শ্রীশ্রী সারদা মা ও আমজাদ সম্পর্ক কি আদৌ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে, না কি অন্য ইঙ্গিত।

    0
    Sarada Maa

    Last Updated on

    শ্রীশ্রী সারদা মা ও আমজাদ সম্পর্ক কি আদৌ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলে? না কি অন্য ইঙ্গিত।

    ॥ রামকৃষ্ণের ফৌজ ॥

    আমি ছোট বেলা শুনে আসছি মা সারদা ও আমজাদ সম্পর্কিত ঘটনাটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সর্বধর্ম সমন্বয়ের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বহু সন্ন্যাসী, বড় বড় বিদগ্ধ পণ্ডিতদের বলতে শুনেছি আমজাদ ও শ্রীশ্রী সারদা মায়ের সম্পর্ক ছিলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কিন্তু মনে রাখতে হবে অবতার আসেন “ধর্ম সংস্থাপন করতে” , সর্বধর্ম সমন্বয় করতে নয় বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি করতে নয়। সবাই একটু জানা যাক যে সারদা মা ও আমজাদ ঘটনা দুটি ঠিক কি ছিলো। সবাই আমজাদ সম্পর্কিত একটি ঘটনাই উল্লেখ করেন। দ্বিতীয় ঘটনাটি চেপে যান। আজ দুটো ঘটনাই আমি নীচে হুবহু তুলে দিলাম : –

    আরও পড়ুন:প্রকাশ্যে গোহত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন শ্রী শ্রী মা-ও

    ” জয়রাম বাটির কাছে শিরোমণিপুরে বহু মুসলমানের বাস। তাহারা পূর্বে তুঁতের (রেশম কীটের) চাষ করিত। বিদেশী রেশমের প্রতিযোগতায় তাদের ঐ ব্যাবসায় ক্রমশঃ নষ্ট হওয়ায় শেষে চুরি ডাকাতিই তাদের জীবিকা হইয়া দাঁড়ায়। পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকরা এই তুঁতে ডাকাতদের ভয়ে সর্বদা সন্ত্রস্ত থাকিত। কোন গ্রামের মধ্য দিয়া একটি তুঁতে কোন দিন চলিয়া গেলে গ্রামবাসীরা শীঘ্রই গ্রামে ডাকাতি হইবে মনে করিয়া সশঙ্ক থাকিত। মায়ের শেষ জীবনে যখন ভক্তদের যাতায়াত বাড়িতে থাকে, তখন মা মামাদের বাড়িতে থাকিলে ভক্তদের অসুবিধা হয় দেখিয়া পূজনীয় শরত্ মহারাজ শ্রীশ্রী মাএর ইচ্ছা অনুসারে তাঁহার জন্য নতুন স্থানে বাড়ি নির্মান করেন। সে বত্সর ওদেশে ভীষণ দুর্ভিক্ষ হওয়ায় আমরা বহু তুঁতে মজুর নিযুক্ত করিয়াছিলাম। গ্রামবাসীরা প্রথমে উহাতে ভয় পাইলেও শেষে বলিত, “মায়ের কৃপায় ডাকাতগুলো পর্যন্ত ভক্ত হয়ে গেল রে”। একদিন মা একটি তুঁতে মুসলমানকে (যে মায়ের বাড়ির দেওয়াল নির্মান করিয়াছিল) বাড়ির ভিতরে তাঁহার নিজের ঘরের বারান্দায় খাইতে দিয়াছেন। তাঁহার ভাইঝি নলিনী উঠানে দাঁড়াইয়া তাহাকে দূর হইতে ছুঁড়িয়া ছুঁড়িয়া পরিবেশ করিতেছিল। মা তাহা দেখিয়া বলিয়া উঠিলেন,”অমন করে দিলে মানুষের কি খেয়ে সুখ হয়? তুই না পারিস আমি দিচ্ছি”। খাওয়ার শেষে মা উচ্ছিষ্ট স্থানটি নিজেই ধুইয়া দিলেন। নলিনী মাকে ঐরূপ করিতে দেখিয়া, “ও পিসিমা, তোমার জাত গেল,” ইত্যদি বলিয়া বড়ই আপত্তি করিতে লাগিল। মা তাহাকে এই বলিয়া ধমক দিলেন, “আমার শরত্ (স্বামী সারদানন্দ) যেমন ছেলে, এই আমজাদও তেমন ছেলে”। তিনি যে জগতের মা। এইরূপ ব্যাবহারেই তো দূর্বল, অধম মানুষের প্রাণে বিশ্বাস আসিবে যে, সেও জগন্মাতার আপন সন্তান”।
    . “একদিন একজন তুঁতে মুসলমান কয়েকটি কলা আনিয়া বলিল, “মা, ঠাকুরের জন্য এইগুলি এনেছি, নেবেন কি”? মা লইবার জন্য হাত পাতিলেন; বলিলেন, “খুব নেব, বাবা দাও। ঠাকুরের জন্য এনেছ, নেব বই কি”। মায়ের সাংসারিক কার্যে সাহায্যার্থ নিকটবর্তী গ্রামের জনৈকা স্ত্রীভক্ত কাছেই ছিলেন। তিনি বলিলেন, “ওরা চোর, আমরা জানি, ওর জিনিস ঠাকুরেকে দেওয়া কেনো”? মা এ কথার কোন উত্তর না দিয়া মুসলমানটিকে মুড়ি মিষ্টি দিতে বলিলেন। সে চলিয়া যাইলে মা ঐ স্ত্রীভক্তটিকে তিরস্কার করিয়া গম্ভীর ভাবে বলিলেন, “কে ভাল, কে মন্দ আমি জানি”। আমরা দেখিতাম, যাহাকে কেহ দেখিতে পারেনা, মা ঠিক তাহাকেই আরও আদর যত্ন করিতেন। কেহ কোন গরহিত কার্য করিয়াও যদি তাঁহার নিকট অনুতপ্ত হইয়া যাইত, তিনি তাঁহাকে অভয় দিতেন”॥

    আরও পড়ুন:হিন্দুধর্ম অপমানিত হতে দেখলে স্বামীজী প্রতিবাদ করতেন, দুবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন

    . শুধুমাত্র এইটুকু জানলে মনে হবে ঘটনাটা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। কিন্তু এই ঘটনার পরেরটুকু জানলে ধারণা উল্টে যেতে পারে। আসলাম উপরের ঘটনার পরের অংশে।

    . ” একদিন জয়রামবাটী হইতে চিঠি আসিল যে, ঐ অঞ্চলের একটি লোক ডাকাতি করিতে গিয়া ধরা পড়িয়াছে। মা শুনিয়াই বলিতেছেন, “ও বাবা দেখলে? আমি জানতাম তার ডাকাতি-বৃত্তিটা নষ্ট হয়নি। আমি কি সাধ করে তাকে অত আদর করতাম, অত জিনিসপত্র দিতাম? তাই আমার বাধ্য হয়ে থাকত। আমার কাছে এলে কেঁচোটির মতো থাকত। এই সব মেয়ের পাল নিয়ে, ওদের অত গয়নাগাঁটি নিয়ে বাস করি। তোমরা কে কখন আছ, কিছুই ঠিক নেই। দুর্জনকে দূরে পরিহার, তা যে ভাবেই হোক”॥

    মা জানতেন যে ডাকাতটা শুধরাবার নয়। আশ্রমে মেয়েরা থাকতেন। তাঁদের গয়নাগাঁটি ছিলো। ডাকাতরা শুধু গয়নাগাঁটি লুট করেনা। ইজ্জতও লুণ্ঠন করতে পারে। ডাকাত তাড়াবার জন্য পুরুষরা সব সময় থাকতেন না। সারদা মা আশ্রমের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। এই সব সাত পাঁচ ভেবে ডাকাতগুলোকে দূরে পরিহার করার জন্য একটা পথ তিনি অবলম্বন করেন। আমজাদ সারদা মায়ের ব্যাপারটা সর্বধর্ম সমন্বয় বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ব্যাপার কি? যেটা রাজনৈতক নেতারা পথে ঘাটে বলে থাকেন। দুটি স্মৃতিকথা এক সঙ্গে জুড়ে পুনর্মূল্যায়ন করা হোক॥

    . সূত্র : শ্রীশ্রী মায়ের কথা ॥
    প্রথম ঘটনা পৃষ্ঠা — 194 ও 195 ॥
    . সাক্ষ্য দিচ্ছেন স্বামী অরূপানন্দ ॥

    দ্বিতীয় ঘটনা পৃ — 351
    . সাক্ষ্য দিচ্ছেন স্বামী ঈশানানন্দ ॥
    ॥ বেলুড় মঠ , উদ্বোধন কার্যালয় ॥

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here