সোমরস

3

Last Updated on

স্বাগতা মন্ডল

সোমরস নিয়ে অনেক গপ্পকথা প্রচলিত । আজ কেউ কেউ মনে করেন সোমরস, Absynthe অর্থাৎ ফরাসি অ্যাঁঁবাস্যৎ এর মতো চরম কিছু। চোঁ করে পিয়ে নিলে ভাই বোন গুলিয়ে যায় । আজ সেই বিতর্কিত সোমরস, যা যজ্ঞকালীন পেয় হিসেবে স্বীকৃত ছিল বৈদিক যুগে, সেটি নিয়ে সত্যি গল্প বলব ।
অশ্বিনীকুমার দুজন ছিলেন শূদ্র দেবতা । পাঠক ভাবছেন শূদ্র আবার দেবতা কি প্রকারে ? এটাই তো মজা ! যদিও অশ্বিনী কুমারদের বাবা ছিলেন ব্রাহ্মণ। স্বয়ং শ্রীমান সূর্য্যদেব, তা সত্ত্বেও ওরা যেহেতু চিকিৎসক , মানে সার্ভিস বা সেবা দেন তাই কর্মভাগে শূদ্র । সেই হেতু ওঁদের যজ্ঞের সোমরসে ও যজ্ঞভাগে অধিকার ছিল না। কি ভাবে পেলেন? সে ও এক মজার গল্প !
মহারাজ শর্য্যাতি একবার মেয়েকে নিয়ে বনের মধ্যে বনভোজনে এসেছিলেন। রাজকন্যা সুকন্যা ছেলেমানুষ । ঘুরতে ঘুরতে এসেছিলেন এক উইঢিবির পশে । উনি কি করে জানবেন উই ঢিবি আসলে বহু বছর ধরে তপস্যামগ্ন ভৃগুপুত্র চ্যবন? মহর্ষি সবে ধ্যান ভেঙে উঠেছেন , উইঢিবির মধ্যে চকচকে কিছু দেখে রাজকন্যা হস্তধৃত কাঠি দিয়ে দিলেন এক খোঁচা । ঋষির তো টালমাটাল অবস্থা । ব্যপার দেখতে পারিষদ সহ রাজা এলেন দৌড়ে । এত সম্মানজনক মহর্ষির সাথে এই আচরণের প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রজ্ঞাবান পারিষদরা রাজাকে পরমর্শ দেন রাজকন্যার সাথে মহর্ষির বিয়ে দেওয়া হোক । রাজার আদরের দুলালী ! রাজা পড়েন দো টানায়। কিন্তু আট রকম বিবাহের মধ্যে ব্রহ্ম বিবাহ সবচেয়ে ভালো । ব্রহ্ম বিবাহ মানে যে পুরুষ ব্রহ্মচর্য পালনের পরে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার পর বিয়ে করেন ও নারীরা সেই সূত্রে প্রাজ্ঞ পতি ও তারফলে বুদ্ধিমান সন্তান লাভ করার সুযোগ পান। Pure Genetics আর কি ! তো রাজা রাজি হন । সুকন্যা কিছু বোকা মেয়ে ছিলেন না, তার পরিচয় আমরা পরে আরো পাব । উনি বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে চ্যবনের হাত ধরে রাজমহলের সুখ ছেড়ে তপোবনে চলে আসেন । সব ঠিক ছিল শুধু চ্যবনের বয়স তপস্যা করতে করতে বেড়ে গেছিল প্রচুর । তাই উনি বিয়ের সব শর্ত পালনে অক্ষম ছিলেন । সুকন্যা এসব না ভেবে সংসারের বাকি কাজে ব্যস্ত রাখতেন নিজেকে । একদা সুপ্রভাতে নদী থেকে জল নিয়ে যখন রাস্তা আলো করে রূপসী ফিরছেন, অশ্বিনীকুমার দুজন মুগ্ধ হয়ে ওঁকে অনুসরণ করে বাড়ি অবধি চলে আসেন ও সঙ্গপ্রার্থনা করেন । সুকন্যা তো রেগে আগুন তেলে বেগুন । অশ্বিনীকুমার দের যুক্তি জলের মত সোজা । বৃদ্ধ পতি যখন বিয়ের সব শর্ত পালনে সক্ষম নন , তখন ওঁদের চাহিদা ধর্মত অন্যায় নয় । বুদ্ধিমতি সুকন্যা ব্রহ্মজ্ঞানী পতি ও তপোবনের শান্তি ছাড়তে নারাজ । উদার চ্যবনও তখন ভালোবাসায় লীন । উনি নিজেও সুকন্যা কে ইচ্ছেমতো পতি নির্বাচনের অনুমতি দেন । অশ্বিনীকুমাররা কিছু কম বুদ্ধিমান ছিলেন না ! নইলে আর ডাক্তার তাও আবার দেবচিকিৎসক হবেন কিভাবে ? মোক্ষম চালটি দেন এবার । বলেন, চ্যবনের যৌবন ফিরিয়ে দেবেন, তার বদলে ওঁদের যজ্ঞভাগের অধিকার আর সোমরস পানের অধিকার করে দিতে হবে । চ্যবন পাওয়ারফুল ঋষি ছিলেন, ওঁর কথা দেবতারা না শুনলে বিপদ ! ওইটা আসল কারণ ছিল তারজন্য এত্ত নাটক ! এই শর্তে সব্বাই খুশ । বিখ্যাত চ্যবনপ্রাশ খেয়ে আর কায়কল্প treament করে চ্যবন ফিরে পেলেন যৌবন । সুকন্যা পেলেন যুবক পতি আর অশ্বিনীকুমার গণ পেলেন যজ্ঞভাগ ও সোমরস পানের অধিকার !
যে সোমরসের জন্য এত্ত উর মাটি চুর হল , এবার আসি সেই প্রসঙ্গে । যারা চ্যবনপ্রাশের মত এত জবরদস্ত জিনিস বানাতে পারেন যা খেয়ে বুড়ো , যুবক হয়ে যায় তাঁরা কি আর সোমলতার ঝোল বানিয়ে নিজেরা খেতে পারতেন না ? এত কান্ডের কি দরকার ছিল ?
ভগবান শ্রী কৃষ্ণ বলছেন,
त्रैविद्या मां सोमपाः पूतपापा
यज्ञैरिष्ट्वा स्वर्गतिं प्रार्थयन्ते |
ते पुण्यमासाद्य सुरेन्द्रलोक-
मश्र्नन्ति दिव्यान्दिवि देवभोगान् ||
অর্থাৎ , যারা বেদ অধ্যয়ন করতে করতে সোমরস পান করেন ও স্বর্গ প্রার্থনা করেন তাঁরা আসলে অপ্রত্যক্ষ রূপে আমারই ভজনা করে অন্তিমে সুরেন্দ্রলোক তথা স্বর্গলাভ করে দেবতাদের মতো সুখভোগ করেন ।
কেউ কেউ মনে করেন সোমরস অধুনা হিন্দুকুশ পর্বতজাত ওষধি সোমলতা থেকে উৎপাদিত হত । সেজন্য ঋগ্বেদের 10.34.1 নম্বর সূক্ত উদ্ধৃত করে থাকেন “सोमस्येव मौजवतस्य भक्षः”। কিন্তু এ ব্যপারে কিছু সন্দেহ আছে । নিরুক্ত তে উল্লিখিত মুজবান পর্বত আসলে ঋগ্বেদে উল্লিখিত মোজবত নাও হতে পারে । কারণ সুশ্রুত সংহিতাতে মুজ্জবান, সোমের পর্যায় রূপে বর্ণিত আছে ।
ঋগ্বেদে বলা আছে, প্রবল সোমরস পানের ইচ্ছা পোষণকারী ইন্দ্রদেব শুদ্ধ দইমিশ্রিত সোমরসের ভাগ পান।(ঋগ্বেদ -1/5/5)
আবার ঋগ্বেদের 1/23/1নম্বর সূক্ত তে বলা হয়েছে, হে বায়ুদেব এই সোমরস ঝাঁঝালো হাওয়ার কারণে এটি দুধ মিশিয়ে বানানো হয়েছে , আপনি এসে এটি পান করুন।
।।शतं वा य: शुचीनां सहस्रं वा समाशिराम्। एदुनिम्नं न रीयते।। (ঋগ্বেদ -1/30/2)

এর অর্থ , নীচের দিকে প্রবাহিত জলের মতো, শত কলসি জলে , হাজার কলস দুগ্ধ মিশ্রিত সোমরস ইন্দ্রদেবের প্রাপ্য হোক ।
সোমরস তৈরির বিবরণ ও ঋগ্বেদে বর্ণিত আছে ।
।।उच्छिष्टं चम्वोर्भर सोमं पवित्र आ सृज। नि धेहि गोरधि त्वचि।। (ঋগ্বেদ 28 শ্লোক 9)
অর্থাৎ পিষ্ট সোম পাত্র থেকে বের করে পবিত্র কুশ এর উপর এবং ছেঁকে নেওয়ার জন্য রাখা হোক মানে পিউরিফিকেশন এর পদ্ধতি আরকি !

।।स्वादुष्किलायं मधुमां उतायम्, तीव्र: किलायं रसवां उतायम। उतोन्वस्य पपिवांसमिन्द्रम, न कश्चन सहत आहवेषु।।- ঋগ্বেদ (6-47-2)

অর্থাৎ সোমরস তীব্র স্বাদবিশিষ্ট মধুর মত স্বাদু পানীয় , যিনি এটি পান করেন তিনি বলশালী হন ।
এই অবধি বোঝা গেল নিশ্চয় সোমরস কিছু মাদক নয় ! আরেকটি প্রমাণ দিই ।

।।हृत्सु पीतासो युध्यन्ते दुर्मदासो न सुरायाम्।।

ঋগ্বেদে সুরার নিন্দা করে বলা হয়েছে সুরাপানকারী ব্যক্তি মারপিট যুদ্ধ ইত্যাদি মন্দ কর্মে লিপ্ত থাকেন । সুতরাং কোনো বস্তুর একইজায়গাতে প্রশংসা এবং নিন্দা হতে পারে না , তাই না ?
এবার ফিরে যাই গল্প যেখানে শেষ হয়েছিল । যারা চ্যবনপ্রাশ এর মতো একটা জিনিস বানাতে পারে যা বিজ্ঞানের এত উন্নতি সত্ত্বেও আধুনিক যুগে বানানো সম্ভব হয় নি , তাঁরা সোমরস বানিয়ে পান করতে পারল না ? মহর্ষি চ্যবনকে কেন প্রয়োজন হল তাদের ? এর সাথে ব্রহ্মজ্ঞান এর কি কিছু সম্পর্ক ছিল ?
দেখে নিই ঋগ্বেদ এ ব্যাপারে কি বলছেন …

सोमं मन्यते पपिवान् यत् संविषन्त्योषधिम्। सोमं यं ब्रह्माणो विदुर्न तस्याश्नाति कश्चन।। ঋগ্বেদ (10 -85 -3)

অর্থাৎ বহু লোক এটা মনে করেন , সোম খাওয়া বা পান করা যায় , কিন্তু সোম আসলে আধ্যাত্ম জ্ঞান লাভ হলে শরীরের ভিতর উৎপন্ন হয় , এই অমৃতস্বরূপ পরম তত্ত্ব কেবল প্রাজ্ঞজন উপলব্ধি করতে পারেন । বিষয় টি খাদ্য পানীয় ইত্যাদির মতো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় নয় ।

মহর্ষি চ্যবন যেহেতু এই বিশেষ জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন তাই ওঁর সুনজরে আসা দরকার ছিল । অশ্বিনীকুমারগণ শেষে সোমরস পান করেন নি লাভ করেছিলেন ।

বহু রূপক গল্প দিয়ে জীবনযাপনের সারমর্ম বেদে ব্যখ্যা করা হয়েছে । চর্যাপদে যেরকম সান্ধ্যভাষা, সেরকমই বেদে রয়েছে বিবিধ রূপকল্প দিয়ে জীবনের পরম সত্যের উদঘাটন ।

শেষে একটি মিষ্টি গল্প বলি । যৌবন লাভের পর চ্যবন যখন ফেরেন, দুষ্টুমি করে অশ্বিনীকুমার দুজনে চ্যবনের মতোই রূপ ধারণ করেন । সুকন্যা কে পরীক্ষা করাই উদ্দেশ্য । সুকন্যা নিজের স্বামী কে চিনে নেন ! কিভাবে ? খুব সোজা … চ্যবনের চোখে রোজকার মতোই ভালোবাসা ছিল, আর অশ্বিনীকুমারদের চোখে অপরিচিতের কামনা !

3 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here