পশ্চিমবঙ্গ ইসরায়েল নয়, ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ তৈরি করার পথে বাধা বাঙালিরাই

    0
    NRC and undivided bengal

    Last Updated on

    শেখর ভারতীয়

    ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট যারা বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সমালোচনা করেছিলেন, পরবর্তীকালে তাঁদের একটি বড় বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। অবশ্যই একটি কারণে, তাঁরা হিন্দু। ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্টের পর পূর্ব পাকিস্তান এবং এখনকার বাংলাদেশ থেকে জলের তোড়ের মতোই হিন্দুরা ভারতে এসেছেন, আসছেন। বাংলাদেশ হওয়ার আগে পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৭১ এর আগে সে দেশটির সঙ্গে ভারতের জনবিনিময় চুক্তি ছিল। তবে এই জনবিনিময় চুক্তিটি কিরকম? দেশভাগ হওয়ার সময় যে সমস্ত হিন্দুরা ভয়ে বা অত্যাচারিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলেন তাঁরা নিজের দেশ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে ফিরতে পারবেন এবং একই নিয়ম ছিল ভারতীয় মুসলিমদের জন্য। নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলির মধ্যে হওয়া এই চুক্তি থাকলেও পূর্বপাকিস্তান থেকে আসা অত্যাচারিত হিন্দুরা কখনোই আবার পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সাহস দেখাননি। শ্যামপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পূর্ববঙ্গের বাঙালি হিন্দুর খারাপ অবস্থার কথা আগাম অনুধাবন করতে পেরেছিলেন বলেই হয়ত তিনি পশ্চিমবঙ্গকে, ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ বানাতে চেয়েছিলেন। যা তৎকালীন বাংলার কমিউনিস্ট ও কংগ্রেসীদের জন্য সম্ভব হয়নি।

    পরেও আর পশ্চিমবঙ্গকে ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ ঘোষণা করার কোনও রকম প্রচেষ্টা করা হয়নি। অন্যদিকে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি তৈরিই হয়েছিল সারাবিশ্বের ইহুদীদের জায়গা দেওয়ার জন্য। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সময় ইসরায়েলের মূল আদর্শ ছিল বিশ্বের যে কোনও প্রান্তে থাকা ইহুদিদের আশ্রয়স্থল। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এরকম কোন ঘোষণা আনা সম্ভব হয়নি। যার জন্য ‘পশ্চিমবঙ্গ বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ এ দাবি দেশের হিন্দুত্ববাদীদের কাছে মানবিক হলেও সংবিধানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

    এখনও কিছু বাঙালি এবং তাদের সংগঠনই সবচেয়ে বড় বাধা পশ্চিমবঙ্গকে ‘বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড’ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে। তারা প্রচার করছে পশ্চিমবঙ্গ ভাষার ভিত্তিতে গঠিত রাজ্য। যা সর্বৈব মিথ্যা। স্বাধীন ভারতে প্রথম ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগঠন সংক্রান্ত আলোচনার জন্য ১৯৪৮ সালে এস কে ধর কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৪৮ সালেই আর একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং জওহরলাল নেহরু। কমিটির নাম ” জেভিপি কমিটি”
    জে= জওহরলাল
    ভি= বল্লভ ভাই প্যাটেল (পটেল)
    পি= পট্টভি সীতারামাইয়া।
    ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠন নিয়ে এই কমিটি অস্বীকৃত হয়। এর পর ১৯৫৩ সালে ‘ফজল আলি কমিশন’ (রাজ্য পুনর্গঠন কমিটি) গঠন করা হয়। এই কমিশন প্রথম ভাষার ভিত্তিতে রাজ্য পুনর্গঠনকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন আইন গঠিত হয়। মূলত ১৯৫৩ সালের পর ভারতে বেশ কয়েকটি রাজ্য ভাষার ভিত্তিতে গঠিত হয়। অন্ধ্রপ্রদেশ তার একটি। এখন এইসব ঘটার আগেই আমাদের বাংলার (পশ্চিমবঙ্গের) জন্ম হয়ে গেছে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট (২২জুন প্রস্তাবের স্বীকৃতি মিলেছিল)। এখানে প্রশ্ন উঠবে তাহলে কিসের ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গ গঠিত হয়েছিল? সহজ উত্তর, যে ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছিল। অর্থাৎ দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে এগোলে স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি হিন্দুর অধিকার স্বীকৃত হত। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ ভাষার ভিত্তিতে গঠিত রাজ্য। এর উদ্দেশ্য? রাজ্যে ২৫ শতাংশ বাংলাভাষী মুসলিমদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এটি করতে গিয়েই একশ্রেণীর বাঙালি ও তাদের সংগঠন লক্ষ লক্ষ হিন্দু বাঙালির দুয়ারে কাঁটা ফেলতে চাইছেন। সোশ্যাল মিডিয়াতে অনেকেই এই সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলেন। অনেকের মতে বাঙালির বন্ধু রূপে আত্মপ্রকাশ করা এই সংগঠনগুলি উগ্রবাদী সংগঠন জামাতের টাকায় চলে। এবার যদি এদের প্রশ্ন করেন ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গের ভাষা এক ছিল। তাহলে ভাষার ভিত্তিতে পূর্বপাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গ ভাগ হল কিভাবে? তার উত্তর এই সংগঠনের কেউ দেবেন না। স্বভাবতই এটা স্পষ্ট যে পশ্চিমবঙ্গকে বাঙালি হিন্দুর হোমল্যান্ড বানানোর পথে সবচেয়ে বড় বাধা একাংশের বাঙালিরাই!

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here