বাঙালির বামপ্রীতি ঘুচিল…?

0

Last Updated on

শিবাজি প্রতিম

আমরা বাঙালিরা বরাবরই রেডিক্যাল, এবং কেন্দ্রবিরোধী। প্রাচীন যুগে যখন ‘মহারাজাধিরাজ’ হর্ষবর্ধণ গোটা উত্তরভারত শাসন করছেন তখন বংলা শাসন করছেন ‘প্রথম সার্বভৌম’ রাজা শশাঙ্ক। তাকে হর্ষ কোনোদিনই নিজের বাগে আনতে পারেননি। পরবর্তীকালে মধ্যযুগে মুসলমান শাসনের প্রথমে সুলতানি এবং পরে মুঘলরা যখন দিল্লীর তখত দখল করে বসে আছেন তখনও বাংলায় তারা সেভাবে কখনোই সমান দাপটের সঙ্গে শাসন করতে পারেনি। মধ্যযুগের মধ্যেই একটু পরের দিকের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে কোনো না কোনো স্বাধীন নবাব বাংলা আলো করে বসে আছেন। মুঘলদের পরে দেশের শাসনভার ব্রিটিশদের হাতে গেলে দেখা গেল বাঙালিই আবার তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের নেত্রীস্থানীয় জায়গায় পৌঁছে গেল। আন্দামানে আজও গেলে দেখা যায় যেসব ভারতীয়রা কালাপানি পার করে সেখানে পৌঁছেছেন, সেখানে প্রতি একশো জনে আশি জন বাংলি। যারা যারা ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান দিয়ে ফাঁসিকাঠে শহীদ হয়েছেন তারাও বেশিরভাগই বাঙালি। এই হল মোটামুটিভাবে বাঙালির কেন্দ্রবিরোধীতার খুব সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
এখন প্রশ্ন বাঙালির বামপ্রীতির সঙ্গে এর সম্পর্ক কী…? সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে তবে বাংলায় বামপন্থার ইতিহাস ঘাঁটতে হবে।
মোটামুটিভাবে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই এই বাংলার মাটিতে বয়কট এবং স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়| যা বাংলার মাটিতে সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের ভিত তৈরি করে দেয়। সেই যুগকে টেক্সট বইয়ের বাইরে অগ্নিযুগ বলে আখ্যা দেওয়া হত। সেইসময় থেকেই এক নতুন ধরণের বিপ্লবী আন্দোলন যেখানে এক হাতে গীতা অপর হাতে বোমা নিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লববাদী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে বাঙালি যুবক-যুবতীরা দুবার ভাবেনি। ‘বন্দেমাতরম’ ছিল সেই সময়ের অগ্নিমন্ত্র। বিপ্লবী খুদিরাম, মাষ্টারদা সূর্য সেন, বিনয়-বাদল-দিনেশ, বাঘাযতীন, ঋষি অরবিন্দ এরা সবাই বিপ্লবী অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত ছিলেন। সশস্ত্র বিপ্লববাদ একাধারে ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদও। কিন্তু সশস্ত্র বিপ্লববাদ ব্রিটিশের ভীত নড়িয়ে দিয়ে পাকাপাকি ভাবে বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে জায়গা করে নিলেও তা শেষ অবধি কার্যকরি হয়নি। স্বাধীনতা এল তার অনেক পরে। একাধারে গান্ধীর নেতৃত্বে ভারত ছাড়ো আন্দোলন, অন্যদিকে নেতাজীর নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজের দিল্লী চলোর ডাক দিয়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমর এবং তার পরবর্তী পর্যায়ে নৌ-বিদ্রোহ সহ একাধিক আন্দোলনের ফলে ব্রিটিশ ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে তার পরবর্তী সময়ে সশস্ত্র বিপ্লববাদে দীক্ষিত এবং নেতাজীর যুদ্ধের সহকর্মীদের একাংশ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বামপন্থাকে বেছে নেন। হয়তো ঐ সময় রুশ বিপ্লব সহ পৃথিবীর একাধিক দেশে সমাজতন্ত্রের সাফল্যই সেটার জন্য দায়ী। স্বাধীনতার সমকালীন পর্বে তেভাগা আন্দোলন এবং তার প্রায় এক দশক পরে খাদ্য আন্দোলন পাকাপাকিভাবে বামেদের পশ্চিমবঙ্গে জায়গা করে দেয়। তখন থেকেই জঙ্গি ট্রেড ইউনিউন আন্দোলন, কৃষক আন্দোলনের রেশ পড়তে শুরু করেছে বাঙলাতে। ভারত-চীন যুদ্ধ এবং তার পরবর্তী সময়ে মতাদর্শগত বিরোধের কারণে কমিউনিষ্ট পার্টি ভাগ হয় ১৯৬৪ তে।
আবার একপ্রস্থ খাদ্য আন্দোলন এবং শ্রমিক কৃষক আন্দোলনের ফলশ্রুতি হিসেবে ১৯৬৭ তে প্রথম যুক্তফ্রণ্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা হল তার পরবর্তী ঘটনা। কিন্তু লাগাতার ঘেরাও, অবরোধ আন্দোলনের উপর ভর করে ততদিনে বাংলা থেকে পুঁজির পলায়ন শুরু হয়ে গেছে। সে সঙ্গে শুরু হয়েছে একের পর এর শিল্প কারখানা বন্ধ হওয়ার ট্র্যাডিশনও। যুক্তফ্রণ্ট সরকার গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করে ঘেরাও করা বেআইনি নয়। বলে বাংলার পু্জির কফিনে পেরেক পোঁতার কাজ সেদিনই শুরু হয়ে গেছিল। যুক্তফ্রণ্ট সরকার চলে যাওয়ার পর ১৯৭৭এ আবার বামফ্রণ্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাপক হারে ভূমি সংস্কারের উপর ভর করে সেই সরকার বহুদিন স্থায়ি হয়। মুখ্যমন্ত্রী পদে তখন জ্যোতি বসু। তিনি প্রতি বছরই বিদেশ সফর করেন। গাদা গাদা মৌ সাক্ষর করেন, কিন্তু শিল্প বা পুঁজির বিনিয়োগ বাঙলার অধরাই থাকে। তার পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে মুখ্যমন্ত্রী হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ইতিমধ্যেই নরসিমা রাও জমানার অর্থমন্ত্রী এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ মনমোহন সিংহের নেতৃত্বে আর্থিক সংস্কার চালু হয় ১৯৯১ তে। বাংলাও ব্যাতিক্রমী থাকেনি। নতুন মুখ্যমন্ত্রী তার পূর্বসুরীর বিপরীত পথে হেঁটে ধীরে ধীরে শিল্প আনার চেষ্টা শুরু করেন। তার ফেরী করা উন্নয়নের স্বপ্নে ২০০৬ এর নির্বাচনে বাংলা দুহাত তুলে তাকে আশীর্বাদ করে। এ যাবৎ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে বামেরা জয়ী হয়। কিন্তু ঐ যে বললাম, বাংলা বরাবরই কেন্দ্রবিরোধী এবং নিজের পায়ে কুঁড়ুল মেরে এসেছে। তিনিই বা ব্যাতিক্রম থাকবেন কেমন করে ! বিরোধী তৃণমূলের অবিসংবাদী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শিল্পায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলনের জেরে ২০১১তে দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক ব্যাপী বামফ্রণ্টের পতন হয়। কিন্তু চোখ ধাঁধানো কিছু চটকদারী জনমোহিনী কাজ ছাড়া নতুন সরকার কোনো দিশাই বাংলাকে এ যাবৎকাল অবধি দেখাতে পারেননি তা বলাই বাহুল্য। তবে তাঁর বিকল্প কে…? বিকল্প কি পক্ককেশ কিছু বৃদ্ধের নেতৃত্বাধীন বামফ্রণ্ট…? মানুষ তাদের দেখতে দেখতে কার্যত ক্লান্ত। অন্যদিকে ২০১২ সালের নভেম্বরে শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানে দেশের একেবারে প্রথম সারিতে নিয়ে যাওয়া গুজরাটকে নতুন স্বপ্ন দেখানো নরেন্দ্র মোদি হলেন বিজেপি তথা এনডিএর পরবর্তী নির্বাচনের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী। একা তার ক্যারিশমার উপর ভর করে গোটা দেশে বিজেপি প্রথম বারের জন্য একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। বাদ গেল না এ রাজ্যও। প্রায় ১৭ শতাংশ ভোট এবং দুটি আসনে জয়ী হল মোদির দল যা এখনও অবধি সবচেয়ে বেশি এ রাজ্যের ইতিহাসে। তারপর থেকে গঙ্গায় অনেক জল গড়িয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বিরোধীদের মধ্যে থেকে শাসক দলকে চ্যালেঞ্জ করার জায়গায় অনেকটাই পৌঁছে গেছে বিজেপির মত একটা অতি-দক্ষিণপন্থী দল, যা পূর্বে ভাবাই যেত না। বাঙালি কি তবে বামপন্থা থেকে দক্ষিণপন্থার দিকে ঝুঁকছে…? এ প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতন্ত্র নিয়ে রোম্যাণ্টিসাইজ করে আসা বাঙালি কি পারবে বিজেপির সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে আপন করে নিতে? আপাতভাবে প্রায় ৯ কোটি জনসংখ্যা বিশিষ্ট বাংলায় বিপুলভাবে বর্তমান এবং যে কোনো রাজনৈতিক দলের পাখির চোখ নবীন প্রজন্মের ভোটাররা। তাদের কাছে বামেদের আবেদন প্রায় শূন্যই বলা চলে। তারাই হয়তো আগামী দিনের বাঙলার রাজনীতির নির্ধারক হবে। ভবিষ্যত বাংলার রাজনীতির গতিপথ তারাই ঠিক করবে বলে মনে হয়।
আপাতত ২৩ তারিখের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। সেদিন অনেক হিসেব হয়তো ওলট-পালট করে দেবে বাঙালি। আপাতত প্রশ্নের উত্তর সময়ের গর্ভেই থাক না হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here