে চলে আসতে হয়েছে এই হতচ্ছাড়া জায়গাতে, গরম, মশা এবং মানসিক অস্বস্তি পেতে। আমার জীবনটাকে আমার নিজের মত করে চালাব, তার সুযোগ দেখতে পাচ্ছিনা। এখানকার লোকগুলো যদি খারাপ হত সে একরকম হত। এরা সকলেই নিজের মত করে ভাল। সবাই যেন একটা সূক্ষ্ম জাল দিয়ে বাঁধা পড়েছে। যাবার জায়গা নেই, ভাবার পথ নেই। সুতরাং পড়ে আছে এখানে, না থাকলেও কারো কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি হতনা এমন ভাব। এ কী রকমের জীবন যাপন?
কাঁধে একটা হাত পড়ল, কখন জেঠু এসে বসেছে পাশে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসল একটু, কোনও কথা বললনা। একটু পরেই খসখস আওয়াজ পেলাম শাড়ির। ঝিমলি এসে বসল আমার অন্যপাশে। কথা বলল না, মুচকে হাসল। হাসিটা তেমন সুন্দর নয়। কাল রাতে রান্নাঘরে বা আজকে দোকানে তার হাসির অন্য মাত্রা ছিল। এখনকার হাসিটা যেন মজা পাওয়ার হাসি। আমরা তিনটে নিশ্চুপ প্রাণী ঈশ্বরের আলোয় বসে আছি, নিস্তব্ধ হয়ে। সময় চলে যায়, আমরা কথা বলিনা একজনও। অনেক পরে জেঠু ভাঙল নিস্তব্ধতা।
— এই বাড়িটা তখন একতলা ছিল, আমি বাবা আর মা থাকতাম। আমি সামনের ইস্কুলটাতে পড়তাম, ক্লাস টু। একদিন বাবা একটা মেয়েকে নিয়ে এল। বলল, কালকে বাচ্চাটা অনাথ হয়ে গেছে। এখন থেকে আমাদের কাছে থাকবে। সেই মেয়েটা আমাদের বাড়ির মেয়ে হয়ে গেল, তার কিছু সম্পত্তি ছিল দূরের দিকের গ্রামে। সেটা বিক্রি করে চারহাজার টাকা পাওয়া গিয়েছিল। তাই দিয়ে দোকানটা কেনা হয়েছিল। মেয়েটাকে আমার মা খুব ভালবাসত, আমিও মনে মনে খুব ভালবাসতাম। ভেবেছিলাম ওকে আমি বিয়ে করে নেব, তাহলে আর চলে যেতে হবেনা। কেননা বাবা প্রায়ই বলত এর বিয়ে হয়ে গেলে চারহাজার টাকা সুদ সমেত দিতে পারা যাবেনা। তাতে আমি আরও খুশি হয়েছিলাম। তারপর তার বিয়ের কথা হল অন্য একজনের সঙ্গে। তখন তাকে আমি বলেছিলাম আমার স্বপ্নের কথা। বলেছিলাম বাবা বলেছে তোমার চারহাজার টাকা দিতে পারবেনা। আমি তোমাকে কতদিন থেকে ভালবাসি, আমাকে বিয়ে করো। সে বলেছিল, সে কথা আগে থেকে বললে একরকম হত। আমি তো তোমাকে দাদা বলে জানি সেই ছোটবেলা থেকে। তখন আমি কী করি? তার বিয়ে হয়ে গেল। যেটুকু সম্ভব বাবা খরচপত্র করল। দোকানটা সে দিয়ে গেল বাবাকে। বলে গেল ওটা তাকে প্রতিপালন করার খরচ। বাবা মানতে চায়নি। বলল যখন দরকার হবে চেয়ে নিস। তারপর বাবা মরে গেল, মাও গেল। আমি খুব অসুখে পড়ে গেলাম। পুরুলিয়ার সরকারি হাসপাতালে ছিলাম একমাস। ভাল হলাম, কিন্তু কাজের হলাম না। দুটো পায়ের শক্তি কমে গেল। বসে বসে থাকতে হয় আমাকে, পরিশ্রম করতে পারিনা। বিয়ে করা হয়ে উঠলনা, করলাম না বলাই ঠিক।
ঝিমলি বলল — তোমার এ গল্পটা তো আমি শুনিনি জেঠু। তুমি বিয়ে করনি কেননা তোমার শরীর ভাল নয়। যে কোনও সময় মরে যেতে পার বলে বিয়ে করনি বলেছ আমাদের।
— সে কথাও ঠিক। পিন্টু তুমি সেই মেয়েটিকে চেন, তার নাম সোনা।
— সোনা তো আমার মায়ের নাম?
— আজও আমি তোমার মায়ের ঋণ বয়ে বেড়াচ্ছি পিন্টু। তুমি এসেছ, এবার সব বুঝে নাও। এই ঘর বাড়ি, এই ঝিমলি আর তার দোকান, ঘরকন্না; এই ভোলা আর তার শবজী ক্ষেত, তার আগে এই অকেজো জেঠুটাকেও বুঝে নাও। সব তোমার, সব তোমার। আর একটা কথা, কাউকে ভাল লাগলে তাকে সেকথা বলতে দেরি কোরোনা। দেরি করার মাসুল আমি আজও দিয়ে চলেছি। তুমি এসেছ, সোনা তোমাকে পাঠিয়েছে, আমার ঘরে তুমি সুখ বয়ে এনেছ।
আমি দেরি করবনা, কখনই না। উঠে দাঁড়ালাম, দুজনের সামনে এলাম, বললাম আমি ঝিমলিকে সারা জীবনের সঙ্গী করে নিতে চাই। আমি এ সংসারটার দায়িত্ব নিতে চাই। জেঠু, কেবল তোমার জন্যে নয়, আমার জন্যেও, আমার মায়ের জন্যেও। এটা আমার জীবনের উদ্দেশ্য হোক। তোমার কী মত ঝিমলি? তুমি কী কিছু সময় নিতে চাও?
ঝিমলির চোখে জল নামল। খুব আস্তে আস্তে বলল
— আমি যে পাঁক থেকে এসেছি তার খবর জানলে তুমি আমাকে জীবনসাথী করতে চাইতে না।
জেঠু বলল – আবার ওসব কথা আসছে কেন? কী বল পিন্টু? আমাদের জীবনটা একটাই। তাকে উপভোগ করতে হবে।
— ঠিক বলেছ জেঠু। এই যে মনের মত আলো, তাকে যেমন আমরা উপভোগ করছি এখন, ঠিক তেমনি করে আমরা উপভোগ করব আমাদের ছোটমত জীবনটাকে।
আমি উঠোনে নেমে এলাম, বললাম, — চলে এস ঝিমলি, দেরি কোরোনা। জেঠুর মত করে ভালবাসতে শেখো, আলো হাওয়া আর তাঁকে ভালবাসো যিনি আমাদের এসব জিনিস দিয়েছেন উপভোগের জন্যে। সবাইকে নিয়ে চলতে হবে, সবাইকে সুন্দর করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এই চেষ্টাটার একটা ভালদেখে একটা নাম দিতে হবে। আমি পৃথিবীকে সেই নামটা দিয়ে যেতে চাই। আমি জেঠুর মত হতে চাই।
ঝিমলি উঠে চলে এল আমার কাছে, দাঁড়াল আমার পাশে, তার দুচোখ ভর্তি জল সমেত। আমাদের একসঙ্গে দেখে জেঠুর চোখে মুখে উজ্বল আনন্দ জ্যোতির মত প্রকাশিত হল। আকাশের দিকে উঠে গেল তার দুটি হাত, কিন্তু মুখে কিছু বলল কীনা শোনা গেলনা। হয়ত খুব বেশি আনন্দ হলে মানুষের মুখে কথা থাকেনা। এরও একটা নাম দিতে হবে।

1 COMMENT

  1. গল্পটা দারুণ। লেখকের নামের মতই মণি রত্ন ছড়ানো। মিষ্টি প্রেম, বিরহ, মিলন, ঝিম ধরিয়ে দিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here