মাটি ঘাঁটতে ঘাঁটতেই ‘প্রতিমা’ হয়ে উঠলেন মৃৎশিল্পী

0
female-artist-making-Durga-idol-professionally

Last Updated on

রাইজিং বেঙ্গল ডেস্ক : শিল্পের মূল্য সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য নয় সব সময়। তবে যার রক্তে শিল্প সে কখনও কি ভুলে থাকতে পারেন তার শৈল্পিক সত্বাকে ভুলে থাকতে? স্বচ্ছল পরিবারের গৃহবধূ প্রতিমা দেবী কি কখনো ভেবেছিলেন অদৃষ্টের পরিহাসে ছোটবেলায় মৃৎশিল্পী বাবা যতীন্দ্রনাথ চিত্রকরের সাহায্য করতে গিয়ে মাটি ঘাঁটতে ঘাঁটতে শেখাই যে কোন একদিন রোজগারের প্রধান রাস্তা শিল্পকর্মই হয়ে উঠবে, তা বোধ করি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি তিনি।

বয়স তখন আট কি নয় বাড়ির উঠোনে চলত মেয়েবেলার নানান খেলাধুলো; কিতকিত, বুড়ি চু, মাঝেমধ্যে বর বউ খেলা। তারই মাঝে সংসারের অভাব-অনটন সামাল দিতে মৃৎশিল্পী বাবাকে সাহায্য করতে করতে ঝুলন পূর্ণিমার পুতুল পুতুল বানানোর শুরু। এরপর প্রাথমিক শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে উচ্চবিদ্যালয়ের নবম থেকে দশম শ্রেণীতে পড়া। আর এরই মাঝে এসে পড়ল উত্তম বিবাহ প্রস্তাব। স্থানীয় মিলে কর্মরত গৌরমোহন দে’র সচ্ছল পরিবার থেকে বিবাহ প্রস্তাব আশাতে প্রতিমা দেবীর বাবা আর দেরি না করে পাত্রস্থ করলেন তাকে। ভরা সংসারে স্বামী পুত্র নিয়ে সুখেই দিন কাটছিল প্রতিমা দেবীর। আচমকাই ঝড় উঠল তার শান্তির নীড়ে যখন হঠাৎ করে তালা পড়ল বিখ্যাত বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর মিলে যেখানে প্রতিমা দেবী স্বামী ছিলেন কর্মরত।

আরও পড়ুন – সহানুভূতি নয় কাম্য সমান অনুভূতি – এই ভাবনার প্রতিফলন এবারের হাওড়ার কল্যাণপল্লী সার্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটির পূজামণ্ডপে।।

সুখের সংসারে বাসা বাঁধলো অভাব অনটন আর তাই পরিস্থিতির চাপে পড়ে প্রতিমা দেবীকে স্বামী-সন্তান নিয়ে এসে উঠতে হল পিতৃগৃহে। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও তার সহায় ছিল না। মৃত্যু হল প্রতিমা দেবীর বাবার। উপায়ন্তর না দেখে বাড়ির পাশেই একটি গুমটি চালাতে শুরু করেন তারা। কিন্তু টিমটিমে ওই একরত্তি গুমটিতে সংসার চালানো নেহাতই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অগত্যা মাটি দিয়ে একে তৈরি করতে শুরু করলেন ঝুলনের পুতুল, কালী, সরস্বতী,বিশ্বকর্মা,গণেশ ইত্যাদি দেবদেবীর মূর্তি। মহিলা শিল্পীর এই নিখুঁত দক্ষতায় রীতিমতো আলোড়নের সৃষ্টি হল। এরপর এলো দুর্গা ঠাকুর গড়ার অনুরোধ। সেখানেও সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেন প্রতিমা দেবী। সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। ধীরে ধীরে তার তৈরি দুর্গা প্রতিমা ব্যক্তিগত পূজার গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেল বারোয়ারি পূজা মন্ডপে। প্রতিমা দেবী স্বয়ং হয়ে উঠলেন আক্ষরিক অর্থেই দশভুজা। স্বীকৃতি লাভ করলেন জেলা তথা রাজ্যের মহিলা মৃৎশিল্পী হিসেবে। নিজের যোগ্যতায় তিন ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে পাঠাতে চাইলেন চাকরির উদ্দেশ্যে। কিন্তু ছেলেরা মায়ের সঙ্গে শেখা হাতের কাজকেই আপন করে নিতে চাইলো। ৬০ ছুঁই ছুঁই প্রতিমা দেবী এবছর বাড়িও বারোয়ারি পূজা মিলিয়ে মোট ৩৫ টি প্রতিমা গড়েছেন। স্থানের অভাবে ফিরিয়ে দিতে হয়েছে বহু অর্ডার, এ এক পরম আক্ষেপ প্রতিমা দেবীর। তবে প্রায় ৬০ বছর বয়সের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এতটুকু ক্লান্ত নন তিনি এভাবেই সৃষ্টির মাঝেই বেঁচে থাকতে চান বাকি জীবনটা।

আরও পড়ুন – যুগান্তেও ফিকে পড়েনি বোইদুলের চৌধুরী দের দূর্গা পুজোর বনেদিয়ানায়

২০১১ সালে তৎকালীন পুলিশ সুপার তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন বিশেষ পুরস্কার। তবে প্রচারের আলোয় আসতে প্রবল আপত্তি প্রতিমা দেবীর। তিনি মনে করেন সরকারি সাহায্যের জন্য দোড়ে দোড়ে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে যোগ্য শিল্পী তৈরি করাটা অনেক শ্রেয়। ইতিমধ্যেই তিনি তৈরি করে ফেলেছেন তার যোগ্য উত্তরসূরি তার বড় ছেলে সনৎ দে কে। এখন দুর্গা প্রতিমার শেষ মুহূর্তের কাজ গুলি সনৎ বাবুর হাতেই সম্পন্ন হয়। পরিবারের সদস্যরা বলেন প্রতিমা দেবী তৈরি প্রতিমার মধ্যেই তারা ওনাকে খুঁজে পান তিনি কখনো চতুর্ভূজা কখনো দশভূজা। হুগলি শ্রীরামপুর পৌরসভার দক্ষিণ প্রান্তের এই পটুয়াপাড়া এখন ব্যস্ততম স্থান,যেখানে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন মহিলা মৃৎশিল্পী প্রচারবিমুখ প্রতিমা দে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here