পেটো বনাম চাপাতি

1

Last Updated on

দেবাশিস লাহা

একমুখী দর্শনের মধ্যে অদ্ভুত একটি সাদৃশ্য আছে। ‘সহি’ ‘অসহি’র ঝামেলা। এই যেমন ধরুন ইসলাম আর বামপন্থা!  কিরকম?  পড়ুন তবে! 

১) আচ্ছা, ইসলাম নাকি শান্তির ধর্ম!  আইসিস-এর কাণ্ড কীর্তি দেখেছেন !  খুন, ধর্ষণ,  লুটপাট কিছু বাকি রাখছে না।

আপনার মগজে গোবর ছাড়া কিছু আছে ভাইজান? 
আইসিস সহি ইসলাম নয়!  সহি ইসলাম হইল ইন্দোনেশিয়া। সবচেয়ে বেশি মুসলমান ওদেশেই আছে!  

কিন্তু ওদেশে তো শরিয়তি শাসন নেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। পূর্বপুরুষ নাকি সব ভারতীয় ছিল। কুড়ি বছর হল সেখানে ডেমোক্রেসি চলছে। 

ভুল হইছে ভাইজান। ইন্দোনেশিয়া নয়। ইরাণ হইল গিয়া সহি ইসলাম। শরিয়তি শাসন হইলে যে বেহেস্ত নাইমা আসে, ওরাই দ্যাখাইছে।  

কিন্তু ওদেশে তো নারীদের দাসী বানিয়ে রাখে। পান থেকে চুন খসলেই পাথর দিয়ে মারে। এই তো সেদিন সোরাইয়া নামে একটা মেয়েমানুষকে —

ভুল হইছে ভাইজান। ইরান সহি ইসলাম নয়, সহি ইসলাম হইল পাকিস্তান!  

ওদেশে তো শিয়া সুন্নির মারামারি লেগেই আছে। কত লোক যে মরছে হিসেব নাই। শিয়া মসজিদে একটার পর একটা হামলা!  থামতেই চায় না!  

আবার ভুল হইল ভাইজান। পাকিস্তান নয়, সহি ইসলাম হইল বাংলাদ্যাশ!  

কিন্তু ওদেশে তো নাস্তিকদের সঙ্গে ইসলামিষ্টদের মারাত্মক ঝামেলা। নাস্তিক পেলেই চাপাতি চালাচ্ছে। তাছাড়া ওই দেশে অনেকেই শরিয়ত শাসনের বিরুদ্ধে।  নববর্ষ উদযাপন না করার ফতোয়া মানছে না। মৌলবাদীরা আলপনা নষ্ট করে দিয়েছিল। কিন্তু পরের দিন এই শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষেরা রাজপথ জুড়ে আলপনা দিয়েছে। 

আবার ভুল!  বয়স হইতাছে তো!  ভাইজান আপনি কিছু মনে কইরবেন না। সহি ইসলাম হইল সৌদি আরব। এতে কুনো ভুল নাই। 

কিন্তু ওদেশেও মেয়েদের ভোটাধিকার নাই। বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলোকে বুড়ো দামড়া গুলো বিয়ে করার নামে ভোগ করে। নারীরা একা বেরোতে পারে না। স্বামী, ভাই অথবা বাবা ছাড়া অন্য কোন পুরুষ সঙ্গীর সঙ্গে বাইরে যাওয়া যায় না। তাছাড়া এখন ওরা ইয়েমেনে শিয়াদের উপর বোমা ফেলছে। নারী শিশু সহ অনেক সাধারণ মানুষ নিহত হয়েছে। 

দ্যাখলেন ভাইজান, আবার ভুল কইচি!  এরা কেউই সহি ইসলাম নয়। সহি ইসলাম হইল কুরান!  আমাদের আসমানি কিতাব!  

তাই?  কিন্তু ওখানেই তো নারীর রক্তমূল্য পুরুষের অর্ধেক বলা হয়েছে। ধর্ষিতা হলে নারীকেই নাকি  চারজন পুরুষ সাক্ষীর ব্যবস্থা করতে হয়!  

ভাইজান, এই দ্যাখেন!  বলেন তো এডা কি?  

একী এটা আবার কেন?  এটা তো চাপাতি!  

হাঁ ঠিক কইছেন। এবার কন দেহি কি কওনের আচে!  

২)

বামপন্থীরা নাকি প্রগতির কথা বলে!  কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কী হল বলুন তো!  জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়নবাজি করে সব কল কারাখানাই বন্ধ করে দিলেন, কমরেড?  

আপনি ভুল জানেন দাদা। সিপিএমই বলুন আর বামফ্রন্টই বলুন এরা কেউই সহি  বামপন্থী নয়। সত্যিকারের বামপন্থী হল নকশালরা!  

কিন্তু ওরা তো নিজেদের মধ্যেই মারামারি করে!  কত রকমের গোষ্ঠী!  এ বলে আমি ঠিক ও বলে আমি ঠিক!  সন্তোষ রানা যখন জাগতে বলেন, চন্দ্রপোল্লা রেড্ডি তখন ঘুমোতে যান!  অন্ধ্রপ্রদেশে নিজেদেরকে ওরা যতটা মেরেছে, পুলিশ তার অনেক কম!  

ভুল হয়ে গেল দাদা। নকশাল নয়, সত্যিকারের বামপন্থী হল মাওবাদীরা।  

কিন্তু ওরাও নকশাল!  নতুন পাত্রে পুরনো মদ। সেই গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা, চীনের চেয়ারম্যান আমদের চেয়ারম্যান জাতীয় শ্লোগান এবং কর্মসূচি।  শেষই হয়ে গেল প্রায়। দু একটা রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে হয়ত গুটিকতক আছে। কিষাণজীর অবস্থা তো জানেনই। 

আবার ভুল বললাম দাদা। নকশাল, মাওবাদী নয়, সত্যিকারের বামপন্থী হল সোভিয়েত ইউনিয়ন।

দূর সে তো কবেই ভেঙে গেছে। ওদেশের মানুষই লেনিন স্তালিনের মূর্তি ভেঙেছে। এখন ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্র। 

আবার ভুল হল দাদা। আসল বামপন্থী ছিল কম্বোডিয়া।  

মানে?  সে তো ভয়ংকর!  উন্মাদ পল পট 1975 থেকে 1979 এই সময়ে প্রায় কুড়ি লক্ষ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেন। তাঁর স্বপ্নের যৌথ খামারকে কী বলা হয় জানো?  killing fields!

ভুল হল আবার। সত্যিকারের বামপন্থী হল চীন। মাও -এর স্বপ্নরাজ্য।

কিন্তু ওদেশে এখন তো মাওকেই মানা হয় না। শুধু ছবিটা রেখেছে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি অনেকাংশেই মেনে নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের অবস্থাও খুব খারাপ। আট ঘন্টা তো ছেড়েই দিলাম,  বারো চোদ্দও ছাড়িয়ে যায়। এখন আবার মুসলিমদের নাম আর দাড়ি ধরে টান দিচ্ছে। তিয়েন আর মেন স্কোয়ারের ঘটনা না হয় বাদই দিলাম। এখন তো উইগুর মুসলিমদের উপর চরম অত্যাচার করছে। কোরান বাজেয়াপ্ত করেছে। দাড়ি রাখা নিষেধ। পনের লক্ষ ধধর্মপ্রান মুসলমানকে জোর করে আটকে রেখে চীনা সমাজতন্ত্র শেখাচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত।  

বারবার ভুল হচ্ছে দাদা। মনে পড়েছে। সত্যিকারের বামপন্থা আপনি উত্তর কোরিয়াতেই পাবেন।

উত্তর কোরিয়া?  বল কী?  ওরা তো নিজেদের লোকজনকে খাওয়াতে পারে না। বিদেশ থেকে খাদ্য যায়। 2015 সালেই তো UNO ওদের ১১৫ মিলিয়ন ডলারের খাদ্য সাহায্য করল। তবু  বোমা আর মিশাইল বানায়।  আমেরিকা থেকে শুরু করে চীন সবাই উদ্বিগ্ন। দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভিক্ষ চলছে।  অথচ অস্ত্র তৈরিতে খামতি নেই। এখন তো চীনও হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। আর ওই মোটা সোটা গোলগাল ছেলেটা!  কী যেন নাম,  সে নাকি রাজ্যপাট ছেড়ে দিনরাত মেয়ে– না বাবা আর বলব না! 

ভুল বলেছি।  আসলে মাথা কাজ করছিল না। কাল রাতে ঘুম হয়নি তো।  ফার্স্ট হাফে বাবলি, লাস্ট হাফে লাভলি!  আর মিডল হাফে হেরোইন, হাসিস আর পুরনো গিটার!  তাই —- 
যাক এবার আর ভুল হবে না। সত্যিকারের বামপন্থী হল কিউবা!  The country of Fidel and Che! Our heart throbs!  

কিন্তু একটা মানুষ আমৃত্যু ক্ষমতা ভোগ করে যাবে,  সেটা কী ঠিক? ১৯৫৯  এর পর একটাও নির্বাচন হল না!  তাছাড়া ওই ছোট্ট দেশেও দুশোর উপর জেল। এক লক্ষের বেশি কয়েদি। অনেক লোক তো বোটে করে আমেরিকায় পালিয়ে আসে শুনেছি। এইসব পালিয়ে আসা লোক নাকি dissidents!  ভাবো!

সব ভুল দাদা। এরা কেউ সত্যিকারের বামপন্থী নয়!  কেউই ঠিকঠাক এপ্লাই করতে পারেনি! লেনিন, মাও প্রথমে সফল হলেও পরের দিকে সংশোধবাদী বিচ্যুতি ঢুকে পড়ে।  ডায়ালেক্টিকস -এ কোনো ভুল থাকতে  পারে না। সত্যিকারের বামপন্থা  হল Communist Manifesto, Dus Capital!  

কিন্তু প্রয়োগ করতে গেলেই যখন বিচ্যুতি হচ্ছে, তখন মনে হয় না গোড়াতেই হয়ত কোনো গলদ আছে। দেশ কাল মানুষ সব কিছুকেই একটা বস্তুবাদী দর্শন দিয়ে বিচার করা কী ঠিক?  মানুষ তো বস্তু নয় যে হাইড্রোজেন আর অক্সিজেন মেলালে যেমন জল হয় তেমনই সবসময় একই রেজাল্ট দেবে!  

এটা কি বলুন তো দাদা?  

একী এটা কেন ভাই!  এ তো পেটো!  

ঠিক ধরেছেন দাদা । হ্যাঁ কী যেন একটা বলছিলেন!
মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here