ভোটের বাজারদর

1

Last Updated on

ভোট আসবে আর বাজারদর নিয়ে তুমুল তর্কবিতর্ক হবে না এমন আবার হয় নাকি? দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল, ধর্না, অনশন ও হরতাল, বাস রোকো, রেল রোকো থেকে শুরু করে ঘণ্টা খানেক সঙ্গে সুমন বা চায়ের দোকানে তুমুল ঝগড়া, এসব হল ভোটের বাজারে রোজনামচা।
কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এইসব বিতর্ক বা আন্দোলনে যোগদানকারী মানুষের সিংহভাগেরই বাজার এবং বাজারদর সম্পর্কে ন্যুনতম ধারনাটুকুই নেই।দাদারা বলে দিয়েছে গ্যাসের দাম বাড়ার জন্য কেন্দ্র সরকার দায়ী, অতএব কেন্দ্র সরকারকে গালি দাও। কিম্বা, অমুক নেতা বলে দিয়েছে রাজ্য সরকারের লোকেরা সব চুরি করে নিচ্ছে বলেই জিনিষ পত্রের দাম বাড়ছে; ব্যাস,রাজ্য সরকারের গুষ্টি উদ্ধার শুরু।
এদের চেপে ধরে জিজ্ঞেস করুন তো, ভাই সৌদি আরবে গ্যাসের সিলিন্ডার এর দাম কত? বা পেট্রোল, ডিজেল কত করে লিটার? বলবে ‘ওদের দেশের দাম জেনে আমার লাভ কি? এখানে দাম বাড়ছে কেন জবাব চাই, জবাব দাও।’ যদি বোঝাতে যান যে ‘জবাবটাই তো দিচ্ছি, তুমি তো শুনছ না।’ বলবে ‘মেলা জ্ঞান দেবেন না তো, যান ফুটুন এখান থেকে, আমাদের জবাব চাই, জবাব দাও।’
আর এই অজ্ঞানতার সুযোগটাই সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতা মন্ত্রী রা নিয়ে থাকে। কেন্দ্র রাজ্য নির্বিশেষে তারা কিন্তু খুব ভাল করেই জানে কোন জিনিষের দাম কেন বাড়ছে বা কমছে এবং কে বা কারা দায়ী অথবা আদৌ কেউ দায়ী কিনা এসব তারা ভালই বোঝে। তবু তারা ভোটের বাজারে পরস্পরকে গালি দেয় আর বোকারা তাদের তালে তাল মেলায়।
তার চেয়ে আসুন বাজার ও বাজারদর সংক্রান্ত কিছু প্রাথমিক ধারনা নিয়ে আলোচনা করা যাক, যাতে সাধারন মানুষ এইধরনের হাস্যকর বিতর্কে জড়িয়ে সময় নষ্ট না করে।
প্রথমেই আসি তেলের দাম প্রসঙ্গে, না না সরষের তেল নয়, পেট্রোলিয়াম অয়েল, সোজা কথায় পেট্রল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাস (LPG) এর দাম।
প্রথম কথাই হল ভারতে পেট্রোলিয়াম উৎপন্ন হয় না। বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
দ্বিতীয় কথা হল পেট্রোলিয়াম হল সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ন আন্তর্জাতিক মানের পণ্য। এখন যে কোন আন্তর্জাতিক মানের পণ্যের দাম অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। যেমন –
১. পণ্যটির উৎপাদনের মাত্রার হ্রাস-বৃদ্ধি।
২. পণ্যটির আন্তর্জাতিক চাহিদার হ্রাস-বৃদ্ধি।
৩. পণ্য উৎপাদন কারী দেশগুলির সঙ্গে ব্যবহারকারী দেশটির অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক।
৪. পণ্যটির উৎপাদন ও ব্যবহারের ফলস্বরূপ আন্তর্জাতিক ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষতিবৃদ্ধি।
৫. আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে পণ্যটির ভূমিকা।
৬. আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পণ্যটির ভূমিকা।
৭. প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর পন্যটির প্রভাব।
৮. ব্যবহারকারী দেশটির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। অর্থাৎ ব্যবহারকারী দেশটি ওই পন্যটির ব্যবহার বাড়াতে চাইছে না কমাতে চাইছে।
উপরের প্রতিটা পয়েন্ট নিয়ে পৃথক পৃথক প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে, এখানে বিশদে যাওয়ার অবকাশ নেই। পয়েন্টগুলো উল্লেখ করে বোঝাতে চাইছি যে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়া বা কমাটা মোটেও সহজ সরল বিষয় নয়। ‘বাড়ল কেন? জবাব চাই, ‘-বলে চিৎকার জোড়ার আগে অন্তত জেনে নিন-
১. কোন কোন দেশ পেট্রোলিয়াম উৎপন্ন করে।
২. কোন দেশটি কত পরিমান উৎপন্ন করে।
৩. ভারত কোন কোন দেশ থেকে আমদানি করে।
৪. আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়ামের দাম গত ২৫-৩০ বছরে কীভাবে বাড়া কমা হয়েছে। ( আর তার সাথে ভারতের কেন্দ্র সরকার পরিবর্তনের আদৌ কোন সাদৃশ্য আছে কিনা।)
৫. আন্তর্জাতিক বাজারে পেট্রোলিয়ামের দাম বাড়া কমা হয় কেন?
৬. গ্লোবাল ওয়ার্মিং কী? তার সঙ্গে পেট্রোলিয়ামের কী সম্পর্ক?
৭. পেট্রলিয়ামের বিকল্প পেয়ে গেলে আপনি কি আর রান্নার গ্যাস কিনবেন?
৮. আপনি না কিনলে যে দেশ গ্যাসটি উৎপন্ন করে তার কী হবে?
কী মাথা ঝিমঝিম করছে? বাদ দিন,
এবার আরেকটি পন্যের দাম নিয়ে একটু গল্প করা যাক —-
মেয়ের জন্যে সম্বন্ধ দেখছেন? বিয়ের গয়না গড়াতে দেবেন? সোনার দাম বাড়বে না কমবে বুঝতে পারছেন না তো? আরে না না লজ্জা পাবার কিছু নেই, কেউই বুঝতে পারে না, ধরা যাক এখন সোনার দাম ত্রিশ হাজার টাকা(একভরি বা দশগ্রাম যা হোক একটা ধরে নিন, ১ভরি=১১.৫৬ গ্রাম)। এবার ধরুন কেউ আপনাকে বলল দু-বছর পর ঐ দশগ্রাম সোনার দাম সত্তর হাজার টাকা হয়ে যাবে, গ্যারান্টি সহকারে (বিফলে মূল্য ফেরৎ)। আপনি কি করবেন? ধরুন আপনি যে রাজনৈতিক দলটিকে সমর্থন করেন বা যে দাদা বা নেতাটি আপনার আদর্শ সে ই বলল; কি করবেন?
বাড়ি, ঘর, জমিজমা, ব্যাঙ্কের সব টাকা পয়সা তুলে নিয়ে সোনা কিনবেন ? বোধহয় না; কারন, একটা কিন্তু থেকে যাবে। যদি না বাড়ে? যদি উলটে কমে যায়? তখন তো সর্বনাশ হয়ে যাবে!
(অবশ্য কেউ কেউ এমন কাজও করেন, আর তার ফল কি হয় মা সারদাই জানেন)
তাহলে কি বুঝলেন? আপনার ওই মহাজ্ঞানী দাদাটিকেও আপনি ভরসা করতে পারছেন না কারন ওনার পক্ষেও গ্যারান্টি দেওয়া সম্ভব নয়।
পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিটাই এই দুটো পণ্য নিয়ন্ত্রণ করছে; পেট্রোলিয়াম আর সোনা।
কাজেই ‘বাসের ভাড়া বাড়ল কেন? জবাব চাই জবাব দাও’ করে কিছু হবে না।
সোনার দাম কমবে কমবে করে অপেক্ষা করাও অর্থহীন, বরং চিন্তা করুন মেয়েকে বিয়েতে সোনার গয়না দেবেন? নাকি একটা Mutual Fund করে দেবেন।
আর যা কিছু, চাল, ডাল, নুন, তেল, জামা কাপড় ইত্যাদি পণ্যগুলির দামও অনেকাংশে পেট্রোলিয়াম এর দামের ওপর নির্ভর করে।
কেন্দ্র বা রাজ্যসরকারের কিছু নীতির ওপর অবশ্যই কিছুটা নির্ভর করে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব অনেক বেশী থাকে।
এবার আরেকটি জিনিষের দাম নিয়ে আলোচনা করে আড্ডা শেষ করব। টাকার দাম। হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন, টাকার দাম।
আচ্ছা বলুন তো টাকার দাম বাড়ছে না কমছে? হাসছেন কেন? সবাই জানে টাকার দাম কমছে, এটা আবার জিজ্ঞাসা করার কি আছে? তাই হাসছেন, তাই তো? আচ্ছা বেশ, বুঝিয়ে দিন দেখি টাকার দাম ঠিক কতটা কমেছে। ‘এতো সোজা ব্যাপার, জিনিষপত্রের দাম যত বাড়ছে টাকার দাম তত কমছে। আমাদের ঠাকুরদার আমলে তিনশ টাকা মাইনেতে হেসে খেলে সংসার চলে যেত আর এখন মাসে ত্রিশ হাজার টাকাতেও কূলকিনারা করতে পারছি না আমরা। টাকার দাম তো কমেছেই।’
তাই! ভেবে বলছেন তো! আচ্ছা বলুন তো আপনার ঠাকুরদার আমলে সোনার দাম কত ছিল? মানে কত করে ভরি ছিল? যখন আপনার ঠাকুরদার মাইনে তিনশ টাকা ছিল?
জানা নেই তো ! বলে দিচ্ছি।
১৯৭৩ সালে সোনার দাম ছিল দশ গ্রামের দাম ২৯০.২৫ টাকা অর্থাৎ প্রায় ৩০০ টাকা। তার মানে তখন আপনার দাদু এক মাসের মাইনে দিয়ে ১০ গ্রাম সোনা কিনতে পারত, আর এখনও আপনি এক মাসের মাইনে দিয়ে ওই দশ গ্রাম সোনাই কিনতে পারেন।
তাহলে টাকার দাম কোথায় কমল?
গুলিয়ে যাচ্ছে, ঠিক আছে পরিষ্কার করে দিচ্ছি। টাকার দাম কমেছে কথাটা আসলে অসম্পুর্ন। বলা উচিৎ আমাদের টাকার দাম কমেছে। আমরা কারা? আমরা ভারতীয়রা। ভারতের টাকার দাম কমেছে। অর্থাৎ ডলারের দাম বেড়েছে। আগে চল্লিশ টাকা দিলেই এক ডলার পাওয়া যেত, এখন প্রায় সত্তর টাকা দাম।
এর মানেটা বোঝেন?
টাকার (INR) দাম কমেছে আন্তর্জাতিক বাজারে। অর্থাৎ আমেরিকার তুলনায় ভারতীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে।
‘তাতে আমার আপনার কি এল গেল? আমাদের চাল, আটার দাম না বাড়লেই হল।আমরা তো আর ডলার দিয়ে চাল কিনতে যাচ্ছি না, বা চাল বিদেশ থেকেও আমদানি করছি না। তাহলে চালের দাম বাড়ার সঙ্গে ডলারের কি সম্পর্ক?’
ধীরে বন্ধু ধীরে, একটু দম নিন।
আপনার আমার এই সোনার ফসলের দেশ ভারতের জনসংখ্যা কত? প্রায় একশ পঁয়ত্রিশ কোটি। গড়ে প্রত্যেকে প্রতিদিন একশ গ্রাম করে চালের ভাত বা একশ গ্রাম আটার রুটি খেলেও রোজ ১৩.৫ কোটি কিলোগ্রাম ধান, গম আমরা খেয়ে ফেলছি। অথচ দেশের কৃষিজমির পরিমান প্রতিদিনই কমছে।
তাহলে এই এত মানুষের মুখের অন্ন জোটাতে যে বিপুল পরিমাণ ধান, গম চাষ করতে হচ্ছে ; রাসায়নিক সার ছাড়া তা সম্ভব? ( দেখবেন আবার জৈব সার টার বলবেন না, শুনলে গরুও হাসবে)
ইউরিয়া সারের নাম শুনেছেন? কিম্বা পটাশ অথবা ফসফেট সার? এগুলো তৈরীর কাঁচামাল (Raw material) বেশীরভাগটাই আসে বিদেশ থেকে(Imported Raw materials) কারণ ওগুলো তৈরীর কাঁচামাল এদেশে পাওয়া যায় না।
তাহলে কী বুঝলেন? সেই ডলার, হ্যাঁ ডলার দিয়েই কিনতে হয় সালফার, পটাশ আর ফসফেট এর মত কাঁচামালগুলো।
তাই জবাবটা আপনাকে আমাকেই দিতে হবে। অন্য কেউ দেবে না।
নিন জবাব দিন ——
১. জনসংখ্যা এত বাড়ল কেন?
২. খাদ্য, জল এত অপচয় করেন কেন?
৩. বসে বসে খেলে, আপনার খাবার কে জোগাবে?
৪. ফালতু ফালতু আলো, পাখা চালিয়ে রেখে বিদ্যুতের অপচয় করেন কেন?
৫. ট্রেনে বিনা টিকিটে ওঠেন কেন?
৬. ঘুষ দেন কেন? ঘুষ নেন কেন?
৭. প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগটা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেললেন কেন?
…..এই কেন র তালিকাটা অনেক অনেক দীর্ঘ দাদাভাই। সারাজীবনেও উত্তরগুলো দিয়ে উঠতে পারবেন না।
তারচেয়ে আসুন আমরা আঙুলগুলো নিজেদের দিকে তুলে ধরি, নিজেদেরই প্রশ্ন করি-
ভোটের জন্য কোটি কোটি টাকার খরচটা অপব্যয় নয় কি? আমরা যদি সভ্য হতাম, yes I repeat, আমরা যদি সভ্য হতাম, ভোটে এত টাকা খরচ হত কি? নিজের কাছে জবাব চান, কোন উন্নত দেশে ভোটের জন্য এত টাকা খরচ হয় কি?
ভোটের বাজারে এই ‘জবাব চাই, জবাব দাও’ একটাই জিনিষের দর বাড়ায়। সেটা হল ভোটের বাজারদর।
তাই আসুন, সমস্বরে বলি-
‘ভোটের বাজারদর বাড়ছে কেন? জবাব চাই, জবাব দাও।’
লেখক:সম্বরণ চট্টোপাধ্যায়
মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত|

1 COMMENT

  1. সম্বরন দা,
    শ্রীচরণে প্রণাম?।
    অসাধারণ লিখেছেন।আমার মত নির্বোধের ও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here