বীরভূমের দুই বীররাজা ও এক রাজনগর

    2
    Rajnagar,Birbhum

    Last Updated on


    —- উত্তম মণ্ডল                                                                      

    শুরুতেই শিরোনাম দেখে অনেকেই দ্বিধায় পড়তে পারেন, আবার অবাক হয়ে যেতে পারেন কেউ কেউ। আর বীরভূমে দুই বীররাজার ‘মিথ্’ যেভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে এক ব‍্যক্তিতে পরিণত হয়ে দীর্ঘকাল ধরে মানুষের বিশ্বাসে আটকে রয়েছে, সেই প্রচলিত ভুল বিশ্বাসকে ভেঙে সত‍্যের সন্ধানে আজ রাজনগরের দিকে এই নগণ্য কলমচির যাত্রা।…                                 
        যাত্রাপথের শুরুতেই দেখতে পাচ্ছি, খৃষ্টিয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর  ঐতিহাসিক  মিনহাজ  উদ্দিনের লেখা “তবকৎ-ই-নাসিরি”-তে উল্লিখিত রয়েছে, সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইয়ূজ খিলজি, যিনি ১২১১ খৃষ্টাব্দ থেকে ১২২৬ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন, তিনি লক্ষ্মণাবতী থেকে দেবকোট ( দিনাজপুর) পর্যন্ত একটি রাস্তা তৈরি করেন। আর এই রাস্তার ধারেই ছিল রাজনগর—অতীতের “লখনোর।” এই “লখনোর” আসলে হলো “লক্ষ্মণনগর।” বাংলার সেনবংশীয় রাজা লক্ষ্মণসেন পাল রাজাদের হাত থেকে রাজনগর দখল করে নিজের নামে এই স্থানের নামকরণ করেছিলেন ” লক্ষ্মণনগর।” এই লক্ষ্মণনগর-ই  মিনহাজউদ্দিনের লেখায়  ঊর্দুতে হয়ে  গেছে “লখনোর।” ঐতিহাসিক আচার্য যদুনাথ সরকার এই “লখনোর”-কে বতর্মান “রাজনগর” হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। এল এস এস ও’ম‍্যালি “ভবিষ‍্য পুরাণ”-এর “ব্রহ্মখণ্ড” অধ‍্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে এ এলাকার একটি জনবসতিপূর্ণ স্থানের সন্ধান দিয়েছেন। এলাকাটি দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল, একটি হলো, ভাগীরথী ও দ্বারকেশ্বরী নদীর পশ্চিমে নারিখণ্ড ( ঝাড়িখণ্ড) ,যা পশ্চিমে পঞ্চকূট পর্বত থেকে উত্তরে কীকট পর্যন্ত  বিস্তৃত ছিল। এই ভাগের মধ্যে ছিল বৈদ‍্যনাথ ধাম। অন্য ভাগটি  “বীরভূমি” নামে পরিচিত ছিল, যেখানে অবস্থিত ছিল বক্রেশ্বর ধাম। এই ভাগের মধ্যে ছিল অজয় নদ। এই বিবরণ থেকে ও’ম‍্যালি এই সিদ্ধান্তে এসেছেন, নগর ( রাজনগর ) ছিল হিন্দু রাজাদের রাজধানী এবং দেশটি পরিচিত ছিল বীরদেশ বা বীরভূমি নামে, যা আজকের”বীরভূম।”                                         
       উড়িষ্যার গঙ্গো বংশীয় রাজা তৃতীয় অনঙ্গভীম ( খৃ ১২১১–১২৩৮ খৃ ) ছিলেন বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিনের সমসাময়িক।

    আরও পড়ুন :বীরভূমে অবহেলায় দাঁড়িয়ে এখনও হুল বিদ্রোহীদের জন্য ব্রিটিশ সরকারের জীবন্ত “ফাঁসি কাঠ” ঐতিহাসিক গাবগাছ।

    সেনরাজ বল্লালসেনের সময়( আ ১১৫৯–৭৯ খৃ ) পর্যন্ত মেদিনীপুর অঞ্চল উড়িষ্যার গঙ্গো বংশীয় রাজাদের অধীন ছিল। ১২০২ খৃ বখতিয়ার খিলজির নদীয়া বিজয়ের পর লক্ষ্মণসেনের পূর্ববঙ্গে পলায়নের পর থেকেই রাঢ়ের রাজনগর ছিল উড়িষ্যার গঙ্গো রাজাদের দখলে। সুলতান গিয়াসউদ্দিন বীরভূমের এই দক্ষিণ অংশ থেকে তাদের উচ্ছেদ করতে পারেননি। তৃতীয় অনঙ্গভীমের পর উড়িষ্যার রাজা হোন তাঁর পুত্র প্রথম নরসিংহদেব ( খৃ ১২৩৮–১২৬৪ খৃ )। তিনি ১২৪৪ খৃষ্টাব্দে রাজনগরের পাঠান জায়গিরদার ফকর-উল-মুলুক করিমউদ্দিন ল‍্যাংঘ্রিকে পরাজিত ও নিহত করে দখল করে নিলেন সমগ্র রাঢ় এবং বীরভূম-বর্ধমান-মেদিনীপুরের রাঢ় অঞ্চল নিয়ে গঠন করলেন নতুন একটি প্রদেশ, নাম ” মান্দারণ প্রদেশ”, যার সদর দপ্তর হলো বর্ধমান। পূর্বতন সেনরাজাদের শাসক প্রতিনিধিদের নিয়ে তাদের আনুগত্যে উড়িষ্যারাজ প্রথম নরসিংহদেব রাজনগরসহ রাঢ়ে নিজের আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন। খৃষ্টিয় চতুর্দশ শতাব্দীতে এই রাজনগরে এক শক্তিশালী বীররাজার আবির্ভাব ঘটে, যিনি উড়িষ্যারাজের সহায়তায় রাজনগরে তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করে বীরত্বের সঙ্গে রাজত্ব করে গেছেন। বীরত্বের জন্য জনগণ তাঁকে ভূষিত করেছিল  “বীর রাজা” নামে। জনতার এই বীররাজা ছিলেন রাঢ়ী শ্রেণির ব্রাহ্মণ। রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ কূলজি গ্রন্থে বর্ণিত ইনিই সেই লখনোররাজ, যাঁর নাম ইতিহাসের অনেক চাপা পড়া পাতা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, রাজনগরের এই বীররাজার প্রকৃত নাম “বসন্ত চৌধুরী।”            এবার বীরভূমের আরেক বীররাজার কথা শুনুন। মগধের জরাসন্ধ বংশোদ্ভূত রাজ‍্যহারা তিন ভাই–বীরসিংহ, চৈতন্য সিংহ ও ফতেসিংহ, সুলতানি আমলে ভাগ‍্যান্বেষণে এই রাঢ় বাংলায় এসেছিলেন। কারো মতে, তাঁরা ছিলেন চার ভাই, চতুর্থজন মল্লার সিংহ, যাঁর নামে আজকের মল্লারপুর। সময়কাল খৃষ্টিয় ষোড়শ শতাব্দী। দিল্লির মসনদে তখন শের শাহ। বীরসিংহ বীরসিংহপুরে, চৈতন্য সিংহ চৈতন গাঁয়ে এবং ফতেসিংহ ফতেপুরে ( মুর্শিদাবাদ) আপন আপন রাজধানী স্থাপন করে রাজ‍্যশাসন করছিলেন। চৈতন্য সিংহের রাজধানী ছিল ব‍র্তমান সিউড়ি থানায় চৈতন গাঁ, যা লোকমুখে এখন হয়েছে “খটঙ্গা।”

    আরও পড়ুন :গ্রামের বাইরে পঞ্চপাণ্ডবদের অস্ত্র চুরি গেলেও বীরভূমের বৈদ‍্যনাথপুর গ্রামে আজও কোনো ডাকাত পড়েনি

    অন‍্যদিকে, সিউড়ি-আমজোড়া বাদশাহি সড়ক ধরে ছ’মাইল উত্তর-পশ্চিমে ময়ূরাক্ষীর পূর্ব তীরে “বীরপুর”-এ নিজের রাজধানী স্থাপন করেন জ‍্যেষ্ঠ ভ্রাতা বীরসিংহ। বীরসিংহের নামে বীরপুর হলো “বীরসিংহপুর।” অনেকে এই বীরসিংহের নাম থেকেই এ জেলার নাম “বীরভূম” হয়েছে বলে দাবি করেন। কিন্তু এ মত ঠিক নয়। কারণ, বীরসিংহ ছিলেন জমিদার শ্রেণির রাজা। কাজেই তাঁর নামে নিজের এলাকার নাম হতে পারে, কিন্তু যে অঞ্চলের তিনি অধীশ্বর নন, সেই গোটা  বীরভূমের নাম তাঁর নামে হতে পারে না। যাই হোক, ঘোর জঙ্গলাকীর্ণ এই অঞ্চলে সুলতানি আমলের শেষ দিকে “ঝাড়বান্দি” দস্যুদের ভীষণ উপদ্রব হয়েছিল। আসলে এরা ছিল বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজিত খিলজি সর্দার ও তাদের দলবল। প্রাণ বাঁচাতে সে সময় এরা দুর্গম পাহাড় জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার কোনও উপকরণ এদের ছিল না। তাই খাবারের সন্ধানে মাঝে মধ্যে এরা পাহাড় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে সমতলভূমির গ্রামগুলোতে আক্রমণ চালাতো। এদের দমন করতে শের শাহ সিউড়ির শাসনভার তুলে দেন তাঁর এক বিশ্বস্ত কর্মচারি আবদুল্লাহর হাতে। জনশ্রুতি অনুসারে,আবদুল্লাহ এই বীরসিংহের মাধ্যমেই ঝাড়বান্দি দস‍্যুদের দমন করেছিলেন। কিন্তু এদের দমন করতে গিয়ে একটি যুদ্ধে নিহত হলেন বীরসিংহ। নিগৃহীতা হবার আশঙ্কায় রাজা বীরসিংহপুরের রাণি পুকুরের জলে ডুবে আত্মহত্যা ক‍রলেন। সে পুকুর এখন “রাণিদহ” নামে খ‍্যাত।

    আর রাজা বীরসিংহের কীর্তির মধ্য রেখে যাওয়া কালো গ্রাণাইট পাথরে খোদিত একখানি অপূর্ব কালীমূর্তি, যা বীরসিংহের কালী বা মগধেশ্বরী কালী নামে আজও বিরাজমানা।                              
       যাই হোক, এই হলো বীরভূমের দুই বীররাজার কথা। অনেকেই এই দুই বীররাজাকে বেমালুম এক করে দিয়েছেন। কিন্তু সময়ের বিচারেই তাঁরা ভিন্ন ব‍্যক্তি। রাজনগরের বীররাজা ছিলেন রাঢ়ী শ্রেণির ব্রাহ্মণ,সময়কাল খৃষ্টিয় চতুর্দশ শতাব্দী, আসল নাম–বসন্ত চৌধুরী। অন‍্যদিকে, ক্ষত্রিয় বংশোদ্ভূত বীরসিংহপুরের রাজা বীরসিংহের সময়কাল খৃষ্টিয় ষোড়শ শতাব্দী। বীরভূমের এই দুই “বীররাজা” এক রাজনগরের মাটিতে মিলেমিশে একাকার হয়ে “মিথ্”  হয়ে গেছেন। ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে।

    2 COMMENTS

    1. ঐতিহাসিক তত্ত্ব ও তথ্যকে জনগোচরে আনার জন্য লেখক উওম কে অসংখ্য ধন্যবাদ।এর আগে আমি ও এক আধটুকু লিখেছিলা, যার সবটুকুই ছিল প্রবাদ নির্ভর।কেউ কেউ এই রাজানগরের ইতিহাসকে অজ্ঞের মত অন্যখাতে প্রবাহের চেষ্টা করে।উত্তমের এই লেখার পার সম্ভবত সেই অজ্ঞতার অন্ধকার কেটে যাবে।আবারো বলি,সত্য ইতিহাসকে গোচরে আনার জন্য উত্তমকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here