দূষিত বায়ুকণা ‘পি এম ২.৫’ যখন ভিলেন

0

Last Updated on

উত্তম মণ্ডল

বাড়ছে বায়ুদূষণ, বাড়চ্ছে ব‍্যস্ত আনুপাতিক হারে অপরাধ। সারা বিশ্বের কাছে এখন এটাই হালফিল মাথা ব‍্যথার কারণ। আর ভাবতে অবাক লাগলেও বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত “ভিলেন” বায়ুদূষণের বদমাইশী।
মানুষের চুলের থেকেও প্রায় ৩০ গুণ সরু ছোট দূষিত কণা ভাসছে বাতাসে। কলকারখানা, পোড়া কাঠ প্রভৃতি থেকে উৎপন্ন এই কণার নাম “পি এম-২.৫।” এরাই বাতাসে মিশে পরিবেশ দূষিত করছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা “হু” জানিয়েছে, বিশ্বের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন এই দূষিত বায়ু থেকেই শ্বাস নিচ্ছে। আর বিশ্বের প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ এই বায়ুদূষণজনিত কারণেই অকালে মারা যাচ্ছে। এরপর যারা বেঁচে রয়েছে, তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যা ও অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, বর্তমানে বিশ্ব জুড়ে খুন, ধর্ষণ, রাহাজানি, প্রতারণা, চুরি, ভাঙচুর থেকে শুরু করে পড়ুয়াদের স্কুল পালানোর মতো অপরাধের মূলে বায়ু দূষণের অদৃশ্য হাত রয়েছে।
২০১১ সালে গবেষণাটা শুরু করেছিলেন ” লণ্ডন স্কুল অব্ ইকোনমিক্স”-এর শিক্ষক সেফি রথ। তিনি দেখেন, পরীক্ষার দিনে যেসব এলাকায় বায়ু দূষণের মাত্রা বেশি ছিল, সেইসব এলাকার পরীক্ষার্থীরা পিছিয়ে থেকেছে।
এরপর ২০১৬ সালে রথ ও তাঁর সঙ্গীরা লণ্ডনে ২ বছরে ৬০০ ইলেকটোরাল ওয়ার্ডে সমীক্ষা চালিয়ে দেখলেন, যেসব দিনে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি ছিল, সেইসব দিনগুলোতে ভয়ংকর অপরাধ ঘটেছে। তাঁরা আরও দেখলেন, দূষিত বায়ু যেদিকে যাচ্ছে, অপরাধ সেইদিকেই বাড়ছে।

লণ্ডনের পর এবার গবেষণা চলে আমেরিকায়। ২০১৮ সালে আমেরিকার “ম‍্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব্ টেকনোলজি”-র গবেষক জ‍্যাকসন লু একটানা ৯ বছর ধরে এ নিয়ে গবেষণা করে দেখলেন, বায়ুদূষণ এলাকাতেই খুন-ধর্ষণ-ডাকাতি বাড়ছে। জ‍্যাকসন লু ও তাঁর সহকর্মীরা দেখেছেন, বায়ুদূষণের প্রভাবে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনার ব‍্যাঘাত ঘটায়। আমেরিকান ও ভারতীয়–দু’দেশের মানুষকে নিয়েই তাঁরা এই গবেষণা করেন।
আবার সাউথ ক‍্যালিফোর্ণিয়া ইউনিভার্সিটির গবেষক ডায়ানা ইউনান ও তাঁর সহকর্মীরা গবেষণা করে জানান, ছোটখাটো চুরি, ভাঙচুর, প্রতারণা, পড়ুয়াদের স্কুল পালানোর মতো ঘটনার জন্য দায়ী বায়ুদূষণ।
গবেষণা বলছে, দূষিত বায়ুতে শ্বাস নিলে প্রয়োজনের চেয়ে কম অক্সিজেন মস্তিষ্কে পৌঁছায়। ফলে মস্তিষ্কে স্নায়বিক সংযোগের ক্ষেত্রে ক্ষতি হয়। আমাদের বিবেক-বিবেচনাবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের যে প্রি-ফ্রন্টাল লোবের ভূমিকা থাকে, সেই অংশেরই ক্ষতি হয়। এর ফলে মানুষের বিবেক-বিবেচনা-মনুষ্যত্ববোধ সবকিছুই এলোমেলো হয়ে যায়। দূষিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে তাই দেখা যায় উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা। এর ফলে তাদের মধ্যে স্বার্থপরতা ও অপরাধপ্রবণতা ভীষণভাবে বেড়ে যায়। শুধু মস্তিষ্কই নয়, মানুষের নাক-কান-গলা থেকে শুরু করে ফুসফুসের ওপরেও প্রভাব ফেলে বায়ুদূষণ। দূষিত এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে তখন জৈবিক পরিবর্তন ঘটে এবং এই পরিবর্তনের ফলেই মানুষ হয়ে যায় অপরাধপ্রবণ অমানুষ।
এক সমীক্ষায় জানা গেছে,বিশ্বের ১০২ টি শহরের মধ্যে গত ৫ বছরে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়েছে শহর কলকাতায়। সুতরাং , এই দূষণ কমাতে না পারলে তিলোত্তমা কলকাতা আগামীদিনে অপরাধ-নগরী হয়ে উঠলে আশ্চর্যের কিছু নেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here