তন্ত্রক্ষেত্র তন্ত্রেশ্বর : পঞ্চপাণ্ডবের স্মৃতি আঁকড়ে ইতিহাসের এক বধ‍্যভূমির ঠিকানা ঝাড়খণ্ড

    1

    Last Updated on

    উত্তম মণ্ডল

    বীরভূম জেলার ঝাড়খণ্ড লাগোয়া প্রান্তিক অঞ্চল  রাজনগর থেকে ১২ মাইল উত্তরে বয়ে চলেছে সিদ্ধনালা বা সিদ্ধেশ্বরী নদী। সিদ্ধেশ্বরী মিশেছে ময়ূরাক্ষীতে। এই সিদ্ধেশ্বরীর পাড়েই অবস্থিত প্রাচীন তন্ত্রক্ষেত্র তন্ত্রেশ্বর। স্থানটি একসময় বীরভূমের অংশ ছিল, তারপর&১৮৫৫ খৃষ্টাব্দে সাঁওতাল বিদ্রোহের পর বৃটিশরা এটিকে তদানীন্তন বিহার রাজ‍্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে গঠন করে “সাঁওতাল পরগনা।” তন্ত্রেশ্বরের আশেপাশে রয়েছে আদিবাসী সাঁওতাল জনজাতির বাস। বর্তমানে এটি ঝাড়খণ্ডের অধীনে। জনশ্রুতি, মহাভারতের পঞ্চপাণ্ডবরা মাতা কুন্তিসহ তাদের অজ্ঞাতবাসপর্বে কিছুকাল এখানে ছিলেন।এখানে জৈনদের একটি স্তূপ আছে। এই তন্ত্রক্ষেত্রের অধীশ্বর হিসেবে রয়েছেন তন্ত্রেশ্বর শিব। এই শিব মন্দিরের বারান্দার দেওয়ালে গাঁথা রয়েছে একটি প্রাচীন মূর্তি। রাজনগরের বীর রাজার রাজবাড়ির ইঁটের সঙ্গে এখানকার ভাঙা মন্দিরের ইঁটের আকার ও গঠনগত মিল রয়েছে। এ থেকে বলা যায়, রাজনগরের বীর রাজার সময়েই এই তন্ত্রেশ্বর শিবের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বীর রাজার সময়কাল খৃষ্টিয় চতুর্দশ শতাব্দী। বড়ো পাথর কেটে তৈরি হয় তন্ত্রেশ্বর শিবলিঙ্গ। এটি অনাদি লিঙ্গ‌। প্রাকৃতিক ভূমিকম্প থেকে গলিত লাভা ক্রমশ জমে শিলায় পরিণত হয়েছে। তাই মাটির নিচে ৩০ ফুট খুঁড়েও এই শিবলিঙ্গের মূল খুঁজে পাওয়া যায় নি। এখানে আরও ৭/৮ টি মন্দির ছিল। আর তন্ত্রেশ্বর শিবের দক্ষিণে একটি বড়ো বটগাছের নিচে  ছিল একটি বড়ো কালী মন্দির। কারো মতে, দুর্গা মন্দির। তবে কালী মন্দির হওয়াটাই  স্বাভাবিক। কারণে, এটি ছিল “মশান” অর্থাৎ বধ‍্যভূমি। আর বধ‍্যভূমিতে কালীমন্দিরে মা কালীর সামনে জল্লাদ মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত আসামির মুণ্ডুচ্ছেদ করতো‌। তাই এটি কালীমন্দির ছিল , তা বলাই যায়। কিছুটা দূরেই মশানজোড় ও তরণী পাহাড়। সুতরাং, এখানে “মশান” শব্দ এখনো প্রচলিত রয়েছে স্থাননামে। বর্তমানে এই মাতৃমন্দিরের ভিতের ওপর কলকাতার উৎসাহী ভক্তদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ” দ্বাপরেশ্বর শিবমন্দির।” মায়ের স্থান তাই এখন বাবার দখলে। এখানকার সব স্থাপত্য কালাপাহাড় ধ্বংস করেছিল বলে জনশ্রুতি। এই কালীমন্দিরের ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি টুকরো টুকরো করে ভাঙা  মূর্তি উদ্ধার হয় এবং সেটিকে বতর্মান তন্ত্রেশ্বর শিবমন্দিরের বারান্দার উত্তর দিকের দেওয়ালে গেঁথে দেওয়া হয়। এটিকে কেউ কেউ বলেন, জৈন তীর্থংকর পার্শনাথের মূর্তি। আজ থেকে প্রায় ৬৫ বছর আগে বর্তমান ঝাড়খণ্ডের বাঁশকুলি গ্রামের রামভরত ও প্রহ্লাদ মাড়োয়ারির যৌথ চেষ্টায় নতুন করে তৈরি হয় তন্ত্রেশ্বর শিবমন্দিরটি। সে সময় শিবলিঙ্গটিকে বহু চেষ্টা করেও মাটি থেকে তোলা যায়নি। তাই পুরোনো শিবলিঙ্গটিকেই আধখানা অবস্থায় রেখে দেওয়া হয়।                                                                         তন্ত্রেশ্বরের চলতি নাম “তাঁতলয়।” তন্ত্রেশ্বর শিবের  দক্ষিণে একটি নালায় রয়েছে গরম জলের স্রোত। তাপমাত্রা ৭৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে ১৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির দিন একদিনের এক জমজমাট গ্রামীণ মেলা বসে এখানে। এখানে রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের একটি হিলিয়াম ল‍্যাবরেটরি।  বেশ কয়েক বছর আগে ধানবাদ জিওলজিক্যাল সার্ভে অব্ ইণ্ডিয়া-র উদ্যোগে তাতলয় এলাকায় ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা চালানো হয়। তাতে জানা যায়, অদূরে ছোটনাগপুরের মালভূমি হলো প্রথম ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা, তারপর এই তন্ত্রক্ষেত্র তন্ত্রেশ্বর। এখানকার মাটির নিচের উষ্ণ প্রস্রবণের সঙ্গে বীরভূমের শৈবক্ষেত্র বক্রেশ্বরের উষ্ণ প্রস্রবণের যোগ আছে। তবে যতদিন এখান থেকে গরমজল বেরোচ্ছে, ততদিন এলাকায় ভূমিকম্পের কোনো সম্ভাবনা নেই‌। তবে এই উষ্ণ প্রস্রবণের স্রোত কোনোদিন থেমে গেলেই সেদিন ঘটতে পারে ভূ-বিস্ফোরণ। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এখনই তন্ত্রক্ষেত্র তন্ত্রেশ্বর ঝাড়খণ্ডের একটি আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতেই পারে।…

    1 COMMENT

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here