শহর কলকাতার পুজো পরিক্রমা (পর্ব-১)

0
ancient-history-of-Durga-puja-in-westbengal.

Last Updated on

শিবাজি প্রতিম

শহর কলকাতার আনাচে কানাচে বহু ইতিহাস। কল্লোলিনী তিলোত্তমার প্রতিটি গলি, তার প্রতিটি লেনের মধ্যে কোনো না কোনো ইতিহাস তার নিজস্ব ঐতিহ্য নিয়ে আবহমান কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। চরিত্রে ‘কসমোপলিটান’ হলেও এই শহর মূলত বাঙালি হিন্দুর শহর। দেশভাগের পর বাঙালি হিন্দুর ‘হোমল্যাণ্ড’ হওয়া আমাদের এই রাজ্য ‘পশ্চিমবঙ্গে’র প্রধান আর্থিক কেন্দ্র এই শহর রাজধানী শহর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে ‘বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ’ আমরা জানি। সেই তেরো পার্বণের মূল উৎসব হল বাঙালির দুর্গাপুজো। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে এই দুর্গাপুজোর শুরুটা কিভাবে হল ? বা কে প্রথম দুর্গাপুজোর পত্তন করলেন বা এত জাঁকজমকভাবে বাঙালি কেন তার প্রধান উৎসব হিসেবে একে নিজের ক্যালেণ্ডারে স্থান দিল ?

আরও পড়ুন – নাইজেরিয়ার মাছ উৎসব এবার দুর্গাপুরের মার্কনীর মন্ডপে

ইতিহাসে একটু পিছনের দিকে যাওয়া যাক। তখন বাংলায় নবাবের শাসন। ১৭৫৬ সালে নবাব আলিবর্দী খাঁর হাত থেকে শাসনভার গেছে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার হাতে। অল্পবয়সী সিরাজ ছিলেন প্রচণ্ড বদমেজাজী এবং খামখেয়ালী ধরণের। অন্যকে কষ্ট দিয়ে তার মধ্যে আনন্দ খোঁজার মাধ্যমে ছোট নবাবের মনে একধরণের ‘স্যাডিজম’ কাজ করতো। গঙ্গা দিয়ে হয়তো কোনো নৌকো পার হচ্ছে একদল যাত্রী নিয়ে। নৌকোটাকে উল্টে দিয়ে দেখা যাক কেমন হয় ? এইধরণের নৃশংস কাজও তার মধ্যে স্থান পেত। তথাকথিত ‘মার্ক্সিস্ট স্কুল অফ হিস্টোরিওগ্রাফি’র স্কালাররা সিরাজকে হিন্দুদরদী, ধর্মনিরপেক্ষ এবং পরবর্তীকালে তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী বলে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার কাণ্ডারী বলে বর্ণনা করলেও বাস্তবের সিরাজ মোটেও এরকম ছিলেন না। বরং উল্টোটা অর্থাৎ চরম হিন্দুবিরোধীই ছিলেন।

আরও পড়ুন – যুগান্তেও ফিকে পড়েনি বোইদুলের চৌধুরী দের দূর্গা পুজোর বনেদিয়ানায়

তো এমনতর নবাবের নবাবী ভাগ্যও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। নবাবের এককালের অত্যন্ত ঘনিষ্ট এবং বাংলায় ঐ সময়কালের সবচেয়ে ধনী ব্যাবসায়ী জগত শেঠকে নবাব কোনো এক কারণে প্রকাশ্য সভায় চড় মেরে বসেন। এবং সেই ঘটনাই নবাবের কাল হয়। জগত শেঠ তলে তলে সিরাজের সেনাপতি মীরজাফরের সাথে ফেঁদে বসলেন এক চক্রান্ত। সে সঙ্গে আরো কিছু হিন্দু রাজা যেমন কৃষ্ণনগরের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, সূতানুটির সবচেয়ে বড় জমিদার রাজা নবকৃষ্ণ দেব এবং সবশেষে ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বাংলার সর্বাধিনায়ক লর্ড ক্লাইভ ছিলেন সেই ষড়যন্ত্রের অংশীদার। চক্রান্তে ঠিক হল সিরাজের কলকাতা আক্রমণ পরবর্তী যুদ্ধে ক্লাইভের সেনার সামনে মীরজাফরের নেতৃত্বাধীন সিরাজের সেনা নিক্রিয় থাকবে। সেইমত পলাশীর যুদ্ধে একটা ঢিলও সিরাজের দিক থেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উপর পড়ল না। পরবর্তীকালে ক্লাইভ তার ডাইরিতে একই কথা লিখেও গেছিলেন। চক্রান্ত সফল হোল এবং সিরাজের পতনও হোল সে সঙ্গে। শোনা যায় রাজধানী মুর্শিদাবাদের রাস্তায় নাকি সিরাজকে জ্যান্ত কেটে তার দেহ টুকড়ো টুকড়ো করে হাতির পিঠে চড়িয়ে নাকি তার হারকে উদযাপন করেছিল মীরজাফরের সঙ্গীসাথীরা।
পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কলকাতার চিত্রটা হয়েছিল উৎসবের। অধুনা শোভাবাজার এবং তৎকালীন সূতানুটিতে রাজা নবকৃষ্ণ দেব সেবারই প্রথম শরতকালে জাঁকজমক করে তার বর্তমান শোভাবাজার রাজবাড়ি বলে যাকে আমরা চিনি সেখানে আয়োজন করেছিলেন এক বিরাট দু্র্গাপুজোর। এলাহী ছিল সেই আয়োজন। রাজকীয় কায়দায় খাওয়া-দাওয়া এবং অফুরন্ত মদ্যপানের আয়োজন ছিল বলে শোনা যায় তাতে। এমনকি বহির্দেশ থেকে বাইজি আনিয়ে নাচগানের ব্যবস্থাও ছিল সেবার। সেই অনুষ্ঠানে প্রধাণ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রন জানানো হয় রবার্ট ক্লাইভকে। সপার্ষদ রাজা নিজে এবং ক্লাইভ মিলে সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন এবং সেকারণেই শোভাবাজারের রাজবাড়ির পুজোর অপর নাম হয়ে গেল ‘কোম্পানি পুজো’।
বর্তমান কলকাতার বনেদী বাড়ির পুজো বলতে একডাকে প্রথমেই যে পুজোর নাম আসে তা হোল শোভাবাজার রাজবাড়ির এই পুজো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here