বাউল ধর্মের হাফ্ প্র‍্যাকটিক‍্যাল্

1
Baul and Spiritual Sex

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

মূলত হেঁয়ালি ভাষা ও গোপন যৌন সাধনার কারণেই প্রথমে আকৃষ্ট হয়েও পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ বাউল ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ বাউল গানের প্রতি আকৃষ্ট হলেও গৃহস্থ ঘরে ঠাঁই হয়নি কোনো বাউলের। এ ব‍্যাপারে সাধারণ মানুষ থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সবাই এক পথেই হেঁটেছেন। আর তাই গান গেয়ে নাম করলেও বাউলরা সমাজে “ব্রাত্য”-ই থেকে গিয়েছেন। আজও আমরা বাউল গান শুনে হাততালি দিই ঠিকই, কিন্তু কোনো বাউলকে ঘরে এনে তুলি না।

আরও পড়ুন:মণিমাণিক্য খচিত টয়লেটের পর হীরের তৈরি মিউজিয়াম দেখবে বিশ্ববাসী

একটা সময় বীরভূমের কেঁন্দুলির মেলায় দেখা যেতো প্রকৃত সাধক বাউলদের। সারা গায়ে ছাই মাখা, সামনে জ্বলছে ধুনি, দমকে দমকে আগুনের ফুলকি উঠছে হাতে ধরা সরু কল্কে থেকে। এই প্রসঙ্গে বলা যায়, প্রচণ্ড শীতে খালি গায়ে ছাই মাখার একটা বৈজ্ঞানিক উপযোগিতা আছে। ছাইয়ে শরীরের লোমকূপগুলি বন্ধ হয়ে যায় এবং তখন আর তার শরীরে শীত অনুভব হয় না। কিন্তু ছাই মাখার বৈজ্ঞানিক ব‍্যাখ‍্যা থাকলেও বাউলদের বীর্যপাতহীন যৌনসংসর্গকে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান অবাস্তব বলেই মনে করে। অনেক ক্ষেত্রে সংযমের কিংবা মুদ্রার ভূমিকা থাকে ঠিকই, তবে তা এককথায় সাধারণ মানুষের আয়ত্বের বাইরে। আর এখানেই রয়ে গেছে বাউল সাধনার রহস্যময়তা। তন্ত্রধর্মের উচ্ছিষ্ট থেকে জন্মানো বাউল তাই আজও সাধারণ মানুষের থেকে বহু দূরে।

আরও পড়ুন:চায়ে এলাচ, খাবার পর ফলাভ্যাস বর্জনে বাঁচুন কর্কট রোগ থেকে

সহজিয়া বাউল বৈষ্ণবরা প্রতিদিন নিয়ম করে স্ত্রী বা সাধনসঙ্গিনীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ করে থাকেন। এটি তাদের নিত্যদিনের “কর্ম।” এটিই তাদের ধর্মের উপাসনা পদ্ধতি। তবে যৌন সংসর্গ হবে, কিন্তু বিন্দুপাত হবে না। আর যদি তা হয়ে যায়, তবে সে সাধনা ব‍্যর্থ। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেতে পারে না। তাই এই সহজিয়া বাউল সাধন পদ্ধতির দিকে সাধারণ মানুষের আকর্ষণ কম। রজ:স্বলা নারীদের ক্ষেত্রে সেই কয়েকটি দিন অন্য সব ধর্মে ধর্মাচরণে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। ব‍্যতিক্রম বাউল ধর্মে। সহজিয়া বাউল বৈষ্ণবধর্মে কিন্তু এই তিনটি দিন হলো সাধনার পক্ষে প্রশস্ত ও পবিত্র সময়। এদিক দিয়ে তুলনা করলে সহজিয়া পন্থীদের সঙ্গে পশু জগতের অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। কোনো নারী পশুর মাসিক ধর্ম শুরু না হলে কোনো পুরুষ পশুই তার সঙ্গে যৌন সংসর্গে যায় না। এর একটাই কারণ, শৃঙ্খলাবোধ।

আরও পড়ুন:“ইয়ে লাল রং কব মুঝে ছোড়েগা”

মানুষের শরীর জুড়ে কতকগুলি “ব্রেক” আছে, বাউলরা যৌন সংসর্গের সময় সেগুলি ব‍্যবহার করে বীর্যপাত রোধ করে, এমনটাই মত বাউল সাধকদের। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কিন্তু এগুলোকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। বরং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে, অসম্পূর্ণ যৌন সংসর্গ লাভের থেকে ক্ষতিই ডেকে আনে বেশি। এতে শারীরিক অস্থিরতা ও মানসিক অতৃপ্তি থেকে যায়, যার ফলে জন্ম নিতে পারে বিভিন্ন রোগ-ব‍্যাধি। সহজ প্রকৃতি ধর্মের স্বাভাবিক পরিণতি না হলে মানুষের আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে। আর বাস্তবেও আমরা বহু “কাম পাগল” মানুষকে দেখতে পাই, প্রকৃত যৌন জীবন সম্ভোগ করতে না পেরে যাদের এমন দশা হয়েছে। আমি ছোটবেলায় এক প্রতিবেশি প্রায় ষাট বছর বয়সী এক ভদ্রলোককে দেখেছি, যিনি যৌবনে তার স্ত্রীকে হারান। দুই জোয়ান ছেলে, আর বিবাহিতা তিন মেয়ে এবং নাতি-নাতনি নিয়ে বেশ ভরা সংসার। তারপরেও ফি বছর অঘ্রাণ মাসে জমির পাকা ধান উঠলে রীতিমতো ক্ষেপে যেতেন সেই ভদ্রলোক। ধান বেচে নগদ টাকা হাতে আসতেই শুরু হতো তার পাগলামি। সারাদিন ধরে চলতো তার চটুল নাচগান। তারপর ধান টাকা শেষ হলেই আবার এক বছরের জন্য চুপচাপ। তার এক সহোদর ভাই আমাকে একদিন কথা প্রসঙ্গে জানান, ওর স্ত্রী অসময়ে মারা গেছে বলে ঠিকমতো “দেহভোগ” হয়নি, আর তাই ভাইয়ের এই পাগলামি। শেষজীবনে এই ভদ্রলোক বীরভূমের শৈবক্ষেত্র বক্রেশ্বর গোপাল মন্দিরে সেবা-পুজোর জন্য কিছুটা জমি দান করে যান।

আরও পড়ুন:অযথা সময়ের অপচয় বন্ধ করে নিজেকে জানুন,বাঁচুন নিজের জন্য

আমরা জানি, যৌবনে নর-নারী “সুন্দর” হয় ঈস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন নামে দুটো হরমোনের কারণে। এরাই যৌবন তথা যৌন জীবনের নিয়ন্ত্রক। নারী-পুরুষের প্রেম-ভালোবাসার মূলেও এই দুটি হরমোনের কারসাজি। তাই প্রকৃতিগতভাবে স্বাভাবিক দেহজ ধর্মকে উপোসী রেখে মানুষ, বিশেষ করে সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক থাকতে পারে না। অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, তোদের দু’একটি করে ছেলেপুলে হলে তোরা স্বামী-স্ত্রীতে ভাইবোনের মতো থাকবি। এখানে সংযম পালনের কথাই বলতে চেয়েছেন তিনি। বাউলরা যেখানে প্রতিদিন নিয়ম করে ভাত-রুটি খাওয়ার মতো স্ত্রী বা সাধনসঙ্গিনীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ করে ধর্ম পালন করতে হয়, সেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন ঠিক তার বিপরীত।
ঘটনাক্রমে এক বাউল পথের পথিকের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। বছর পঁয়ত্রিশের ওই বাউলমশাই তার দু’গালের কালো দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে সগর্বে জানিয়েছিলেন, তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে রোজ প্রায় দু’ঘন্টা ধরে যৌন সংসর্গ করে “ছাঁচের জল মড়কাচায় তোলেন।” অবাক হয়েছিলাম তার এই অসম্ভব ক্ষমতার কথা শুনে। বছর দশেক পরে এখনো তাকে মাঝে মাঝে দেখি, গালের দাড়ি উধাও, চোয়াল ভেঙে গেছে, শরীর জুড়ে শুধুই কংকালের নড়াচড়া। ক্ষমতার অতিরিক্ত অপব‍্যবহারের ফলে তার এই হাল। সাধনা করা কবেই ঘুচে গেছে তার। বাউল হয়ে গেছে “ফাউল।”

আরও পড়ুন:ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অরুণাচলের কিবিথু হতে পারে পরবর্তী ড্রিম ডেস্টিনেশন

সাধক বাউলরা এখন সংখ্যালঘু। অন্যদিকে, ফি বছরই বাউল সাজছে বহু তরুণ। এই সাজা বাউলরা বিদেশ থেকে একপিস সাদা মেম ধরে আনতে পারলেই সিদ্ধপুরুষ। উঁচু-নিচু ভেদ সব দেশেই আছে। এইসব সাদা মেমরা সবাই অভিজাত ঘর থেকে আসে না, বেশির ভাগই আসে সে দেশের ব্রাত্য পরিবার থেকেই। লংকা ঝাল জেনেও আমরা যেমন খাই, সে রকম স্বাদ উপভোগের জন্য আমাদের দেশের সাজা বাউলদের গলা ধরে পশ্চিমী দেশের সাদা মেমের দল এ দেশে আসে। বাউলের দু’চারটে সিডি বেরোয়, গানের বায়না আসে, পয়সা আসে। তার ওপর পাশে মেম থাকলে জনগণের কাছে আকর্ষণ বাড়ে। সব মিলে জীবন ভোগের সম্পূর্ণ আয়োজন, জীবন তখন আর সাধনার জন্য থাকে না। আর বাইরের এই বাহারি চটকদারিতেই মজে সাধারণ মানুষের মন। মানুষ তখন ছুটে যায় কেঁন্দুলির মেলায় বাউল খুঁজতে। বাউলের সান্ধ্য ভাষার মর্ম বোঝে না, তবুও জোরে জোরে হাততালি দেয়। আর বাউলের এই হেঁয়ালি কথাই মানুষকে এক ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন করে রাখে।
বাউলের কথা বলতে গিয়ে বীরভূমের লোকপুর থানার ভাড্ডি গ্রামে বসে খ‍্যাতিমান গীতিকার ও গায়ক নারায়ণ কর্মকার জানালেন, বাউলদের নিয়ে লেখকরা তত্ত্বকথা লিখেছেন অনেক, আর “সাজা বাউলে” ভরে গেছে দেশ।

আরও পড়ুন:হট মাড বাথের জনপ্রিয়তা বাড়ছে ক্রমেই

কিন্তু বাউল কাকে বলে ?
উত্তরে নারায়ণ কর্মকার বললেন, নিম্নবিত্ত, না খেতে পাওয়া গরীব-গুর্বোরাই বাউল হয়েছে। বাউল হতে গেলে তার যন্ত্রণা থাকবে, কষ্ট থাকবে, প্রেম থাকবে, আবার শরীরে তাগদও থাকবে। বাউল ভাববে, কীজন‍্য পৃথিবীতে এলাম, কে আনলো, কেন আনলো, কোথায় থাকবো, কেন থাকবো, কীজন‍্য শরীর, কীজন‍্য পৃথিবী ?
বলতে বলতে অনবদ্য ভঙ্গিতে নারায়ণ কর্মকার গেয়ে ওঠেন,
“যন্ত্রণা যার, সেই তো বাউল হয়
মন বাউলে কথা কয় রে, কথা কয়–
ক্ষ‍্যাপা তুই জন্মে সংসারে
কত পথ ঘুরে ঘুরে
জন্মেছিস দুখ যাতনায় বুকের খামারে
রক্ত-মাংসে ঢাকা দেহ কত আর যন্ত্রণা সয়!
যন্ত্রণা যার, সেই তো বাউল হয়।”…
গান শেষে মুখ তুললেন নারায়ণ, একটু দম নিয়ে পুনরায় বললেন,
“বাউলে রাখলে হবে গতি
মনটা হলে বাউল মনা–
দু:খ-ভাবনা কিছুই রয় না।”…
শেষে আত্মসমর্পণের কথাও বলে গেলেন নারায়ণ, বললেন,
“ওই পদ্মানদীর পাড়ে এক বাউল কন‍্যা রয়।
তার মহুয়া মাখা ঠোঁটে প্রেম করেছে আশ্রয়।।
সে যখন তখন বাজায় একতারা।
আমি সেই সুরে পাগল পারা, পাগল পারা।।
সে নাইতে নেমে নদীর ঘাটে গা খোলে যখন।
তার শ‍্যামলা গায়ে চিকুর মারে বিজুরি যেমন।।
তার গা বেয়ে জল মোতির মালা।
গড়িয়ে পড়ে ধারা।।
সে যখন তখন বাজায় একতারা।
ভোলা মন, আমি হলাম তার প্রেমে মাতোয়ারা।।”…
যাই হোক, সহজিয়া বাউলরা বলেন, রোজ যৌন সংসর্গ করো, কিন্তু বিন্দুপাত কোরো না। সাধনকর্মে ব‍্যস্ত থাকার সময় বীর্যপাতের উপক্রম হলেই লিঙ্গমূলের বাঁ-দিকে মারো “ব্রেক” কষে, দেখো অঘটন আর ঘটবে না।
সাধারণ মানুষ এই “ব্রেক” খুঁজতে বাউলের পিছন পিছন ঘোরে। এখনও ঘুরছে। তবে খুঁজে পেয়েছে ক’জন ?

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here