পাঠ প্রতিক্রিয়া: বৃষ্টিলেখা / কুমারেশ চক্রবর্তী -দেবাশিস লাহা

0

Last Updated on

Great God, I ask for no meaner pelf
Than that I may not disappoint myself,
That in my action I may soar as high
As I can now discern with this clear eye.

And next in value, which thy kindness lends,
That I may greatly disappoint my friends,
Howe’er they think or hope that it may be,
They may not dream how thou’st distinguished me.

কবি এবং কবিতার আলোচনাতে ঢুকে পড়লে অনেকটা অনিবার্যভাবেই Henry David Thoreau নামক প্রিয় অ্যামেরিকানটি টেবিলের উল্টোদিকে বসে পড়েন। অযাচিতভাবেই শুনিয়ে দিয়ে যান তাঁর লেখা Great God, I ask for no meaner pelf কবিতার প্রথম দুটি স্তবক। মুগ্ধ বিস্ময়ে প্রণাম সেরে নেওয়ার পরও সান্ত পঙক্তিগুলি অনন্তের সঙ্গে কথোপথন চালিয়ে যায়।
“হে ঈশ্বর, আমি তোমার কাছে কম মহার্ঘ্য কিছু চাইনি !
আমি যেন নিজের জন্য হতাশা না কুড়িয়ে বেড়াই—
দুচোখ দিয়ে যতটা স্বচ্ছ করে দেখি, কাজেও যেন তেমন
এক উচ্চতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি।

মূল্যবোধের পথে চলতে গিয়ে আমি হয়ত অনেক বন্ধু/ প্রিয়জনকে
আঘাত দিয়ে ফেলব; কেউ কেউ অখুশিও হবে —
তারা আমাকে নিয়ে কি ভাবল, কি আশা করল তার চেয়ে
অনেক মূল্যবান তুমি আমাকে কিভাবে বিশিষ্ট করেছ !
প্রিয় হেনরির অমল এই উচ্চারণ ব্যাপ্তিময় এক প্রার্থনার উচ্চারণধ্বনি হলেও, যে কোনো সাধক তথা কবির জন্য আবহমান বেদবাক্য। হেনরির ঈশ্বর, নিছক মেঘমণ্ডলের অধিবাসী নন, কবির অন্তরাত্মা। এই আর্তি নিজের প্রতি, নিজের বিবেকের প্রতি। কোনো দৃশ্যমান বা অদৃশ্য বন্ধু/ পাঠককে তৃপ্ত করার জন্য তিনি যেন কলম না ধরেন। কবিতা কখনও মনোরঞ্জনের উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা হয়না। এ প্রসঙ্গে আমার নিজের লেখা একটি পর্যবেক্ষণ উদ্ধৃতি হিসেবে দিলে অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

শিল্পের জন্য শিল্প অথবা জীবনের জন্য শিল্প যেভাবেই ভাবুন সাহিত্য কখনও বিনোদন হতে শেখেনি। ডিলান থমাস, টি এস এলিয়ট, ডব্লিউ এইচ অডেনদের কথা না হয় ছেড়েই দিন, ছেড়ে দিন নাজিম হিকমত, গার্সিয়া লোরকা অথবা কহলিল জিব্রান ; সিমবলিস্ট আন্দোলনের প্রাণপুরুষ শার্ল বোদলেয়ার, স্টিফেন মালার্মে থেকে শুরু সাম্প্রতিক চিলি সাহিত্যে এন্টি পোয়েমের প্রবক্তা
নিকানো পারনার কবিতাও কেউ নিছক বিনোদনের জন্য পড়েন বলে মনে হয় না। বিনোদন সময় কাটায়, কিন্তু সময়কে কাটে না। এন্টারটেইনমেন্ট একটি স্থিতাবস্থা মাত্র। বড় জোর থিসিস, এন্টি থিসিস উপস্থাপনা করার ক্ষমতা তার কখনই ছিল না।
তাই আবার বলছি সময় কাটলে বিনোদন। সময়কে কাটলে সাহিত্য।

কবি কুমারেশ চক্রবর্তীর “বৃষ্টিলেখা” কাব্যগ্রন্থটি পড়তে পড়তে একথাই বার বার মনে হয়েছে।দি সি বুক এজেন্সি থেকে প্রকাশিত বইটিতে তাঁকে আশির কবি বলে চিহ্নিত করা হলেও, এই জাতীয় কোনো এপিথেট-এ বিশ্বাস না রেখেই পাঠক হিসেবে আমি আমার অকিঞ্চিৎকর পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাব।কতটা নির্মোহ হতে পারব বলা মুশকিল। তবে প্রয়াস তো থাকবেই।
প্রথমেই বলে রাখা ভাল মাননীয় কুমারেশ চক্রবর্তী কিন্তু গজদন্ত মিনারে বসে জীবন দেখেন না। মাটির সঙ্গে সম্পৃক্ত কবি এক অর্থে অবশ্যই কুমার, চলতি বাংলা যাকে কুমোর বলা হয়। তাঁর শিল্পই বলুন বাঁ সাধনাই বলুন সবই মাটি দিয়ে, মাটি নিয়ে। মাটি ছুঁয়ে বেঁচে থাকা মাটির মানুষগুলোকে নিয়ে তাঁর ভাবনা, ভালবাসা এবং আশঙ্কার জগত। তাই কুমারশ্রেষ্ঠ শিল্পীটি arts for art’s sake বা pure aestheticism বাংলা পরিভাষায় যাকে কলাকৈবল্যবাদ বলা হয়, সেই পরিমণ্ডল থেকে নিজেকে অত্যন্ত সচেতনভাবেই সরিয়ে নিয়েছেন। “L’art pour l’art” [ ইংরেজিতে arts for art’s sake] Théophile Gautier ব্যবহৃত [Mademoiselle de Maupin নামক গ্রন্থে] এই দর্শনটি একসময় যথেষ্ট সাড়া ফেললেও [এখনও কম হৈ চৈ হয় না] একে আক্ষরিকভাবে অনুসরণ করে শিল্প চর্চা কতটা সম্ভব সে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। যাক সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। Truth is beauty, beauty truth নয়, কুমারেশের সত্য কখনই তেমন সুন্দর নয়। সে বড় অপ্রিয় এবং কখনও বেশ কদাকার। তিনি dispassionate observer এর মত দূর থেকে দেখেন না, এমনকি এডিশনের মত প্রায় নিরপেক্ষ Spectator ও নন; পক্ষ বেছে নিতে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই। ৫৭ টি কবিতার পাঠ খুব সহজেই বুঝিয়ে দেয় তিনি কেবল মানুষের পক্ষে। বিমল এই পক্ষপাতিত্বটিই কখনও সোচ্চারে কখনও অস্ফুটে সেই সনাতন সত্যটিই ঘোষণা করে “সবার উপরে মানুষ সত্য তাঁর উপরে নাই”। Man is the measure of all things [একই ব্যঞ্জনা নিয়ে গ্রীক সোফিষ্ট প্রোটাগোরাস এই পর্যবেক্ষণটি রাখেন] এই সত্যটিকেই সবার উপরে স্থান দিয়ে কোকিল, শঙ্খচিল, নদ নদী, সৃষ্টি , সৌন্দর্য, যাপন , বোধ এবং দর্শনের জন্ম দিতে হবে এই প্রত্যয় নিয়েই তিনি পাঠককুলকে একটি কবিতা থেকে পরবর্তী কবিতায় টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

তাঁর কবি পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়েছে—“আশির দশকের বিশিষ্ট কবি কুমারেশ চক্রবর্তীর দেখা ও বোধ প্রতিনিয়ত ঘটনা পরম্পরায় একে অন্যকে আপডেট করে যাচ্ছে। সত্তর দশকের উত্তাল এই বাংলার মুক্তির স্লোগানে বিদীর্ণ অক্ষরের আত্মহনন, বিনা বিচারে জেলহাজত-অপমৃত্যু—তার তখনকার প্রাক যৌবনের দেখাকেও ভীষণভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং পাশাপাশি সেই অবচেতন মনে এক অন্য বোধও জন্ম নিয়েছিল। ——সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক অবক্ষয় আজ সামাজিক চেহারা নিয়েই এ সমাজে কমবেশি প্রতিষ্ঠিত——-“

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে, বিশেষ করে স্বাধীনতা উত্তর শিল্প চর্চায় সামাজিক তথা রাজনৈতিক সচেতনতা বলতে অনিবার্যভাবেই বামপন্থী ভাবনার স্রোতে বহমান এক মননকে বোঝায়। সে বামপন্থা দলীয় আনুগত্যকে কেন্দ্র করেও হতে পারে, অথবা নির্দিষ্ট কোন ছাতা ছাড়াই সমাজতান্ত্রিক সাম্যবাদের ভাবনায় নিজেকে স্নাত করাও হতে পারে। সুকান্ত ভট্টাচার্য্য দিয়ে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ মিছিলে যেমন দীনেশ দাস আছেন, তেমনই আছেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়,বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সমর সেন, অমিতাভ দাশগুপ্তের মত নমস্য কবি। কিন্তু তাঁরা এক ভিন্ন সময়ের সাক্ষী ছিলেন। সোভিয়েত বিপ্লবের ঢেউ সমগ্র বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে, দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনের যাদু স্পর্শে বাঙালি মানস তখন শিহরিত। আর তাই বুদ্ধিজীবী মানেই অবশ্যম্ভাবীভাবেই যেন বামপন্থী।তাঁদের উচ্চারণে এক গভীর আত্মপ্রত্যয়, উজ্জ্বল আশাবাদ। শোষণহীন সমাজের ছবি আঁকায় নিরলস তাঁদের লেখনী।কবি কুমারেশ চক্রবর্তী সেই সময়কালের প্রতিনিধি নন। তিনি মার্ক্সীয় বামপন্থার সাফল্য এবং ব্যর্থতা তিনি সমানভাবে দেখেছেন। নিছক আন্তর্জাতিক বামপন্থা নয়, দেশীয় বামপন্থার উত্থান এবং পতনের সাক্ষী তিনি।সামাজিক তথা রাজনৈতিক সচেতনতার প্রতিফলন ঘটলেও তিনি কোন অর্থেই তিনি এই উজ্জ্বল অগ্রজদের উত্তরসূরী নন। বিংশ শতাব্দীকে যখন an age of doubt বলে অভিহিত করা হয়, তখন নিছক ধর্মীয় তথা নৈতিক সংশয়বাদকেই অন্তর্ভূক্ত করা হয় না, অন্তিম অর্ধে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সন্দেহবাদও এই সময়কালকে সমানভাবে বিশিষ্ট করেছে। এর প্রথম অর্ধ যদি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্ম দেখে থাকে, শেষ অর্ধ সেই স্বপ্নের মৃত্যুও দেখেছে। ১৯১৭ থেকে ১৯৯১, বলশেভিক বিপ্লবের সাফল্য থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন –এই সময়কালের মধ্যবর্তী কোন একটি সময়ে কুমারেশের জন্ম। স্বভাবতই তাঁর লেখনীতে উপরি উল্লিখিত অগ্রজ কবিকুলের উজ্জ্বল আশাবাদ, সুদৃঢ় প্রত্যয় সেভাবে প্রতিবিম্বিত হয়নি। উদবাস্তু হয়ে যাওয়া বিশ্বাসের সিংহাসনে সন্দেহের ক্যু দে তা ![জবরদখল]
নাম কবিতাটিতেই [বৃষ্টিলেখা] তার দেখা মেলে।

“—বুঝিলাম বেলাশেষের সাম্পানে / মানে অভিমানে আর কিছুটা সন্দেহে ফিরিয়াছে অনুভব !”

অনুভবও আর সংশয়হীন নয়। ভেঙে পড়া আশাবাদ, স্বপ্ন ভঙ্গ এবং তার সঙ্গে এক সুতীব্র অভিমান। কোথাও যেন যাওয়ার কথা ছিল। অথচ যাওয়া হয়ে উঠল না। আমার লেখা “দেবদারু” গল্পটির কয়েকটি পংক্তি মনে পড়ে যায়—এখানে নয়, অন্য কোথাও যাবার কথা ছিল। একা নয়। সবাইকে নিয়ে। এক সঙ্গে। যেখানে নদীকে ঠিক নদী-ই মনে হবে। পাখিকে পাখি। স্নান করলে সবার চুল ভিজে যাবে যেখানে। তেমন একটা জায়গা।” অভিমান ক্রমশ গাঢ় হয়, যন্ত্রণাও। তবু খোঁজ কখনও শেষ হয়না।ছাই ঝেড়ে ফিনিক্সও উঠে দাঁড়ায়। কুমারেশও ধুলো ঝেড়ে উঠে বসেন। হয়ত বা উঠেও দাঁড়ান। কিন্তু সে উচ্চারণও বড় স্থিমিত, চাপা—প্রায় এক স্বগতোক্তির মত— if winter comes, can spring be far behind—এর মত সেখানে কোনো robust optimism নেই। নেই “ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত-এর প্রত্যয়, নেই “ তাদের জিজ্ঞাসা করো যে পাখিরা গান গায়,/ যে ঝর্ণারা নিশিন্ত মনে এদিক ওদিক/ ছোটাছুটি করছে/ যে বাতাসে এই মহাদেশের মধ্যকার/ মানচিত্র থেকে মর্মরিত হয়/ তারা সকলেই উত্তর দেবে–/ এই কালো রঙের মানুষটা / যে দিনরাত গাধার খাটুনি খাটছে।/ আহা আমাকে অন্তত ওই তালগাছটার চূড়োয় উঠতে দাও/ সেখানে বসে আমি মদ খাবো/—[ সেই মানুষটি যে ফসল ফলিয়েছিল/ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়] –না এমন কিছুই নেই ! তবে কি আছে বৃষ্টিলেখায় ?
“তারপর গান ভাসাইয়া ফকির লালনে খুঁজি / আমাদের শাপগ্রস্ত দিবালোকে বিশুদ্ধ জলের কলরব—”
লেনিন থেকে লালনে ফিরে যাওয়া নাকি লেনিনের মধ্যেই লালন খুঁজে নেওয়া ? শাপগ্রস্থ সময়ে ঠিকঠাক বুঝে ওঠাও কঠিন । আমার কিন্তু প্রথমটিই মনে হয়েছে। সংকীর্ণ কোন ইজম দিয়ে আর মানুষকে বেঁধে ফেলার প্রয়াস নয়, সে তো অনেক হল ! এবার বরং বিশ্ব মানবতাবাদের কথা বলা যাক। বিশুদ্ধ জলের সন্ধানে বেরিয়ে পড়া বৃষ্টিলেখা-র, এই দুটি পংক্তিই প্রকৃতপক্ষে কেন্দ্রবিন্দু। এই বোধকে কেন্দ্র করেই সমগ্র কাব্যগন্থটির বুনন। ম্যাকবেথ নাটকটির কথা মনে করিয়ে দেয়। সেখানেও প্রথম দৃশ্যের সূচনায় উল্লিখিত দুটি পংক্তির মধ্যেই সমগ্র রচনাটির আকর নিহিত আছে—“Fair is foul, and foul is fair: / Hover through the fog and filthy air”

এভাবেই কবি দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে হেঁটে যান। না, ঠিক হেঁটে যাওয়া নয়, বেশ খানিকটা খুঁড়িয়ে, এমনকি হামাগুড়ি দিয়েও। দৃপ্ত পদক্ষেপ কবেই তো জীবশ্ম হয়ে গেছে। তাই গন্তব্যও এখন অলীক।
আমাদের ধোঁয়াশা তাড়িত জন্ম-মৃত্যুর ফাতনা/ ভাসছে –ডুবছে—নানা নোটেশানে—/ কম্পিউটারপ্রশ্রয়ী গেমে, ডিজে সিস্টেমে, বা থ্রি-ডি সিস্টেমের / প্রিমিয়ার শোতে –/ আর অসংখ্য রাস্তায় বিভাজিত মানুষ / পরস্পরকে লুকিয়ে চুরিয়ে পরস্পরের অন্ধকারে / অগণন মৃত তারাদের এক মিথ্যে আকাশের দিকেই স্বপ্ন ছোটাচ্ছে–” [অলীক গন্তব্যে]

এই ‘অলীক’ কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতীতি নয়। কেবল গন্তবই অলীক নয়, গোপন আততায়ীর মত পারাপারও এখন বিপদজনক। তাই ‘অহল্যা’-র পরেই কবিকে আবার অলীকেই ফিরে যেতে হয়।
“ নদী ও নৌকার মাঝখানে সন্ত্রাসবাদী দেশীয় জলচর!/ চারপাশে ছোট ছোট ঢেউয়ে ছোট ছোট ঘৃণা—/ সন্দেহ ও ক্ষয়ের রঙ্গমঞ্চে এক অলীক পারাপারের ডুবোপথ / নিষ্ঠাবান শ্রমিকের মতো তবু কেউ কবিতা লিখি!” [অলীক পারাপারে]
প্রায় প্রতিটি শব্দে জেগে থাকা সংশয় ও আশংকার দোলা কোনো পাঠকেরই চোখ এড়িয়ে যায় না। কবিতার নামকরণেও এই বোধ বারবার প্রতিফলিত হয়। বৃষ্টি দিয়ে লেখা বর্নমালা তো কোনো আকাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্বের কথা বলে না, মুছে যাওয়ার অমিত সম্ভাবনা নিয়েই তার জন্ম। তাই অবরুদ্ধ সংলাপ, অলীক গন্তব্য, অলীক পারাপারে, আলোয় লেখা অন্ধকার, অশ্রুকণা, ব্লক, দেখা ও বর্বরতা, স্বেচ্ছাচার, কানামাছি, লাশ দখলের নেপথ্যে, চাঁদ বণিকের সাপ, পীড়িত –এভাবে প্রায় প্রতিটি কবিতার নামকরণে নীরব এক রক্তক্ষরণ —সংশয়াপন্ন , বিপন্ন অন্তরাত্মার।
কবিতাটি শেষও হয় অলীককে ছুঁয়ে —
“আমার প্রথম ভাললাগা এভাবেই বেঁচে আছে—
ওই অলীক পারাপারে-”

অদ্ভুত এক ভীতি গ্রাস করে। প্রথম ভাল লাগাটিই যদি অলীকের ছত্রছায়ায় বেঁচে থাকে, তবে যাপনের গতিপথ কোন দিকে ! সেই ভাল লাগা নারীই হোক অথবা রাজনৈতিক দর্শন।

অলীকের মিছিলটি তার যাত্রা অব্যাহত রাখে। পরবর্তী কবিতাতেই সে ফিরে আসে নাছোড়বান্দা ভাইরাসের মত—একবার নয়, বার বার—
“আমি তখন এই উপদ্রুত আকাশের নিচে অলীক কাশফুলের দ্যোতনায় এক অলীক মহামায়ার/ বোধনের কথাই লিখি!”[ আলোয় লেখা অন্ধকার]

কেই এই অলীক মহামায়া ? নিশ্চিত কোনো নারী বা দেবী নন। টলে যাওয়া বিশ্বাস। কি সেই বিশ্বাস? বামপন্থার স্বপ্ন ভঙ্গ ? নাকি “সমাজতান্ত্রিক” সংশয় ? ভেবে নেওয়ার অবকাশটি থাক।তবেই তো কবিতা।

এভাবে বাঁচা যায় না। সত্যিই বাঁচা যায় না। কবির আর্তনাদ শোনা যায়—

“এরই নাম যদি বাঁচা, হাঃ ঈশ্বর—/ তা’হলে মৃত্যু এত অপবাদ নিয়েও কেন কোনো আদালতে/ বিচারপ্রার্থী হতে পারে না !”

এভাবেই হয়ত অবচেতনে মৃত্যুই কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে। হেইনরিখ হেইনের পদধ্বনি শোনা যায়– Sleep is good, death is better; but of course, the best thing would to have never been born at all.
ঘুম ভাল, মৃত্যু আরও ভাল; তবে সবচেয়ে ভাল যদি জন্মই না হত।
তবু স্বপ্ন ভঙ্গের অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়ার আগেই কবি নিজেকে সামলে নেন। সলিলকির আদলে বলে ওঠেন—
“মধ্যরাতের পাড়াগাঁ থুতুকফে/ মার্কসবাদের অপরিপক্ক ব্যাখ্যায় উচ্ছিষ্ট হতে থাকে [ বিশ্বাবিশয়ন]
এখানে কিন্তু স্পষ্ট কবি মার্কসবাদে বিশ্বাস হয়ত হারান নি। এই দর্শনের অপব্যাখ্যা নিয়েই তিনি ভাবিত। তবে তাঁর গন্তব্যটি বার বার অলীক হয়ে ওঠে কেন ? কবি কুমারেশ চক্রবর্তী কি ভয় পাচ্ছেন ? আগের লেখা সমস্ত কবিতাকে কি অর্থহীন মনে হচ্ছে তাঁর ? তাই কি শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলনটি প্রকাশিত হওয়ার পরেও তিনি নতুন করে কিছু বলতে চান ? অথচ সাহস পান না। এমন কি হতে পারে নিছক অপব্যাখা না সমগ্র দর্শনটি নিয়েই তিনি সংশয়ে পড়েছেন ? আর তাই সবকিছুই এমন অলীক হয়ে উঠছে ! কিন্তু ডুবন্ত মানুষের জন্য খড়কুটোর বদান্যতাটুকুও ছিনিয়ে নিলে, সে শ্বাস নেবে কি করে ! তাই কি কবি ভয় পাচ্ছেন ? মূল বাদ দিয়ে শাখাপ্রশাখার গলদ ধরছেন ? কবিতার বহুমাত্রিকতায় পাঠক তা বুঝে নেবেন। আমার কাজটি কেবল প্রশ্ন রাখা।

বৃষ্টিলেখা আপাদমস্তক এই সময়ের দিনলিপি। সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ, অমানবিতা, সাম্প্রদায়িক হিংস্রতার নখ এবং দাঁত কবিমানসে গভীর রেখাপাত করে। “জলের ধর্ম জলত্ব, আগুনের ধর্ম আগুনত্ব, মানুষের ধর্ম মনুষ্যত্ব ” এই মহান ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতীতিকে সরিয়ে রেখে এ কোন ধর্মের চাষ শুরু হল এই একুশ শতকে!

“তোমাকে চিনি, বা, না চিনি– / সেটা বড় কথা নয়–/ তুমি দলিত? সংখ্যালঘু? না কি উচ্চ-বর্ণীয়/ কোনো হিন্দু বালিকা? / সেটাও বড় কথা নয়—/ কার মিছিলের পতাকা কাঁধে হেঁটে যাচ্ছ ময়দানের দিকে –/ বড়ো কথা নয় সেটাও —/
কিন্তু যারা তোমাকে বলাৎকারের শেষে / জলে জঙ্গলে, কিম্বা, কোনো পতিত জলাশয়ে —/ ফেলে যাচ্ছে মৃত–/ তাদের বিরুদ্ধে আমি কোথাও মুখ খুলছি না! ” (দূষণ)

সংকীর্ণ স্বার্থের পূজারী এই নীরবতা অবশেষে এক ভয়াবহ উপলব্ধির দিকে তাড়িত করে, যা আমরা সবাই কম বেশি জানি — “আমি ভাবছি না –আমার কলেজ ফেরতা মেয়েটাও হয়ত ওই সূর্যাস্তে মিশে যেতে পারে!” (দূষণ)

অথবা “আজ কেন মনে পড়ছে না — একই সঙ্গে পাশাপাশি / ঈদ উৎসব আর দুর্গাপূজোর আনন্দ মাখামাখি / কেন মনে পড়ছে না–সেই বিবাহবাসর–জুলিয়া / আমিই দায়িত্ব সামলেছি তোমার মেয়ের অভিভাবকের! ” (রবিয়ুল)

সুতীব্র ক্ষোভ আর যন্ত্রণার বর্ণমালা আজ কেবল একটি প্রশ্নই ছুঁড়ে দিতে পারে — তুমি কতটা শান্তিতে ঘুমাচ্ছ রবিয়ুল?”

এ কেমন বৃষ্টি দিয়ে লেখা? বৃষ্টিলেখা! সে কি আকাশ থেকে নামে, নাকি চোখ থেকে? নাকি মরে যাওয়ার আগে প্রিয় নদীটি যে পথ এঁকে রাখে, সেই পথেই কবিকে বার বার ছুটে যেতে হয়! “এ কোন সকাল রাতের চেয়েও অন্ধকার? “

এভাবেই “এক কাল্পনিক অভ্যাস” “রানওয়ে ” “সম্পর্ককথা” “সিস্টেম ও দাসত্ব ” তাঁতঘর “”তোমাকে লিখেছি” পেরিয়ে কুমারেশ “প্রাণায়ামের” মাইলস্টোন ছুঁয়ে ফেলেন, পৌঁছে যান এই গ্রন্থের অন্তিম কবিতায়।

“এ বয়স না থামুক কোনো অবরোধে— কী এমন ক্ষতি তাতে! / উপেক্ষিত প্রণয়ের ক্ষত জাগিয়ে তুলেও যদি / আবার রক্তাক্ত ফিরি তীব্র অন্ধকারে —-“

কবি দাঁড়ি টানতে পারেন না, পূর্ণচ্ছেদের পটভূমিকা থেকে বহু দূরে তাঁরা বাস। অভিমান, ব্যর্থতা, আর্তনাদ, সব কিছুকে অতিক্রম করে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরা চলাটিই সত্য হয়ে ওঠে। তিনটি ডট যেন বৃষ্টির তিন ফোঁটা জল। এভাবেই কবি আবার ভাবনায় ডুব দেন। মগ্ন হন প্রাণায়ামে। চরৈবেতির মন্ত্র ছুঁয়ে উপলব্ধি করেন চলা ব্যতীত কোনো বিকল্প নেই। আর গন্তব্য? আমার নিজের লেখা কয়েকটি পঙক্তি উড়ে আসে —

ভগবান আর ভালবাসা, দুটোই আসলে এক্স ফ্যাক্টর — / সাঁতার কাটার সময় যেমন ধরে নিতে হয় ওপারে সত্যিই কোনো ভূখণ্ড আছে!

আঙ্গিক নিয়ে বলতে চাইলে প্রথমেই উল্লেখ করতে হবে কুমারেশের কবিতার আকর্ষণ কনটেন্ট, ফর্ম ততটা নয়। মেসেজই বলুন আর বক্তব্যই বলুন, কুমারেশ চক্রবর্তীর কবিতায় সেটিই উপজীব্য বিষয়। পোশাক অবশ্যই জরুরী। কিন্তু তাকে নিয়ে অহেতুক এক্সপেরিমেন্ট সচেতবভাবেই তিনি এড়িয়ে গেছেন। বিমুর্ততার আরাধনা নয়, তাঁর কবিতায় তিনি বিশেষভাবে মূর্ত। তবে যেহেতু সমকালের উচ্চারণ, তাই সমসাময়িক ভাষ্য এবং প্রকরণই উঠে এসেছে। এন্ড্রয়েড সভ্যতার ডিজিটাল শব্দবিন্যাসের বাংলা প্রতিশব্দ তিনি সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। তাঁর লেখনীতে খুব সাবলীলভাবেই ব্লক, মেমরি কার্ড, ডিলিট, ডিকোড, চ্যাটিং, ফেসবুক ইত্যাদি ইংরেজি তথা প্রযুক্তিনির্ভর শব্দের বিচরণ। যা একান্তই স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য। তবে প্রতিশব্দ থাকা সত্ত্বেও বেশ কিছু ইংরেজি শব্দের ব্যবহার হয়ত বিশুদ্ধতার পূজারীকুলকে আহত করবে। তবে আমার কোনো পাঠ ব্যাঘাত ঘটেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রেই অভিনবত্বের স্বাক্ষর। সহজবোধ্য, প্রাঞ্জল ভাষারীতির আশ্রয় নিয়েছেন বলেই কুমারেশের কবিতায় সিমিলি,( simile) মেটাফোরের ( metaphor) কোলাজ থাকলেও কনসিটের ( conceit) কোনো ব্যবহার নেই। তাই তাঁর কবিতা পড়তে চাইলে সাহিত্যের নিবিড় পাঠক হওয়ার দরকার নেই।

কবি কুমারেশ চক্রবর্তী এই সময় তো বটেই আগামীতেও পঠিত হবেন। তবে কতদিন বেঁচে থাকবেন, তা মহাকালই নির্ণয় করবেন। কবির মত কবিতারও মৃত্যু ঘটে। পরিবর্তিত সময়ের ভাষারীতি, বোধ, পাঠাভ্যাস এবং প্রকরণ অতীতের প্রায় সব কিছুকেই অপ্রাসঙ্গিক, ব্রাত্য করে দেয়। তাই আক্ষরিক অর্থে কালজয়ী বলে কোনো প্রতীতি নেই। কবিতাও অরগানিক। তাকেও মরতে হয়। বাচনরীতি এবং কথনশৈলী বদলে যেতে যেতে একসময় তার মৃত্যুঘন্টাটিও বেজে ওঠে। তবে অন্তর্নিহিত বোধটির সহজে মৃত্যু ঘটে না। কবি কুমারেশের মৃত্যু ঘটলেও, তিনি যে উপলব্ধির চাষ করে চলেছেন, তাকে বাদ দিয়ে মানুষের ভাল থাকা অসম্ভব। এই বোধটিকেই আমি ফিনিক্স বলি। দহনের ভস্ম থেকে সে বার বার জেগে উঠবেই। ভিন্ন কথন তথা ভাষারীতি নিয়ে তাকেই উড়ান দেবে আগামীর কোনো কুমারেশ। মাটির কাছাকাছি বেঁচে থাকা কোনো কুমোর শিরোমণি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here