অবহেলায় পড়ে বীরভূমের পাইকরে পালযুগের শিলালিপি।

    0
    stone scriptures of birbhum

    Last Updated on

    —উত্তম মণ্ডল

    পালরাজ প্রথম মহীপালের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নয়পালদেব মগধ বিজয় সম্পূর্ণ করে ছুটে আসেন গৌড়-বঙ্গ জয় করতে। সে সময় উত্তর রাঢ়ের রাজা ছিলেন চেদিরাজ কর্ণদেব। কর্ণের মূল রাজধানী ছিল নর্মদার তীরে ত্রিপুরী নগরে।পিতা গৌড়ধ্বজ গাঙ্গেয়দেব ছিলেন দিগ্বিজয়ী বীর। মহামহোপাধ‍্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নেপাল থেকে আনা একখানি রামায়ণের পুঁথির পুষ্পিকা থেকে জানা যায়, ১০০২ খ্রিস্টাব্দে ধঙ্গদেব আক্রমণ করেছিলেন রাঢ়বাংলা। এর কিছুকাল পরেই পালরাজ প্রথম মহীপাল যুদ্ধ ঘোষণা করেন গৌড়ধ্বজ গাঙ্গেয়দেবের বিরুদ্ধে। ইতিহাসখ‍্যাত এই গাঙ্গেয়দেব ১০১৯ খ্রিস্টাব্দ সময়ে নর্মদাতীরভূমির অধীশ্বর ছিলেন। এই গাঙ্গেয়দেবের পুত্র কর্ণদেব বা লক্ষ্মীকর্ণ কিছুকাল প্রাচীকোট নগরে থেকে এলাকার শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এই প্রাচীকোট হলো বর্তমানে বীরভূমের পাইকর গ্রাম।
    এখানেই অযত্ন, অবহেলা আর সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে জেলা বীরভূম তথা বাংলার ইতিহাসের এক প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণ—পালরাজ নয়পালদেব ও চেদিরাজ কর্ণের যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পাইকর শিলালিপি। স্থানের নাম আগে ছিল “প্রাচীকোট।” এলাকার সামন্তরাজ এবং সেনরাজ বিজয়সেনের মন্ত্রী পাহি দত্তের নামে একে বলা হতো “পাহিকোট।” পরে বর্তমানে তা থেকে নাম হয়েছে “পাইকর।”

    আরও পড়ুন :রাষ্ট্রদ্রোহী “দেবতা” পরশুরাম, বিবর্তনবাদ ও ভারতের কৃষি সভ‍্যতা


    এলাকার অধিকার নিয়ে সেনরাজ নয়পালদেবের সঙ্গে যুদ্ধ হয় চেদিরাজ কর্ণ বা লক্ষ্মীকর্ণের। বিক্রমশীলা মহাবিহারের অধ‍্যক্ষ অতীশ দীপংকরের মধ‍্যস্থতায় উভয়পক্ষের মধ্যে সন্ধি হয় এবং যে স্থানে এই সন্ধি হয়, তার নাম “মিত্রপুর।” সন্ধির শর্ত অনুযায়ী, পালরাজ নয়পালের পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের সঙ্গে চেদিরাজ কর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীর বিবাহ হয়েছিল। পাইকরের কাছে মিত্রপুরেই বসেছিল এই বিবাহ-বাসর, এমনটা বলাই যায়।
    কন‍্যাদানের পর নবদম্পতির শুভকামনায় চেদিরাজ কর্ণদেব পাইকরে একটি মন্দির তৈরি করান এবং সেই মন্দিরের গায়েই উৎকীর্ণ হয়েছিল এই লিপি। কালের নিয়মে সে মন্দির এখন নিশ্চিহ্ন। তবে লিপিটি একটি স্তম্ভের গায়ে উৎকীর্ণ। আর রয়েছে একটি নৃসিংহ মূর্তি। ক্ষেত্রসমীক্ষায় মন্দিরের খোঁজ মেলেনি, তবে এলাকাটি “নারায়ণ চত্বর” নামে পরিচিত। এলাকার নাম “নারায়ণ চত্বর” এবং নৃসিংহ মূর্তি প্রমাণ করছে, এখানে কাছাকাছি কোথাও নারায়ণ মন্দির ছিল। এখানে একটি পুকুর রয়েছে। আর পুকুর পাড়ে এই প্রাচীন শিলালিপির নিচে এলাকার মেয়েরা অরণ্যষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন।
    পালদের পর বাংলায় শুরু হয় সেনরাজত্ব। সেনরাজাদের রাজধানী ছিল বীরভূমের উত্তর প্রান্তে পাইকরের কাছেই বীরনগর। পালযুগের পর উত্তর রাঢ়ের বীরনগর থেকে রাজ‍্য বিস্তার করতে করতে সেনরাজ বিজয় সেন বরেন্দ্রভূমি ( বগুড়া ), বাংলা ও আসাম পর্যন্ত জয় করেন। তাঁর মন্ত্রী ছিলেন পাহি দত্ত, যার নামেই পাইকর গ্রামের নাম হয়। বিজয়সেন দক্ষিণ রাঢ়ের শূরবংশীয় রাজকন্যা বিলাসবতী দেবীকে বিয়ে করেন। এই বিলাসবতী দেবীর নামেই রয়েছে পাইকরের কাছে মুরারই থানার অধীনে বিলাসপুর গ্রাম। আর রাণী বিলাসবতী দেবীর নামে রয়েছে “রাণীদীঘি।”

    আরও পড়ুন :ভারতীয় ঐতিহ্যে অসুর


    সেনরাজ বিজয়সেন নারায়ণ মন্দিরের জন্য যে গ্রাম অর্থাৎ দেবরাজ‍্য উৎসর্গ করেছিলেন, তার নাম হয়েছিল “মুরারী।” আর এই “মুরারী” থেকেই নাম হয়েছে “মুরারই।” এলাকার রেলস্টেশনের নাম “মুরারই।”
    প্রাচীন বাংলা বঙ্কিম অক্ষরে উৎকীর্ণ খ্রিস্টিয় একাদশ শতকের এই লিপির বিশুদ্ধ পাঠোদ্ধার করেন ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মহাঅধিকর্তা ডি. বি. স্পুনার। লিপির পাঠ এইরকম :
    ১ম পংক্তি : শ্রীগণপতি।
    ২য় পংক্তি : ক্ষয়প্রাপ্ত, পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
    ৩য় পংক্তি : দেবদ্বিজ গুরু ( ভজ:) ন্তরি দ্বয়ম ভক্তিনান্ত।
    ৪র্থ পংক্তি : নেহয়ন ( শ্রদ্ধ ) যা স্মিন কর্মনি রাজ শ্রীকর্ণদেব।
    ৫ম পংক্তি : ওঁ স্বস্তি সমৃদ্ধ রাজ‍্য শ্রীচেদীর ( আজ‍্য ) –শ্রীকর্ণদেব ( স‍্য ) জ‍্য নন্তরা কীর্তি প্রশস্তি।
    ৬ষ্ঠ পংক্তি : শ্রীবিশ্বকর্মা চরণ প্রসাদাৎ দেবীমূর্ত্তি নৃমিতপ্তীয় শ্রীকীর্ত্তি।
    এখানে বেশ কতকগুলি প্রাচীন মূর্তি রয়েছে। এছাড়া আরও কিছু প্রাচীন মূর্তি রয়েছে পাইকর গ্রামের মাঝে বুড়ো শিবের মন্দিরের ভেতরে। তবে সে মন্দিরের অবস্থাও বেশ শোচনীয়। এখানে ওখানে খসে পড়েছে ছাদের সিলিং। তার মধ্যে একটি পুষ্পিকায় উৎকীর্ণ রয়েছে :
    “মাষস‍্য ……
    মণ্ডল পাহীদত্তেন।”
    আবার এখানেই পালযুগের একটি ভগ্ন বাসুদেব মূর্তির পাদপীঠে উৎকীর্ণ রয়েছে :
    “পণ্ডিত বিশ্বরূপস‍্য …..।”

    দু:খের বিষয়, সম্পূর্ণ খোলা বটগাছের তলায় অবহেলায় পড়ে রয়েছে জেলার মূল্যবান এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শণ। আগেই বলেছি, এলাকার মহিলারা এই জায়গাটিতে এখন অরণ্যষষ্ঠীর ব্রত পালন করে থাকেন। নৃসিংহদেব মানুষের কাছে এখন হয়েছেন ষষ্ঠী ঠাকুরুণ !

    ছবি : ক্ষেত্রসমীক্ষায় বেরিয়ে সব ছবি লেখকের তোলা।

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here