অ্যাডমিশন টেস্ট

0

Last Updated on

স্বাগতা মন্ডল

আপনি যে নম্বরে ফোন করছেন, সেটির সঙ্গে এই মুহূর্তে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না… The number you are trying to reach is currently unavailable…আট ন’ বার চেষ্টা চলছে, রেকর্ডেড নারীকণ্ঠ একই কথায় অনড়…ভদ্রলোকের এক কথা …নাহ্ Bon Jovi গাইছে কলার টিউনে…
– উফ্ লাইনই পাওয়া যায় না! কতক্ষণ চেষ্টা করছি…মিষ্টি রিনরিনে কণ্ঠস্বরে উদ্বেগ ঝরে পড়ে মেয়েটির|
– আরে আমিও বহুক্ষণ চেষ্টা করেছি, পাইনি…ছেলেটি অপেক্ষাকৃত সংযত|
– কাল রাতে আর ফোন করলি না তো ?
– হলই না !
উভয়পক্ষের উদ্বেগ- অপেক্ষা – আকাঙ্খার তরঙ্গ পরস্পরের তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের সাথে সমানুপাতিক কিনা মাপামাপি চলতে থাকে.
-আগের দিন গল্প বলবি বলেছিলি, বলে ওঠে মেয়েটি |
-রোমাঞ্চকর ভারি কিন্তু মোলায়েম গলার হাসি ছড়িয়ে পড়তে চায় চরাচরে…এখনো কি খুকুমণি নাকি ? রোজ একই বায়না …গল্প !
-আরে বলই না…
-শোন তাহলে, এক ছিল গ , ল আর প…
-বোকা ছেলেরা প্রায়ই এরকম গল্প বলে, আর এক ছিল গ , ল আর প! ! ! কতদিন ওরা তিনটে এক ছিল থাকবে ? এরপর থেকে বলবি তিন ছিল|
-তাহলে একটা ভাল গল্প শোন…এক যে ছিল ছেলে …মানে সেই ছেলেটা বোধ হয় আমি…
-বোধ হয় আমি ! …যাক তারপরে ?

– বুঝলি তো সেবার আমি আ্যডমিশন টেস্ট দিতে গেছি,গভর্নমেণ্ট স্কুলে ক্লাস ওয়ানে, প্রথমবার…

– প্রথমবার মানে ? আ্যডমিশন টেস্ট লোকে ক’বার দেয় ? ওঃ হো ! মনে পড়েছে…হিঃ হিঃ ! আমি যখন ক্লাস নাইনে, ভূগোল কোচিং এ পড়তে যেতাম, দেখতাম গভর্নমেণ্ট স্কুলের ক্লাস নাইনের ছেলেদের দাড়ি গজিয়ে গেছে ! আমরা মেয়েরা খুব হাসাহাসি করতাম আর বলাবলি করতাম , গভর্নমেণ্ট স্কুলের কাকু! তোর অবশ্য তখনো গজায় নি …! বাদ দে …গল্পটা বল …
-আরে প্রথমবার টাই তো গল্প ! বাবার সঙ্গে গেছি টিং টিং করতে করতে …
– টিং টিং করতে করতে ? তুই যখন যাচ্ছিলিস টিং টিং আওয়াজ বেরোচ্ছিল বুঝি ? তা ঘন্টাটা কোথায় বাঁধা ছিল ? গলায়…? আর সাইকেলের বেল বাজাতে বাজাতে গেলে তো ক্রিং ক্রিং আওয়াজ হবে …টিং টিং তো …উঁহু …
– যাহ্ তুই বাজে বকবকই কর…গল্পটা আর শুনতে হবে না!
– না না …প্লিজ বল বল …বলই না বাবা …আর ডিস্টার্ব করব না …
– শোন না …গিয়ে দেখি , মানে যাকে বলে গভর্নমেণ্ট স্কুল ! আগে কোনদিন দেখিনি ! আমার বয়স তখন কত আর …ছয় টয় …ড্যাবড্যাব করে চারপাশে তাকিয়ে দেখছি , ওরে বাবা গভর্নমেণ্ট স্কুল ! বড় মাঠের চারপাশে স্কুল বিল্ডিং আর বেশ কিছু গাছ . আর একটা গাছের ডালে …ওরে বাবা ওটা কি ?
-কি দেখলি ?
-দেখলাম আমার মতো বড় একটা কালো পাখি, গম্ভীর মুখে একটা গাছের ডালে বসে আছে.
– তোর মতো বড় কালো পাখি ? রক পাখি নাকি ! ডিম পেরেছিল ? যাহ্ রক পাখির ডিম ফসকে গেল …ইথার তরঙ্গে হাসি ছড়িয়ে পড়তে থাকে …উফ্ ওই আওয়াজে …যে কোন হৃদয় খান খান হতে পারে …
– আরে আমি তখনো তো আর পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি হইনি ! ছ’ বছরে আমি ছিলাম একটা লিকপিকে ছোটোখট হাবাগোবা বালকমাত্র| তখন পাখিটা আমার সমানই ছিল|
-যাকগে বালক বলো…
– বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ ‘বাবা ওটা কি পাখি ?’ ‘
বাবা বলল, ‘ ‘আরে , ধুর ও তো শকুন |’ ‘
– বাহ্ দারুণ তো ! এই শহরে শকুনও ছিল !
– বুঝলি, বাবা পইপই করে বুঝিয়েছিল, মন দিয়ে ভাল করে পরীক্ষা দিতে , গুবলেট করল শকুনটা !
– শকুনটা ! কেন ? ওটা তোর চাঁদি ঠোকরাচ্ছিল বুঝি !
– তার আর দরকার হয় নি ! আমি যে ক্লাস রুমে বসে পরীক্ষা দিচ্ছিলাম…মানে আমার সিট পড়েছিল জানলার ধারে. সেখান থেকে শকুনটাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল.পরীক্ষা তখন মাথায় উঠেছে ! আমি একটু করে লিখছি আর খানিকটা করে শকুন দেখছি! বাহ্ বেশ তাকিয়ে তাকিয়ে ধ্যান করছে মনে হচ্ছে. কি সুন্দর কালো কালো বড় ডানা, হলদেটে সাদা গলা, বাঁকানো ঠোঁট, কটমটে চোখ! মানে যাকে বলে…আমি মন্ত্রমুগ্ধ ! আরে… তোর ঐ অঙ্কগুলো মনে আছে ? ঐ যে… বারোটা দশ পয়সা, তিনটে কুড়ি পয়সা, পাঁচটা পঞ্চাশ পয়সা …
– হ্যাঁ , মনে আছে রে| মানে টোটাল কতগুলো পয়সা আছে তো ? বা তোমার কাছে মোট কত টাকা কত পয়সা আছে বল| তাই না ?
– হ্যাঁ ঐরকম একটা অঙ্ক এসেছিল. মানে আমি জানি অঙ্কটা কীভাবে করতে হয় , বাড়িতে বহুবার করেছি. কিন্তু একে গভর্নমেন্ট স্কুল মানে স্কুলের বড় খেলার মাঠ , বড় ক্লাসরুম , আর গাছের ডালে শকুন ! মানে শকুনটা এক ফাঁকে অন্যদিকে উড়েও গেছিল. আমি যেখানে বসেছিলাম সেখান থেকে ভালো দেখা যাচ্ছিল না| আমি জানি গুণ করে যোগ করতে হয় , কিন্তু শুধু যোগ করে দিলাম|
– বাহ্ দারুণ তো !
– আমার মাথায় তখন শকুন, আম আইসক্রিম আর পিসির বাড়ি| তাড়াতাড়ি বেরোলে শকুনটাকে দেখা যাবে, আম আইসক্রিম খাওয়া যাবে আর বাবা বলেছিল পরীক্ষার পর পিসির বাড়ি নিয়ে যাবে|
-আম আইসক্রিম আবার কি রে ?
– আম আইসক্রিম দেখিস নি ? সবুজ সবুজ কাঠিওয়ালা আইসক্রিম , কাঁচা আমের এসেন্স দেওয়া|
– আমার বাবা বলত ওগুলো ড্রেনের জল দিয়ে বানায় …ইশ্ …আমি কখনো খেতাম না |
– আমি ছোটবেলায় একটুখানি আইসক্রিম খেলেই ঠান্ডা লেগে যেত| তাই পরীক্ষার বহু আগে থেকেই আইসক্রিম ছিল বন্ধ | তখন ছিল গরমকাল | আমি শকুন , আম- আইসক্রিম আর পিসির বাড়ির লোভে অর্ধেক না লিখে, জানা জিনিস গোঁজামিল দিয়ে করে, আধখ্যাঁচরা খাতা জমা দিয়ে এক দৌড়ে বাবার কাছে | ‘ ‘ বাবা তুমি বলেছিলে পরীক্ষা হয়ে গেলে আম আইসক্রিম দেবে |’ ‘ বাবা তো হাঁ |’ ‘কি রে এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেল যে ? প্রশ্ন কেমন ছিল ? সব লিখেছিস ? ‘ ‘ আমি তাড়াতাড়ি বলেছিলাম , ‘ ‘ খুব সোজা প্রশ্ন বাবা | জলের মত সব লিখেছি | দারুণ পরীক্ষা হয়েছে | ‘ ‘ তুই হাসছিস ! আমার বাবার অবস্থাটা ভাব ! আমি সবুজ সবুজ আইসক্রিম খাচ্ছি আর গোল গোল চোখে শকুন দেখছি | বাব্বা কি বড় ডানা , মাঝে মাঝে ডানা ছড়াচ্ছিল তখন এরোপ্লেনের মত লাগছিল| যাক গে আইসক্রিমও ফুরালো তারপর পিসির বাড়িও গেলাম|
– তারপর শকুনের কি হল ?
– শকুনের আর কি হবে ? আমি চান্স পেলাম না…
– যাঃ
– বাবা খুব একটা বকেনি…শুধু পরেরবার যখন পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়েছি তখন জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘ ‘ এবার কেমন ? ‘ ‘ আমি বলেছিলাম, ‘ ‘ একটা প্রশ্নে ভুল ছিল, মানে প্রশ্নটাতেই ভুল ছিল| ‘ ‘ বাবাকে বলতেই বাবা বলেছিল , আগেরবার জল, এবার ভুল ! তোর আর গভর্নমেন্ট স্কুলে চান্স পাওয়া হয়েছে ! ‘ ‘ বাবাও বিশ্বাস করে নি , আমি চান্স পাব !
– যাহ্ শকুনের জন্য একটা বছর নষ্ট !
– তুই শুধু বছরটাই দেখলি ? অন্য কিছু দেখলি না !
– কি দেখব ?
– শকুনটা না থাকলে একবছর নষ্ট হত না | তাহলে তোর থেকে এক অ্যাকাডেমিক ইয়ারের সিনিয়র হতে হত ! মোদ্দা কথাটা হল এই যে ভূগোল কোচিং এ তোর সাথে আমার দেখা হত না !
– দেখা না হলে ?
অনুচ্চারিত কথাটাই ইথার তরঙ্গ হয়ে রাতের আকাশে ঝিলমিল রিমঝিম করতে থাকে …
– কিন্তু দেখা হওয়াটা তো পূর্বনির্ধারিত …
– পূর্বজন্ম থেকে ?

যারা এখনো ভাবছেন গল্পটি কি নিয়ে তারা গল্পের অন্য একটি নাম দিতে পারেন …একটি শকুন এবং …কিম্বা আরেকটি নাম হতে পারে …একটি প্রেমের গল্প …

ছবি: শান্তনু ব্যানার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here