বাল্মীকি কোনোদিন দস্যু রত্নাকর ছিলেন না।

    0
    rishi Valmiki

    Last Updated on


    –উত্তম মণ্ডল


    কবি কৃত্তিবাসের লেখা বাংলা রামায়ণ পড়ে এতদিন আমরা জেনে এসেছি, বাল্মীকি প্রথম জীবনে ছিলেন “দস্যু রত্নাকর।” এই ঘোরতর পাপী মানুষটির মুখ দিয়ে কিছুতেই রামনাম বেরোচ্ছিল না। অনেক ঘটনার পর অবশেষে ব্রহ্মার বরে অনেক বছর “মরা ” “মরা” জপতে জপতে তবে তার মুখ থেকে “রাম” “রাম” বেরিয়েছিল। আর এই রামনাম জপতে জপতে তাঁর শরীরে তৈরি হয়ে যায় উইঢিপি। উইয়ের আরেক নাম “বল্মীক”, আর তা থেকেই দস্যু রত্নাকরের নাম হয়ে গেল বাল্মীকি মুনি। এরপর বাল্মীকি রচনা করেন রামায়ণ মহাকাব‍্য।
    এবার থামতেই হচ্ছে। কারণ, কবি কৃত্তিবাস নিজেই বলছেন,
    “নাহিক এসব কথা বাল্মীকি বচনে ।
    বিস্তারিত লিখিত অদ্ভুত রামায়ণে ।।”
    এখন প্রশ্ন, কৃত্তিবাস এসব তথ্য তাহলে পেলেন কোথায় ?
    এ প্রসঙ্গে আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, স্কন্দপুরাণ অনুসারে বাল্মীকির শৈশব থেকে যৌবনকাল কেটেছিল অরণ্যবাসী কিরাত সম্প্রদায়ের লোকজনদের সঙ্গে। পরবর্তীকালে তিনি আর্য শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে ব্রাহ্মণ হোন। স্কন্দপুরাণ অনেক পরের লেখা। কৃত্তিবাস স্কন্দপুরাণের এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়েছেন, বলা যায়।
    বাল্মীকি ছিলেন ভৃগুবংশজাত, যে বংশের বিখ্যাত ঋষিরা হলেন চ‍্যবন, ঋচিক, জমদগ্নি ও পরশুরাম। সম্ভবত বাল্মীকি ছিলেন ঋষি চ‍্যবনের উত্তরসূরী।

    আরও পড়ুন :রাষ্ট্রদ্রোহী “দেবতা” পরশুরাম, বিবর্তনবাদ ও ভারতের কৃষি সভ‍্যতা


    পৌরাণিক তথ্য অনুসারে, বাল্মীকি ছিলেন দেবতা বরুণের ঔরসজাত ভৃগুবংশীয় আর্যপুত্র। প্রথমথেকেই তাঁর কবিখ‍্যাতি ছিল এবং সেজন্য ব্রহ্মা তাঁকে রামায়ণ রচনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাই আদি পুরাণে বাল্মীকি প্রথম থেকেই ঋষি হিসেবেই পরিচিত। কোথাও তাঁর নাম “দস্যু রত্নাকর” নয়।
    আর কৃত্তিবাসী রামায়ণের সব লেখাও কৃত্তিবাসের নয়। অনেক কবির লেখা কৃত্তিবাসের সঙ্গে জুড়ে গেছে। “বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ” থেকে একবার চেষ্টা হয়েছিল, প্রক্ষেপের প্রলেপ থেকে মূল কৃত্তিবাসী রামায়ণকে উদ্ধারের। এ কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় ড: হীরেন্দ্রনাথ দত্তকে। এরপর বিশেষ বিবেচনার পর “বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ” প্রকাশ করে “অয‍্যোধ‍্যা” ও “উত্তর কাণ্ড।” কিন্তু পণ্ডিতমহলে তা গ্রাহ‍্য হয়নি বলে সে উদ্যোগের সেখানেই ইতি ঘটে।
    আচার্য সুনীতিকুমার জানান, বাল্মীকি তাঁর রামায়ণ রচনা শেষ করেন খ্রিস্ট পূর্ব সপ্তম শতকের মাঝামাঝি সময়ে। রামায়ণের উত্তর কাণ্ডেই রয়েছে ইতিহাস। মূল রামায়ণ বাল্মীকির একক রচনা। সেখানে প্রক্ষিপ্ত কম।
    বাল্মীকি ছিলেন রাজা দশরথের সমসাময়িক। তাই রাম জন্মের আগে রামায়ণ তৈরি হয়নি। বাল্মীকি রামায়ণেই বলা হচ্ছে,
    “প্রাপ্তরাজ‍্যস‍্য বাল্মীকির্ভগবান্ ঋষি: ।
    চকার চরিতং কৃতস্নং বিচিত্রপদমর্থবৎ ।।”
    অর্থাৎ রামের রাজ‍্যাভিষেকের পরেই রচিত হয় রামায়ণ।

    আরও পড়ুন :আর্যরা অনুপ্রবেশকারী নন, ভারতের ভূমিপুত্র এবং হরপ্পা সভ‍্যতা আর্য সভ‍্যতারই অঙ্গ।


    মূল রামায়ণে ছিল চব্বিশ হাজার শ্লোক। পাঁচশো সর্গ এবং ছয়টি কাণ্ডে বিভক্ত ছিল কাব‍্যটি। মূল রামায়ণে দেখা যাচ্ছে,
    “চতুর্বিংশৎ সহস্রাণি শ্লোকানামুক্তবান্ ঋষি: ।
    তথা সর্গ শতান্ পঞ্চ ষটকাণ্ডানি তথোত্তরম্ ।।”
    পরে রামায়ণের মূল রচনার সঙ্গে জুড়ে যায় “সুন্দর কাণ্ড।”
    সুতরাং, বাল্মীকি জন্মেছিলেন ভৃগু ঋষির কুলে, তিনি ছিলেন প্রথম থেকেই কবি এবং কোনোদিন “দস্যু রত্নাকর” ছিলেন না। আর সেসব জেনে কবি কৃত্তিবাস নিজেই সেকথা বলে গেছেন,
    “নাহিক এসব কথা বাল্মীকি বচনে।”
    এবার আমাদের বলতেই হয়, বাল্মীকি কোনোদিন দস্যু রত্নাকর ছিলেন না। তার দরকারও ছিল না। কারণ, বাল্মীকি ঋষিই ছিলেন এবং প্রথম থেকেই তাঁর কবি-প্রতিভা ছিল, যার অসামান্য প্রকাশ তাঁর রচিত রামায়ণে।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here