রাজনগরে মদনমোহনের ভোগেই হয় মা দুর্গার পুজো

0
durgapuja of raajnagar birbhum

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

জেলা বীরভূমের একসময়ের রাজধানী এবং বর্তমানে এ জেলার ঝাড়খণ্ড লাগোয়া প্রান্তিক অঞ্চল রাজনগর। এখানেই এই অভিনব পুজোর নিয়ম চালু রয়েছে রাজনগর থানার রাণীগ্রামের প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো দুর্গাপুজোয়। এখানে চট্টরাজ পরিবারের প্রাচীন মদনমোহন মন্দির ও দুর্গামন্দির পাশাপাশি অবস্থিত। একসময় শত্রুরা আক্রমণ করেছিল এই মদনমোহন মন্দির, কিন্তু ভাঙতে পারেনি। এই শত্রু বলতে, স্থানীয় জনশ্রুতিতে বর্গিদের নাম শোনা যায়। আবার অন্যদিকে, ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে সাঁওতাল বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহী সাঁওতালরা এই রাজনগর এলাকা আক্রমণ করেছিল, সেকথা লিখেছেন উইলিয়াম উইলসন হাণ্টার তাঁর লেখা “অ্যানালস্ অব্ রুরাল বেঙ্গল” গ্রন্থে।

আরও পড়ুন :ঐতিহ্য মেনে আজও সেজে ওঠে আগমেশ্বরীর একচালার দূর্গা

এই চট্টরাজ পরিবারের সপ্তম পুরুষ ভজনকৃষ্ণ চট্টরাজ বর্তমান ঝাড়খণ্ডের কুমিরদহা গ্রাম থেকে জীবন-জীবিকার তাগিদে রাজনগরে এসেছিলেন। এ বিষয়ে পরিবারের বর্তমান প্রবীণ উত্তর পুরুষ ভবানীশংকর চট্টরাজ জানান,  এই দুর্গাপুজোটা ছিল একতলা গ্রামের রায়দের। তাঁরা ছিলেন জমিদার। জমিদারি চলে যাবার পর তাঁদের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। তাঁরা আমাদের শিষ্য। তখন জমিদার আমাদের এই পুজোটা আমাদের দিয়ে দেন। কিন্তু জমিদারের গুরুদেব গরীব ব্রাহ্মণ ভজনকৃষ্ণ একসঙ্গে মদনমোহন ও মা দুর্গার আলাদা আলাদা ভোগের বন্দোবস্ত করতে পারেননি। তখন মা দুর্গা স্বপ্নে তাঁকে বললেন, তুই চিন্তা করিস না। মদনমোহনের ভোগ দিয়েই আমার ভোগ দিবি। তোকে আলাদা ব‍্যবস্থা করতে হবে না। সেই থেকে মা দুর্গার সন্ধিপুজোর ভোগ ওই মদনমোহনের ভোগ দিয়েই হয়। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে,একসময় রাজনগরের রাজা ছিলেন সেনবংশীয় লক্ষ্মণসেন। তিনি ছিলেন পরম বৈষ্ণব। তাঁর প্রভাবেই এখানে বৈষ্ণব ও শাক্ত ধর্মের মিলন ঘটে এবং সেই ঐতিহ্য এখনো চলে আসছে।

আরও পড়ুন :রীতি মেনে নবমীর দিনই শুরু হয় তালুকদারদের জগদ্ধাত্রীর কাঠামো

মন্দিরের কিছুটা দূরেই রয়েছে সেনরাজ লক্ষ্মণসেনের স্মৃতিবিজড়িত “লক্ষ্মণপুরের ডাঙা।” এখানে একসময় রাজা লক্ষ্মণসেনের কাছাড়ি বাড়ি ছিল। কয়েক বছর আগে এখান থেকে পোড়া মাটির জল-পাইপ পাওয়া যায়। তাছাড়া রাজনগরের আগে নাম ছিল “লক্ষ্মণ নগর”,যেটি মীনহাজ উদ্দিনের খ্রিস্টিয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে লেখা ” তবকৎ-ই-নাসিরী”-তে উল্লিখিত আছে “লখনোর।” ঐতিহাসিক আচার্য যদুনাথ সরকার এই “লখনোর”-কে আজকের “রাজনগর” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

রাজা লক্ষ্মণসেনের সময়ে রাঢ়ের শাসনকেন্দ্র ছিল এই রাজনগর। পারিবারিক ঐতিহ্য শৈব উপাসনা ছেড়ে গীতগোবিন্দের কবি জয়দেবের সংস্পর্শে এসে লক্ষ্মণসেন বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেন। সুতরাং সেনরাজ লক্ষ্মণসেনের এলাকায় বৈষ্ণবধর্মের প্রভাব পড়াটা স্বাভাবিক।
যাই হোক্, মদনমোহনের ভোগেই এখনো এখানে মা দুর্গার ভোগের রীতি চালু রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here